০৫ ডিসেম্বর ২০২৩, ২০ অগ্রহায়ন ১৪৩০, ২০ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৫ হিজরি
`

এ কেমন শখ!

এ কেমন শখ! - প্রতীকী ছবি

বাংলায় শখ বা ইংরেজিতে হবি মানুষের চিত্ত-বিনোদনের অন্যতম উপাদান। শখ হলো মনোবাসনা পূর্ণ করা। যে কেউ শখের কাজ করে চিত্তবিনোদনের অভিপ্রায়ে। শৌখিনতার জন্য। মনের খেয়ালে। বাংলা অভিধান ঘেঁটে শখের প্রতিশব্দ বা অর্থ পাওয়া যায়- আগ্রহ, মনের ঝোঁক, পছন্দ, সাধ, খেয়াল, রুচি ইত্যাদি। এসব অর্থ দেখে বলা অসঙ্গত হবে না যে, উপার্জন বা অত্যাবশ্যকীয় কাজ বাদে অন্য যা কিছু করে আনন্দ পায় মানুষ; তাই শখ বলে আখ্যায়িত। অর্থাৎ পেশা বাদ দিয়ে অন্য যে কাজ করে আনন্দ পাওয়া যায় তাই হচ্ছে শখ।

শখ এমন একটি নিয়মিত ক্রিয়াকলাপ হিসাবে বিবেচিত যা ভোগের জন্য নয় উপভোগের জন্য করা হয়। এর মানে, মনের আনন্দে শখের কাজ করে মানুষ। এখানে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে ভোগ এবং উপভোগে পার্থক্যটা কী। সহজ ভাষায় জবাবটি হতে পারে- ভোগ প্রয়োজন মেটানো। আর উপভোগ শিল্পসম্মতভাবে কোনো কিছুর রস আস্বাদন। এ জন্য মানুষ শখের কাজ করে অবসর সময়ে। মানুষ প্রয়োজনীয় সময়ে করে প্রাত্যহিক জীবনের দৈনন্দিন সব দরকারি কাজ। যেমন, পেশাজীবীরা তাদের নিত্যদিনের কাজ শেষে বাড়তি সময়ে শখের কাজ করেন। ঠিক তেমনি কোনো শিক্ষার্থী পড়ালেখা শেষে শখের বিষয়গুলোতে মনোযোগী হন।

শখের মধ্যে ভাবার্থ বহন করে এমন বস্তু সংগ্রহ করা, সৃজনশীল এবং শৈল্পিক কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত হওয়া, খেলাধুলা করা বা অন্যান্য বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ড উপভোগ সবচেয়ে বেশি করে মানুষ। তবে ব্যক্তি চরিত্রের ভিন্নতায় শখ হয় আলাদা আলাদা।
অনেকে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন। নতুন নতুন জায়গায় গিয়ে অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ করতে সচেষ্ট হন। বই পড়ার শখ প্রবল থাকলে তাদের ঝোঁক বই সংগ্রহে। সাইকেলিং বা সুইমিং অনেকের হবি। মুভি দেখা কারো পছন্দের তালিকায় থাকে সবার উপরে। একসময় ডাক টিকিট সংগ্রহের শখ ছিল অনেকের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে। নানা দেশের মুদ্রা সংগ্রহ করাও কারো কারো শখ। কারো যদি কোনো বিষয়ে শখ থাকে এবং সে ক্ষেত্রে তিনি যদি নিয়মিত হন; তবে এর উপর যথেষ্ট দক্ষতা এবং জ্ঞান অর্জনে উৎসাহী হন।

প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর ৮০০ কোটি মানুষের প্রত্যেকের রয়েছে বিচিত্র সব শখ। কত মানুষের কত ধরনের শখ থাকে, সেই শখ পূরণে কত কিছু না করে মানুষ। কথাতে আছে, শখের তোলা আশি টাকা। মানুষ তার শখ মেটাতে ব্যয় করে প্রচুর অর্থ। এখন শখের পণ্যও একটি লাভজনক বাণিজ্য। উনিশ শতকের অগ্রযাত্রা উৎপাদন এবং প্রযুক্তি শখের সাথে জড়িয়ে পড়ায় শ্রমিকদের আরো অবসর সময় দিয়েছিল। এ কারণে, সময়ের সাথে শখগুলোতে বিনিয়োগ প্রচেষ্টা বেড়ে গেছে ব্যবসায়ীদের।

