০১ ডিসেম্বর ২০২০

লাদাখ প্রসঙ্গে রাজনাথের মুখে 'যুদ্ধ'


যুদ্ধ শুরু করা আমাদের হাতে। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তা শেষ করা আর কারো হাতে থাকে না। লাদাখ প্রসঙ্গে রাজ্যসভায় বিবৃতি দেওয়ার সময় এ ভাবেই ভারত-চীন সাম্প্রতিক সংঘাতকে ব্যাখ্যা করলেন ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।

লোকসভায় আগেই এ প্রসঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার রাজ্যসভায় বিবৃতি দেন তিনি। বিরোধীদের প্রশ্নের উত্তরও দেন।

ইউপিএ আমলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি রাজনাথকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ভারতীয় সেনারা লাদাখ সীমান্তে পেট্রলিং করতে পারছে কি না। কারণ, ওই পেট্রলিংকে কেন্দ্র করেই দুই দেশের সেনার মধ্যে প্রথম সংঘর্ষ হয়।

রাজনাথ জানিয়েছেন, কোনো দেশ ভারতীয় সেনার পেট্রলিং বন্ধ করতে পারবে না। তার জন্য যত দূর যাওয়া দরকার, ভারত যেতে প্রস্তুত আছে। কিন্তু এ বিষয়ে কারো কাছে মাথা নত করা হবে না। অন্য কোনো দেশকেও ভারত তার সামনে মাথা নত করতে বলবে না।

গত সপ্তাহেই মস্কোয় পর পর দুইটি বৈঠক হয়েছিল ভারত এবং চীনের। প্রথমে দুই দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং তারপর পররাষ্ট্র মন্ত্রী। পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের বৈঠকের পর পাঁচটি পয়েন্টে লাদাখ সংকট কাটানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পাঁচটি পয়েন্ট নিয়ে দুই দেশের সেনার মধ্যে বৈঠক হওয়ারও কথা ছিল। ঠিক হয়েছিল, দুই দেশই সেনা প্রত্যাহার করবে সীমান্ত থেকে। কিন্তু কীভাবে করবে, তার সিদ্ধান্ত নেবেন সেনা কর্মকর্তারা।

বৃহস্পতিবার সংসদে দাঁড়িয়ে অন রেকর্ড রাজনাথ যা বললেন, তার সঙ্গে ওই সমঝোতা চুক্তি মিলছে না। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, লাদাখে ভারত এবং চীনের সীমান্ত বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক আছে। কাঁটাতার দিয়ে সীমান্ত চিহ্নিত নয়। জনমানবহীন শীতল মরুভূমিতে হাওয়ায় পাথরও সরে যায়।

তাছাড়া যে কাল্পনিক রেখাকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বলে মনে করা হয়, তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে তীব্র বিতর্ক আছে। ফলে বিতর্কিত অঞ্চলে দুই দেশই ক্ষমতা মতো পেট্রলিং করে। এটাই জমির উপর ক্ষমতা জারি রাখার অন্যতম প্রক্রিয়া। বরাবর ওই পেট্রলিং নিয়েই দুই দেশের সেনার মধ্যে সংঘাত হয়।

প্যাংগং, ডেপসাং, গোগরা, হটস্প্রিং অঞ্চলে এটাই সংঘাতের কারণ। জুন মাসে গালওয়ানেও ঠিক এই কারণেই সংঘাত হয়েছে। এবং ২০ জন সেনা জওয়ানের প্রাণ গিয়েছে। যদিও গালওয়ান বিতর্কিত অঞ্চল ছিল না।

রাজনাথের কথা মতো যদি পেট্রলিং চলতে থাকে, তা হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আলোচনায় উঠে আসা সমঝোতা সম্ভব নয়। পেট্রলিং বন্ধ না করলে দুই দেশের সেনা পিছনে যেতে পারবে না।

বস্তুত, সেনা সূত্রের বক্তব্য, এপ্রিল মাসের পর থেকে চীন ডেপসাং অঞ্চলে অনেকটাই ঢুকে এসেছে। প্যাংগংয়ের উত্তর প্রান্তেও একই ঘটনা ঘটেছে। আবার প্যাংগংয়ের দক্ষিণে ভারত দুইটি গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ের দখল নিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সেনা পিছিয়ে নিতে হলে, বিতর্কিত অঞ্চলে পেট্রলিং বন্ধ করতে হবে। রাজনাথ বলছেন, পেট্রলিং বন্ধ হবে না। তা হলে সমঝোতারও কোনও সম্ভাবনা নেই বলে বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য।

তা হলে সমাধান কোথায়? ভারতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী যা বলেছেন, যেভাবে 'যুদ্ধ' শব্দটি কৌশলে ব্যবহার করেছেন, তা থেকে অনেকেই মনে করছেন, আপাতত সমঝোতায় যাওয়ার কথা ভাবছে না ভারত। বরং সময় কেনার চেষ্টা করছে। দেখতে চাইছে, চীন এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়।

কারণ, এই মুহূর্তে চীনের সঙ্গে সমঝোতা করে সেনাদের বর্তমান অবস্থান থেকে পিছিয়ে নিলে তা ভারতের ক্ষতি বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। গত ১৫ বছর ধরে ডেপসাং এবং প্যাংগং অঞ্চলে ক্রমাগত নিজের শক্তি বৃদ্ধি করেছে চীন।

এ বছরের গোড়াতেও তারা সে কাজ করেছে। ফলে এখন সমঝোতা হলে চীন অ্যাডভান্টেজ পেয়ে যাবে।

রাজনাথ বলেছেন, তাদের সরকার আগের মতো নয়। যে কোনো প্রক্রিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ভারতের মাথা নত হতে তারা দেবেন না। বাস্তবে যদি তাই ঘটে, তা হলে বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। শীত যত বাড়বে, ততই পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হবে লাদাখে।

এ দিন সংসদে রাজনাথ বলেছেন, বিষয়টি সংবেদনশীল। দেশের নিরাপত্তার বিষয় জড়িয়ে রয়েছে এর সঙ্গে। ফলে সব কথা সংসদে দাঁড়িয়ে তার পক্ষে বলা সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট কয়েকজন সংসদকে নিয়ে একান্ত বৈঠকে আরো বিশদে আলোচনা করবেন তিনি। ডয়চে ভেলে


আরো সংবাদ