০২ অক্টোবর ২০২২, ১৭ আশ্বিন ১৪২৯, ৫ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

রাশিয়ার সস্তা তেলই বাঁচিয়ে দিলো ভারতকে!

রাশিয়ার সস্তা তেলই বাঁচিয়ে দিলো ভারতকে! - ছবি : সংগৃহীত

সত্যি কথা বলতে কী, রাশিয়াই সস্তায় তেল দিয়ে ভারতকে বাঁচিয়ে দিলো। না হলে ভারতে তেলের দাম কমা দূরে থাক, অনেকটা বেড়ে যেত।

একটা সময় ছিল, যখন ভারতে লাগাতার ১২ দিন ধরে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বেড়েছিল। সব মিলিয়ে ১৫ দিনের মধ্যে অন্তত ১৪বার তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তেলের দাম লিটারে এক শ’ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তারপর পেট্রোল-ডিজেলের সেঞ্চুরি নিয়ে সামাজিকমাধ্যম ও মিডিয়ায় বেশ আলোচনা হয়। এমনো আলোচনা শুরু হয়েছিল যে পেট্রোল-ডিজেলের দাম নিয়ে সরকার পুরো টেন্ডুলকারের ফর্মে ব্যাট করছে।

এই সমালোচনা যখন প্রবল হয়, তখনই এক ধাক্কায় পেট্রোল-ডিজেলের দাম লিটার প্রতি সাড়ে নয় টাকা কমিয়ে দেয় সরকার। ফলে দিল্লিতে পেট্রোলের দাম হয়েছে লিটার প্রতি ৯৬ টাকার সামান্য বেশি দামে। এমন নয় যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেনি, বরং ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তা অনেকটাই বেড়েছিল।

তা সত্ত্বেও সরকার যে এই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে তার কারণ রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল পাওয়া। তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলপিজির ক্ষেত্রে ভারত তার চাহিদার ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ আমদানি করে। ভারত এতদিন তেল-গ্যাসের বেশিরভাগ কিনতো মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ৫২ দশমিক সাত শতাংশ এখান থেকেই আসত। ১৫ শতাংশ আসত আফ্রিকা থেকে এবং আমেরিকা থেকে ১৪ শতাংশ। মাত্র দুই শতাংশ তেল রাশিয়া থেকে আসত।

এই পরিস্থিতির রাতারাতি বদলে যায় ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর। ইউরোপ রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস কেনা কমিয়েছে, রাশিয়াও তাদেরকে কম তেল ও গ্যাস সরবরাহ করছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর বাকি দেশগুলোতেও রাশিয়ার তেল ও গ্যাস অনেক কম যাচ্ছে বা যাচ্ছেই না। রাশিয়ার থেকে তেল এখন মূলত নিচ্ছে ভারত ও চীন।

আমরা জানি, অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ খুবই নিরস। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা বুঝতে গেলে এই হিসাবের দিকে তাকানোটাও খুবই জরুরি।

২০২১ সালে এপ্রিল-মে মাসে রাশিয়া থেকে মাত্র ৪৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের তেল কিনেছিল ভারত। আর ২০২২ সালের শুধু মে মাসেই ১৯০ কোটি ডলারের তেল কিনেছে ভারত। আগে বছরে চাহিদার মোট দুই শতাংশ রাশিয়া থেকে আনা হতো। এবার এপ্রিল-মে মাসে চাহিদার ১০ শতাংশ তেল রাশিয়া থেকে এসেছে। যত সময় গড়িয়েছে, ততই রাশিয়া থেকে তেল আনার পরিমাণও বেড়েছে। কারণ রাশিয়া সস্তায় তেল দিচ্ছে।

কতটা সস্তা? এ নিয়ে ভারত সরকার মুখ খোলেনি। তবে আন্তর্জাতিক স্তরের হিসাব হলো, মধ্যপ্রাচ্য থেকে যে দামে তেল কিনে ভারত, তার তুলনায় ব্যারেল প্রতি প্রায় ২০ ডলার বা তারও বেশি ছাড় দিয়েছে রাশিয়া। তাই ভারত এখন যে সব দেশ থেকে তেল কিনে সেই তালিকায় দুই নম্বরে উঠে গেছে রাশিয়া। আগে সৌদি আরব ছিল দুই নম্বরে। এখন তারা তিন নম্বরে। আর এক নম্বরে আগের মতোই ইরাক রয়েছে।

রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আসার ফলে দু’টি সুবিধা পেয়েছে ভারত। এক, তাদের তেল কেনার খরচ কমেছে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার সাম্প্রতিক সময়ে তেলের দাম বিশেষ বাড়ায়নি, বরং কমিয়েছে। দুই, ভারতের বিদেশী মুদ্রার ভাণ্ডারে টান পড়েনি। ভারতের কাছে এখন যথেষ্ট পরিমাণ বিদেশী মুদ্রা আছে, ফলে সেদিকে চিন্তার কোনো কারণ নেই। আর রাশিয়ার কাছ থেকে ভারত যে তেল কিনছে, তা আমেরিকা ও ইউরোপের আপত্তিকে উড়িয়ে দিয়েই কিনেছে।

বাইডেনের পরামর্শদাতা ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান ভারতে এসেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদি জার্মানিসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে গেছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর আমেরিকা গেছেন। সব জায়গায় রাশিয়া থেকে তেল কেনার প্রসঙ্গ এসেছে। কিন্তু ভারত জানিয়ে দিয়েছে, তারা রাশিয়া থেকে তেল কিনবে। ভারতের বক্তব্য ছিল, ইউক্রেনে হামলার পরও ইউরোপ রাশিয়া থেকে একদিনে যে পরিমাণ তেল ও গ্যাস কিনছে, সেই পরিমাণ তেল ভারত সারাবছর ধরেও রাশিয়ার কাছ থেকে কিনে না। তাহলে কেন ভারতের ক্ষেত্রে আপত্তি তোলা হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতে এসে জয়শঙ্করকে অনুরোধ করেছিলেন যাতে ঢাকাও সস্তায় তেল কিনতে পারে সেই রাস্তা বাতলে দেয় দিল্লি। তিনি এটাও জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশ ছোট দেশ বলে তাদের উপর চাপ অত্যন্ত বেশি। তাই তারা ভারতের সাহায্য চাইছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একথা একেবারেই ভুল না। কারণ, ইউরোপ-আমেরিকার চোখরাঙানিকে ভারত ভয় না পেয়ে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা বাড়িয়ে যাচ্ছে, তার কারণ হলো- আয়তনে, প্রভাবে ভারত অনেকটাই বড়। ভারতের বিশাল বাজার ধরতে সব দেশের কোম্পানি উদগ্রীব। ভারতের বাজার হারালে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি রীতিমতো বিপাকে পড়বে। অস্ত্র থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য- সবকিছুর ক্ষেত্রেই ভারতের বাজার তাদের কাছে খুবই লোভনীয়। সেজন্য ভারত এই চাপকে উপেক্ষা করতে পারে। বাংলাদেশ পারে না।

আর রাশিয়ার সস্তা তেলই বাঁচিয়ে দিলো ভারতকে। না হলে বাংলাদেশ, পাকিস্তানের মতো এখানেও তেলের দাম আকাশছোঁয়া হতো। তার প্রভাব সব জিনিসের উপর পড়ত। যুদ্ধের ফলে ভারতেও মুদ্রাস্ফীতি হচ্ছে। তবে তা সাত শতাংশের সীমার মধ্যে আছে। ইউরোপ ও আমেরিকার থেকে ভালো অবস্থা ভারতের। তাই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে যতই সমালোচনা হোক না কেন, ভারতের মানুষ যুদ্ধের বাজারে মস্কোর সাথে দিল্লির এই বন্ধুত্ব নিয়ে কোনো আপত্তি জানাচ্ছে না। বরং তারা এখন স্বস্তিতে, কারণ তেলের দাম গত প্রায় ৯০ দিন ধরে বাড়েনি।
সূত্র : ডয়েচে ভেলে


আরো সংবাদ


premium cement