০২ জুলাই ২০২২
`

সিলেটে বরাক মোহনায় ডাইক ভেঙ্গে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে

জেলার ৮৬ ইউনিয়ন বন্যায় প্লাবিত, কমেছে সুরমার পানি
সিলেটে বরাক মোহনায় ডাইক ভেঙ্গে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে। - ছবি : নয়া দিগন্ত

সিলেটের জকিগঞ্জের অমলশিদ এলাকায় বরাক মোহনায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর উৎসস্থলের একটি ডাইক (নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ) ভেঙ্গে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে। প্লাবিত হচ্ছে বিস্তীর্ণ এলাকা।

শুক্রবার (২০ মে) সকাল পৌনে ৯টার দিকে তীব্র পাহাড়ি ঢলের ধাক্কায় ডাইকটি ভাঙতে ভাঙতে ডাইকের কমপক্ষে ৬০ ফুট অংশ ভেঙ্গে গেছে। এ ভাঙনের ঘটনায় সিলেটের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ভারতের সীমান্তবর্তী বরাক নদের মোহনায় ডাইকটি ভেঙ্গে গেছে। এরপর মুহূর্তেই জকিগঞ্জ উপজেলার ফিল্লাকান্দি, অমলশিদ, বারঠাকুরী, খাসিরচক, খাইরচক, বারোঘাট্টা, সোনাসারসহ বেশ কিছু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। একইসাথে উপজেলা সদরের সাথে অমলশিদ যাতায়াতের রাস্তাটিও পানিতে ডুবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে এই রাস্তা দিয়ে যান চলাচল বন্ধ আছে।

এলাকাবাসী জানিয়েছেন, সিলেট থেকে প্রায় ৯২ কিলোমিটার দূরে জকিগঞ্জের অবস্থান। এটি জেলার সবচেয়ে দূরবর্তী উপজেলা। ভারতের করিমগঞ্জ জেলার বরাক নদের দুটি শাখা হচ্ছে সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারা নদী। এদের মিলনস্থল হচ্ছে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার অমলশিদ এলাকা। এই অমলশিদে একটি ডাইক আছে। বরাক থেকে পানি এসে প্রথমে সরাসরি এ ডাইকে আঘাত করে। এরপর পানি ভাগ হয়ে সুরমা ও কুশিয়ারায় প্রবাহিত হয়।

সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর মাধ্যমেই মূলত সিলেট বিভাগের প্রায় ১০০টি নদ-নদীতে পানি প্রবাহিত হয়। এখন ডাইক ভেঙ্গে যাওয়ায় পানি কোনো বাধা না পেয়ে তীব্র গতিতে সরাসরি সুরমা ও কুশিয়ারায় গিয়ে ঢুকছে। ফলে পুরো সিলেট জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।

জকিগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পল্লব হোম দাস নয়া দিগন্তকে বলেন, ডাইকটি ভেঙ্গে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে প্রবল বেগে পানি ঢুকছে। এতে নতুন করে উপজেলার কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ ডাইক ভেঙ্গে যাওয়ায় সিলেটের অন্যান্য উপজেলায়ও পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা আছে।

এদিকে প্রায় ১৫ দিন ধরে টানা বৃদ্ধির পর অবশেষে ভাটার টান পড়েছে সুরমার পানিতে। শুক্রবার থেকে সিলেটের এই প্রধান নদীর পানি কিছুটা কমতে শুরু করে। তবে এখনো প্রতিটি পয়েন্টেই বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

শুক্রবার বিকেল ৪টায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হিসেবে সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট পয়েন্টে ৯৬ সেন্টিমিটার ও সিলেট পয়েন্টে ৩২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পাউবোর হিসাবে, শুক্রবার কানাইঘাট পয়েন্টে ভোর ৬টায় ১৩.৭৫ মিটার, সকাল ৯টায় ১৩.৭০ মিটার এবং বিকেল ৪টায় ১৩.৬৯ মিটার দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এই পয়েন্টের বিপদসীমা ১২.৭৫ মিটার।

অপরদিকে, সিলেট পয়েন্টে সকাল ৬টায় ১১.২০ মিটার, সকাল ৯টায় ১১.১৮ মিটার ও বেলা ৪টায় ১১.১২ মিটার দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এই পয়েন্টে বিপদসীমা ১০.৮০ মিটার।

পাউবোর হিসাবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুক্রবার বেলা ৪টা পর্যন্ত সুরমার পানি কানাইঘাটে ১২ সেন্টিমটার ও সিলেট পয়েন্টে প্রায় ১৬ সেন্টিমিটার পানি কমেছে।

অপরদিকে, কুশিয়ারা নদীর পানি অমলসীদে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুক্রবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ৮ সেন্টিমিটার কমেছে। তবে এই সময়ে ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এছাড়া কিছুটা কমেছে লোভা, সারি, ধলাই, নদীর পানিও।

জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলার ১৩টি উপজেলার ১০টিতে ৭০টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছিল। শুক্রবার নতুন করে আরো ১৬টি যোগ হয়ে বন্যাকবলিত ইউনিয়নের সংখ্যা বেড়ে হলো ৮৬টি। সিলেট জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার আহসানুল আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সিলেট জেলায় ১ হাজার ৪২১ হেক্টর আউশ ধানের বীজতলা এবং বোরো ফসলের ১ হাজার ৭০৪ হেক্টর এবং গ্রীষ্মকালীন সবজির ১ হাজার ৩৩৪ হেক্টর জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার পুকুর ও জলাশয় প্লাবিত হয়ে প্রচুর পরিমাণ মাছ ভেসে গেছে। এছাড়া প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ মাদরাসাসহ ৬৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্যা কবলিত হয়েছে।

পানিবন্দি লোকজনের আশ্রয়ের জন্য সিলেট জেলায় ৩২৬টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বর্তমানে ৯৫টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৭ হাজার ৩৪৯ জন আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। ২৩৮টি গবাদিপশু আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

এর আগে বুধবার পর্যন্ত পানিবন্দি লোকজনের আশ্রয়ের জন্য সিলেট জেলায় ২৭৪টি আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হলেও এক দিনের ব্যবধানে আশ্রয় কেন্দ্র বৃদ্ধি করা হয়েছে। ৭৮টি আশ্রয় কেন্দ্রে ৬ হাজার ৪৭৫ জন আশ্রয় গ্রহণ করলেও তা এখন ৭ হাজার ছাড়িয়েছে।


আরো সংবাদ


premium cement