১৮ জুলাই ২০২৪, ৪ শ্রাবণ ১৪৩১, ১১ মহররম ১৪৪৬
`

একদলীয়, নির্দলীয় ও বহুদলীয় নির্বাচনী সরকার

একদলীয়, নির্দলীয় ও বহুদলীয় নির্বাচনী সরকার। - ছবি : সংগৃহীত

কোনো দেশ ও জাতির সঙ্কট থেকে উত্তরণে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি নিশ্চিতকরণের প্রয়োজনে ‘জাতীয় সরকার’ গঠিত হয়ে থাকে। জাতীয় সরকারের আরেকটি প্রতিরূপ হচ্ছে : অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকার হতে পারে একদলীয়, নির্দলীয় ও বহুদলীয়। জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনে যেমন জাতীয় সরকার হয়ে থাকে, ঠিক তেমনি একটি শাসন থেকে অপর শাসনে উত্তরণে যে সময় অতিবাহিত হয়, সে সময়ের সরকারকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলে। এর আরেকটি নাম আছে- অস্থায়ী সরকার।

সরকার যখন কর্তৃত্ববাদী বা কার্যত এক দলীয় তখন নানা নামে এবং নানা ধামে মূলত একই বৃত্তে ঘুরতে থাকে তারা। রাজনৈতিক দলগুলো যখন একে অপরের কর্তৃত্বে ভয় পায় তখন বিচারপতি বা শক্তির শাসনের কাছে তারা আত্মসমর্পণ করে। যেহেতু তারা কোনো দলভুক্ত নয় সে জন্য নির্দলীয় বলা হয় তাদের। আবার যখন সব দলের বা অনেক দলের সমন্বয়ে আস্থার সৃষ্টি হয় তখন কার্যত বহুদলীয় ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা ঘটে। গ্রেট ব্রিটেনে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালে চার্চিলের নেতৃত্বে এ ধরনের সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, চীনসহ বিভিন্ন দেশে ইতিহাসের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এ ধরনের সরকার পরিস্থিতির অনিবার্যতায় দেশ পরিচালনা করেছে। আমাদের দেশে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতার জন্য যে সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়, তার নাম ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। এখন সবাই একমত যে, বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের উৎস তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একধরনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রতিশব্দ হিসেবে নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচন সহায়ক সরকার ও জাতীয় সরকার ইত্যাদি প্রত্যয় ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে গুণ ও মাত্রাগত পার্থক্য রয়েছে। সব সংসদীয় কাঠামোর মধ্যেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হতে পারে। আবার সব রাজনৈতিক দল ও পক্ষের সমন্বয়ে যে সরকার গঠিত হয় তার নাম ‘জাতীয় সরকার’। যেকোনো শাসন কাঠামোতে এটি সম্ভব। সংসদীয় সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত সবাই জানেন, এটি নিছক দলীয় সরকার। নির্বাচনকালীন সময়ও এ সরকার বহাল থাকে। তাই নির্বাচনকালে পূর্ব প্রতিষ্ঠিত দলীয় সরকারটি নির্দলীয় আদলে কার্যক্রম পরিচালনা করে। আসলে তারা দলীয় স্বার্থই সংরক্ষণ করে। আর যদি সেটা হয় সব মত সব দলের সমন্বয়ে একটি জাতীয় সরকার, সেখানে আস্থা, বিশ্বাস ও দায়িত্বশীলতা পূর্ণ মাত্রায় বজায় থাকে।
দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে কমবেশি অভিযোগ থেকেই গেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, গণচরিত্র ও রাজনৈতিক এলিটদের গতি-প্রকৃতির কারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার আন্দোলন সূচিত হয়। জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের তৎকালীন আমির প্রফেসর গোলাম আযম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল প্রবক্তা। জামায়াত ও আওয়ামী লীগের যৌথ আন্দোলনে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জাতীয় রূপ লাভ করে। ১৯৯৬ সালের প্রথম দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির বিপুল বিজয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে শঙ্কিত করে তোলে। জাতীয় ঐকমত্যে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা বাতিলের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এর বিপরীতে রাজনৈতিক কৌশল ও আন্দোলন করতে ব্যর্থ হয়।

এই রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে জাতি ইতোমধ্যে প্রায় দেড় দশক অতিক্রম করে। এ সময়ে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ ও জাতীয় নির্বাচন কোনোটিই সাধারণ মানুষের সাদামাটা অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়নি। বরং প্রতিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির অপকৌশলের রকমফের মানুষকে বিস্মিত করেছে। তাই রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে শঙ্কিত। ২০১৭ সালের প্রথম দিকে খালেদা জিয়া নির্বাচন কমিশনসংক্রান্ত ১৩ দফা দাবি উত্থাপন অবশেষে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’-এর কথা বলেছেন। ওই একই বছরের শেষ দিকে খ্রিষ্টানদের বড়দিন অনুষ্ঠানে তিনি ‘জাতীয় সরকার’ প্রত্যয়টি ব্যবহার করেছেন। ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিএনপি সব পর্যায়ের আন্দোলনে নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিটি প্রধান দাবি হিসেবে উত্থাপন করে আসছে।

গত ২৯ মার্চ ২০২২ লন্ডনে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জাতীয় সরকারের নতুন ধারণার কথা বলেন। ধারণাটি হচ্ছে, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপিসহ আন্দোলনকারী দলগুলো যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাদের সবাইকে নিয়েই জাতীয় সরকার গঠিত হবে। নির্বাচনে মিত্র দলগুলো জিতলেও সরকারে থাকবে, হারলেও থাকবে। প্রস্তাবটি অভিনব এবং এতে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টির প্রমাণ রয়েছে।

বিগত প্রায় ৫০ বছরের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনকালে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারে না। ১৯৯১ সালের নির্বাচন সব দলমতের কাছে সবচেয়ে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। কিন্তু তাতেও পরাজিত দলটি ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র অভিযোগ তোলে। ১৯৯৬ সালে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে ক্ষেত্রে পরাজিত পক্ষ ‘স্থূল কারচুপি’র আশঙ্কা প্রকাশ করে। ২০০১ সালের নির্বাচনটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও পরাজিতরা একই অভিযোগ উত্থাপন করে। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নিয়ে রাজনৈতিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়। বিএনপি সরকার এর রাজনৈতিক সমাধানে ব্যর্থ হয়। বরং উচ্চ আদালতের বিচারকদের বয়সসীমা বাড়িয়ে দিয়ে ক্ষমতাসীন দল সন্দেহের মাত্রা বৃদ্ধি করে। বিরোধী আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক সমাধানের পরিবর্তে রাজপথের সহিংসতাকে অগ্রাধিকার দেয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি, বুদ্ধিমত্তা ও জাতীয় ঐকমত্য প্রদর্শনে দারুণভাবে ব্যর্থ হন। বিস্ময়ের ব্যাপার, যে কারণে এবং যাদের কারণে তত্ত্বাবধায়ক সৃষ্টি, তারাই যখন পরবর্তীকালে ব্যবস্থাটি বাতিল করে তখন মানুষ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়।

বিগত বছরগুলোতে দেশী-বিদেশী বিজ্ঞজন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন, প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য এবং কার্যধারা নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সিভিল সোসাইটির সদস্যরা ফর্মুলার পর ফর্মুলা দিয়েছেন। কোনো কাজে আসেনি। ‘বিশ্বাসে মেলে বস্তু তর্কে বহু দূর’। বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের মনোভঙ্গি, প্রধান বিরোধী দলের সীমাবদ্ধতা, সুশীলসমাজের সদিচ্ছা সর্বোপরি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার নিরিখে আমাদের নির্বাচন পূর্বে এ বিষয়ে সহজ জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছা অনিবার্য ছিল।

২০১৪ সালের নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি ছোট নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করেছিল। সেটি তখন ১০ সদস্যের একটি ‘জাতীয় সরকার’ গঠিত হয়। ক্ষমতাসীন সরকার সংসদীয় শাসনব্যবস্থা বিশেষত ব্রিটেনের অনুসরণে প্রমাণ করতে চায় যে তারা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। আসলে সেটা ছিল একটি প্রকাশ্য প্রতারণা। একই দৃশ্যের অবতারণা ঘটে ২০১৮ সালের নির্বাচনে। এসব ঘটনা সত্ত্বেও অনেকে নির্বাচনকালীন সরকারের অনুপস্থিতিতে শক্ত নির্বাচন কমিশনের কথা বলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এটাও প্রমাণ করে শুধু নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে নির্বাচন নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করা সম্ভব নয়। পদ্ধতিগতভাবে নির্বাচন কমিশন আইনের মাধ্যমে শক্তিশালীকরণ একটি কঠিন কাজ। অর্থনৈতিকভাবে তারা অপরের অধীন। ব্যক্তিগতভাবে তারা এতই মেরুদণ্ডহীন যে, নিজেদের ক্ষমতা প্রয়োগেও তারা ভয় পান। সুতরাং সবচেয়ে সহজ ও বাস্তবসম্মত হলো রাজনৈতিক সমাধান। প্রস্তাবিত ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচন নিরপেক্ষ ও সব দলের অংশগ্রহণে সম্পন্ন করা সম্ভব।

গোটা জাতির প্রতিটি নাগরিক ২০২৩ সাল অবশেষে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন ও উৎকণ্ঠিত। এমনিতে আমাদের মতো দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সম্পর্কে নানাবিধ কথা রয়েছে। তৃতীয় বিশ্বের নির্বাচন দৃশ্যকে কেউ বলছেন, ‘সিডো বা কপট’ গণতন্ত্র। কেউ বলছেন, ‘ইললিবারেল বা অনুদার গণতন্ত্র’। আবার কেউ বলছেন, ‘ওয়ানডে ডেমোক্র্যাসি’। মূলত আমাদের অর্ধ-শতাব্দীর ইতিহাস গণতন্ত্রের সফলতার কোনো প্রমাণ দেয় না। ২০০৯ সালে আওয়ামী যুগের সূচনার পর থেকে অবস্থা আরো হতাশার। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আস্থা ও বিশ্বাসের সঙ্কটই নির্বাচন বিপর্যয়ের মূল কারণ। বিশ্বাস যখন ক্ষীণ হয়ে যায়, পদ্ধতি তাকে এগিয়ে নেয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক এলিটদের ওপর আস্থা না রেখে বরং আইন তথা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে নির্ভরশীল হতে হবে। সে প্রতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাটি মূলত নির্বাচনকালীন সরকার, যে নামেই তাকে ডাকা হোক। এ নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে গত এক বছর ধরে রাজনৈতিক বাহাস চলছে। নির্বাচনের আগে জাতীয় সরকার নাকি নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার; এ নিয়ে জোটের নেতাদের মধ্যেই মতবিরোধ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ঐক্যফ্রন্টের নেতা আ স ম আবদুর রব ও ২০-দলীয় জোটের নেতা অলি আহমদ জাতীয় সরকারের পক্ষে মত দেন। তাদের আগেই জাতীয় সরকারের পক্ষে অবস্থান প্রকাশ করে বক্তব্য দেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

যেকোনো রাজনৈতিক সঙ্কটকালে ‘জাতীয় সরকার’ নিয়ে সরগরম আলোচনা হয়। জাতীয় সরকারের দাবি তখনই সামনে আসে, যখন দলীয় সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ। বিগত ১৫ বছরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে নির্বাসনে দিয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনো নির্বাচনের বিষয়ে ঐকমত্যে আসতে পারেনি। আর সরকারি দল ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করতে চাচ্ছে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার অন্তত দু’বার ‘জাতীয় সরকার’র দাবি করেছে। তবে কয়েকটি দল মিলে সরকার হলেই সেটি জাতীয় হয় না। সরকারের বাইরে যারা থাকে, তারাও জাতির অংশীদার।

বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সরকারের ধারণাটি আসে ১৯৭১ সালে। সে সময় আওয়ামী লীগের বাইরে যেসব রাজনৈতিক দল মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, তাদের দাবি ছিল সব দলকে নিয়েই সরকার গঠন করা হোক। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব সেই দাবি মেনে নেয়নি, তারা এককভাবে সরকার গঠন করে। স্বাধীনতার পর জাতীয় সরকার গঠনের প্রথম দাবি উত্থাপন করেছিলেন তৎকালীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। মওলানা ভাসানী সে দাবিকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন। আওয়ামী লীগ সে দাবি গ্রাহ্য করেনি। আওয়ামী লীগের নেতাদের ভাবটা ছিল, ‘আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। আমরাই দেশ শাসন করব। অন্যরা নাক গলাবে কেন?’

কিন্তু যখন দেশের পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হতে থাকে, জাতীয় সংসদে ২৯৩টি আসন নিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছিল না, তখন বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করেন। একদলীয় সরকারকেই জাতীয় বলে চালানো হলো। লক্ষ করার বিষয় বাকশাল গঠনে বাংলাদেশ শব্দের পরিবর্তে জাতীয় শব্দটি ব্যবহৃত হয়, যেমন জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয় যুবলীগ ও জাতীয় ছাত্রলীগ। ১৯৭৫ সালের বিয়োগান্তক ঘটনাবলির পর জাসদ নেতা কর্নেল (অব:) আবু তাহের আওয়ামী লীগবিরোধী সব দলকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সব মত ও সব পথের নেতাদের একত্র করে সরকার গঠন করেছিলেন। তখন প্রকৃত জাতীয় ঐক্য অর্জিত হলেও জিয়া একে জাতীয় সরকার বলেননি। আবার এরশাদ আমলেও অনেক দল থেকে অনেক নেতাকে ভাগিয়ে জাতীয় ঐক্যের রূপ দেয়ার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম শাসনামলেও বিএনপির দুই সংসদ সদসকে ভাগিয়ে মন্ত্রী করে ‘জাতীয় ঐকমত্যের’ নমুনা স্থাপন করা হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো বিএনপি আরেকটি জাতীয় সরকারের ধারণাকে সামনে নিয়ে এসেছে। এর মূল কথা হলো : নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন করার পর আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সব দলকে নিয়ে (জয়ী বা পরাজিত) জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। আগেই বলা হয়েছে প্রস্তাব দিয়েছেন লন্ডনে থাকা দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। বেশ কিছু দিন আগে থেকে বিএনপি ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বাইরের বেশ কিছু দলের সাথে আলোচনা শুরু করে। উদ্দেশ্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে জোরদার আন্দোলন। এর ফলাফল হিসেবে ১২ দলীয় সমমনা জোট এবং সাত দলীয় গণতন্ত্র মঞ্চের কথা উল্লেখ করা যায়।

এখন সরগরম বিতর্ক হচ্ছে আগামী জাতীয় নির্বাচনটি দলীয় সরকারের অধীনে হবে, না নির্দলীয় বা জাতীয় সরকারের অধীনে হবে। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও জেএসডি নেতা আ স ম আবদুর রব দাবি করে আসছিলেন জাতীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। নির্বাচনকালীন সরকার বা জাতীয় সরকারের নির্বাচন নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন মত আছে। সবচেয়ে জোরালো প্রস্তাবটি হচ্ছে নির্বাচনকালীন সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে। প্রস্তাবটি বাতিলকৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আদলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় প্রস্তাবনায় জাতীয় সরকারের কথা বলা হচ্ছে। এর আবার দু’টি ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমটি ডা: জাফরুল্লাহর। নব গঠিত ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ প্রস্তাবটিকে বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, জাসদ নেতা আ স ম রব অনেক আগে থেকেই এ ধরনের প্রস্তাব করে আসছেন। তারা বলছেন, সেই সরকার কমপক্ষে দুই বছর ক্ষমতায় থেকে ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন করবে।

জাতীয় সরকারের দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি এরকম যে, নির্বাচন পরিচালনার জন্য সব দলের সমন্বয়ে তিন মাসের জন্য একটি বহুদলীয় সরকার গঠন। অন্যদের থেকে এই প্রস্তাবের ভিন্নতা এই যে, অন্যরা যেখানে নিরপেক্ষ লোকদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলছেন, সেখানে এরা সব দল থেকে একজন দু’জন নিয়ে বহুদলীয় সরকারের কথা বলছেন। এই প্রস্তাবের প্রধান প্রবক্তা হচ্ছেন চরমোনাইয়ের বর্তমান পীর সাহেব হজরত মাওলানা রেজাউল করীম। ডা. জাফরুল্লাহ ও অন্যরা জাতীয় সরকারের নামে দুই বছর রাষ্ট্র মেরামতের সময় চান। পীর সাহেব দীর্ঘ মেয়াদের ব্যাপারে একমত নন। জাফর উল্লাহর জাতীয় সরকারের গঠন প্রকৃতিকে গণতান্ত্রিক মনে করেন না চরমোনাইয়ের পীরের নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জাতীয় নির্বাচনের তফসিলের আগে সংসদ ভেঙে মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এই প্রস্তাবিত জাতীয় সরকার গঠিত হবে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য থেকে।

এক দলীয় স্বৈরাচার, নির্দলীয় নির্বিকার সরকারের চেয়ে নির্বাচনকালীন বহুদলীয় সরকার উত্তম এ জন্য যে, এই সরকারে জাতীয় ঐকমত্যের প্রকাশ ঘটে। ছোট-বড়, প্রধান-অপ্রধান এবং দুর্বল অথবা শক্তিশালী সব রাজনৈতিক দলের সমকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শক্তি যদি একমত হয়ে আবারো জাতীয় সরকার গঠন করে তা পরবর্তী সংস্কার কার্যক্রম বা নির্বাচনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সহায়ক হয়। তবে অপ্রিয় সত্য এটি যে, ‘বৃক্ষত ফলত পরিচায়ত’। নির্বাচনকালীন সরকারকে যে নামেই ডাকা হোক আদর্শ ও লক্ষ্য যদি থাকে যথার্থ তাহলে ‘মাঞ্জিলে মাকসুদে’ বা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছা হবে নিশ্চিত।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


আরো সংবাদ



premium cement