০৯ আগস্ট ২০২০

ভারতের গুন্ডা সর্দারের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মৃত্যু নিয়ে যে কারণে প্রশ্ন উঠছে

24tkt

ভারতের উত্তরপ্রদেশের কানপুরে একসঙ্গে আটজন পুলিশকর্মীকে হত্যার ঘটনার মূল অভিযুক্ত বিকাশ দুবে আজ শুক্রবার সকালে পুলিশের সঙ্গে এক 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত হয়েছেন।

আটদিন ধরে ব্যাপক তল্লাশি চালিয়ে বৃহস্পতিবার তাকে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী থেকে গ্রেফতার করা হয় বলে পুলিশ দাবী করেছিল।

তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, না কি সে আত্মসমর্পণ করেছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মধ্যপ্রদেশ থেকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার পরে উত্তরপ্রদেশ পুলিশ যখন শুক্রবার তাকে কানপুরে নিয়ে আসছিল, সেই সময়ে তাদের গাড়িটি দুর্ঘটনায় উল্টে যায়।

উত্তরপ্রদেশ পুলিশে অতিরিক্ত মহানির্দেশক প্রশান্ত কুমার বলেছেন, "স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের যে গাড়িটিতে বিকাশকে নিয়ে আসা হচ্ছিল, সেটি কানপুরের কাছে দুর্ঘটনায় পড়ে উল্টে যায়। বিকাশ এক পুলিশ কর্মীর পিস্তল ছিনিয়ে নিয়ে পালাতে গেলে পুলিশ তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।"

বুধ আর বৃহস্পতিবার দুটি পৃথক ঘটনায় বিকাশ দুবের তিন সহযোগীও পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। তার আগে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে তার আরও দুই সহযোগী। গ্রেফতার হয়েছে অনেকে, যার মধ্যে রয়েছে কানপুরের তিন পুলিশ কর্মীও।

ওই তিন পুলিশ কর্মীই বিকাশ দুবেকে খবর পাচার করেছিল যে পুলিশ তার বাড়িতে গ্রেফতার করতে যাচ্ছে।

ঘটনার পরেই এই বন্দুকযুদ্ধ আর তাতে গ্যাংস্টার বিকাশ দুবের মারা যাওয়া নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী থেকে শুরু করে উত্তরপ্রদেশের দুই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব আর মায়াবতী - অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন।

অখিলেশ যাদব টুইট করে লিখেছেন, "গাড়ি উল্টায়নি। রহস্য ফাঁস হলে সরকারটাই উল্টে যেত। সেটা বাঁচানো গেছে।"

"অপরাধী তো শেষ হয়ে গেল। কিন্তু অপরাধ আর তাকে রক্ষা করছিলেন যারা, তাদের কী হবে?" টুইটারে প্রশ্ন তুলেছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী।

শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ফেক এনকাউন্টার হ্যাশট্যাগ দিয়ে হাজার হাজার টুইট করা হয়েছে, প্রশ্ন উঠেছে বন্দুকযুদ্ধে বিকাশ দুবের নিহত হওয়ার 'কাহিনী' কতটা সত্য, তা নিয়ে।

গাড়িটি কি আদৌ দুর্ঘটনায় পড়েছিল?
কানপুর শহরের ঠিক বাইরে যে জায়গায় দুর্ঘটনায় গাড়িটি উল্টে যায় বলে পুলিশ দাবী করছে, সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দারা সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলছেন, তারা কোনও দুর্ঘটনা ঘটতে দেখেননি। গুলির আওয়াজ শুনে তারা অকুস্থলের দিকে যেতে গেলে পুলিশ তাদের তাড়া করে সরিয়ে দেয়।

দুর্ঘটনার ঠিক আগে সাংবাদিকদের গাড়ি কেন আটকিয়ে দেওয়া হল?
উজ্জয়িনীতে গ্রেফতার হওয়ার পরে বিকাশ দুবেকে নিয়ে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের তিনটি গাড়ির পিছনে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক এবং কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরা ক্রু আসছিল।

"যে জায়গায় দুর্ঘটনা হয়েছে বলে পুলিশ দাবী করছে, তার ঠিক আধ ঘন্টা আগে একটা টোল প্লাজায় ব্যারিকেড করে সাংবাদিকদের গাড়িগুলো আটকিয়ে দেয় পুলিশ। শুধুমাত্র বিকাশ দুবে যে গাড়িতে ছিল সেটি আর সঙ্গের আরও দুটি পুলিশের গাড়ি বেরিয়ে যায়। রাতভর যে সাংবাদিকরা পুলিশকে ফলো করে আসছিলেন, তাদের কেন আটকানো হল?
আর এমন একটা জায়গায় এটা করা হল, যার কিছুক্ষণের মধ্যেই বন্দুকযুদ্ধের খবর পাওয়া গেল। তাই প্রশ্ন তো উঠবেই," বলছিলেন উত্তরপ্রদেশে বিবিসি-র সংবাদদাতা সমীরাত্মজ মিশ্র।

