০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

অভাব-অনটন মোকাবেলায় মন দিন

-

রাজধানীর ফুটপাথগুলোর দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে অনেক গরিব-নিঃস্ব মানুষ এখন সেখানে ঠাঁই নিয়েছে। কিছুদিন আগেও যে দৃশ্য দেখা যায়নি, এখন তা দেখা যাচ্ছে। ঢাকায় ভিক্ষুকের সংখ্যাও বেড়ে গেছে।

সেই ১০ টাকার মোটা চাল এখন বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৫ টাকায়। এক মাসে আটার দাম বেড়ে গেছে ২৪ শতাংশ। বেড়েছে মাছ, গোশত, শাকসবজি, তেল-নুনসহ প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম। সার সঙ্কটে কৃষকরা দিশেহারা। আগামী আমন উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। চার দিকে অভাবের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে।

দেশের পরিস্থিতি যখন এমন, তখন সরকার সে দিকে নজর না দিয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি দমনে। প্রতিদিন বিএনপি ধোলাই চলছে। মিছিলে হামলা, বাড়িঘরে হামলা, মামলা-গ্রেফতার, হয়রানির শেষ নেই। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধির প্রতিবাদ ও কৃষক বাঁচাওয়ের দাবিতে সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি। জেলায় জেলায় চলছিল এ কর্মসূচি। কিন্তু বিক্ষোভ দমনে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও সরকারি দলের ক্যাডাররা একজোট হয়ে মাঠে নেমেছে। মিছিল ভেঙে দিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, বিএনপি নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে গিয়ে হামলা চালিয়ে তাদের এলাকা ছাড়া করা হচ্ছে। প্রতিদিনই এমন খবর ছাপা হচ্ছে সংবাদপত্রে।

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হবে না। সভা-সমাবেশ মিছিল করতে বাধা নেই। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর অফিস ঘেরাও করতে এলেও বিএনপিকে বাধা না দিয়ে অফিসে বসিয়ে চা-বিস্কুট খাওয়াবেন বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী; কিন্তু কোথাও তার নজির দেখা যাচ্ছে না।

মোটা চালের দাম
সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা এখন চাল নিয়ে। চালের দাম এতটা বেড়ে চলেছে যে, সংসার চালাবেন কিভাবে সেটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে। ‘১০ টাকায় কেজিতে চাল খাওয়াব’- এ স্লোগানে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির আন্দোলনের ফলে ২০০৭ সালে জরুরি সরকার দেশে আসে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। কিন্তু সেই ১০ টাকার চাল এখন বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। এক মাস আগেও ঢাকার বাজারে অনেক কম দামে এ চাল বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এখন সেটির দাম বেড়ে গেছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে এই মোটা চাল (স্বর্ণা) কেজিতে ছিল ৩০ টাকা। এখন সেটি প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। বাজার নজরে রাখা ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সাম্প্রতিককালে এ দর সর্বোচ্চ।

চালের মূল্যবৃদ্ধির এ দর সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ টিসিবির দেয়া। বাজার ঘুরে সাংবাদিকরা প্রতিবেদনে বলেছেন, এ দর কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। টিসিবি বলেছে, মোটা চালই (স্বর্ণা) শুধু নয়, সরু এবং মাঝারি চালের দামও বেড়েছে। তবে মোটা চাল যে হারে বেড়েছে, ততটা নয়। মোটা চাল যেখানে বেড়েছে ১৫-২০ শতাংশ, সরু ও মাঝারি চাল সেখানে বেড়েছে ৪ থেকে ৫ শতাংশ। বাজারে এখন মোটা চাল (স্বর্ণা) সর্বনিম্ন ৫৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। সরু চাল বিক্রি হচ্ছে কেজি-প্রতি ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে। আর মাঝারি চাল বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকা কেজিতে।

চালের দামের সাথে পাল্লা দিয়ে বাজারে আটার দামও বেড়েছে। বাজারে খোলা আটার দাম বেড়ে হয়েছে প্রতি কেজি ৫২-৫৫ টাকা। টিসিবির বাজারদরে দেখা যায়, খোলা আটার দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি, যা এক মাস আগের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি।

তেমনি বেড়েছে ময়দার দাম। আর এর সাথে পাল্লা দিয়ে কোম্পানি ও বেকারির রুটি-বিস্কুট-কেকের দামও কয়েক টাকা করে বেড়েছে। টিসিবির হিসাবে দেখা গেছে, এক বছরে আটার দাম বেড়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। দেশে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টন গমের চাহিদা আছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হানের একটি গবেষণায় বলা হয়, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেলে মানুষ ব্যয় সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে মাঝারি চাল থেকে সরে এসে মোটা চাল কেনা শুরু করেন। এবারো ওই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চাল। এর দাম বাড়লে তা মূল্যস্ফীতির ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) জানিয়েছে, ২০০৯ সালে ঢাকায় মোটা চালের গড় দাম ছিল প্রতি কেজি ২৩ টাকার কিছু বেশি। সরু চাল বিক্রি হতো সর্বোচ্চ ৪০ টাকা কেজি দরে। টিসিবির হিসাবে ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি ঢাকার বাজারে মোটা চালের দাম ছিল ৩৪ থেকে ৩৬ টাকা, যা পাঁচ বছর পর ২০১৯ সালে দাঁড়ায় ৩৮ থেকে ৪২ টাকা কেজি। এখন সেই চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকা কেজিতে।

অর্থনীতিবিদদের হিসাবে দেশে এক কোটি দরিদ্র পরিবারের বাইরে আরো এক কোটি সীমিত আয়ের পরিবার দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে টিসিবির ওএমএস কর্মসূচি যেভাবে হওয়ার কথা, সেভাবে চোখে পড়ছে না। টিসিবি ট্রাকে করে যেসব জায়গায় চাল বিক্রি করছে সেখানে গরিব মানুষের দীর্ঘ সারি। ক্যাবের সভাপতি গোলাম রহমান সাংবাদিকদের বলেন, মোটা চালের দাম এতটা কখনো ছিল না। মানুষের অবস্থা যে খারাপ, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। দাম আগে এতটা দেখিনি।

সার সঙ্কট, আমন ফলনে শঙ্কা
সার নিয়ে কৃষক এখন দিশেহারা। বেশি দাম দিয়েও তারা সার পাচ্ছেন না। সরকার ইউরিয়া সারের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে প্রতি কেজি ২২ টাকা। সেই সার কৃষক পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে কেজি-প্রতি ২৫-২৬ টাকা দরে। অন্যদিকে ১৫ টাকা কেজি দরের এমওপি (মিউরেট অব পটাশ) সার বিক্রি হচ্ছে ২৪ থেকে ২৬ টাকায়। এই বাড়তি দাম দিয়েও কোনো কোনো জেলায় সার পাচ্ছেন না কৃষক। পরিবেশকের কাছে ধরনা দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী সে পরিমাণ সার তারা পাচ্ছেন না। সারের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি সাম্প্রতিককালে দেখা যায়নি।

কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার আমন মৌসুমে বৃষ্টি কম হচ্ছে। বাড়তি দরে ডিজেল কিনে কৃষকদের সেচ দিতে হচ্ছে। সরকার ইউরিয়াসহ সারের দাম বাড়িয়েছে। এর মধ্যে কৃষকের সার পেতে যদি দুর্ভোগ পোহাতে হয়, নির্ধারিত দরের চেয়ে দাম বেশি রাখা হয়, তাহলে তা আমন ধান উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কৃষক আমন উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হবেন। এতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশে সারের চাহিদা রয়েছে বছরে ইউরিয়া সার ২৬ লাখ টন, টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) সাড়ে সাত লাখ টন, ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়া ফসফেট) সারে ১৬ লাখ টন এবং এমওপি সাড়ে আট লাখ টন। ইউরিয়া দেশে উৎপাদিত হয় ১০ লাখ টনের মতো। বাকিটা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে আমদানি হয়। টিএসপি, টিএপি ও এমওপি সারেরও বড় অংশ আমদানি করা হয়।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দেশে কৃষকের সংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখ। মোট আবাদি জমি আছে ৬০ লাখ হেক্টর। কৃষিজমি যেভাবে কমছে, অচিরে তা ৫০ লাখ হেক্টরে নেমে আসবে। আমাদের এক কোটি ৭০ লাখ কৃষকের মধ্যে ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র চাষি। এদের গড়পড়তা জমি এক হেক্টরের নিচে। এ পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও বাংলাদেশের কৃষকরা আমাদের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য উৎপাদন করছেন। সে ক্ষেত্রে কৃষকরা যদি প্রয়োজনীয় সহযোগিতাটুকু না পান তাহলে ধান ও অন্যান্য ফসলের ফলনে বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য।

এমনিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। আকস্মিক বন্যায় গত বোরো মৌসুমে ফসলহানি হয়েছে। খরার কারণে আউশ উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে আমন রোপণের সময় বৃষ্টি নেই, ডিজেলের দাম অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় সেচ সঙ্কট দেখা দিয়েছে, সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের হিমশিম অবস্থা। এ অবস্থায় আমন ফলন কম হওয়ায় আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে দেশে এবার চালের উৎপাদন কম হতে পারে। তাই কৃষি ও কৃষকের স্বার্থের দিকে নজর দিতে হবে। দেশের সেচযন্ত্রগুলোর মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ বিদ্যুৎচালিত। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ ডিজেল-চালিত। ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সেচের জন্য কৃষককে বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে। তাই ফলন ঠিক রাখার স্বার্থে সরকারকে কৃষকের সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে। বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পের দিকটি শুধু বিবেচনায় নিলে হবে না, ডিজেল-চালিত পাম্প যেহেতু দুই-তৃতীয়াংশ, সে জন্য সে দিকে বেশি নজর দিতে হবে। ডিজেলের বাড়তি খরচের বোঝা থেকে কৃষককে মুক্তি দিতে হবে।

করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বব্যাপী এখন নানামুখী সঙ্কট। এর প্রভাব তো আছেই। তার মধ্যে অব্যাহত দুর্নীতি-অপচয়, টাকাপাচার, সিন্ডিকেট ব্যবসা, কালোবাজারি, মুনাফাখোরদের দৌরাত্ম্য, মজুদদারি, লোডশেডিং, অর্থনীতি ধ্বংস এবং দেশ পরিচালনায় সীমাহীন ব্যর্থতার কারণে দেশের অবস্থা খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে। অভাব-অনটনে মানুষ দিশেহারা। তাই সরকারের এ মুহূর্তে একান্ত কর্তব্য কাজ হলো- মানুষের অভাব মোকাবেলায় মন দেয়া।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব
Email: abdal62@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement