০১ জুন ২০২০

হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা এখন হোমকোয়ারেন্টাইনে

হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা এখন হোমকোয়ারেন্টাইনে - সংগৃহীত

করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার শঙ্কায় সুনামগঞ্জের হাওরবাসীর জীবন-জীবিকা এখন হোম কোয়ারেন্টাইনে। জেলার জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা, দিরাই, শাল্লা সহ ১১ উপজেলার হাট-বাজার শ্রমজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা এখন চলে গেছে হোম কোয়ারাইন্টানে। বিভিন্ন উপজেলার কর্মহীন হতদরিদ্র মানুষগুলো এখন পর্যন্ত সরকারী কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেনা। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে যে সহায়তা দেওয়া হয়েছে তাও প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। অনেকেই এ প্রতিবেদককে জানান ইউপি সদস্য-সদস্যারা এগুলো অনেকটাই মুখ দেখে ও তাদের বলয়ের লোক দেখে দেথে তালিকা করছেন। এ নিয়ে কর্মহীন বেকার দরিদ্র্য অভাবী জনগোষ্ঠীর মাঝে চরম অসন্তোষ ও হতাশা দেখা দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী হুঁশিয়ার করে বলেছেন, কোন মানুষ যাতে অভুক্ত না থাকে। কিন্তু বিভিন্ন উপজেলায় এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এতে করে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। এমন উদ্ভূত পরিস্থিতিতে অনেকই বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন করছেন যে, এভাবে বেকার বাড়িতে বসে না খেয়ে মরার চেয়ে, করোনা ভাইরাসে মরাই ভালো। বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে শহরে সাময়ীক সহায়তা দিলেও গ্রাম পর্যায়ের খবর এখনো কেই নেয়নি। সরকারের একাউন্টে ধনাঢ্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া কোটি কোটি টাকা যুক্ত হলেও গ্রামের সাধারণ মানুষ এখনও কোন সহায়তা পাচ্ছে না। শহরে ব্যাক্তি পর্যায়ে সহায়তার নামে ফটো সেশনের প্রতিযোগীতার কারণে পরিশ্রম করে সংসার চালাতে সাচ্ছন্দবোধ করেন এমন অনেকই ও নিম্ন মধ্যবিত্ত লোকজন লাইনে যেতে সারা পাড়ায় চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।

জামালগঞ্জের রিক্সা চালক উসমান মিয়া বড় আক্কেপ করে বলেন, ‘রিক্সা চালানো বন্ধ, রোজি নাই বৌ বাচ্চা নিয়া না খাইতে-না খাইতে এমনিতেই মইরা যাইমু। এর চাইতে করোনায় মইরা যাওয়াই বালা। সরকারে চাউল ডাইল দিব, এইডা খালি হুইনাই যাইতাছি। কোন দিন দিব, মরার পরে দিলে লাভডা কিতা হইব?’ আমরার ভাগ্যে আছে নি। ফেনারবাঁক গ্রামের বেশ কয়েকজন খুব অক্ষেপ করে বলেন, মহিলা মেম্বার তার লোকজন চিইন্যা-চিইন্যা নাম দিতাছে। এমন দুর্যোগেও যারা সরকারী মাল লইয়া এমন অবিচার করে আমরা আল্লাহর উপরে ছাইড়া দিলাম...।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি প্রতি উপজেলা আজ পর্যন্ত প্রথম ধাপে ৬শ থে প্রায় ৮শর মধ্যে কর্মহীন, গরীব দুঃস্থদের মাঝে ত্রাণ বন্টন করা হয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। এতে শতকরা হিসেবে এক জন পেয়েছে কি না সন্দেহ। আর এগুলোর মধ্যে মেম্বার-চেয়ারম্যানদের ঘনিষ্ট জনরাই ভাগ বসিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া বিভিন্ন উপজেলায় ব্যক্তি উদ্যোগেও কিছু ত্রাণ সহায়তা করা হলেও ফটো সেশনের লাজে অনেকই এড়িয়ে চলেছেন। বেশ কটি ইউনিয়ন সচিবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানিয়েছেন, উপজেলা প্রশাসন থেকে আমাদেরকে তালিকা প্রদানের জন্য বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা তালিকা প্রস্তুত করে জমা দিয়েছি। এখন কবে কতজনকে এ ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হবে সেটা বলা যাচ্ছে না। তাঁরা আরও জানিয়েছেন, প্রতি ইউনিয়নে পৃথকভাবে প্রায় পনেরোশ থেকে আড়াই হাজারেরও উপরে শ্রমজীবী বেকার মানুষের নাম তালিকাভুক্ত করে তারা জমা দিয়েছেন। এদের মধ্য থেকে ঠিক কতজনকে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে তা জানা যায়নি।

সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি সহ-সভাপতি ও তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আনিসুল হক বলেন, ‘যারা দিন আনে দিন খায় তাদের অবস্থা খুব করুণ। এদের মধ্যে চরম হতাশা ও অস্বস্তি কাজ করছে। সব বন্ধ থাকায় তারা কেউ কাজে যেতে পারছে না। ফলে অনেকটা অসহায় অবস্থায় দিন পার করছে তারা। তাই দ্রুত ত্রাণ তৎপরতা চালানো প্রয়োজন। সুনামগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ফোরাম সভাপতি মোহনা টিভির জেলা প্রতিনিধি কুলেন্দু শেখর তালুকদার বলেন, ‘দেশ একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার চেয়েও বড় ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। যারা এখন গৃহবন্দী, কাজে যেতে পারছে না। তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘোর বিপাকের মধ্যে আছে। বিশেষ করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে না। এ ব্যাপারে সরকারের দ্রুত মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।

সুনামগঞ্জ জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিষ্টার এম.এনামুল কবীর ইমন বলেন, করোনা ভাইরাসের প্রকোপে বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের মানুষও খুব কষ্টে জীবন যাপন করছে। আর সেই তুলনায় আমাদের দেশের মানুষ ও গ্রামের নিম্ন আয়ের পরিবারের লোকজনও খুব অসহায় হয়ে পরেছে। আ’লীগ সরকারের পক্ষ থেকে অতীতেও ফসলহারা হাওরবাসীর খাদ্যের জন্য কেউ কষ্ট পায়নি। বর্তমানেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবার জন্য খাদ্য নিশ্চিত করছেন। সরকারী, দলীয় ও আমার ব্যক্তিগত তহবিল থেকেও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। যতদিন বেঁচে থাকবো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পুরণে মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাব।

পরিবারে ছোট শিশু সন্তান কে বাসায় রেখে সারাক্ষণ গ্রামীণ জনপদে কাজ করে যাওয়া জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রিয়াংকা পাল বলেন, ‘প্রতি ইউনিয়ন থেকে যে তালিকা এসেছে তার মধ্যে ৬৪০ জন কে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। আগামী পরশুর মধ্যে আরো ২৭শ জনকে সরকারী সহায়তা প্রদান করা হবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, সুনামগঞ্জের সব ক’টি উপজেলায় সরকারী সহাযতা পৌঁছে দেয়া হয়েছে যা পথম পর্বে দেয়া হয়েছে আগামী পরশুর মধ্যে দ্বীতয় পর্ব সহায়তা কর্মহীন, দরিদ্র ও গ্রামীন জনগোষ্টির হাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সকল প্রকার সহযোগীতা আমরা পৌঁছে দেবে। ইতো মধ্যে জেলার ১১ উপজেলার ৮৮ ইউনিয়নে ১৮০ জন ডিলারের মাধ্যমে ৯১ হাজার ৯ শত ৫০ জন কার্ডধারী এই চাল ক্রয়ের সুযোগ পাবেন। একটি হতদরিদ্র পরিবার প্রতিমাসে ১০ টাকা দরে সর্বোচ্চ ৩০ কেজি চাল নিতে পারবেন। তিনি আরো জানান, করোনার সক্রমণরোধে মানুষকে ঘরে রাখা নিশ্চিত করতে ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এই ওএমএস চালু করা হয়েছে। এতে কোন অনিময় সহ্য করা হবে না। ডিলার যথাযথভাবে বিক্রয় না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


আরো সংবাদ