০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২৪ মাঘ ১৪২৯, ১৫ রজব ১৪৪৪
ads
`

ধর্ম যার যার, নাকি তার তার

ধর্ম যার যার, নাকি তার তার - ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান- এ চারটি ধর্মাবলম্বীর বাস হলেও সামগ্রিক জনসংখ্যার ৯০ ভাগের অধিক মুসলিম। অবশিষ্ট দশ ভাগের ৮ ভাগ হিন্দু এবং ২ ভাগ বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান। বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রটিকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলা হলেও রাষ্ট্রধর্ম বিষয়ে বলা হয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবেন। ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার রয়েছে। বাংলাদেশ সৃষ্টিলগ্ন থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে এলেও একটি উল্লেখযোগ্য সময় সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বিলুপ্ত ছিল।

বাংলাদেশে বসবাসরত চারটি প্রধান ধর্মমতাবলম্বীদের ধর্মীয় রীতিনীতি ও আচার অনুষ্ঠান একটি অপরটির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ দেশের প্রধান ধর্মীয় গোষ্ঠী মুসলিমদের ধর্ম ইসলামে পৌত্তলিকতা অর্থাৎ মূর্তি পূজার কোনো স্থান নেই। মুসলিমরা এক আল্লাহে বিশ্বাসী এবং তাঁর কোনো প্রতিচ্ছবি নেই। হিন্দুরা বহু দেবদেবীতে বিশ্বাসী এবং তারা এসব দেবদেবীর মূর্তি বানিয়ে মূর্তির সম্মুখে আরাধনা করে তার কৃপা প্রার্থনা করে। খ্রিষ্টানদের মধ্যে যারা রোমান ক্যাথলিক তারা যিশুখ্রিষ্ট ও মেরির মূর্তি বানিয়ে উভয়ের পূজা অর্চনা করে। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা গৌতম বুদ্ধের মূর্তির সম্মুখে দাঁড়িয়ে ভক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রার্থনা করে।

হিন্দু ধর্মে অতীতে ধর্মান্তর অনুমিত ছিল না; তবে বর্তমানে অপর যেকোনো ধর্মাবলম্বীর হিন্দু ধর্ম গ্রহণে কোনো বাধা নেই। ইসলাম, খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ ধর্ম অপর ধর্মাবলম্বীদের এর যেকোনোটিতে ধর্মান্তরে কোনো ধরনের বাধা দেয় না।

পৃথিবীর যেসব রাষ্ট্র ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করে সেসব রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিক যেকোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকার ভোগ করে। এ অধিকারটি একজন নাগরিকের স্বেচ্ছাধীন। একজন নাগরিক স্বেচ্ছায় এ অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ধর্মান্তরিত হতে চাইলে তার জন্য সাবালক ও প্রকৃতস্থ হওয়া অত্যাবশ্যক। তাছাড়া স্বেচ্ছাধীন ধর্মান্তকরণ আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকার পরিপন্থী যেন না হয় সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে সচেষ্ট থাকতে হয়।

ধর্ম হলো ঐশ্বরিক শক্তির নিকট নিজেকে সমর্পণ। আর তাই একজন প্রকৃত ধর্ম বিশ্বাসী যে ধর্মেরই অনুসারী হন না-কেন তার পক্ষে অপরকে জোরপূর্বক নিজ ধর্মের প্রতি টেনে আনা সমীচীন নয়।
আমাদের দেশসহ সমগ্র বিশ্বের মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফেতর ও ঈদুল আজহা। এ দুটি উৎসব আমাদের দেশে রোজা ও কোরবানির ঈদ নামে সমধিক পরিচিত। সমগ্র বিশ্বের মুসলমানরা ৩০ দিন রোজা পালনান্তে আনন্দঘন পরিবেশে রোজার ঈদ উদযাপন করে। রোজার ঈদের সময় প্রতিটি মুসলিম পরিবার সামর্থ্য অনুযায়ী নতুন কাপড় পরিধান করে এবং নিজ নিজ গৃহে উন্নত সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করে। কোরবানির ঈদের সময় যেসব মুসলমানের ওপর জাকাত ফরজ তারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোরবানির পশু জবাইয়ের মাধ্যমে নিজেকে সব ধরনের পঙ্কিলতা ও অন্যায় হতে যখন মুক্ত করতে পারে তখন তার কোরবানি দেয়া হয় সার্থক। উভয় ঈদের সময় মুসলিমরা বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আসা-যাওয়ার মাধ্যমে নিজেদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। দুর্গাপূজার সময় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের দেবী দুর্গার সম্মুখে ভোগ হিসেবে উন্নতমানের খাবার উপস্থাপন করে। ঢাক ঢোল বাজিয়ে আনন্দ-উল্লাস ও প্রার্থনার মাধ্যমে পূজা অনুষ্ঠান সমাপনান্তে ভোগ হিসেবে দেয়া খাবার প্রসাদরূপে ভক্তদের মাঝে বিতরণ করা হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের নিকট এ ধরনের প্রসাদ খাওয়া পুণ্যের কাজ।

বিগত কয়েক বছর যাবৎ আমাদের দেশে এক শ্রেণীর মুসলিমদের মধ্যে লক্ষ করা যাচ্ছে যে, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এমন বক্তব্য প্রদানের মধ্য দিয়ে হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার সময় দেবীর সামনে গিয়ে হাতজোড় করে আরাধনা করেন এবং পূজার আনন্দ উল্লাসের সাথে নিজেদের শামিল করে প্রসাদ খেয়ে তৃপ্ত হন। একজন মুসলমানের জন্য মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আরাধনায় অংশগ্রহণ এবং প্রসাদ খাওয়া ইসলাম ধর্ম দ্বারা অনুমোদিত নয়। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এমন উক্তি ইসলাম স্বীকার করে না। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাও এ ধরনের উক্তি স্বীকার করে না। হিন্দুরা এ ধরনের উক্তি স্বীকার করলে ভারতের হিন্দুরা তাদের দেশে মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব কোরবানির ঈদের সময় গরু জবাইয়ে বাধা দিত না।

