০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৮, ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩ হিজরি
`

সুনামির পর আরো ধর্মপ্রাণ মালদ্বীপের মুসলমানরা


১১৯২ দ্বীপের দেশ মালদ্বীপ। লোক বসতি ১৮৭ দ্বীপে। শতভাগ মুসলমানের এই দেশের মানুষ আগে ছিল মালেকী মাজহাবের অনুসারী। পরে তারা শাফী মাজহাবকে অনুসরণ করতে শুরু করে। রাজধানী মালেসহ পাশের বিলিকিলি, হুনহুমালে বা আরেকটু দূরের মাফুশি দ্বীপে গেলেই চোখে পড়বে মাতায় স্কার্ফ বা হিজাব পরা মালদ্বীপের মেয়েদের। ভারতীয় মহাসাগরের এই দেশে প্রায় ৯৬ ভাগ নারীই হিজাব পরে রাস্তায় বের হন। তাদের এই হিজাব বা স্কার্ফ পরে চলাটা ২০০৪ সালের সুনামির পর। এমনটাই জানান মালদ্বীপ প্রবাসী বাংলাদেশী ও স্থানীয়রা।

পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তাণ্ডব চালানো ওই সুনামিতে মালদ্বীপে ১০৯ জন মানুষ মারা যায়। এর মধ্যে ১০২ জন স্থানীয়। সাতজন বিদেশী। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে সামান্য উপরে (১.৫ মিটার বা ৪ ফুট ১১ ইঞ্চি) অবস্থিত এই দেশের মানুষ সুনামির পর অনুধাবন করতে থাকে, যেকোনো মুহূর্তে তাদের দেশে এমন সুনামি ফের আঘাত হেনে সব শেষ করে দিতে পারে। তাই এরপর থেকেই মালদ্বীপের স্থানীয় জনগোষ্ঠী দিভেহীদের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি ব্যাপকভাবে জেগে উঠে। নারীদের পর্দা করে চলাটা এরপর থেকেই।

উল্লেখ্য, সুনামিতে মালদ্বীপের ছয়টি দ্বীপ ধ্বংস হয়ে যায়। ৫৭টি দ্বীপ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৪টি দ্বীপ জনশূন্য করতে বাধ্য হয় সরকার। ২১টি রিসোর্ট বন্ধ করে দেয়া হয়। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের ৪০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছিল, যা মোট জিডিপির ৬২ ভাগ। সেই সুনামিতে মালে শহরও ডুবে গিয়েছিল। তবে সুনামি কোনো আঘাত হানেনি নয়টি দ্বীপে।

মালদ্বীপের নারীদের মধ্যে কেউ পুরো শরীর কালো বোরকায় ঢাকা। কেউ শরীরের উপরের অংশ ঢেকে রাখেন। কেউবা শরীরের সাথে লেগে থাকা পোশাকের সাথে শুধু মাথায় স্কার্ফ পরেন।

শুধু নারীরাই নয়, ২০০৪ সালের সুনামির পর মালদ্বীপের পুরুষরাও ব্যাপক হারে মসজিদমুখী হয়েছেন। যা এখনো বর্তমান। গত কয়েক দিন দেশটিতে অবস্থানকালে মালেতে দেখা গেল, নামাজের সময় হলেই সব দোকানপাঠ বন্ধ রাখা হয়। অবশ্য কিছু বাংলাদেশী দোকানের মালিক দরজার সামনে ‘ক্লোজড’ (বন্ধ) প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে ভেতরে দোকানের কাজ চালাতে থাকে।

মালে শহরে চাকরি করতে অন্য দ্বীপ থেকে আসা নারী নিশা দাবি করলেন, মালদ্বীপের নারীরা আরো আগ থেকেই পর্দা করছে। তবে সুনামির পর থেকে এই হার বেড়েছে। এখন তা শত ভাগের কাছাকাছি।

নিশার কথায়, অবশ্য মুসলমানের এই দেশে সুনামির আগেও মানুষ এতটা ধর্মপ্রাণ ছিল না। বরং বেহায়াপনা আর অশ্লীলতায় লিপ্ত থাকতো মালদ্বীপের মানুষ। দিনের বেলায় যেকোনো একটু নিরিবিলি স্থানে ব্যভিচারে লিপ্ত হতো নানা বয়সের নারী-পুরুষ। পর্যটন কেন্দিক দেশ হওয়ায় অনেক নারী যৌনতা বা ব্যভিচারকে আয়ের মাধ্যম করে নিয়েছিল। সেই দৃশ্য এখন আর আগের মতো নেই। শুধু নিশা নন, এমন দাবি মালদ্বীপে অবস্থানকারী বাংলাদেশী প্রবাসীদেরও।

মালদ্বীপের দৈনিক মিহারুর সাংবাদিক ওজোনেও স্বীকার করেন তা। তার মতে, সুনামির পর সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের সময় আলেম সমাজের ব্যাপক ইসলাম প্রচারণা দিভেহীদের ধর্মমুখী করে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মামুন আবদুল গাইয়ুমের আমলে কোনো আলেমকে ইসলাম নিয়ে বয়ান করার জন্য সরকারি অনুমতি নিত হতো। এই অনুমতি পেতে লেগে যেত দু’বছর। নাশিদ সরকার এই বিধিনিষেধ তুলে দেন। ফলে আলেম সমাজ যেকোনো উন্মুক্ত স্থানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করে মানুষকে ইসলাম মেনে চলার তাগিদ দেন। এরই ধারাবাহিকতায় দেশটির মসজিদগুলোতে নামাজের সময় পরিপূর্ণ হতে থাকে। মালে শহরে কিছু নারী আধুনিক পোশাক পরলেও দ্বীপগুলোতে এখন আর হিজাব ছাড়া কোনো নারী দেখা যাবে না। মালদ্বীপের মেয়ে বা মায়েরা সমুদ্র বিচে নামলেও বোরকা পরেই নামেন।

মালদ্বীপ বিদেশী পর্যটকদের কাছে ভ্রমণের জন্য খুবই প্রিয় জায়গা। পশ্চিমা দেশের পর্যটকরা এই দেশে এসে স্বল্প পোশাক পরেই নেমে পড়েন সাগরে। তবে মালেতে এই স্বল্প পোশাক পরে কেউ বিচে যেতে পারবে না। বিশেষ করে নারীরা। বিচের পাশে লেখা সাইনবোর্ড- ‘নো বিকিনি’।

একবার কয়েকজন নারী বিকিনি পরে বিচে গেলেও পুলিশ তাদের তাড়িয়ে দেয়। জানান স্থানীয়রা। বিদেশীরা স্বাধীন মতো বিচে বিচরণ করতে পারে বিভিন্ন দ্বীপে অবস্থিত রিসোর্টে।

রাজধানী মালে শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরের মাফুশি দ্বীপে গিয়ে দেখা গেল, দুই মাইল আয়তনের এই দ্বীপের ছোট ছোট বিচগুলোতে স্বল্প পোশাকের বিদেশীদের। তবে রাস্তায় রাস্তায় লেখা সাইনবোর্ড, স্বল্প পোশাকে কোনোভাবেই লোকালয়ে ঘুরাঘুরি করা যাবে না।

এক সময় ভারত থেকে কিছু শিয়া এখানে এসে মসজিদ বানিয়েছিল। পরে তারা চলে যাওয়ার পর মালদ্বীপ সরকার সেই মসজিদের দখল নেয়। বর্তমানে মালদ্বীপে কোনো শিয়া মতাদর্শের লোক নেই। সবাই সুন্নি। তবে দেশটিতে পরিবারিক সম্পর্ক একবারেই দুর্বল। ছেলে মেয়েরা বড় হলে মা-বাবার খবর কমই রাখে। আর সন্তান ১৮ বছর বয়সী হলেই মা-বাবার নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়ে যায়। ফলে কেউ কেউ তখন চলাচল শুরু করে ইউরোপিয়ান স্টাইলে। আর এই দেশে তালাকের হার প্রায় ৯০ ভাগ। তথ্য দেন প্রবাসী বাংলাদেশী ও স্থানীয় দিভেহীরা। ফলে বেশিরভাগ নারী-পুরুষ একাধিক বিয়ে করছেন।

এমন পরিস্থিতির কারণে প্রবাসী বাংলাদেশীদের কারো কারো অভিযোগ, এই যে পর্দা দেখছেন তা তাদের ফ্যাশনের অংশ। চলে তো ইউরোপিয়ান স্ট্রাইলে। মিহারু পত্রিকার সাংবাদিক ওজোনে এর জন্য মালদ্বীপে খুব সহজে বিয়ে করতে পারাটাকে দায়ী করেন।

মালে শহরে প্রচুর তরুণকে দেখা যাবে, যাদের মেয়েদের মতো লম্বা চুল। তারা মাস্তান হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন ফুটবল ক্লাব ও রাজনৈতিক দলের লোক তারা। ডাকা হয় পার্টির লোক নামে। তাদের যত মাস্তানি ছুরি কেন্দ্রিক। কোনো আগ্নেয়াস্ত্র এদের হাতে নেই। ফলে ছুরি আর ব্লেড দিয়েই চলে খুন-খাবারি আর রক্তারক্তির ঘটনা।

পুলিশের সামনে কোনো খুন বা হামলা হলেও নিশ্চুপ থাকে দেশটির পুলিশ। তবে অভিযোগ এলে তখন শুরু হয় তৎপরতা।



আরো সংবাদ