৩০ নভেম্বর ২০২২, ১৫ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

ধর্ম যার যার : নিরাপত্তা সবার

ধর্ম যার যার : নিরাপত্তা সবার - ছবি : সংগৃহীত

অল্প কিছু দিন পরই আমাদের দেশে শুরু হতে যাচ্ছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ উপাসনা উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। প্রতিবার পূজার সময় এলেই আমাদের দেশে একটি স্পর্শকাতর আবহ তৈরি হয়ে যায়। গত বছরও কুমিল্লার নানুয়ার দীঘিরপাড়ের পূজামণ্ডপে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনা ঘটিয়ে সারা দেশেই পূজামণ্ডপে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। কাজেই এবারো এই দুর্গাপূজার সময় আমাদের আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতারা, জনপ্রতিনিধি, যুবসমাজ ইত্যাদি সব স্টেকহোল্ডারকে সদা সজাগ থাকতে হবে যেন কোনো দুষ্কৃতকারী কোনো ধরনের হাঙ্গামা সৃষ্টির পটভূমি সৃষ্টি করতে না পারে। জানা যায়, এ বছর পূজার্চনার বিস্তৃতি আরো ব্যাপকতর হচ্ছে। গতবারের চেয়ে এবার এক হাজারের বেশি মণ্ডপে অর্থাৎ সারা দেশে মোট ৩২ হাজার ১৬৮টি মণ্ডপে পূজা হতে যাচ্ছে।

মাইনরিটি পলিটিক্স বা সংখ্যালঘু রাজনীতি আমাদের উপমহাদেশে অনেক দিন ধরেই চলমান রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে; বিশেষ করে ভারত এবং বাংলাদেশে। তবে দুই দেশে দুই ধরনের রাজনীতি হচ্ছে এই সংখ্যালঘুদের নিয়ে। ভারত সরকার পুরোপুরি সাম্প্রদায়িক হওয়ায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের দমনপীড়নের মাধ্যমে প্রান্তিক করার প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগুরুদের সহানুভূতি ও সমর্থনপ্রাপ্তির রাজনীতি করছে। বিশেষ করে মোদি সরকার গত সাত-আট বছর পুরোপুরি উগ্র হিন্দুত্ববাদী ক্যারিশমার ওপর ভর করে চলছে এবং সরকারের সব ধরনের ব্যর্থতাকে ঢেকে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। অন্য দিকে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা মূলত লুটপাটজীবীদের দ্বারা নিগৃহীত হচ্ছে। একই সাথে ভোটের রাজনীতিতে সংখ্যালঘুদের সহানুভূতিকে পুঁজি করার প্রতিযোগিতায়ও এই সংখ্যালঘুরাই অত্যাচারের বলি হচ্ছে। অর্থাৎ লুটপাটজীবীরা এক ঢিলে দুই পাখি মারছে। এক দিকে তারা ধর্ম অবমাননার দোহাই দিয়ে সংখ্যালঘুদের আক্রমণ করে লুটপাট এবং জমি-জিরাত দখল করছে।

অন্য দিকে, এর দায় মুসলমানদের ওপর চাপিয়ে ভোটের বাজারে সেক্যুলার দাবিদারদের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে। এ জন্যই ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের চেহারা সাম্প্রদায়িক কিন্তু চরিত্রটা রাজনৈতিক। এর সাথে রাষ্ট্র জড়িত- এ কথা ভুললে চলবে না’ (প্রথম আলো, ২৫ জুলাই ২০২২)। ভারতে ধর্মীয় দল ক্ষমতায়। তাদের রাজনীতির ভিত্তিই হলো উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ। কিন্তু আমাদের দেশের চিত্র ভিন্ন। এখানে ধর্মীয় দল ক্ষমতায় নেই। তাদের রাজনৈতিক দর্শনও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। আবার তারা সংখ্যালঘিষ্ঠবান্ধব সরকার বলেও বহুল পরিচিত। এর পরেও সংখ্যালঘুরা কেন এখানে বারবার বর্বরতার শিকার হচ্ছে?

বিচ্ছিন্নভাবে সীমিত পর্যায়ে এ দেশে কোনো কোনো স্থানে সংখ্যালঘু বা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন নির্যাতিত হয়েছে। কিন্তু গত এক দশকে সংখ্যালঘুদের ওপর বেশ বড় বড় কিছু হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব প্রতিটি ঘটনার সূত্রপাত এবং হামলার গল্প বা ন্যারেটিভ একই; ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে।’ তারপর এই আঘাতের বিষবাষ্পকে ছড়িয়ে দিয়ে, লোকজন জড়ো করে হিন্দুদের বাড়ি ও মন্দির আক্রমণ এবং ব্যাপক লুটপাট। প্রতিটি আক্রমণেই আবার নেতৃত্ব দিয়েছেন স্থানীয় প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিক নেতারা। বদরুদ্দীন উমর লিখেছেন, ‘এসব হামলার কোনো প্রকৃত সাম্প্রদায়িক চরিত্র নেই। এ আক্রমণ সব ক্ষেত্রেই ঘটছে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণীর সাথে সম্পর্কিত লুণ্ঠনজীবীদের দ্বারা, যারা প্রধানত সরকারি দল ও সরকারের সাথে নানা ক্ষেত্রে সম্পর্কিত। সব ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ঘটনাগুলো ঘটেছে পুলিশের নাকের ডগায়’ (প্রথম আলো, ১২ আগস্ট ২০২২)।

২০১২ সালে রামু হামলার ঘটনায় বিভিন্ন তদন্তে বেরিয়ে আসে যে, হামলার ১০ দিন আগে চারটি পর্বে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে স্থানীয় প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যর্থতাকে দায়ী করা হয় এবং ২৯৮ জনকে আক্রমণকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু অদ্যাবধি দায়ী বা আক্রমণকারীদের বিচার সম্পন্ন হয়নি। ২০১৬ সালে ৩০ অক্টোবর বি.বাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার কাশিপাড়া গ্রামের দত্তবাড়িতে ‘তওহিদি জনতার’ ব্যানারে আক্রমণ করে ১০টি বাড়িঘর এবং ১৭টি হিন্দু মন্দির ভাঙচুর এবং লুটপাট করা হয়। পাঁচ বছর পর ২৬০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয় যার মধ্যে ২০-৩০ জন আওয়ামী লীগের এবং ৪০-৫০ জন বিএনপির নেতাকর্মী রয়েছেন। তবে যে ‘রসরাজ’ নামক জেলের ফেসবুক স্ট্যাটাসকে ব্যবহার করে সেই হামলা ও লুটতরাজ হয়েছিল, সম্প্রতি পুলিশি তদন্তে ওই ‘রসরাজে’র ফোনে কোনো ধরনের ধর্মীয় অবমাননাকর ছবির সন্ধান পায়নি বলে জানা যায় (ডেইলি স্টার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২২)।

২০২১ সালের ১৭ মার্চ সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের জনৈক ঝুমন দাশ তার ফেসবুকে তৎকালীন হেফাজত নেতা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে অবমাননাকর পোস্ট দেয়। একজন মাত্র ধর্মীয় নেতার অবমাননাকে কেন্দ্র করে সরমঙ্গল ইউনিয়নের একজন ওয়ার্ড মেম্বার ও ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম দলবল নিয়ে হিন্দুদের ওপর ব্যাপক হামলা ও লুটপাট চালায়। উল্লেখ্য, ১৬ মার্চ ওই অপরাধে ঝুমন দাশকে গ্রেফতার করা সত্ত্বেও ১৭ মার্চ ওই হামলা চালানো হয়েছিল। হিন্দুগ্রামবাসী হামলার বিষয়টি আঁচ করতে পেরে আগেই পুলিশ, জনপ্রতিনিধি এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছিল।

এরপর ২০২১ সালের অক্টোবরে কুমিল্লায় নানুয়ার দীঘিরপাড় পূজামণ্ডপে রাতের আঁধারে মূর্তির পাশে কে বা কারা পবিত্র কুরআন রেখে যায়। খবর পেয়ে পুলিশ তা উদ্ধার করে এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারের অপেশাদার হ্যান্ডলিংয়ের কারণে জনৈক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এটি দেখানোর সুযোগ পায়। এ ঘটনা কুমিল্লা, নোয়াখালী ও ফেনীতে উত্তেজনা সৃষ্টি করে; পূজামণ্ডপ ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাট করা হয়। এসব ঘটনার পরপরই পুনরায় রংপুরের পীরগঞ্জে ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার স্লোগান তুলে জনৈক ছাত্রনেতার নেতৃত্বে হিন্দু গ্রামে হামলা ও লুটপাট চালানো হয়। প্রতিটি হামলাতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সময়মতো পদক্ষেপ না নেয়ার কারণেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং আহতের ঘটনা ঘটেছে। নিকট অতীতের এসব হামলার সুষ্ঠু বিচার সম্পর্কেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এখন প্রশ্ন হলো সরকারের এত সতর্কতা, জিরো টলারেন্স নীতি, স্তরভিত্তিক প্রহরা এবং নিদ্রা নিরাপত্তা দেয়ার প্রতিশ্রুতির পরও কেন হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা থামছে না; একের পর এক হামলার ঘটনা কিভাবে ঘটেই যাচ্ছে? এর মূল কারণ হিসেবে সুশীলসমাজ দেখছেন আগের ঘটনার বিচারে দীর্ঘসূত্রতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। সেই সাথে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো দুর্বৃত্তপনা, লুণ্ঠনবাদ এবং ভ‚মিদস্যুবৃত্তির চর্চাকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়া। কোথাও কোনো সংখ্যালঘু আক্রান্তের ঘটনা ঘটলেই সেটা মুখস্থভাবে মৌলবাদী বা সাম্প্রদায়িক হামলা বলে চিত্রিত করা হয়। অথচ সাম্প্রদায়িকতার সাথে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। এর সম্পর্ক শুধুই লুটতরাজ এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রক্রিয়ার। যারা এই হামলা করছে তারা কেউ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বা ধর্মচর্চাকারী মানুষ নয়। আজ পর্যন্ত কোনো আলেম-উলামাকে এসব হামলার নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়নি।

নেতৃত্ব দিয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের প্রভাবশালীরা। আর এসব দুর্বৃত্তরা আড়ালে পড়ে যাচ্ছে সেই সব মতলববাজ গোষ্ঠীর আর্তচিৎকারে, যারা চোখ বন্ধ করে সভা-সমাবেশ করে প্রচার করছে, মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক শক্তি এই হামলা করেছে। এসব লোকেরাই বরং এভাবে একটি দুর্বৃত্তায়ন প্রক্রিয়াকে সাম্প্রদায়িক রূপ দেয়ার চেষ্টা করছে অর্থাৎ সংখ্যালঘুদের বিপরীতে সংখ্যাগুরু ধর্মকে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে এবং দু’টি ধর্মের মধ্যে সঙ্ঘাত সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। তারা সাধারণত ঢালাওভাবে দেশের দাড়ি-টুপিওয়ালা ধর্মপ্রাণ সাধারণ জনগণকেই মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক বলে গালাগাল দেয় এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হলেই এদের দায়ী করে অন্ধভাবে। অবশ্য এই-সেই ছুতায় হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর মহড়া করলে বা ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে বক্তৃতা-বিবৃতি শুনলে দেশ-বিদেশের অনেকে খুব খুশি হয়ে থাকে। অথচ এই গোষ্ঠীটি ওইসব সংখ্যালঘুর ওপর হামলা বন্ধের কোনো ধরনের পদক্ষেপ বা প্রক্রিয়া বা সামাজিক আন্দোলনের কাজে যুক্ত হয় না। বরং মনে হয়, তারা অপেক্ষা করতে থাকে, কোথায় কখন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা হবে এবং মিডিয়ায় তাদের প্রতিক্রিয়ার লম্ফঝম্ফ দেখাতে পারবে। এভাবে ওই মতলববাজ গোষ্ঠীটি কথিত সাম্প্রদায়িক শক্তি নামক একটি অদৃশ্য শক্তির আড়ালে লুণ্ঠনজীবীদের লুকিয়ে থাকার সুযোগ সৃষ্টি করে দিচ্ছে প্রতিটি আক্রমণের ঘটনার পরপরই।