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন মূর্তিকে ঈশ্বর বা দেবতা গণ্যে প্রসাদ দেয়। এ প্রসাদ পরবর্তীতে আগত ভক্তদের খাওয়ার জন্য দেয়া হলেও ইসলাম ধর্মাবলম্বী কারো জন্য এ ধরনের প্রসাদ খাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারা, সূরা মায়িদাহ, সূরা আনআম ও সূরা নাহল এ উল্লেখ রয়েছে ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস খাওয়া। আর যে পশু জবাই করার সময় আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নাম নেয়া হয়েছে।’ সুতরাং যে পশু জবাইকালে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নাম নেয়া হয় সেটা মুসলমানদের জন্য হারাম। আর এ কারণেই ইসলামে পূজার প্রসাদ খাওয়া হারাম। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ধর্মগ্রন্থ বেদ অবলোকনে দেখা যায় মহান স্রষ্টার কোনো প্রতিমূর্তি নেই।

গরু জবাই করা ও গরুর গোশত খাওয়া হিন্দু ধর্মে নিষিদ্ধ হলেও ইসলাম ধর্মে নিষিদ্ধ নয়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ভারতে মুসলমানদের এ ধর্মীয় অধিকারে বাধা দেয়া, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার এ উক্তিটির সাথে সাংঘর্ষিক। মূর্তিপূজা ইসলাম ধর্মে সম্পূর্ণ হারাম। অপর দিকে হিন্দু ধর্মীয় আচারে এটা উপাসনা ও পুণ্যের কাজ। এ দেশে মুসলমানরা ইসলামে নিষিদ্ধ হিন্দুদের মূর্তিপূজায় কখনো বাধা প্রদানের প্রয়াস নিলেও সরকারের তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপে প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের নিবৃত্ত করা সম্ভব হয়েছে কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে এটি পরিলক্ষিত হয়নি।

হিন্দু ধর্মের ইতিহাস অধ্যয়নে জানা যায় প্রাচীন ভারতে গরুর অন্তর্ভুক্ত ষাঁড় দেবতার উদ্দেশ্যে বলির পর এর মাংস ভক্ষণ করা হতো কিন্তু দুগ্ধ প্রদানকারী গরুর অন্তর্ভুক্ত গাভী জবাই নিষিদ্ধ ছিল। হিন্দুদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ বেদে গাভীকে দেবতা উল্লেখপূর্বক দেবের মাতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দু ধর্মে গরুকে খাদ্যের উৎস এবং জীবনের প্রতিরূপ হিসেবে সম্মানের সাথে দেখা হয়। হিন্দু ধর্মবহিভর্‚ত অনেক মানুষ মনে করে থাকে হিন্দুরা গরুর উপাসনা করে। আসলে ব্যাপারটি তা নয়। সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয় হিন্দু ধর্মে গরু পবিত্র হওয়ার চেয়ে জবাই নিষিদ্ধ। মনে করা হয় জৈন ধর্মের প্রভাব থেকে হিন্দু ধর্মে গরু নিধন বন্ধ করা হয়। প্রাচীন ভারতে হিন্দুদের মধ্যে যখন গরুর গোশত ভক্ষণ অনুমিত ছিল তখনো বেদে নিরামিষ ভোজীদেরকে উৎসাহিত করা হয়েছিল।

ভারতে যখন উগ্রবাদী হিন্দু দলসমূহ গরু জবাই সম্পূর্ণ বন্ধের জন্য সোচ্চার এবং তাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কিছু রাজ্যে যখন গরু জবাইয়ের ওপর নিষেধাঙ্গা আরোপিত হয়েছে তখন দেখা যায় ভারত পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম গরুর গোশত রফতানিকারক দেশ। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায় সে বছর ভারত ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টন গরুর গোশত রফতানি করেছে যা পৃথিবীর সামগ্রিক গরুর গোশত রফতানির এক-পঞ্চমাংশ।

হিন্দুদের ধর্মীয় উপাসনা পূজা বা আরাধনায় যে কোনোরূপে অংশ নেয়া মুসলমানের জন্য বৈধ নয় । একজন মুসলমানকে অনুধাবন করতে হবে যে, পূজা করা তার ধর্ম নয়, প্রতিমা তৈরিতে ব্যক্তিগত সাহায্য করা যাবে না এবং উপাসনায় দৈহিক, মানসিক কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতার সুযোগ নেই । একজন মুসলমান ব্যক্তিগত পর্যায়ে অমুসলিমদের পূজা-অর্চনায় শরিক হলে, পূজা অনুষ্ঠান উপভোগ করলে, অথবা গুণকীর্তন করলে নিজ ধর্মের প্রতি তার আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থেকে যাবে।
প্রতিটি ধর্মমতাবলম্বীর ধর্মীয় রীতিনীতি ও আচার অনুষ্ঠান পৃথক হওয়ায় এবং বিশেষত ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য মূর্তিপূজা হারাম হওয়ায় ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কারো নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসের অবমাননায় নিছক আনন্দ উল্লাসে মত্ত হওয়া ধর্ম যার যার, উৎসব সবার নয় বরং ধর্ম যার যার, উৎসব তার তার এর পরিপন্থী।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail : iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement