০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ১৫ রজব ১৪৪৪
ads
`
দেখা-অদেখা

কৃষ্ণপক্ষ সব গ্রাস করছে


এক-একটি মৌসুম আসার প্রাক্কালে তার আগাম বার্তা থাকে বাতাসে। যেমন বসন্ত শেষে ঝড় বাদলে থাকে গ্রীষ্মের আগমনী বার্তা। এমন প্রতিটি মৌসুমেই প্রকৃতির চেহারায় ভিন্ন ভিন্ন রূপ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অন্য কোথাও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের দৃশ্যের কতটুকু কি হয় জানি না। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায় সব সময়ই বায়ু বহে উথাল পাথাল। এ দেশকে ষড়ঋতুর দেশ বলা হলেও গত পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, এখানে প্রায় সব সময়ই রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বসন্ত শেষের ঝড়ঝঞ্ঝার দিনগুলোরই মতো পরিস্থিতি বিরাজ করে। তখন প্রবহমান বায়ুর গতিবেগ থেকে অনুমান করা যায়, বড় ধরনের কোনো ঝড়ের সমূহ সম্ভাবনা। সে ঝড় প্রধানত ক্ষমতাসীনদের প্রতিপক্ষের ওপরই বয়ে যায়।

এই মুহূর্তে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বহমান বায়ু তরঙ্গে যে বার্তা আসছে তাতে এটি স্পষ্ট যে, অচিরেই একটা ঝড় শুরু হতে পারে। হয়ত সেই পুরনো দিনের মতো আবারো হামলা মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে বিপর্যস্ত করা হবে। প্রধানত দু’টি দলের ওপরই অতীতের মতো সব গায়েবি মামলা রুজু বা পুনরুজ্জীবিত করা হতে পারে। দিকে দিকে সরকারের প্রতিপক্ষের বিভিন্ন সভা সমাবেশে যে হারে মানুষের সমাগম তারা সেটা লক্ষ্য করছে। এখন ভয়ভীতি তাদের পেয়ে বসেছে। ফলে নেতিবাচক প্রক্রিয়ায় প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার জন্য মনস্থির করছে বলেই রাজনৈতিক পর্যবক্ষকরা ধারণা করছেন। আর একটা বিষয় খুবই স্পষ্ট, হামলা মামলা করার জন্য একটা অজুহাত থাকতে হয়। সেজন্য ‘বেøম গেম’ তথা অভিযোগের একটা বড় ঝুড়ি নিয়ে চলা হচ্ছে, যাতে যখন যেমন অভিযোগ সেখান থেকে তুলে নেয়া যেতে পারে। অথচ কেউ নিজের দিকে তাকায় না, যেমন চালুন বলে সূচের পেছনে ছিদ্র রয়েছে। অভিযোগের মালা গেঁথে জনগণকে ক্ষণিকের জন্য হয়ত বিভ্রান্ত করা যায়, কিন্তু সব সময় সেটা কাজ করে না। সম্প্রতি পক্ষ শক্তি প্রধান প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে বলেছে, এরা ক্ষমতায় গেলে দেশ গিলে খাবে। কথা হচ্ছে, দেশে আর কি কিছু খাওয়ার মতো অবশিষ্ট আছে? কথাটা কী চালুনের মতোই হলো না। ভাণ্ডার তো শেষ!

ঝড়ঝঞ্ঝার বিষয়টি এই মুহূর্তে আর শুধু সম্ভাবনার পর্যায়ে নেই। এরই মধ্যে বিপদের সব নমুনা সুস্পষ্ট। কোনো রাখ ঢাক না রেখে পরিষ্কারভাবে বলে দেয়া হয়েছে, ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ যেভাবে তছনছ করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই তারা সব প্রতিপক্ষকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেবে। এরপর কি বোঝার বাকি থাকে, দেশে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসতে মুহূর্তকাল দেরি নেই! যখন কোনো কর্তৃপক্ষের চতুর্দিকে বিপদ ঘনিয়ে আসে তখন তারা আত্মরক্ষার জন্য যেকোনো উপায় অবলম্বনে পিছপা হয় না। সাইক্লোনের গতিবেগ সৃষ্টি করে এক দিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে চায়। আজকে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি অনেকটা সে রকমই। প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো পরিস্থিতিই দেখা যাচ্ছে। এমন অবস্থায় দেশে কোথায় গণতন্ত্র, মানবাধিকার! ন্যায়-অন্যায়ের সব বিবেচনাই তো উবে গেছে। চূড়ান্ত বা দিন শেষে দেখা যাবে দেশের বিড়ম্বনা শত গুণ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

দেশটা কে গিলে খেয়ে ফেলেছে বা খাবে তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক করা যায়। সেটা হবে অকারণ, অযথা বিতর্ক। বরং সে বিচারের ভার দেশের মানুষের ওপর ছেড়ে দেয়া হোক। এমন বিচার খুব নিখুঁতভাবে করতে পারবে দেশের পরিপক্ব সাধারণ মানুষই। তাদের সা¤প্রতিক অবস্থা তথা জীবনযাপনে যে হাল, তা দিয়েই তারা বুঝতে সক্ষম হবে কোথাকার পানি কোথায় গড়িয়েছে। বিদেশী ব্যাংকে অনেকের হাজার হাজার কোটি টাকার স্তূপ জমেছে। এই অর্থ খুব বেশি দিন আগে লোপাট হয়নি। এসব একেবারে হাল আমলেরই কাহিনী। এ কাহিনী এমন নয় যে এতে কোনো গোঁজামিল রয়েছে। খোদ যেখানে এসব অর্থ জমা পড়েছে তাদের প্রতিবেদনে তার সব নাড়ি নক্ষত্র খুব স্বচ্ছভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। টাকা জমা পড়ার দিনক্ষণ পর্যন্ত সেখানে সন্নিবেশিত। তাই ‘উদোর পিণ্ডিবুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর কোনো অবকাশ নেই। সে জন্য অকারণ বিতর্ক কেবল বিরক্তই উৎপাদনই করতে পারে।

উপরের কথার জের ধরেই খুব প্রাসঙ্গিক একটা বিষয় নিয়ে কিছু কথা বলা যায়। কিছুদিন থেকে জাতীয় মিডিয়ায় এ নিয়ে কথা চালাচালি হচ্ছে। বিষয়টি হলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বল বপু নিয়ে। সেটা নাকি এখন শূন্য হওয়ার পথে। চারপাশ থেকে এই শূন্য ভাণ্ডার নিয়ে নানা শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার যোগান দেয়া যাচ্ছে না। এর ফল কী হবে তা ভেবে অর্থনীতিবিদরা এখন আর ক‚লকিনারা পাচ্ছেন না। তবে এটি খুবই স্বাভাবিক যে সময়ের পিঠে চেপে সব কিছু ফুরায় ও ফুরাবে। এটি একেবারে সরল অঙ্কের মতোই সহজ। আর এর পুনর্ভরনটাই হচ্ছে মূল কথা। সেখানে নিহিত থাকে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নির্বাহীদের সক্ষমতা পারঙ্গমতা। সব অনুক‚ল-প্রতিক‚ল পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেয়ার মধ্যেই প্রশাসনের সক্ষমতা উপযুক্ততা পরিমাপ হয়ে যায়। কোন ব্যাপারে কখন ঝাঁপ দিতে হবে সেটি না বুঝলেই বাঁধে গোল, এখন যেমনটি হচ্ছে।

বিভিন্ন সূত্রের খবর হচ্ছে, খাদ্যসামগ্রীর চাহিদা পূরণে চলতি অর্থবছরে অন্তত এক কোটি টন গম ও চাল আমদানি করতে হবে। অথচ এরই মধ্যে খাদ্যশস্য আমদানি ব্যাপকভাবে কমেছে। কেবল চাল ও গমই নয়, ডাল আমদানিও হ্রাস পেয়েছে। এই তিন পণ্যই হচ্ছে দেশের প্রধান খাদ্যশস্য। এমন এক সময় এসব পণ্যের আমদানি কমেছে, যখন আগামী বছরে বৈশ্বিক খাদ্য সঙ্কট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্বয়ং জাতিসঙ্ঘ। এসব তথ্য উপাত্ত হাতে থাকা, আমাদের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ব্যাপক ‘শর্ট ফল’ এসব মিলিয়ে তথা বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে, ২০২৩ সালে খাদ্যের মারাত্মক সঙ্কট দেখা দেবে।

২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রায় ১০ লাখ টন চাল আমদানি করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে আমদানি আগের তুলনায় কমেছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে ডলার সঙ্কটে ব্যাংকগুলো চাহিদানুযায়ী এলসি (ঋণপত্র) খুলতে পারছে না। এতে করে খাদ্যশস্য আমদানিতে মারাত্মক সঙ্কট সৃষ্টি হবে তাতে সন্দেহ নেই। এদিকে প্রশাসন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ পেতে হন্যে হয়ে পড়েছে। আইএমএফ দেশের অর্থনীতির নানা দিক নিয়ে চুলচেরা হিসাব শুরু করেছে। সরকারি কর্তৃপক্ষ আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়ে ডলারের সঙ্কট ঘুচাতে চায়। আইএমএফ যদি ঋণ দিতে রাজি হয়ও, তাহলে প্রথম কিস্তির অর্থের পরিমাণ এবং সেটি পেতে যে সময় যাবে তাতে বর্তমান সঙ্কট থেকে উত্তরণ কতটা সম্ভব এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দেশের রফতানি আয় পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। জানা গেছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের চতুর্থ মাস অক্টোবরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ মিলিয়ন ডলার। আয় হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন ডলার। এই হিসাবে অক্টোবর মাসে লক্ষ্যের চেয়ে কমেছে ১২ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ব্যালেন্স অব পেমেন্টে মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে।

আরো একটি বিষয় এখানে প্রাসঙ্গিক কারণে উল্লেখ করা যেতে পারে। ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিপক্ষ পুরো দেশে যেসব সমাবেশ করছে সেগুলো বলতে গেলে মহাসমাবেশে পরিণত হচ্ছে। আশ্চর্যের বিষয়, এসব সমাবেশে যাতে উল্লেখ করার মতো লোক সমাগম না হতে পারে সে জন্য নানা ছলা-কলা-কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে ও হচ্ছে। মানুষ যাতে পথকষ্টের জন্য এসব সমাবেশে হাজির হতে না পারে তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এসব আয়োজন করার পরও সবই যখন নিঃস্ফল হচ্ছে, তখন পক্ষশক্তি ভিন্ন পথ ধরে বক্তব্য বিবৃতি দিচ্ছে। বলা হচ্ছে, পক্ষশক্তি এ ব্যাপারে ইতিবাচক থাকার কারণেই নাকি প্রতিপক্ষের জন্য এমন সব সমাবেশ করা সম্ভব হচ্ছে। তাদের বাস্তব কর্মকৌশল আর বাক-শৈলীর মধ্যে কী আকাশ পাতাল ব্যবধান! তাছাড়া প্রতিটি রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতি-ধর্মীয় সংগঠনের জন্য আইনশৃঙ্খলা বজায় রেখে সমাবেশ করা তাদের সাংবিধানিক অধিকার সেটা কারো অনুকম্পা নয়। তবে কথা উঠতে পারে, সা¤প্রতিককালে সংবিধানের চর্চা অনুশীলন কতটুকু হচ্ছে! সংবিধানের বহু মৌলিক নীতি নির্দেশনা মান্য এবং কার্যকর করা অতি আবশ্যক হওয়া সত্তে¡ও তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হেলা ফেলা চলছে। তার অনেক উদাহরণ পেশ করা যেতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সংবিধান স্বয়ং বলছে এই সর্বোচ্চ আইনগ্রন্থের প্রতিটি অনুচ্ছেদ মানতে প্রত্যেক নাগরিক বাধ্য। তার ব্যত্যয় ঘটানো অবশ্যই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এসব কথার সার নির্যাস হচ্ছে এ ক্ষেত্রে অনুরাগ-অনুকম্পা বা বিরাগ-বিদ্বেষ পোষণ করার কোনো অধিকার কাউকে দেয়া হয়নি। এখানে কে কেউকেটা আর কে সাধারণ এমন বিন্যাস বিবেচনা খাটবে না। তাছাড়া যারা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নির্বাহী তাদের সংবিধানের আলোকে যে শপথ গ্রহণ করতে হয়, সেখানে এসব নির্বাহীর শপথ নেয়ার সময় বলতে হয় ‘আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব।’ নিয়তই সংবিধানের নানা ব্যত্যয় ঘটছে। আর এ জন্য প্রশাসনই মুখ্যত দায়ী। তাহলে এমন ব্যত্যয়ের প্রতিবিধান কী হবে এবং কারা বা কোন কর্তৃপক্ষ সেটি করবে? এসব নিয়ে জবাবদিহিই বা কে করবে?

প্রকৃত বিষয় হচ্ছে, স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে এসেও এদেশে অধিকাংশ সময় ক্ষমতার চর্চা করেছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল। প্রায় আড়াই দশক ধরে তারাই রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্ণধার এবং দশ বছরের বেশি সময় ধরে চলেছে অসাংবিধানিক শাসন। এই দীর্ঘ সময় যারা এ দেশের মোড়লি করেছে এবং করছে, তারা রাষ্ট্রকে একটা সঠিক ট্র্যাকে তুলতে সক্ষম হয়নি। আর সে কারণের এই জনপদে নানা সঙ্কট ঘনীভ‚ত হয়ে পড়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এসব সঙ্কট সৃষ্টির পেছনে নিহিত রয়েছে, দেশ ও দশের কথা না ভেবে ব্যক্তি গোষ্ঠীর অভিপ্রায়, স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া। শুদ্ধাচারের পরিবর্তে স্বেচ্ছাচার বেছে নেয়া, আইনের অনুশীলনকে পাশ কাটিয়ে, যোগ্যতা সক্ষমতার পরিবর্তে অর্বাচীনকে সুযোগ করে দেয়া। যদি তেঁতুলের বৃক্ষ বপণ করে কেউ মিষ্ট ফলের আশা করে তবে সেটা হবে অর্থহীন। এসবের যোগফল হচ্ছে দেশকে দুরাচারের তীর্থভূমিতে পরিণত করা। দুর্জনদের পদভারে সব কিছু কম্পমান হয়ে ওঠা। সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহির সব মিনার ধসিয়ে দেয়া হয়েছে। ইতিহাসের পাঠ থেকে এসব জানা বোঝা দরকার, দেশের গতিপথ ফেরানোর জন্য। কিন্তু সেই পাঠেও আজ এমন বিকৃতি ও কালিমা লেপন করা হচ্ছে, যা আর পাঠযোগ্য থাকছে না। ফলে কৃষ্ণপক্ষ সব কিছু গ্রাস করে ফেলছে।

ndigantababar@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement

সকল