২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

পুলিশ ব্যতীত অপরাপর হেফাজতের আইনগত বৈধতা

-

আমাদের মূল দণ্ড আইন- দণ্ডবিধি। এটি ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬০ সালে প্রণীত হয়। দণ্ডবিধির অধীন কৃত অপরাধের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া ফৌজদারি কার্যবিধিতে বিবৃত বিধানাবলির আলোকে পরিচালিত হয়। এ আইনটিও দণ্ডবিধির মতো ব্রিটিশ শাসনামলে প্রণীত। এটি ১৮৯৮ সালে প্রণীত। ব্রিটিশ প্রণীত দণ্ডবিধি ও ফৌজদারি কার্যবিধি উপমহাদেশের অপর দুই রাষ্ট্র পাকিস্তান ও ভারতেও প্রচলিত রয়েছে, যদিও আইন দু’টির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দেশভেদে ক্ষেত্রবিশেষে সময় ও যুগের চাহিদার নিরিখে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয়েছে। দণ্ডবিধির অধীন কৃত অপরাধের তিনটি শ্রেণী রয়েছে; যথা- ক. আমলযোগ্য ও অআমলযোগ্য; খ. জামিনযোগ্য ও জামিন অযোগ্য এবং গ. আপসযোগ্য ও আপসঅযোগ্য। আমলযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই আটক করতে পারে। দণ্ডবিধি প্রণয়ন-পরবর্তী অপর যে সব দণ্ডনীয় বিশেষ আইন প্রণীত হয়েছে সেগুলোতে কিছু কিছু বিষয়ে তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে ভিন্নতর কিছু উল্লেøখ থাকলেও অনুল্লিখিত বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধিতে উল্লিখিত বিধানাবলি অনুসৃত হয়।

দণ্ডবিধি ও কিছু বিশেষ আইনের অধীন কৃত অপরাধের ক্ষেত্রে দু’ভাবে মামলার উদ্ভব হয়। এর একটি হলো জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) মামলা এবং অপরটি সিআর (কমপ্লেইন্ট রেজিস্টার) মামলা। জিআর মামলা থানায় এজাহার দাখিলের মাধ্যমে দায়ের করা হয়। দায়ের পরবর্তী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তার অধীনে কর্মরত একজন কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত সম্পন্ন করে অভিযোগপত্র অথবা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তার এ প্রতিবেদনটিকে বলা হয় পুলিশ প্রতিবেদন। জিআর মামলার ক্ষেত্রে পুলিশের প্রতিবেদনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারে সোপর্দ করা হলে ম্যাজিস্ট্রেটের পরোয়ানা জারির ক্ষমতার উদ্ভব ঘটে। জিআর মামলা থানায় পিএস (পুলিশ স্টেশন) কেইস হিসেবে রুজু হয়। আর এ কারণে এ মামলাকে পুলিশি মামলাও বলা হয়।

সিআর মামলা আমলি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে অথবা ক্ষেত্রবিশেষে বিশেষ দায়রা আদালতে নালিশি দরখাস্ত দাখিলের মাধ্যমে দায়ের করা হয়। আর এ কারণে সিআর মামলাকে নালিশি মামলাও বলা হয়। সিআর মামলা দায়ের-পরবর্তী আমলি ম্যাজিস্ট্রেট অথবা বিশেষ দায়রা জজ সরাসরি নালিশি দরখাস্তটি গ্রহণ করে নালিশি মামলাটি আমলে নিতে পারেন অথবা মামলায় আনীত অভিযোগ বিষয়ে তদন্তসাপেক্ষে নালিশি মামলাটি আমলে নিতে পারেন। নালিশি মামলার ক্ষেত্রে আমলি ম্যাজিস্ট্রেট বা বিশেষ দায়রা জজ নালিশি মামলা আমলে নেয়ার সাথে সাথে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করতে পারেন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৬১ গ্রেফতার ব্যক্তিকে পুলিশ হেফাজতে রাখার সময়-বিষয়ক। এ ধারাটিতে বলা হয়েছে- কোনো পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেফতারি পরোয়ানা ব্যতিরেকে আটক কোনো ব্যক্তিকে ধারা ১৬৭ তে প্রদত্ত ম্যাজিস্ট্রেটের বিশেষ আদেশ ছাড়া প্রয়োজনীয় যাতায়াতের সময় ব্যতীত ২৪ ঘণ্টার অধিক সময় নিজ হেফাজতে আটক রাখতে পারবেন না। এ ধারাটির পূর্ববর্তী ধারা ৬০-এ বলা হয়েছে- গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া আটক ব্যক্তিকে পুলিশ কর্মকর্তা কোনোরূপ অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণ না করে জামিনের বিধানাবলি সাপেক্ষে এখতিয়ারাধীন আমলি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অথবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে প্রেরণ করবেন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ৬০ ও ৬১-এর বিধানাবলি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩(১) ও (২) এ বিবৃত হয়েছে। ধারাটির (১) ও (২) দফায় বলা হয়েছে- গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শিগগিরই গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করে প্রহরায় আটক রাখা যাবে না এবং ওই ব্যক্তিকে তার মনোনীত আইনজীবীর সাথে পরামর্শের ও তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না।

আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে (গ্রেফতারের স্থান থেকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যতিরেকে) হাজির করতে হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়া তাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাবে না।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ (১) এ অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি উল্লেখ রয়েছে- সংবিধান ও আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।

ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার ও দণ্ড বিষয়ে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫(৩)-এ উল্লেখ রয়েছে- ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী হবেন।

বাংলাদেশ জাতিসঙ্ঘের সার্বজনীন মানবাধিকার দলিল, ১৯৪৮-এ স্বাক্ষরকারী দেশ। এ দলিলটি জাতিসঙ্ঘের সর্বজনীন মানবাধিকার দলিল হিসেবে অভিহিত। এ দলিলটির অনুচ্ছেদ ৯-এ উল্লিখিত হয়েছে- কোনো ব্যক্তিকে স্বেচ্ছাচারীভাবে গ্রেফতার, আটক বা নির্বাসন দেয়া যাবে না। দলিলটির অনুচ্ছেদ ১১(১)-এ উল্লিখিত হয়েছে- দণ্ডনীয় অপরাধে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি প্রকাশ্য বিচারে আইন অনুযায়ী দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব নিশ্চয়তা প্রদান সাপেক্ষে নিজেকে নির্দোষ দাবির অধিকার রাখে। উভয় অনুচ্ছেদে উল্লিখিত বক্তব্য আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৩(১) ও (২) এবং ৩৫(৩)-এর বক্তব্যের সমরূপ।

আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অধ্যাদেশ-১৯৭৯ তে সংশোধনীর মাধ্যমে ২০০৩ সালে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) গঠন করা হয়। র‌্যাবে পুলিশ, সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী প্রভৃতির সদস্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। র‌্যাবকে অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা দেয়া হলেও মামলা রুজু ও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দ্বারস্থ হতে হয়। তা ছাড়া সংবিধান ও দেশের প্রচলিত আইনে যে বিধান রয়েছে সে বিধান অনুযায়ী র‌্যাব গ্রেফতারের পর কোনোরূপ কালক্ষেপণ না করে অপরাধীকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করলেই সংবিধান ও প্রচলিত আইন প্রতিপালনে কোনো ব্যত্যয় ঘটে না; কিন্তু কয়টি ক্ষেত্রে হস্তান্তর করা হয় সে বিষয়ে দেশবাসী সন্দিহান।

পুলিশের এসবি (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) ও সিআইডি (ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট) বাহিনীর বিশেষায়িত শাখা। র‌্যাবের মতো উভয় শাখার তদন্তের ক্ষমতা থাকলেও মামলা রুজু ও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের ক্ষেত্রে তা সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হয়। উভয় শাখা স্বতন্ত্রভাবে কোনো অপরাধীকে গ্রেফতার করলে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করতে হয়। র‌্যাব, এসবি ও সিআইডির তদন্তকালীন রিমান্ডে নেয়ার আবশ্যকতা দেখা দিলে ম্যাজিস্ট্রেটের বিশেষ আদেশ ছাড়া রিমান্ডে নেয়ার বিধান নেই।

