১০ এপ্রিল ২০২০

প্রশাসন নিষ্ক্রিয়, দিল্লিতেও গুজরাট দাঙ্গার ‘মডেল’

দিল্লিতে চলছে টানা সংঘর্ষ। অগ্নিসংযোগ, গুলি, বাড়িতে ঢুকে হামলা, বাদ নেই কোনো কিছুই। চার দিন ধরে ভারতের খাস রাজধানীর বুকে শহরের একটা অংশে এমন হিংসাত্মক ঘটনা চলছে, অথচ পুলিশ তা নিয়ন্ত্রণে কার্যত ব্যর্থ। এখানেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, তবে কি পুলিশের এই ‘অপারগতা’ পরিকল্পিত? ঠিক যেমন অভিযোগ উঠেছিল ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময়। কার্যত ‘নিষ্ক্রিয়’ থেকে বাড়তে দেয়া হয়নি তো দিল্লির সংঘর্ষ? এমন প্রশ্ন উস্কে দিয়েছেন বিরোধীরা। কেউ সরাসরি, কেউ ইঙ্গিতে।

ভারতের এনসিপি নেতা নবাব মালিক সরাসরিই গুজরাট দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। তার বক্তব্য,‘গত কয়েক দিন ধরে দিল্লিতে সংঘর্ষ চলছে। পুলিশ সেখানে নীরব দর্শক। রাজধানী শহরে কেন এটা হবে? দিল্লিতেও ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার মডেল চলছে।’

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে নিশানা করে তিনি বলেন,‘প্রশ্ন উঠছে, অমিত শাহ এমন নির্দেশ দেননি তো যে, কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি ব্যবস্থা না নেন এবং পুলিশ জনতাকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে, তা হলে নিশ্চয়ই কিছু গন্ডগোল আছে।’

কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী অবশ্য নাম করেননি। তবে দিল্লির সংঘর্ষের পিছনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন। কার ষড়যন্ত্র, কী ষড়যন্ত্র— সে সব স্পষ্ট না করেও সংঘর্ষ এত বড় আকার নেয়ার দায় ঠেলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং শাসক দল বিজেপির দিকে। পুলিশ-প্রশাসন কেন আগে থেকে সক্রিয় হয়নি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কী করছিলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে দেখেও কেন আগে থেকে আধাসেনা ডাকা হল না, এমন সব প্রশ্ন তুলেছেন।

রাজনীতির এই তরজার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই বলছেন, পুলিশ আগে থেকে আরো সক্রিয় হলে দিল্লির সংঘর্ষের পরিস্থিতি এতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেত না। বরং আগেভাগেই সামলে নেয়া যেত। গুজরাট দাঙ্গায় যে অভিযোগ ছিল, দিল্লির পুলিশ-প্রশাসনকেও একই অভিযোগে কাঠগড়ায় তুলছেন পর্যবেক্ষকদের একটা অংশ। কেন সেনা নামানো হল না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন। সেই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অমিত শাহের উপর। মনে রাখতে হবে, ২০০২ সালে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর সেই সময় গুজরাতে মোদির মন্ত্রিসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কাকতালীয়। তবে অনেকের মনেই ২০০২ সালের গুজরাটের সেই প্রেক্ষাপট ভেসে উঠছে।

কী হয়েছিল সেই সময়? ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের গোধরায় সবরমতি এক্সপ্রেসে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ওই ট্রেনে অযোধ্যা থেকে ফিরছিলেন করসেবকরা। জলন্ত দগ্ধ হয়ে মারা যান ৫৮ জন করসেবক। সেই ঘটনার পর থেকেই গোটা গুজরাট জুড়ে শুরু হয় হিন্দু-মুসলিম সংঘর্ষ। প্রায় তিন মাস ধরে চলে হামলা, অগ্নিসংযোগ, হত্যালীলা। সরকারি হিসেবেই মৃত্যু হয়েছিল ১০৪৪ জনের, নিখোঁজ ছিলেন ২২৩ জন। আহত প্রায় আড়াই হাজার। নিহতদের মধ্যে ৭৯০ জন ছিলেন মুসলিম। হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৫৪ জন।

পরবর্তী কালে অভিযোগ উঠেছিল, সেই সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত ব্যবস্থা তো নেনইনি, উল্টে প্রচ্ছন্ন মদত দিয়েছিলেন দাঙ্গায়। পুলিশ-প্রশাসনের কর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেননি। এমন অভিযোগও ওঠে যে, সরকারি কর্মকর্তারাই মুসলিমদের বাড়িঘর, সম্পত্তির তালিকা তুলে দিয়েছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের হাতে। সেই অভিযোগের তদন্তে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (সিট) গঠন করে দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০১২ সালে সেই সিটের রিপোর্টে ক্লিনচিট দেয়া হয় মোদিকে। পুলিশ-প্রশাসনের নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগও খারিজ করে দেয় সিট। গুজরাট দাঙ্গা থেকে হাত ধুয়ে ফেলেন মোদি-অমিত শাহরা।

কিন্তু দিল্লির সংঘর্ষে ফের ফিরে এসেছে সেই প্রশ্নই। এনসিপির নবাব মালিক যেটা সরাসরি ‘গুজরাত দাঙ্গা’র উল্লেখ করে বলেছেন, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই সেই প্রশ্ন তুলছেন আকারে ইঙ্গিতে। প্রকাশ্যে না হলেও অন্তত ঘনিষ্ঠ মহলে আলোচনা চলছে তেমনটাই।

অন্যদিকে এদিন (বুধবার) ১৯৮৪ সালে শিখ দাঙ্গার প্রসঙ্গ টেনে দিল্লি হাইকোর্ট বলেছে,‘আর একটা ১৯৮৪-র দাঙ্গা হতে দিতে পারি না আমরা।’ সুত্র : আনন্দবাজার।


আরো সংবাদ