শখের বদল ঘটে এক এক বয়সে। ছেলেবেলায় এক ধরনের শখ থাকে অতিপ্রিয়। সেই তারই তরুণ বয়সে অ্যাডভেঞ্চার দানা বাঁধে। তরুণদের আগ্রহ এবং মনের বিকাশে শখের ধারাগুলো পরিবর্তিত হয়। আবার সমাজের দেখাদেখি শখ বদলে যায়। যেমন স্ট্যাম্প সংগ্রহ। বিংশ শতাব্দীতে ডাকটিকিট সংগ্রহ ছিল জনপ্রিয়। তখন ডাকব্যবস্থা ছিল যোগাযোগের মূল মাধ্যম। আজকাল প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অনুসরণে ভিডিও গেমস জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এখন অনেক কিশোর-তরুণের শখ ভিডিও গেম খেলা। শিশুরাও এ থেকে পিছিয়ে নেই। তারা এ শখ মেটাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকে ডিভাইস নিয়ে। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো- সাম্প্রতিক সময়ে সব বয়সের বিপুলসংখ্যক মানুষ ডিভাইসে আসক্ত। তাদের অন্তর্জালে কাটে বেশির ভাগ সময়। অনেকের অবস্থা এমন যে, নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে পড়ে থাকে ডিভাইসে।

প্রতিটি প্রযুক্তির থাকে ভালো-মন্দ। ইন্টারনেট, মানে অন্তর্জাল প্রযুক্তিও এর থেকে আলাদা নয়। এর প্রবল প্রভাব বিদ্যমান ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই দিকে। কে কিভাবে এর ব্যবহার করবে তার ওপর নির্ভরশীল প্রযুক্তিটি তার জীবনে কল্যাণ না অকল্যাণ বয়ে আনবে। তবে এ কথা ঠিক যে, যেহেতু মানুষের শখ বিচিত্র; তাই অনেকে তার শখের সীমানা নৈতিকতা ডিঙিয়ে অনৈতিকতায় গিয়ে পৌঁছায়। সব সময়, সব কালে কিছু অনৈতিক শখের কথা শোনা যায়। অনৈতিক শখ শুধু এখন নয়; সেই প্রাচীনকাল থেকে অনেককে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

নিষ্ঠুর-অনৈতিক শখের অনেক গল্প চালু আছে সমাজে এবং দেশে দেশে। এর সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করা কঠিন। আদৌ এতে সত্যের লেশমাত্র আছে কিনা তা আমাদের অজানা। তেমনি একটি গল্প- প্রাচীন মিসরের সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রার শখ ছিল বড়ই নিষ্ঠুর। তিনি তার যৌবন অটুট বা ধরে রাখতে একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর নররক্ত দিয়ে গোসল করতেন। তার ধারণা ছিল এতে নাকি শরীরে বার্ধক্য বাসা বাঁধতে পারবে না। আবার এক সময়ের বাংলাভূখণ্ডের জমিদারদের অনেকের নাকি শখ ছিল নারীর পেটে কিভাবে বাচ্চা থাকে তা দেখার। এ জন্য জমিদারদের পাইক-পেয়াদারা রাতের আঁধারে কোনো দরিদ্র প্রজার গর্ভবতী স্ত্রীকে ধরে এনে তার পেট চিরে গর্ভের বাচ্চা দেখিয়ে জমিদারের শখ পূরণ করত। এমন নিষ্ঠুর ও মানবতাবিরোধী শখ সত্যি কেউ পূরণ করেছে কিনা তার সত্যতা নির্ণয় করা এখন অসম্ভব। তবে এসব গল্প বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে ছেলেবেলায় শুনেছি। এসব বিকৃত ইচ্ছা আদৌ শখ কিনা সেই বিতর্ক অনায়াসে তোলা যেতে পারে।

তবে হাল আমলে এক তরুণের বিকৃত শখের একটি উদাহরণ দিই। এটি প্রযুক্তির নেতিবাচক দিক। তার কাছে এটি শখ হলেও আইনের কাছে এবং নৈতিকতায় অগ্রহণযোগ্য। প্রকৌশল কলেজের ছাত্র খুলনার ছেলে সামির। তার জীবনে প্রযুক্তি তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। যার কারণে তাকে জেলহাজতে যেতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের করা একটি মামলার তদন্ত করে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার মুঠোফোন ও ল্যাপটপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ তিন দেশের অন্তত ৩০ কিশোরীর ১৬৪টির মতো নগ্ন ছবি উদ্ধার করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মো. সামির (২০) নামের ওই তরুণ অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগের অ্যাপ ডিসকর্ডে এসব কিশোরীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলেন। এরপর ফাঁদে ফেলে তাদের নগ্ন ছবি সংগ্রহ করেছেন।

গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তা মাইকেল লির করা মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী গত মার্চ মাসে ডিসকর্ড অ্যাপে ক্যালিফোর্নিয়ার এক কিশোরীর সাথে সামিরের বন্ধুত্ব হয়। বন্ধুত্বের একপর্যায়ে সামির ওই কিশোরীর পর্নো ছবি তার কাছ থেকে চেয়ে নেন। এ ছাড়া কিশোরীকে ওয়েব ক্যামেরার সামনে এনে তার বিবস্ত্র ছবি তুলে নেন সামির। পরে কিশোরী সামিরের অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তবে সামির বিভিন্নভাবে ওই কিশোরীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে সামির বলেছেন, ‘এসব ছবি সংগ্রহে রাখা তার শখ ছিল। এগুলো তিনি বেচাকেনা করতেন না’ (২৭ আগস্ট ২০২৩, প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণ)।

কিন্তু প্রশ্ন জাগে, আইনের কাছে অগ্রহণযোগ্য বিদঘুটে এই অনৈতিক শখ কেন সামিরের ঘাড়ে সাওয়ার হলো? জানা যায়, মা-বাবা তাকে বাইরে কোথাও যেতে দিতেন না। একাকিত্বের কারণে তার মুঠোফোনে আসক্তি তৈরি হয়। সেই থেকে বিকৃত মানসিকতা গড়ে ওঠে এই তরুণের। শুধু সামির একা নন, তার মতো আমাদের সমাজে হাজারো তরুণ, এমনকি সব বয়সী অগণন মানুষ এখন অনলাইনে পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত। ফলে সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে পড়ছে। সমাজে বাড়ছে অনৈতিক যত কাজ। চার দিক ছেয়ে গেছে বেলেল্লাপনায়। বেড়েছে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। ফলে ধর্মীয় ও পারিবারিক অনেক মূল্যবোধ লোপ পেয়েছে এবং পাচ্ছে।


আরো সংবাদ



premium cement
পীরগাছায় শতাধিক শিক্ষার্থীর হাতে গাছের চারা তুলেন দিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিবন্ধন পাচ্ছে আরো ২৯ দেশী পর্যবেক্ষক সংস্থা গাজায় ফিলিস্তিনি নিহতের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১৬০০০ রাজধানীতে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী দিবস উপলক্ষে সাইকেল র‍্যালি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাথরুম থেকে শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার ইসরাইলের হামলায় হিজবুল্লাহ যোদ্ধা নিহত জোটের প্রার্থী চূড়ান্ত করতে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে নোয়াখালীতে ৭ জুয়াড়ি গ্রেফতার গাজায় ইসরাইলি সৈন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়াসহ নানা রোগ বিরোধীদলের নেতৃবৃন্দকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার বিষয়ে যা বললেন আমিরে জামায়াত মধুপুরে মা-ছেলে ও ছেলের বউসহ ৪ জনকে গাছে বেঁধে নির্যাতন

সকল