অদ্ভূতভাবে দুর্ঘটনায় উল্টিয়ে যাওয়া পুলিশের গাড়িটির ক্ষয়ক্ষতি বলতে গেলে কিছুই হয়নি। পায়ে চোট নিয়ে ৫০০ মিটারও দৌড়নো সম্ভব ছিল না বিকাশের।

সমীরাত্মজ মিশ্র আরও বলছিলেন, "পুলিশ বলছে বিকাশ দুবে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল, সেজন্যই গুলি চালাতে হয়েছে। কিন্তু বিকাশ দুবের পায়ে একটা গভীর চোট আছে, তার পায়ের ভেতরে ইস্পাতের পাত দেওয়া আছে। ৫০০ মিটারও ঠিক করে হেঁটে যেতে পারে না সে। এরকম একজন দৌড়ে পালাতে গেল? পুলিশের এই থিয়োরিটা অবাস্তব।"

তার যে এনকাউন্টার হতে পারে, এরকম একটা সম্ভাবনা গতকাল তাকে গ্রেপ্তার করার পর থেকেই উঠতে শুরু করেছিল।

সুপ্রীম কোর্টে এক আইনজীবি পিটিশান দাখিল করেছিলেন গতকালই, যাতে বিকাশ দুবের এনকাউন্টার করে দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।

প্রশ্ন তার গ্রেফতার নিয়েও
উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দির চত্বর থেকে বিকাশ দুবেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল বলে মধ্য প্রদেশ পুলিশ জানিয়েছিল।

কিন্তু ওই মন্দিরেরই এক নিরাপত্তা রক্ষী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে বিকাশ দুবে মন্দিরে এসে তাদের জানায় যে থানায় যেন খবর দেওয়া হয়। সে মহাকাল মন্দিরেই আত্মসমর্পন করতে চায়।

আট দিন আগে কী ঘটেছিল কানপুরে, যার পরে বিকাশ দুবের নাম সারা ভারত জানতে পারল?

দোসরা জুলাই রাতে কানপুরের কাছেই একটি গ্রামে বিকাশ দুবেকে গ্রেফতার করতে গিয়েছিল পুলিশের একটি বড় দল।

পুলিশ বলেছিল, চৌবেপুর গ্রামে যাওয়ার পথেই মাটি কাটার যন্ত্র দিয়ে পুলিশের পথ আটকায় অপরাধীরা। গাড়ি থেকে নেমে যখন পায়ে হেঁটে গ্রামের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন পুলিশ কর্মীরা, তখনই আশপাশের বাড়িগুলি থেকে গুলিবর্ষন শুরু হয়।

অতর্কিত ওই হামলায় একজন ডেপুটি পুলিশ সুপারিন্টেডেন্টসহ আট জন পুলিশ কর্মী মারা গিয়েছিলেন। বিকাশ আর তার দলবল পালিয়ে যায় রাতের অন্ধকারে।

পরের দিন সকাল থেকেই একদিকে চিরুনি তল্লাশি শুরু হয়, অন্যদিকে ঘটনার তদন্তে নামেন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্তারা।

ধীরে ধীরে বিকাশের দলের সদস্যদের এনকাউন্টার হতে থাকে।

কে এই বিকাশ দুবে
কানপুর অঞ্চলের পরিচিত অপরাধী বিকাশ দুবে। প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে সে নানা অপরাধমূলক কাজ জড়িত, যার মধ্যে হত্যার অভিযোগও আছে।

তার বিরুদ্ধে প্রায় ৬০টি মামলা রয়েছে।

"একটি ঘটনায় থানার ভেতরে এক রাজ্যমন্ত্রীকে হত্যার অভিযোগও ছিল তার নামে। কিন্তু সেই ঘটনায় কোনও সাক্ষী পায় নি পুলিশ। সে তার গ্রামে যথেষ্ট ক্ষমতাবান, কিন্তু নিজে কখনও বিধানসভা বা লোকসভার ভোটে দাঁড়ায়নি। গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরের সব পদই গত ১৫ বছর ধরে তার পরিবারেরই দখলে। আর সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই তার সুসম্পর্ক," বলছিলেন সমীরাত্মজ মিশ্র।

উত্তরপ্রদেশে এনকাউন্টারের খতিয়ান
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পরেই যোগী আদিত্যনাথ সংগঠিত অপরাধ দমনে কড়া হয়েছিলেন।

২০১৭ সাল থেকে ২০১৯ এর ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫১৭৮টি অভিযান চালিয়েছিল পুলিশ, বন্দুকযুদ্ধে মারা গিয়েছিল ১০৩ জন।

এসব ঘটনায় আহত হয় ১৮৫৯ জন অপরাধী। পুলিশের চাপে ১৭ হাজার অপরাধী আত্মসমর্পন করেছিল। বিবিসি


আরো সংবাদ