দুদকের (দুনীতি দমন কমিশন) তফসিলভুক্ত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত, মামলা রুজু, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার, মামলা রুজু পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও অভিযোগপত্র দাখিল সংক্রান্ত সামগ্রিক কার্যাবলি দুদক সম্পন্ন করে থাকে। দুদকের মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার-পরবর্তী দুদক ফৌজদারি কার্যবিধির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে উপস্থাপন করে। কোনো অপরাধীকে রিমান্ডে নেয়ার আবশ্যকতা দেখা দিলে ম্যাজিস্ট্রেটের বিশেষ আদেশের প্রয়োজন হয় এবং দুদকের নিজস্ব হাজত না থাকায় রিমান্ডের ব্যাপ্তি এক দিবসের অধিক হলে দুদক অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জিডিমূলে সংশ্লিষ্ট থানার হাজতখানায় রাখার ব্যবস্থা করে এবং জিডি-মূলে পুনঃ নিজ হেফাজতে গ্রহণ করে।

ইংরেজি ‘রিমান্ড’ শব্দটির অর্থ গ্রেফতারকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশি হেফাজতে পুনঃপ্রেরণ। বাংলায় এ শব্দটির অর্থ ও প্রায়োগিক দিক বিবেচনায় সঠিক কোনো শব্দ ব্যবহৃত না হওয়ায় ‘রিমান্ড’ শব্দটি বিদেশী শব্দ হিসেবে বাংলা ভাষায় স্থান করে নিয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৬৭ ও ৩৪৪-এর সংমিশ্রনে ‘রিমান্ড’ শব্দটির ব্যাখ্যা করলে যে অর্থ দাঁড়ায় তা হলো- ‘রিমান্ড’ বলতে একজন গ্রেফতারকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেট বা আদালতের বিচারিক আদেশের মাধ্যমে পুলিশি হেফাজত থেকে পুনঃ পুলিশি হেফাজতে অথবা বিচারিক হেফাজত থেকে পুলিশি হেফাজতে প্রেরণ বোঝায়। মামলা প্রমাণের জন্য প্রাপ্ত সাক্ষ্য অপর্যাপ্ত বিবেচিত হলে সাধারণত রিমান্ড চাওয়া হয়; তবে রিমান্ডে থাকাকালীন শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন আইনে সমর্থিত নয়। রিমান্ডের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অধিকতর সাক্ষ্য প্রাপ্তির জন্য নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের সময় এক অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে অপর অভিযুক্ত ব্যক্তির মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদসহ বিভিন্নভাবে প্রশ্ন পাল্টা-প্রশ্ন করে সঠিক তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করা হয়।

পুলিশ, পুলিশের বিশেষ শাখা বা বিভাগ ও দুদক ব্যতীত অন্য কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার গোয়েন্দা বিভাগ বা এর কোনো শাখাকে দেশের প্রচলিত আইন কোনো ধরনের গোপন কারাগার রাখার অনুমোদন দেয় না। এরূপ গোপন কারাগারে রেখে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংগঠন বা গুম করা মারাত্মক দণ্ডনীয় অপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ। পুলিশ বা এর কোনো বিভাগ বা শাখা বা অপর কোনো বাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ বা শাখার বেআইনি হেফাজত যেমন আইনের সুস্পষ্ট বিধানের লঙ্ঘন, অনুরূপ এরূপ বেআইনি হেফাজতে থাকাকালীন যেকোনো ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বিচারবহির্র্ভূত হত্যা, গুমের শিকার প্রভৃতি কোনোভাবেই কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। এরূপ কার্য সংগঠনের দায় থেকে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিরাসহ তাদের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে ন্যস্ত ব্যক্তিরাও অবমুক্ত নন। এ ধরনের অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়- নিজেদের জীবদ্দশায় সময়ের পরিক্রমায় দেশের প্রচলিত আইনের বিচার অথবা প্রকৃতির বিচার এড়াতে পারেনি।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail : iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement