১৪ জুলাই ২০২৪, ৩০ আষাঢ় ১৪৩১, ৭ মহররম ১৪৪৬
`

ইন্ডিয়ার বদলে ভারত : উৎস কী ভারত নামের?

-

ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদি মুর্মুর পাঠানো একটি নৈশভোজের আমন্ত্রণপত্র এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রীর ইন্দোনেশিয়া সফরের বিস্তারিত তথ্য সম্বলিত এক সরকারি নথিতে ইংরেজিতে ‘ভারত’ নামটি ব্যবহার করায় শুরু হয়েছে বিতর্ক।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

আলোচনার শুরু জি-২০ সম্মেলন উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদি মুর্মু আয়োজিত একটি নৈশভোজের আমন্ত্রণপত্র নিয়ে। সেখানে লেখা হয়েছে ‘প্রেসিডেন্ট অফ ভারত’। ওই আমন্ত্রণপত্রটি দুই কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ও গিরিরাজ কিশোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। আবার বিজেপির মুখপাত্র সম্বিত পাত্র নরেন্দ্র মোদির আসন্ন ইন্দোনেশিয়া সফরের একটি সরকারি নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন মঙ্গলবার রাতে, সেখানেও মোদির পরিচয় লেখা হয়েছে ‘প্রাইম মিনিস্টার অফ ভারত’।

ইংরেজিতে ‘ইন্ডিয়া’ শব্দটি ব্যবহার না করে কেন ‘ভারত’ ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়ে কোনো ব্যাখ্যা রাষ্ট্রপতি ভবন বা কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে দেয়া হয়নি।

তবে বিরোধী দলগুলো বলছে, ‘ইন্ডিয়া’ নামে যে বিজেপি বিরোধী জোট তৈরি হয়েছে, তার সাথে সামঞ্জস্য থাকায় সরকারিভাবে ‘ভারত’ নামটি ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিজেপি বলছে ‘ভারত’ নামটি তো সংবিধানেই রয়েছে, তাই সেটি ব্যবহার করা হলে বিতর্ক কেন হবে।

ঘটনাচক্রে মাস দুয়েক আগে ভারতের বিরোধী দলীয় যে জোট গঠিত হয়েছে, তার নামও রাখা হয়েছে ‘ইন্ডিয়া’।

‘ইন্ডিয়া’ নাম পরিবর্তনের পুরনো দাবি
দেশটির সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ‘India, that is Bharat, shall be a Union of States’।

ভারতীয় জনতা পার্টি ও আরএসএসের নেতারা আগেও ‘ইন্ডিয়া’ নামটি বদল করে ‘ভারত’ করার দাবি তুলেছে।

সম্প্রতি সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে বিজেপির সংসদ সদস্য নরেশ বনসাল বলেছিলেন, ‘ইন্ডিয়া’ নামটি ‘ঔপনিবেশিক দাসত্বের’ প্রতীক এবং এটি সংবিধান থেকে মুছে ফেলা উচিত।

গত বছরের জুন মাসে সুপ্রিম কোর্টে এ বিষয়ে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তাতে ‘ইন্ডিয়া’-র নাম পরিবর্তন করে ‘ভারত’ করার দাবি জানানো হয়েছিল।

আবার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত গুয়াহাটিতে একটি অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ইন্ডিয়া নাম বদলিয়ে ভারত নামটি ব্যবহার করা শুরু করা উচিত।

ভারত নামের উৎস কী?
ভারতবর্ষ নামে যে ভূখণ্ড, সেটিকে প্রাচীনকাল থেকে নানা নামে চিহ্নিত করা হয়ে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে জম্মুদ্বীপ, ভারতখণ্ড, হিমবর্ষ, অজনাভবর্ষ, আর্যাবর্ত, হিন্দ, হিন্দুস্তান আর ইন্ডিয়া নামগুলো। সংস্কৃত বর্ষ শব্দটির অর্থ ভূখণ্ড।

সম্রাট অশোকের শিলালিপিতে জম্মুদ্বীপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

আবার বিষ্ণুপুরাণে পাওয়া যায় ভারতের সীমারেখার বর্ণনা :
‘উত্তরং যৎ সমুদ্রস্য’ হিমাদ্রেশ্চৈব দক্ষিণম
বর্ষং তদভারতং নাম ভারতী যত্র সন্ততি

অর্থাৎ, সমুদ্রের উত্তরে এবং হিমালয় পর্বতের দক্ষিণে অবস্থিত অঞ্চলের নাম হলো ভারত, যেখানে ভরতের সন্ততিরা বসবাস করে।

তবে এসব নামগুলোর মধ্যে ভারত নামটিই সব থেকে বেশি প্রচলিত। আবার এ নামটি নিয়েই রয়েছে সব থেকে বেশি মতবিরোধ।

ভাষাবিদ অজিত ওয়াডনের্কর বলছেন, ‘হিন্দ, হিন্দুস্তান বা ইন্ডিয়া- এই নামগুলোর সাথে সিন্ধু নদের যোগ আছে। কিন্তু সিন্ধু শুধু একটি নদ নয়, এর অর্থ যেমন নদ বা নদী হয়, তেমনই সাগরও এর আরেকটি অর্থ। সেদিক থেকে বিচার করলে দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশটি কোনো এক সময়ে সপ্তসিন্ধু বা পাঞ্জাব বলা হতো। ওই অঞ্চলটি খুবই উর্বর ছিল, তাই সেখান দিয়ে বহমান সাত অথবা পাঁচটি নদীই ছিল এলাকার পরিচয়।’

তার কথায়, ‘প্রাচীন ফার্সি ভাষায় সপ্তসিন্ধুকে হফ্তহিন্দু’ বলা হতো।’

আবার ইন্ডিয়া ও ইন্ডাস নাম পাওয়া যায় গ্রিক ইতিহাসবিদ মেগাস্থিনিসের বর্ণনায়।

পুরাণে একাধিক ভরত
বলা হয়ে থাকে যে পৌরাণিক চরিত্র ভরতের নাম থেকেই ভারত শব্দটি এসেছে। আবার ইতিহাসে ভরত নামে একাধিক চরিত্র পাওয়া যায়।

তাদের মধ্যে একজন যেমন ছিলেন রামচন্দ্রের ভাই, আরেক ভরতের খোঁজ পাওয়া যায় যিনি শকুন্তলা ও দুষ্মন্তের ছেলে। অন্য আরেক ভরত ছিলেন নাট্যশাস্ত্র বিশারদ।

আবার মগধের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের রাজসভাতেও একজন ভরত ঋষির কথা জানা যায়।

পদ্ম পুরাণ ও মৎস পুরাণেও ভরতের উল্লেখ পাওয়া যায়।

ভাষাবিদ অজিত ওয়াডনের্করের মতে ঋগ্বেদের একটি শাখা ‘এতরেয় ব্রাহ্মণ’ গ্রন্থ অনুযায়ী শকুন্তলা-দুষ্মন্তের ছেলে ভরতের নামানুসারেই ভারত নাম এসেছে বলে মনে করা হয়।

হিন্দু পুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই ভরত চক্রবর্তি সম্রাট ছিলেন, অর্থাৎ যিনি চারদিকের জমি দখলে নিয়ে বিশাল এক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনিই অশ্বমেধ যজ্ঞ করেছিলেন বলে জানা যায়। ওই থেকেই তার সাম্রাজ্যের নাম ভারতবর্ষ।

আবার জৈন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রথম তীর্থঙ্কর ভগবান ঋষভদেবের বড় ছেলে মহাযোগী ভরতের প্রসঙ্গও রয়েছে।

এখন কোনো ভরতের নামে গড়ে উঠেছিল ভারত? তা কি আদৌ কোনো এক ব্যক্তি ভরতের সাথে সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না কি ভরত আসলে একটি জনগোষ্ঠী?

ভরত কি ব্যক্তি না জনগোষ্ঠী?
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির সংস্কৃতের দিকপাল অধ্যাপক মনিয়র উইলিয়ামস সংস্কৃত-ইংরেজি অভিধান লিখেছিলেন। তার মতে, বেদে ভরত বা ভরথ শব্দটির অর্থ অগ্নি, লোকপাল বা বিশ্ব-রক্ষক, এক অর্থে রাজা।

ওয়াডনের্কর বলছেন, ‘বৈদিক যুগের এক প্রসিদ্ধ জনগোষ্ঠী ভরতের উল্লেখ অনেক প্রাচীন পুঁথিতে রয়েছে। ওই গোষ্ঠী সরস্বতী নদী তট, যেটি বর্তমানের ঘগ্গর, ওই অঞ্চলে বসবাস করত। এদের নাম অনুসারেই ওই ভূখণ্ডের নাম হয় ভারতবর্ষ।’

তিনি যে ঘগ্গর নদী অঞ্চলের কথা বলছিলেন, ওই অঞ্চলটি আবার হরপ্পা সভ্যতা যেখানে গড়ে উঠেছিল।

শকুন্তলা-দুষ্মন্তর ছেলে ভরত
ভাষাবিদ পবিত্র সরকার বলছেন, শকুন্তলা ও দুষ্মন্তের ছেলে ভরতের নাম থেকেই তার রাজ্যের নাম হয় ভারত, এটাই প্রচলিত ধারণা।

এ ধারণার পেছনে রয়েছে মহাভারতের আদিপর্বের একটি কাহিনী।

মহর্ষি বিশ্বামিত্র এবং অপ্সরা মেনকার মেয়ে শকুন্তলা এবং পুরুবংশীয় রাজা দুষ্মন্তের মধ্যে গান্ধর্বমতে বিবাহ হয়। তাদের ছেলের নাম ছিল ভরত।

মহাভারতের বর্ণনা অনুযায়ী, ঋষি কণ্ব আশীর্বাদ করেছিলেন যে ভরত পরে ‘চক্রবর্তি সম্রাট’ হবেন এবং ওই ভূমিখণ্ডের নাম ভারত হিসেবে বিখ্যাত হবে।

ভারত নামের উৎপত্তির এই কাহিনীটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

মহাভারতে বর্ণিত এই ঘটনা নিয়েই পরে কবি কালিদাস অভিজ্ঞান শকুন্তলম নামের মহাকাব্য রচনা করেন।

ইন্ডিয়া নাম যেভাবে হয়েছিল
মোগল আমলে তাদের শাসনাধীন অঞ্চলকে হিন্দুস্তান বলা হতো। তবে ঐতিহাসিক ইয়ান জে ব্যারো লিখছেন, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে ব্রিটিশ মানচিত্রগুলোতে ইন্ডিয়া নামটির প্রচলন হতে থাকে। তার আগে, মোগল আমলে তাদের শাসনাধীন এলাকাটিকে হিন্দুস্তান বলে চিহ্নিত করা হতো।

ব্যারো জার্নাল অফ সাউথ এশিয়ান স্টাডিসে প্রকাশিত তার প্রবন্ধ ‘ফ্রম হিন্দুস্তান টু ইন্ডিয়া’-তে লিখেছেন, ‘ইন্ডিয়া শব্দটির প্রতি আকর্ষণের কারণ সম্ভবত ছিল তাদের গ্রিক-রোমানদের সাথে নৈকট্য, ইউরোপে এটির দীর্ঘ ব্যবহার এবং সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার মতো বৈজ্ঞানিক ও সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে এই নামটির গ্রহণযোগ্যতা।’

আবার ভারতের সংবিধান রচনার সময়েও বিতর্ক হয়েছিল যে ইন্ডিয়া নামটা আদৌ রাখা হবে কি-না তা নিয়ে। এ নিয়েও মতবিরোধ হয়েছিল যে সংবিধানে দেশের নামকরনের ক্ষেত্রে আগে ভারত, যেটিকে বিদেশী ভাষায় ইন্ডিয়া বলা হয়- এভাবে রাখা হবে না কি এখন সংবিধানে যেভাবে আছে, অর্থাৎ ‘ইন্ডিয়া, দ্যাট ইজ ভারত’ সেভাবে রাখা হবে।
সূত্র : বিবিসি


আরো সংবাদ



premium cement