ইতোমধ্যেই পূজার আগেই বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচন যতই কাছে আসছে এই সংখ্যালঘু আক্রমণের প্রবণতা ততই বাড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এরই মধ্যে গত বছর শাল্লার ঘটনার ‘ফেসবুক কুশীলব’ ঝুমন দাশ জামিনে থাকাবস্থায় পুনরায় ধর্ম অবমাননাকর ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছে বলে জানা যায়। অবশ্য পুলিশ ত্বরিত পদক্ষেপ হিসেবে তাকে গ্রেফতারও করেছে। আবার স¤প্রতি টাঙ্গাইলে একটি কামিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে একজন অন্য ধর্মের বাংলা প্রভাষককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এটা সচেতন মহলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করছে। কামিল মাদরাসায় সিলেবাসে বাংলা বিষয় থাকলেও তা আসলে একটি বিশেষীকৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেখানে মূলত ইসলাম ধর্মের পাঠ্যসূচিকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। কাজেই কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষকে কুরআন-হাদিসের গভীর জ্ঞান রাখার পাশাপাশি একজন প্র্যাক্টিসিং ধার্মিক মুসলমান হওয়াটাও বাঞ্ছনীয় যা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হিসেবে চলমান রয়েছে। সহসা এই ঐতিহ্যকে এড়িয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের এ ধরনের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার দাবি রাখে। এটি কি একটি ভুল বা অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত? অথবা এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে তা বুঝা দরকার। কারণ, এই উদাহরণের ফলে জন্ম নেয়া নেতিবাচক প্রভাব মাদরাসা কর্তৃপক্ষ নয় বরং সরকারের জনপ্রিয়তার ওপরই বর্তাতে পারে বলে সচেতন মহল মনে করেন।

স্মরণকালের রেকর্ড অনুযায়ী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় কোনোভাবেই ইসলাম ধর্ম দায়ী নয়। প্রিয় নবীজি সা: হিজরত করে মদিনা গিয়ে যে রাষ্ট্রীয় সংবিধান দিয়েছিলেন তার প্রথম শর্তই ছিল সব স¤প্রদায় নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে। কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করবে না। এমনকি একদিন এক বিধর্মী মানুষ এসে রাসূলের সা: মসজিদের ভেতরে প্রস্রাব করলেও তাকে শাস্তি দিতে সাহাবিদের বারণ করেছিলেন এবং নিজেরা মসজিদ পরিষ্কার করে সেই ব্যক্তিকে শুধু বুঝিয়ে বলেছিলেন, এই কাজটি অন্যায় হয়েছে (সহিহ মুসলিম-৪২৯)। আর ইসলাম ধর্মের নীতি অনুযায়ী ফেসবুকের গুজবে কান দেয়ার প্রশ্নই তো আসে না। কারণ, কুরআনে বলা হয়েছে, ‘কোনো দুষ্ট লোক কোনো তথ্য আনলে কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে তা অবশ্যই পরখ করে নেবে বা যাচাই করে নেবে’ (আল-কুরআন-৪৯ : ৬)।

রাসূল সা:-ও শিখিয়েছেন, কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তা যাচাই না করেই সে ‘শোনা কথা’ বলে বেড়ায়। আল-কুরআনে বিধর্মীদের মূর্তি ভাঙা তো দূরের কথা, এমনকি ওইসব দেব-দেবীকে গালি দিতেও কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে (আল-কুরআন-৬ : ১০৮)। আবার যদি একজন ফেসবুকে দোষ করেও থাকে তবে তার গোষ্ঠীর লোকদের ওপর হামলা কিছুতেই সঙ্গত হতে পারে না। কুরআন বলেছে, ‘কোনো একজন মানুষই অন্যের পাপের জন্য দায়ী হবে না’ (আল-কুরআন-৫৩ : ৩৮)। নবীজি সা: বলেছেন, ‘অপরাধীর দায়িত্ব কেবল তার ওপরই বর্তায়। পিতা তার পুত্রের জন্য এবং পুত্র তার পিতার জন্য দায়ী নয়’ (বিদায় হজের ভাষণ)।

মদিনা সনদে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছিল, কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে সেটা তার ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ জন্য ওই ব্যক্তির গোটা স¤প্রদায়কে দোষী করা যাবে না। এ ছাড়াও রাসূল সা: ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তার জন্য বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তাদের প্রতি জুলুম, অত্যাচার, অনাচার করবে, মানহানি করবে, তাদের সামর্থ্যরে অধিক কাজে বাধ্য করবে অথবা তাদের সন্তুষ্টি ছাড়াই তাদের কোনো কিছু ছিনিয়ে নেবে, কিয়ামত দিবসে আমি তার প্রতিপক্ষ হবো।’ (আবু দাউদ শরিফ) তিনি সা: আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তিকে কষ্ট দেয়, সে আমাকেই কষ্ট দেয়’ (বুখারি, নাসায়ি, ইবনে মাজাহ)। সর্বোপরি সব সম্প্রদায়ের নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর জন্য ন্যায় সাক্ষ্যদানে অবিচল থাকবে, আর কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনো ন্যায়বিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। এটি আল্লাহ সচেতনতার নিকটতর; আর আল্লাহকে ভয় করো; তোমরা যা করো নিশ্চয় আল্লাহ তা ভালো করেই জানেন’ (আল-কুরআন-০৫ : ৮)। কাজেই এটি পরিষ্কার যে, সংখ্যালঘুদের ওপর বর্বরতা ও হামলার সাথে মুসলমান সম্প্রদায়ের বা ইসলাম ধর্মের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।

সুতরাং আমাদের মাতৃভূমিতে যারা সংখ্যালঘু আছেন তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব সংখ্যাগুরু মুসলমান সম্প্রদায় হিসেবে আমাদের। পূজা পার্বণের সময় যেহেতু লুণ্ঠনজীবী ও দুর্বৃত্তদের কারণে হিন্দুদের নিরাপত্তার বিষয়টি স্পর্শকাতর পর্যায়ে পৌঁছে যায় সেহেতু আমাদের সবার দায়িত্ব হবে সামনের দুর্গাপূজার সময় অতিরিক্ত সচেতন থাকা। না হলে দুর্বৃত্তরা তাদের কাজ করবে, পরজীবীরা সাম্প্রদায়িকতা বলে মুসলমানদের ওপর দোষ চাপাবে। ফলে মুসলমানরা সাম্প্রদায়িকতার অপবাদে দোষী সাব্যস্ত হবে এবং দুর্বৃত্তরা ও লুণ্ঠনজীবীরা আড়ালে পড়ে যাবে। এই আড়াল হয়ে যাওয়া অপরাধীরা পরবর্তীতে অন্য স্থানে পুনরায় সংখ্যালঘুদের আক্রমণে উৎসাহিত হবে। বরাবরের ন্যায় এবারো সংখ্যালঘু নিরাপত্তার ব্যাপারে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট আন্তরিক ও সতর্ক বলে মনে হচ্ছে। তবে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিক সজাগ না থাকলে সরকারের একার পক্ষে এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দুরূহ হয়ে পড়বে। মনে রাখতে হবে ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা সবার।

লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Email: maksud2648@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement