০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ১৫ রজব ১৪৪৪
ads
`

অপরকে নিয়ে মাতামাতি আত্মসম্মানের পরিচায়ক নয়

-

আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা শব্দ দু’টি একটি অপরটির সমার্থক। শব্দ দুটি ব্যক্তি ও জাতি উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। আত্মসম্মান বলতে সাধারণ অর্থে আমরা বুঝি আপনার মান, নিজের প্রতি শ্রদ্ধা, আত্মগৌরব, শ্রদ্ধা, অহঙ্কার প্রভৃতি। একজন ব্যক্তি বা একটি জাতি আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে চাইলে উক্ত ব্যক্তি বা জাতির অবস্থান সবসময় সততা, ন্যায়পরায়ণতা, যথার্থতা, আদর্শপরায়ণতা, নৈতিকতা প্রভৃতির সপক্ষে এবং সব ধরনের অন্যায়ের বিপক্ষে হবে।

একজন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে কখনো নিজের মানসম্মান, কৃষ্টি, সভ্যতা, ঐহিত্য প্রভৃতিকে জলাঞ্জলি দিয়ে এমন কিছু করা উচিত নয় যাতে নিজের ব্যক্তিসত্তা ভূলুণ্ঠিত হয়। এ কথাটি সমভাবে একটি জাতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ক্রীড়া একটি জাতির ঐতিহ্যের অংশ। তবে সব জাতি সমভাবে সব ধরনের ক্রীড়ায় পারদর্শী নয়। ক্রীড়ায় পারদর্শিতার ক্ষেত্রে জাতিগত বৈশিষ্ট্য, শারীরিক গঠন ও ভৌগোলিক অবস্থানের ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে ফুটবল খেলা সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হিসেবে আখ্যায়িত হয়ে আসছে। বিগত শতাব্দীর তৃতীয় দশকের সূচনালগ্নে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে প্রতি ৪ বছরের বিরতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশ্বকাপ ফুটবলের মহা উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে, যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন দু’টি বিশ্বকাপের আয়োজন স্থগিত রাখা হয়েছিল।

ফুটবলের বিশ্বকাপ খেলা আয়োজনের দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও বেশ কয়েকটি খেলা যেমন- ক্রিকেট, টেনিস, গলফ, দাবা প্রভৃতিতে বিশ্বকাপের প্রচলন হয়। কিন্তু বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে অপর কোনো খেলা এখনো ফুটবলের ধারেকাছেও আসতে পারেনি। বিগত শতাব্দীর ৯০ দশকের পর থেকে বিশ্বের ধনী দরিদ্র দেশ নির্বিশেষে টিভি সহজলভ্য হওয়ায় বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ টিভির বদৌলতে তাৎক্ষণিক আন্তর্জাতিকভাবে আয়োজিত ফুটবলসহ অপরাপর খেলাগুলো উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছে। আমাদের দেশে টিভির সহজলভ্যতা সর্বজনীন না হওয়ায় সমাজের একটি বিরাট অংশ পারিবারিক সীমানার বাইরে সামাজিক ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিকভাবে আয়োজিত খেলাগুলো বিশেষ করে ফুটবল খেলা দেখার সুযোগ পাচ্ছে।

আজ থেকে ১৫-২০ বছর পূর্ব পর্যন্ত আমাদের দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল ফুটবল। দেশীয়ভাবে ফুটবল খেলার আশানুরূপ বিকাশ না ঘটায় এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে ফুটবল খেলায় আমাদের সামর্থ্য সীমিত থাকায় বর্তমানে বিভিন্ন কারণে জনপ্রিয়তার দিক থেকে ক্রিকেট খেলা ফুটবলের স্থান দখল করে নিচ্ছে। কিন্তু এর পরও দেখা যায় যখন বিশ্বকাপ ফুটবলের আগমন ঘটে তখন খেলা উপভোগের জন্য জনগণের কোনো অংশের মধ্যেই কোনো ধরনের আগ্রহের কমতি থাকে না।

আন্তর্জাতিকভাবে আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবল পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেরও সর্বাধিক জনগণ উপভোগ করে থাকে। বিশ্বকাপ ফুটবলে সর্বাধিকসংখ্যক পাঁচবার কাপ বিজয়ী হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার বৃহৎ দেশ ব্রাজিল। দক্ষিণ আমেরিকার অপর দু’টি দেশ উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা দুইবার করে ফুটবলে বিশ্বকাপ বিজয়ী হয়েছে। এ দিকে ইউরোপীয় দেশের মধ্যে ইটালি চারবার এবং পশ্চিম জার্মানি তিনবার বিশ্বকাপ বিজয়ী হয়েছে।

আমাদের দেশে বর্তমানে ফুটবলের যে মান সে নিরিখে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলায় আমাদের অংশগ্রহণ সুদূর পরাহত। কিন্তু তাই বলে দুর্মুখদের কথায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেসব দেশ ভালো মানের ফুটবল খেলে পৃথিবীর ফুটবলপ্রেমী দর্শকদের মুগ্ধ করছে তাদের সমর্থক হতে বা সমর্থন করতে আমাদের বাধা কোথায়? এরই ফলে বিগত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে আমাদের ফুটবলপ্রেমীদের একটি বড় অংশ ব্রাজিলের সমর্থক এবং অপর একটি বড় অংশ আর্জেন্টিনার সমর্থক। এর বাইরে জার্মানি, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, ফ্রান্স প্রভৃতি দেশের বিচ্ছিন্ন সমর্থক রয়েছে। আমরা এশিয়া মহাদেশের অন্তর্ভুক্ত। এশিয়া মহাদেশের কোনো দেশ এখনো ফুটবলের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আশানুরূপ ফলাফল করতে পারেনি। তাই আমাদের দর্শকদের মধ্যে এখনো এশিয়ার কোনো দেশের পক্ষে জনমতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন সমর্থকগোষ্ঠী সৃষ্টি হয়নি।

বিগত কয়েকটি বিশ্বকাপ ফুটবলের ক্ষেত্রে দেখা গেছে উদ্বোধনী খেলা শুরু হওয়ায় ন্যূনপক্ষে ৬ মাস পূর্ব থেকেই বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থকরা হাটে, মাঠে, ঘাটে, বাড়ির ছাদে, গাছের উপরে, সাইকেল, রিকশা, গাড়িতে উভয় দেশের পতাকা উড়িয়ে নিজেদের পছন্দের দলের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করছে। আমাদের ফুটবলপ্রেমিকদের এ ধরনের অন্ধ সমর্থনের কারণে দেখা যায় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা চলাকালীন উভয় দেশের বিভিন্ন আকৃতির কয়েক লাখ পতাকা একটি অপরটির সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ছে। পতাকা উড়ানোর সময় এক ভক্তের পতাকা থেকে অপর ভক্তের পতাকা কত বড় ও কত উঁচুতে উড়ছে এটা নিয়েই অনেক বাগ্বিতণ্ডা হয়। ভক্তদের এ মানসিকতার কারণে পতাকা সেলাইয়ের কাজে নিয়োজিত এক শ্রেণীর দর্জির বিশ্বকাপ শুরুর আগ মুহূর্ত থেকে শেষ অবধি ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নেয়ার অবকাশ থাকে না। প্রতি বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে আমাদের ফুটবলপ্রেমিকরা তাদের প্রিয় দলের যে সংখ্যক পতাকা ক্রয় করে থাকেন, তাতে ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ২৫-৩০ কোটি টাকার কম হবে না এবং এর পরিমাণ প্রতিটি আগত বিশ্বকাপের ক্ষেত্রেই বাড়ছে। আমাদের মতো গরিব দেশে এ পরিমাণ অর্থ দিয়ে ৮-১০টি গ্রামের দারিদ্র্য বিমোচন সম্পূর্ণরূপে সম্ভব।

আমাদের ভক্তদের মাঝে দেখা যায় প্রিয় দলের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করতে গিয়ে পতাকার বাইরে প্রিয় দলের জার্সি নিজের দেহে জড়িয়ে দিয়ে প্রিয় দলের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থন ব্যক্ত করছে। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রিয় দলের প্রিয় খেলোয়াড়ের ক্রমিক নং-এর জার্সি পরে তার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ঘোষণা করছে। আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, কলকারখানার শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী ও ব্যবসায়ীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অংশ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রতি নিজেদের সমর্থন ব্যক্ত করতে গিয়ে দু’টি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এ বিভক্তি থেকে প্রতিনিয়ত বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের ঘটনায় দু-একটি ক্ষেত্রে জীবনহানি পর্যন্ত ঘটছে।

আমাদের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও গ্রাম-গঞ্জে পতাকায় উড়ন্ত অবস্থান থেকে অতি সহজেই ধারণা করা যায় কাদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত হচ্ছে। এ সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার হচ্ছে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার সময় যখন আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলসহ আরো কিছু দেশের পতাকার ছড়াছড়ি, তখন আমাদের যেকোনো জাতীয় দিবসের সময় দেখা যায় এর সিকি ভাগ পতাকাও উত্তোলিত হয় না। এটা জাতি হিসেবে আমাদের লজ্জিত করে। আমরা আরো লজ্জিত হই যখন দেখি যে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে নিয়ে আমাদের এত উচ্ছ্বাস ও মাতামাতি সে দুটি দেশের অধিকাংশ জনগণের আমাদের দেশ সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। কথিত আছে ১৯৯০ সালে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবল খেলোয়াড় দিয়েগো ম্যারাডোনাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন-বাংলাদেশ কোথায়?

যেকোনো দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা একজন মন্ত্রী রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী ব্যক্তি। এ ধরনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যারা রয়েছেন যে কোনো আন্তর্জাতিক খেলায় তারা প্রকাশ্যে নিজের দেশের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে থাকেন। কিন্তু ভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের আন্তর্জাতিক খেলায় একটি দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কাউকে বলতে শোনা যায় না আমি এ দেশ বা ওই দেশের সমর্থক। এ ক্ষেত্রে আমাদের বড় দু’টি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদ্বয় কোনো এক বিশ্বকাপ ফুটবল খেলায় অত্যন্ত বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন এবং সাংবাদিকরা শত চেষ্টা করেও বের করতে পারেনি বিশ্বকাপ ফুটবলে তারা কোন্ দেশকে সমর্থন করছেন। তাদের একজন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বললেন, আপনারা যে দলের সমর্থক আমিও ওই দলের সমর্থক। কিন্তু একদা আমাদের দেশের একজন অসাংসদ সংখ্যালঘু পূর্ণ মন্ত্রী ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সামনে এসে বীরদর্পে ঘোষণা করলেন তিনি আর্জেন্টিনার সমর্থক। তার এ বালখিল্য ঘোষণা দ্বারা তিনি তার আত্মমর্যাদার ও তার দেশের আত্মমর্যাদার হানি ঘটিয়েছেন। এ ধরনের অবস্থানে থেকে একজন ব্যক্তির এমন মন্তব্য শুধু ব্যক্তিকে বিব্রত করে না, দেশ ও জাতিকেও বিব্রত করে। এর পরের বিশ্বকাপে দেখা গেল আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একজন কোনো এক মিটিং শুরু হওয়ার প্রাক্কালে বললেন, তার মন খারাপ, আর মন খারাপের কারণ হলো তার প্রিয় দল ব্রাজিলের ফাইনালে পরাজয়।

আমরা একটি স্বাধীন দেশ ও জাতি। আমরা মাতামাতি করলে বা বাড়াবাড়ি করলে আমাদের পতাকা, আমাদের মধ্যে যারা স্মরণীয় ও বরণীয় এবং কীর্তিমান তাদেরকে নিয়ে মাতামাতি বা বাড়াবাড়ি করবো। তাতেই ব্যক্তি হিসেবে আমাদের আত্মসম্মান এবং জাতি হিসেবে আমাদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। আমাদের মতো এভাবে পৃৃথিবীর অন্য কোনো দেশের জনগণ যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সময় ভিন দেশের পতাকা উড়িয়ে নিজেদের অসম্মানিত ও খাটো করছে এমনটি শোনাও যায়নি দেখাও যায়নি। তবে কেন আমরা বিকৃত মানসিকতার উন্মাদনায় মত্ত হয়ে নিজেকে বিলীন করে দিচ্ছি! এ মানসিকতার উত্তরণ ঘটাতে না পারলে একদিন দেখা যাবে আমাদের আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা বলে আর কিছুই অবিশিষ্ট নেই।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
Email : iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement