২৮ মে ২০২৩, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯, ০৭ জিলকদ ১৪৪৪
`

ব্যাংক খাতের সংস্কার

ব্যাংক খাতের সংস্কার। - ছবি : সংগৃহীত

ক’দিন আগে মাত্র দু’দিনের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের দু’টি বড় ব্যাংক কলাপস করেছে। এর প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সাধারণ আমানতকারীরা ও সে দেশের পুঁজিবাজার এ ব্যাংকের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকগুলো কলাপস করতে বাধ্য হয়। আর ওই দেশের সরকার বলছে, তারা এ ধরনের নিমজ্জিত ব্যাংককে ভাসিয়ে তুলতে বেলআউট করবে না। তা হলে অবস্থা কী দাঁড়াল সেখানে? এক দিনের নয়, বহু দিনের অনিয়ম ও ক্রমেই আস্থাহীনতায় আমানতকারীরা টাকা উত্তোলনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর অবস্থান পুষ্টিহীনতায় ভুগতে ভুগতে আজ তাদের এ ভগ্নদশা। অবস্থা বেগতিক হওয়ার আগে রোগ সারিয়ে তুলতে সে দেশে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পরিপালনে দায়িত্বহীনতার কোনো আলামত ছিল না, তবুও শেষ রক্ষা সেখানে মেলেনি। বড় বড় আশাবাদ ও স্মার্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখায় বিভোর বাংলাদেশের ব্যাংক খাত এখনো হয়তো এতটা খারাপ হয়নি এ আশায় বুক বেঁধে আছেন বাংলাদেশের তাবৎ আমানতকারী। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, দেশের কোনো ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার পর্যায়ে নেই, অতীতেও হয়নি। কিন্তু তবুও এটি কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না যে, ব্যাংকের ওপর সাধারণ আমানতকারীদের আস্থায় চিড় ধরেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংকে বড় রকমের দুর্নীতির ঘটনা তথা পুঁজি পাচারের অবারিত পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকায়, মালিকানায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন নাটক মঞ্চস্থ হওয়ায় সাধারণ আমানতকারীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তারা আমানত ব্যাংক থেকে তুলে নিচ্ছেন। ধামাচাপা দেয়ার ছলে দায়িত্বশীলরা পুরোনো কথা বলে চলেছেন ‘গুজবের কারণে’ গ্রাহকরা আমানত উত্তোলন করে নিয়েছেন এবং নানাভাবে গুজব প্রতিরোধের ব্যবস্থা করায় আমানতকারীরা আবারো ব্যাংকমুখী হতে শুরু করেছেন। গুজব প্রতিরোধ করা আর প্রকৃত পদক্ষেপ গ্রহণ এক সাথে যায় না।

অর্থনীতির মেরুদণ্ড ব্যাংক খাত (শিক্ষা যেমন জাতির মেরুদণ্ড)। ব্যাংক অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি প্রতিষ্ঠান। ব্যাংক চলে মানুষের আস্থার ওপর নির্ভর করে। কোনো কারণে যদি সাধারণ মানুষ ব্যাংকের ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে তাহলে সেই ব্যাংক দেউলিয়া হতে বাধ্য। তাই এমন কোনো কাজ করা কারো উচিত হবে না, শাক দিয়ে মাছ ঢাকার প্রয়াসে না যাওয়াই শ্রেয়, যাতে সার্বিকভাবে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর আমানতকারীদের আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হয়। নিকট অতীতে ব্যাংকগুলোতে এমন কিছু দুর্নীতি-অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রতিকার কিংবা প্রতিবিধানে দৃশ্যমান অপারগতা, যা মনে হলে মানুষ আঁতকে ওঠে। মানুষ সব কিছু ভুলে যেতে পারে। কিন্তু অর্থ হারানোর ব্যথা কখনো ভুলতে পারে না। মানুষ ব্যাংকের ওপর শর্তহীন বিশ্বাস রাখে বলে সেখানে তাদের সম্পদ সংরক্ষণ করে। একই সাথে মানুষ ব্যাংকে আমানতকৃত অর্থের বিপরীতে প্রযোজ্য পরিমাণে সুদ বা মুনাফা পেতে চায়। এ সুদের হার অবশ্য মূল্যস্ফীতির হারের বেশি হতে হয়। কোনো ব্যক্তি যদি দেখেন, বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়ে ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আর ব্যাংক তাকে ৬ শতাংশ সুদ দিচ্ছে আমানতের ওপর; তাহলে তিনি কখনো ব্যাংকে আমানত সংরক্ষণ করতে চাইবেন না। কারণ এতে বছর শেষে তার মূল পুঁজিরই অবচয় ঘটবে, অর্থাৎ পুঁজি বসে যাবে। আমানতকারীরা তার অর্থের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বিধান ও নির্দিষ্ট হারে সুদ পেতে ব্যাংকে অর্থ সংরক্ষণ করেন। এ দু’টির যেকোনো একটির ব্যত্যয় ঘটলে মানুষ ব্যাংকে অর্থ সংরক্ষণ করতে চাইবে না। এ জন্য মুদ্রানীতিতে প্রয়োজনীয় বিধান ও আশাবাদ উচ্চারিত হয়, কিন্তু বাস্তবায়ন দেখতে কষ্ট পেতে হয়। ব্যাংক আমানতকারীদের কাছ থেকে যে অর্থ সংগ্রহ করে তা তারা অলস বসিয়ে রাখে না। তারা সেই অর্থ উদ্যোক্তাদের কাছে বিনিয়োগ করে। কাজেই ব্যাংকঋণের সুদের হারও এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে আমানতের ওপর প্রদেয় সুদের হার তুলে দিয়েছে। কিন্তু ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ অপরিবর্তিত রেখেছে। এতে ব্যাংকগুলোর অসুবিধা হচ্ছে- ৬ থেকে ৭ শতাংশ বা তারও বেশি হারে সুদ দিয়ে আমানত সংগ্রহ করছে কিন্তু সেই আমানত সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকের স্পেড কমে যাচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে।

বাংলাদেশের ব্যাংকিং সিস্টেম অনেক দিন ধরে নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আছে। সম্প্রতি কয়েকটি ব্যাংকে বড় ধরনের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের ঘটনা ঘটার ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আমানতকারীরা ব্যাংকে গিয়ে তাদের প্রত্যাশা মোতাবেক অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না। শীর্ষস্থানীয় কোনো কোনো ব্যাংক তারল্য সঙ্কট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ ধার নিচ্ছে। অথচ কিছু দিন আগেও এসব ব্যাংক অত্যন্ত ভালো অবস্থায় ছিল। এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আমানত প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। সীমান্ত দিয়ে নগদ অর্থ চলে যাচ্ছে।

ব্যাংক খাতের একটি বড় সমস্যা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহির অভাব। এ অবস্থা দূর করতে অগৌণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা আবশ্যক হবে। কোনোভাবে যেন ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ সুশাসনের অভাব সৃষ্টি না হয়; তা নিশ্চিত করতে হবে। ব্যাংক পরিচালিত হয় জনগণের টাকায়। কিন্তু ব্যাংকগুলোর পর্ষদে সাধারণ আমানতকারীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নেই। আইন করে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকে একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা দুই থেকে চারজনে উন্নীত করা হয়েছে। তাদের মেয়াদকাল ছয় বছর থেকে বাড়িয়ে ৯ বছর করা হয়েছে। আর সরকারি ব্যাংকগুলোতে সরকার মনোনীত পরিচালকরা বিশেষ সুতোর টানে জবাবদিহির আওতায় ভূমিকা পালন করতে পারেন না বা করেন না বলে প্রতীয়মান হয়, ফলে ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংক অনেকটা পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে ও সরকারি ব্যাংকগুলো কর্তার ইচ্ছায় কর্ম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সম্প্রতি বলেছেন, ‘ব্যাংক পরিচালকদের অনেকে নিজেদের ব্যাংকের মালিক মনে করছেন। তারা সেভাবে ব্যাংকের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে চাচ্ছেন।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের এ সত্য পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সবাইকে মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রীয় হোক আর ব্যক্তি মালিকানাধীন হোক, ব্যাংকের প্রকৃত মালিক হচ্ছে দেশের সাধারণ আমানতকারীরা। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনায় সরকার প্রতিনিধি পাঠায়। কাজেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালক কখনো ব্যাংকের মালিক নন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাদের আচার-আচরণ মালিকের মতো মনে হয়। তারা নানা ধরনের দুর্নীতি আর অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। এক শ্রেণীর ব্যাংক পরিচালক আছেন; যারা নানা ধরনের দুর্নীতির সাথে সরাসরি যুক্ত বলে বাজারে চাউর আছে। তারা স্বার্থসন্ধ বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণদানে সুপারিশ করেন। ঋণ পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। বিনিময়ে ঋণ আবেদনকারীর কাছ থেকে হয়তো হাতিয়ে নেন অর্থ। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বড় অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। ব্যাংকের মালিকানা রাতের আঁধারে পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি যথাযথভাবে না হওয়ায় অর্থবাজারের অস্থিরতা-অসুস্থতা বৃদ্ধির লক্ষণকে উদ্বাহু করেছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকের এক শ্রেণীর পরিচালক আছেন যারা অন্য ব্যাংক থেকে নামে-বেনামে ঋণ হাতিয়ে নিচ্ছেন। সাধারণ গ্রাহক ও আমানতকারীরা যখন এসব কাহিনী শুনেন তখন ব্যাংকব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা কমে যায়।

এ প্রেক্ষাপটে আইএমএফ ব্যাংক খাতের সম্পর্কে যে শর্ত দিয়েছে তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যাংকব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। এক শ্রেণীর প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নামে-বেনামে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে নিয়ে অন্য খাতে প্রবাহিত করছেন। এমনকি সেই ঋণের অর্থ বিদেশে পাচার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। আইএমএফ খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য শর্ত দিয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংক সেক্টর বর্তমানে ভয়াবহভাবে খেলাপি ঋণভারে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংক কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব মতে, দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আইএমএফ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রদর্শিত পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক বেশি।

আইএমএফ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনার শর্ত দিয়েছে। এ শর্ত পরিপালন করা অসম্ভব হতে পারে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিশেষ করে সরকার যদি সিরিয়াসলি কমিটেড না হয় তাহলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত মাত্রায় কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। দুর্নীতি দমন কমিশন বা আদালত খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে তেমন কোনো সাফল্য প্রদর্শন করতে পারছেন না। কেননা, ঋণখেলাপিদের আইনগত অধিকারও তাদের দেখতে হয়। এ কারণে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে সামাজিকভাবে বয়কট করার প্রস্তাব দিচ্ছেন অনেকে। কিন্তু এটি সম্ভব নয় এ কারণে যে, আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে যাদের প্রভাব বেশি তারা জয়ী হবেন, থাকবেন, এটিই স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে সব কিছু সম্ভব।

কে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি ও কে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি নন তা সবাই জানেন। কিন্তু তাদের যখন চিহ্নিত করতে যাওয়া হবে; তখন নানা ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করা হবে। ব্যাংকব্যবস্থা বা অন্য কোনো বিষয়ে গুজবের সৃষ্টি হলে সাথে সাথে সেই গুজব অপনোদন করা প্রয়োজন। কোনোভাবে গুজব বাড়তে দেয়া ঠিক নয়। নিজে অপশক্তি হয়ে অন্যকে অপশক্তির অপবাদ দিয়ে পানি ঘোলা করার প্রয়াস থাকলে গুজব বাড়তে থাকবে, তখন আইএমএফের শর্ত পালনে অপারগতা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়াতে পারে।
লেখক : উন্নয়ন অর্থনীতির বিশ্লেষক


আরো সংবাদ


premium cement