২৭ নভেম্বর ২০২২, ১২ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

উপাচার্যদের কর্মকাণ্ড

উপাচার্যদের কর্মকাণ্ড - ছবি : নয়া দিগন্ত

‘সহজ কথা যায় না বলা অতি সহজে’। সব ক্ষেত্রেই স্থান-কাল-পাত্রভেদ আছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে উপাচার্যরা আছেন অনেক উঁচুতে। তাদের সম্পর্কে কথা বলতে অনেক ভাবতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে, সম্মান বিবেচনায় ও সামাজিক অবস্থানে তারা শীর্ষে আছেন। সাধারণ মানুষের ধারণা, তারা চাঁদের দেশের লোক। আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। ছায়াছবির লোকদের তারকা বলে। এদের কখনো কখনো ধরাছোঁয়া যায়; কিন্তু আমাদের উপাচার্যরা আকাশের সেসব নক্ষত্র, যাদের ধরাছোঁয়ার জন্য আকাশে মই লাগাতে হয়। তারা যেন এই মাটির কেউ নন, আকাশের কিছু। এ রকম একটি ভাবাবেগের মধ্যে বাস করেন উপাচার্যরা।

সেই উপাচার্যরা যখন নিজেদেরকে ভূলুণ্ঠিত করেন তাদের কার্যকলাপে, তখন লজ্জার আর শেষ থাকে না। আকাশের লোকেরা যখন মাটির রহিম, করিম, রাম-শ্যাম ও যদু-মধুর চেয়ে নিচু কোনো কাজ করেন তখন সাধারণ মানুষের হতাশা কতটা নিচু পর্যায়ে পৌঁছে তা লক্ষ করা যায় আজকের গণমাধ্যমে। সত্য কথা এই, পুরনো লোকেরা সেই নস্টালজিয়ায় ভোগেন। ব্রিটিশ আমলে এমনকি পাকিস্তান আমলের সেসব জাঁদরেল ভিসিদের নিয়ে গল্প কথার কল্পলোকে থাকেন। আমার বাবা ব্রিটিশ আমলের মানুষ ছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখার্জির আভিজাত্যের গল্প শোনাতেন। তিনি নাকি বলতেন, ‘আই অ্যাম দ্য আশুতোষ মুখার্জি’। পাকিস্তান আমলে প্রথম মুসলমান উপাচার্য স্যার এফ রহমানের কেতাদুরস্ত পোশাক-আশাক ও আচার-আচরণের গল্প শুনতাম। নন্দিত ও নিন্দিত উপাচার্য উসমান গনির উচ্চতার কথা শুনেছি। ড. সাজ্জাদ হোসেনের তীব্র উষ্ণ ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞান-গরিমার কথা শুনে মুগ্ধ হতাম। এই সে দিন আমাদের সময়ের উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরী, সত্যেন বোসের সমকক্ষ বলে আমরা গর্ব করতাম। সম্ভবত প্রফেসর এমাজউদ্দীন পর্যন্ত এ ধারার কিছু অংশ অবশিষ্ট ছিল।
এরপর দলীয় সরকার যতটাই দলীয় হয়েছে ততটাই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের মান-সম্মান কমেছে। পাকিস্তান আমলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। ব্রিটিশ আইন ও ট্র্যাডিশনেই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হতো। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর গণতন্ত্রায়নের প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। ১৯৭৩ সালে একটি বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ঘোষিত হয়। এতে ভোটের মাধ্যমে ভাইস চ্যান্সেলর নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। ডিনও নির্বাচিত হতে থাকে। বিভাগে হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্টের পরিবর্তে ক্রম জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করা হয়। এসবের ফলে শিক্ষকদের ওপর প্রশাসনের কর্তৃত্ব হ্রাস পায়। আগেকার দিনে রেজিস্ট্রার যথেষ্ট ক্ষমতা ভোগ করতেন। এখন রেজিস্ট্রার হলেন হেড ক্লার্ক বা প্রধান করণিক।

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ’৭৩ যখন স্বাক্ষর করছিলেন তখন বঙ্গবন্ধু নাকি বলেছিলেন, ‘আমি তো দিয়ে গেলাম তোরা রাখতে পারবি তো’। কথাটি মোস্তফা নুরুল ইসলাম বলেছেন স্মৃতিচারণে। যাই হোক, দীর্ঘ ৫০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। অতীত বিশ্লেষণ করে বলতেই হয়- বঙ্গবন্ধুর আশঙ্কা অমূলক ছিল না। আমরা সার্বিকভাবে দেশের ভালো করতে যেমন ব্যর্থ হয়েছি, ঠিক তেমনি শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি তো দূরের কথা- অবনতি হতে হতে তলায় ঠেকেছে। অন্যান্য ক্ষেত্রের কথা এই কলামে প্রাসঙ্গিক নয়, কেবলমাত্র উচ্চ শিক্ষার সবচেয়ে উঁচু জায়গা উপাচার্যদের সম্পর্কে কিছু কথা বলব। আমি নিজেও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলাম। লোকেরা বলে- উপরে থুথু ফেললে নিচের দিকেই আসে, সে দিকটা স্বীকার করেই মনোবেদনা থেকে এই কলাম লিখছি।

সে-ও আবার হঠাৎ করে নয়। গত শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালগুলোর আচার্য রাষ্ট্র্রপতি মো: আবদুল হামিদ বলতে গেলে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা ছড়িয়েছেন। সমাবর্তনে সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবোজ্জ্বল দিক, বর্তমান অবস্থা ও তার চাওয়া নিয়ে কথা বলেন, ‘সম্মানিত উপাচার্য ও শিক্ষকমণ্ডলী, আপনারা সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে নেতৃস্থানীয় ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম এবং এর অনেক পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকদের দেখলে বা তাদের কথা শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসত। কিন্তু ইদানীংকালে কিছু উপাচার্য ও শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে সমাজে শিক্ষকদের সম্মানের জায়গাটা ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।’
কিছুসংখ্যক অসাধু লোকের কর্মকাণ্ডের জন্য গোটা শিক্ষক সমাজের মর্যাদা যেন ক্ষুন্ন না হয়, সে দিকে খেয়াল রাখার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘একজন উপাচার্যের মূল দায়িত্ব প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমের তত্ত্বাবধান, পরিচালনা, মূল্যায়ন ও উন্নয়নকে ঘিরে; কিন্তু ইদানীং পত্রিকা খুললে মনে হয়, পরিবার-পরিজন ও অনুগতদের চাকরি দেয়া এবং বিভিন্ন উপায়ে প্রশাসনিক ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধা নেয়াই যেন উপাচার্যের মূল দায়িত্ব।’

রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, ‘অনেক শিক্ষকও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিকে ঐচ্ছিক মনে করেন। বৈকালিক কোর্স বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়াকেই তারা অগ্রাধিকার দিয়ে থাকেন। ছাত্র-শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সাথে এটি খুবই বেমানান।’

আচার্য আবদুল হামিদ মন্তব্য করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু উচ্চ শিক্ষার একটি প্রতিষ্ঠানই নয়; এটি আমাদের নেতৃত্বের প্রতীক ও পথপ্রদর্শক। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে মূল কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ে গবেষণা কম হওয়া নিয়েও আক্ষেপ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘দুঃখের বিষয় হচ্ছে- গবেষণায় আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। একসময়ের প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশেষ মর্যাদার চোখে দেখা হতো। সময়ের বিবর্তনে ক্রমেই যেন সেই ঐতিহ্য সঙ্কুচিত হয়ে আসছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত না হলেও তা কয়েকগুণ বেড়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সেই তুলনায় শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার সংখ্যা ও মান কতটুকু বেড়েছে বা কমেছে সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে। গবেষণার বিষয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেসব খবর প্রচারিত হয়, তা দেখলে বা শুনলে আচার্য হিসেবে আমাকেও লজ্জায় পড়তে হয়।’ উপাচার্যের নেতৃত্বে ও ছাত্র-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বা সেন্টার অব এক্সিলেন্স হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকসহ যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতাকেই প্রাধান্য দিতে হবে।’ স্নাতকদের উদ্দেশে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আজকের এই অর্জনের পেছনে তোমাদের মা-বাবা, শিক্ষক এবং রাষ্ট্রের যে অবদান ও ত্যাগ রয়েছে তা হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। দেশ ও জনগণের কল্যাণে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত রাখতে হবে- এটিই সবার প্রত্যাশা।’

শুধু রাষ্ট্রপতি বা আচার্যেরই এই অনুভূতি নয়, সমাজের সর্বত্র এই ক্ষোভ ও দুঃখবোধ ছড়িয়ে আছে। ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যগুলো যদি লক্ষ করেন তাহলে এর প্রমাণ মিলবে। আগে ভিসিদের কথা শুনলে শ্রদ্ধায় মাথানত হয়ে আসত। এখন তাদের দুর্নীতির খবর শুনে লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসে। তারা বিভিন্ন পদে নিয়োগ দিচ্ছেন পরিবারের সদস্যদের, করছেন দুর্নীতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে এ রকম মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। আচার্যের ভাষায়ই কথা বলেন তিনি। কয়েকদিন আগে সংসদে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পিরোজপুর বিল-২০২২’ পাসের আলোচনায় ভিসি নিয়োগের সমালোচনা করেন তিনি। দলীয় বিবেচনার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগে দাবি জানান জাপা মহাসচিব। সংসদে বিলটির ওপর জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব উঠানো হলে এ সময় মুজিবুল হক চুন্নুর পাশাপাশি ভিসিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেন বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ।
হারুনুর রশীদ বলেন, ‘ভিসিরা যা খুশি তাই করে যাচ্ছেন। কারো কোনো দায়বদ্ধতা নেই’। এ সময় ঢালাওভাবে ভিসিদের সমালোচনা করার আপত্তি জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি বলেন, ‘কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কার্যকলাপ নিয়ে কিছু কিছু সমালোচনা আছে। যেগুলোর সত্যতাও আছে এবং সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হচ্ছে; কিন্তু ঢালাওভাবে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে নিয়ে মন্তব্য করা সমীচীন মনে করি না।’ শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগের জন্য যখন প্যানেল প্রস্তুত করে পাঠানো হয়, যে বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে তালিকা করা হয়- আমি আগেও বলেছি, আবার বলছি, প্রথমে দেখা হয় তাদের একাডেমিক যোগ্যতা। দ্বিতীয়ত দেখা হয়, তারা গবেষণা কী রকম করেছেন। একই সাথে তাদের যে প্রতিষ্ঠান, সেখানে নেতৃত্ব দিয়েছেন কি না। ভিসি শুধু একাডেমিক দিক দেখেন না, নেতৃত্ব দেয়ার গুণাবলিও জরুরি। একই সাথে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন কি না সেটিও দেখা হয়। এসব বিবেচনায় যারা এগিয়ে থাকেন তাদের নাম প্রস্তাব করা হয়। তারাই নির্বাচিত হন।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের খুবই বরেণ্য শিক্ষক আছেন, যাদের ভিসি হিসেবে পেলে গর্ব অনুভব করতাম; কিন্তু তাদের অনেকেই এই প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হন না। আমরা চাইলে যে সবচাইতে ভালো কাউকে পাবো তা নয়, তাদেরও আগ্রহ থাকতে হবে।’

শিক্ষামন্ত্রীর এই সত্য উচ্চারণের মাধ্যমে একটি অপ্রিয় সত্য বেরিয়ে এসেছে, এমন অবস্থা ও পরিবেশ বিরাজ করছে যে, সর্বত্র যেমন ভালো মানুষের ভাত নেই, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো মানুষের স্থান নেই। তারা দায়িত্ব গ্রহণে ভয় পান। পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে নিজ আত্মসম্মান বাঁচানোর তাগিদে দূরে থাকতে চান- অনেক দূরে। সেই সাথে রাষ্ট্রপতি/আচার্যের ক্ষোভ অনুভূতির বিপরীতে গণমাধ্যমে একজন প্রশ্ন তুলেছেন- এই যদি অবস্থা হয় তাহলে তার জন্য দায়ী কে? এসব উপাচার্য কি রাষ্ট্রপতি/আচার্যের ঔদার্যে ও অনুমোদনে নিয়োগ লাভ করেননি? এসবের দায়দায়িত্বের খানিকটা তাকে স্পর্শ করে না কি?
উপাচার্যদের সম্পর্কে এত সব অভিযোগ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলে এই অপ্রিয় সত্যটি বেরিয়ে আসবে যে, সঠিক মানুষ সঠিক জায়গায় স্থাপিত হয়নি। উপাচার্যদের যোগ্যতা সম্পর্কে দেশে কোনো লিখিত বিধিবিধান নেই। তবে ২০০৭ সালের অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করে। এর মেয়াদকাল বা কার্যকারিতা তাদের সময়কালের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। অনেক ভালোর মধ্যে খারাপ আছে। আবার খারাপের মধ্যেও কিছুটা ভালো আছে। পরম সত্য বা মিথ্যা বলতে কিছু নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নীতিমালার মধ্যে ভালো কিছু কথা ছিল। যেমন- উপাচার্যকে নৈতিক মানসম্পন্ন হতে হবে। অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও দৃশ্যমান গ্রহণযোগ্যতার কথাও ছিল। নিরপেক্ষতা নিশ্চিতের কথা ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর এসব আইন ও বিধিবিধান কাজে লাগেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে তাদের বিবেচনা ছিল এর বিপরীত। যেমন- নৈতিকতা মানদণ্ডটি যদি তারা গ্রহণ করে তাহলে তাদের কম্বল উজাড় হয়ে যাবে। নৈতিক মানুষ পাওয়া যাবে না। আবার নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি সবসময়ই আওয়ামী লীগের জন্য বিপজ্জনক বিধান ছিল বা আছে।

নিরপেক্ষ সরকার, নিরপেক্ষ প্রশাসন ও নিরপেক্ষ বিচারক- তাদের দিয়ে নিয়োগ পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাদের বিবেচনায় নিরঙ্কুশ দলীয় আনুগত্য নাহলে তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি জ্ঞান চর্চার প্রতিষ্ঠান না মনে করে তারা সবসময়ই এটিকে তীব্র রাজনীতিকরণ করেছে। ফ্যাসিস্টদের এ ক্যারেক্টার ছিল। ১৯৭১ সাল থেকে তারা চেয়েছে দলীয় শিক্ষক। এই সময়ে তাদের দল না করার কারণে বা ভিন্নমত পোষণ করার কারণে অনেক বিদ্বান শিক্ষকের চাকরি গেছে। তারা চেয়েছেন ছাত্র শুধু ছাত্রই হবে না, সে হতে হবে তাদের ক্যাডার। তারাই সুযোগ-সুবিধা পাবে। তারাই অন্যায় করার নিরঙ্কুশ অধিকার ভোগ করবে। আগের সময়ে ছাত্ররা শিক্ষক বা উপাচার্যের আড়াই মাইলের মধ্যে যেতে পারত না। এরা দল ও পদকে একীভূত করার ফলে মাঝখানের সম্মান ও সমীহবোধটুকু ছিল না। ১৯৭৩ সালে নিজের চোখে দেখেছি কিভাবে একজন ছাত্রনেতা দলীয় পর্যায়ের ভর্তিগুলো কনফার্ম করিয়ে নিচ্ছেন একজন উপাচার্য থেকে। এরপর বাকশালে সয়লাব।

সামরিক শাসনামলে অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে উপাচার্য নিয়োগে এতটা নীচতা হতে দেখিনি। এ কথা বললে অনেকেই রুষ্ট হবেন। তারা সীমা লঙ্ঘন করেনি; কিন্তু দলীয় সরকারগুলো বিশেষত ক্ষমতাসীন সরকার ভিসি নিয়োগে কোনো নিয়ম-রীতির তোয়াক্কা করেনি। দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ হয়েছিল ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত্তিতে। সেখানে দলীয় পরিচয়ের অনেক প্রবীণ ও প্রজ্ঞাবান মানুষ পাত্তা পাননি। দুঃখের বিষয়- সেই ভিসিকে নিয়ে সেখানে অনেক নাকানি-চুবানি খেতে হয়েছে। যুবলীগের আহ্বায়ক ছিলেন (’৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী শিক্ষকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা স্বীকৃত) এমন একজন শিক্ষককে পুরান ঢাকার সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ করা হলো। হেন অন্যায় নেই যা তিনি করেননি। প্রকাশ্যে সোনার ছেলেদের চাকরি দেয়ার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছেন। এক ইন্টারভিউতে বলেছেন, তিনি উপাচার্যের চেয়ে যুবলীগের সভাপতি হওয়াকে শ্রেয় জ্ঞান করেন। উত্তর বাংলার সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বিদায়ের ক্ষণে সোনার ছেলেদের চাকরি দিলেন। তার মধ্যে দুর্নীতির কোনো আভাস পাননি। ভাবখানা এই, তিনি একটি জাতীয় কর্তব্য সমাপন করেছেন মাত্র। সবচেয়ে উত্তরের বিশ্ববিদ্যালয়টির দুর্ভাগ্য এই, সেখানে সব ভিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দলপ্রীতির অভিযোগ ছিল প্রামাণ্য।

দক্ষিণের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে চাকরি দেয়ার প্রক্রিয়াটি ছিল ওপেন সিক্রেট। বেশির ভাগ উপাচার্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। আর দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব উপাচার্য লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে নিজের স্ত্রী-পুত্র ও পরিজনকে চাকরি দিয়েছেন অনায়াসে। এদের মধ্যে ভাই-ভাতিজা ও ভাগ্নেদের সংখ্যাও কম নয়। একটি ইউজিসি প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮০ শতাংশ অভিযোগ আর্থিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপাচার্যরা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন। তবে সাহস, সততা, দৃঢ়তা, কুশলতা ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে অনেক কিছুই অতিক্রম করা সম্ভব। কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপাচার্যদের আরাম-আয়েশ বিলাস-বসন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্লোগান হবে ‘জ্ঞানই শক্তি’। সক্রেটিসের সেই জ্ঞানশক্তি পরিণত হতে পারে পুণ্যে। জ্ঞান ও পুণ্য শিক্ষাজগৎকে করতে পারে সামগ্রিকভাবে আলোকিত। জ্ঞান ও মেধার মূল্যায়ন না করে শিক্ষক নিয়োগে সর্বত্র চলছে নিকৃষ্ট দলীয় মনোবৃত্তি। শুনলে অবাক হতে হয়, চারটি ফার্স্ট ক্লাস বাদ দিয়ে সেকেন্ড ক্লাস চাকরি পায়। এমনকি থার্ড ক্লাস পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সুনাম! রয়েছে। মামলার আসামি বা অস্ত্র রাখার দায়ে দণ্ডিত ব্যক্তি শিক্ষক হয়েছেন। এখন আবার নতুন রোগ হয়েছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই তার চাকরি হতে হবে। সাধারণভাবে মেধার প্রতিযোগিতা এখানে অনুপস্থিত। দলীয় সঙ্কীর্ণতার সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন গ্রুপের নিয়োগবাণিজ্য। শুধু উপাচার্য একা নন, পরিপার্শ্বের লোকজন গ্রুপ লিডার বা শক্তিশালী সিন্ডিকেট সদস্যও ভাগ পান। এই ভাগ সোনার ছেলেদের পর্যন্তও গড়ায় বলে শুনেছি।

দেশের মানুষ এসব থেকে পরিত্রাণ চায়। শিক্ষাঙ্গন চির আলোকিত থাকুক। এর পবিত্রতা বজায় থাকুক- এই আশাবাদ সবার। কিন্তু আশা ও বাস্তবতার সাথে সাগর পরিমাণ ব্যবধান রয়েছে। এই ব্যবধান ঘুচিয়ে বাস্তবতা অর্জন করতে শিক্ষাঙ্গনের লোকদেরই এগিয়ে আসতে হবে। মনীষী নিজামুল মূলক তার প্রখ্যাত গ্রন্থে ‘সিয়াসতনামা’য় বলেছেন, ‘জ্ঞানবান শাসকরা জ্ঞানবান শিক্ষকের সাহচর্য উত্তম মনে করে। আর জ্ঞানবান শিক্ষকরা শাসকের সাহচর্য এড়িয়ে চলাকেই উত্তম মনে করে।’ আমাদের জন্য এটিই হোক ভারসাম্যের দীক্ষা।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement