০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

সংবিধান মানা, না মানার প্রশ্ন

লেখক : ইকতেদার আহমেদ - ফাইল ছবি

সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। এটি অন্য সব আইনের ঊর্ধ্বে। সংবিধান ও আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। বাংলাদেশের যেসব পদধারী শপথের অধীন তাদের মধ্যে সংসদ সদস্য ছাড়া অন্য সবাইকে শপথ গ্রহণের সময় অপরাপর বিষয়ের পাশাপাশি ব্যক্ত করতে হয় যে, তারা সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। প্রধান বিচারপতি এবং আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারকদের ক্ষেত্রে ব্যক্ত করতে হয় তারা বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করবেন। এরূপ শপথধারীরা পদত্যাগ অথবা অবসরের পর শপথ থেকে অবমুক্ত হয়ে যান।

সংবিধান বা আইন মেনে না চললে একজন সাংবিধানিক পদধারী ব্যক্তি বা দেশের কোনো নাগরিক কী ধরনের অপরাধে দোষী হবে সংবিধান প্রণয়নকালে এ বিষয়ে সংবিধানে কোনো কিছু উল্লেখ ছিল না। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৭ক সন্নিবেশিত হয়। এ অনুচ্ছেদে বলা হয়- সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ, ইত্যাদি অপরাধ। এ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয় (১) কোনো ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায়- (ক) এ সংবিধান বা এর কোনো অনুচ্ছেদ রদ, রহিত বা বাতিল বা স্থগিত করলে কিংবা করবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলে; কিংবা (খ) এ সংবিধান বা এর কোনো বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত করলে কিংবা উহা করবার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করলে- তার এ কার্য রাষ্ট্র্রদ্রোহিতা হবে এবং ওই ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হবে। অপরাধের সাজা বিষয়ে অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।

উল্লেখ্য, প্রচলিত আইনে অন্যান্য অপরাধের জন্য নির্ধারিত দণ্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ দণ্ড হলো মৃত্যুদণ্ড। পঞ্চদশ সংশোধনীটি ২০১১ সালের ৩ জুলাই কার্যকর হয়।

একজন ব্যক্তি সংবিধানের নির্দেশনার ব্যত্যয়ে কোনো কাজ করলে তাতে সংবিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত হয় এবং সে ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ৭ক(১)(খ) আকৃষ্ট হয়।

সংবিধান প্রণয়ন পরবর্তী এবং সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রবর্তন পূর্ববর্তী জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনবিষয়ক যে বিধান ছিল তাতে বলা ছিল, মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে; এবং অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের এ বিধানটি কার্যকর থাকাকালীন সংসদ নির্ধারিত মেয়াদ পূর্ণ করার ক্ষেত্রে সংসদ বহাল থাকাবস্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান ছিল। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রবর্তন পূর্ববর্তী জাতীয় সংসদের ছয়টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ ছয়টি নির্বাচনের কোনোটির ক্ষেত্রেই সংসদের মেয়াদ পূর্ণ না হওয়ার কারণে সংসদ বহাল থাকাবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আবশ্যকতা দেখা দেয়নি। এ ছয়টি নির্বাচনের মধ্যে পাঁচটি ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন এবং একটি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে কর্মরত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনে ক্ষমতাসীনরা বিজয়ী হয়।

অন্য দিকে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারবহির্ভূত সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নির্বাচনের অব্যবহিত আগের ক্ষমতাসীন দল পরাভূত হয়। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন ছিল এবং এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন বিএনপি ক্ষমতাসীন ছিল এবং এ নির্বাচন দু’টিতে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন জাতীয় পার্টি ক্ষমতাসীন ছিল এবং উভয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে।

দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অনুধাবন করতে সক্ষম হয় যে, ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরোধীদের জনসমর্থন যত ব্যাপকই হোক না কেন তাদের বিজয়ী হওয়া দুরূহ। এ উপলব্ধি থেকেই এ দেশে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান প্রবর্তিত হয়। এ বিধান প্রবর্তন পরবর্তী জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন বিষয়ে বলা হয়- মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ক বিধানটি কার্যকর পরবর্তী সংসদ মেয়াদ পূর্ণ করার ক্ষেত্রে তা বহাল রেখে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান অবলুপ্ত হয়। ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রবর্তন পরবর্তী এর বিধানাবলির অনুসরণে জাতীয় সংসদের দু’টি নির্বাচন যথা সপ্তম ও অষ্টম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচন দু’টির প্রথমটিতে নির্বাচনের অব্যবহিত আগের ক্ষমতাসীন দলবহির্ভূত আওয়ামী লীগ এবং শেষেরটিতে নির্বাচনের অব্যবহিত আগের ক্ষমতাবহির্ভূত দল বিএনপি বিজয়ী হয়।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠন করে। এ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি সংবিধান অনুসৃত নির্দলীয় তত্তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনবিষয়ক বিধানাবলি অনুসরণ করে গঠিত হয়নি। এ সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অদ্যাবধি সংসদে অনুমোদন দেয়া হয়নি যদিও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধতাবিষয়ক রিট মামলার আপিলের রায়ে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনার অবতারণায় এটিকে বৈধতা দেয়ার প্রয়াস নেয়া হয়।

নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশের অধিক আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন পরবর্তী জন-আকাক্সক্ষার বিপরীতে এবং তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলের তীব্র আপত্তি উপেক্ষা ও অবজ্ঞাপূর্বক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিষয়ক নিজেদের সুস্পষ্ট অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে দলীয় সঙ্কীর্ণ মনোবৃত্তি দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে একতরফাভাবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিষয়ক উচ্চাদালতের আপিলের রায়কে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে এ ব্যবস্থাটির অবসান ঘটায়।

প্রণিধানযোগ্য যে, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিষয়ক ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করা হয়। পঞ্চদশ সংশোধনীটি সংসদ কর্তৃক ৩০ জুন ২০১১ সালে পাস হয় এবং তদপরবর্তী ৩ জুলাই ২০১১ সালে রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পর এটি কার্যকর হয়। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলবিষয়ক আপিল আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশটি প্রদান করা হয় ১০ মে ২০১১ সালে এবং পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয় ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১২ সালে। সংক্ষিপ্ত রায় প্রদানকালীন প্রধান বিচারপতি হিসেবে কর্মরত ১৯তম প্রধান বিচারপতি ১৭ মে ২০১১ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি অবসর গ্রহণ পরবর্তী তার ৩৪২ পৃষ্ঠা সংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত রায়ে ১৬ মাসেরও অধিক সময় পর স্বাক্ষর করেন।

পূর্ণাঙ্গ রায় দৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, আপিল বিভাগের একজন বিচরপতি ও ছয়জন বিচারক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত আপিল মামলার শুনানি গ্রহণ করেন এবং পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা ও তাতে স্বাক্ষর করার সময় একজন বিচারপতি অবসরে ছিলেন এবং একজন বিচারপতি ও পাঁচজন বিচারক স্ব স্ব পদে বহাল ছিলেন। অবসরে যাওয়া বিচারপতিসহ কর্মরত প্রধান বিচারপতি এবং দু’জন বিচারক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সন্নিবেশিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বেআইনি ঘোষণা করেন। অপর দিকে দু’জন বিচারক এটিকে সংবিধানসম্মত ঘোষণা করেন এবং একজন বিচারক সংবিধানসম্মত ঘোষণা করে এ বিষয়ে বিজ্ঞ সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার সংসদের ওপর ছেড়ে দেন। যেহেতু পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা ও রায়ে স্বাক্ষরকালীন সময় ১৯তম প্রধান বিচারপতি পদে বহাল ছিলেন না তাই আইনের দৃষ্টিতে তিনি যে রায় প্রদান করেছেন তা এখতিয়ারবিহীন ও মূল্যহীন। এ বাস্তবতায় ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত রায়টি ৩:৩ থেকে এ বিভক্ত।

উপর্যুক্ত আলোচনা হতে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত যে, সংসদ কর্তৃক সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী প্রবর্তনকালীন ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলবিষয়ক আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রচারিত হয়নি। সুতরাং সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল বিষয়ে আদালতের রায়কে অজুহাত হিসেবে দেখানোর কোনো অবকাশ ছিল না।

সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত রিটটি দায়ের করা হয় ১৯৯৯ সালে। পরে এ রিটটি শুনানির জন্য তিনজন বিচারক সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হয় এবং ওই বেঞ্চ সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ২০০৪ সালে বৈধ মর্মে ঘোষণা করে। অতঃপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়েরের পর দীর্ঘ দিন আপিল মামলাটি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়েছিল এবং ১৯তম প্রধান বিচারপতি পদে আসীন পরবর্তী এ আপিলটি শুনানির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ওই সাবেক প্রধান বিচারপতি যে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদান করেছেন তা পর্যালোচনায় দেখা যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত রায়ে তিনি যে অভিমত দিয়েছিলেন তার সাথে পূর্ণাঙ্গ রায়ের ভিন্নতা রয়েছে।

সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রের বৃহৎ স্বার্থ ও জনগণের নিরাপত্তার প্রয়োজনে আগামী দু’টি (দশম ও একাদশ) জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিদ্যমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিদায়ী প্রধান বিচারপতি অথবা আপিল বিভাগের বিচারকদের নিয়োগের বিধান বাতিলের বিষয়ে সংসদ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। অপর দিকে সাবেক প্রধান বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ রায়ে আগামী দু’মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ার বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করে নির্বাচনকালীন সরকারের চেয়ে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার ওপর। সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ রায়ের এ ভিন্নতাকে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করেছেন।

১৯তম সাবেক প্রধান বিচারপতির প্রদত্ত রায়ে দেখা যায়, তিনি তার রায়ে আইন, বিধিবিধান ও নীতিনৈতিকতা উপেক্ষা করে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ১/১১-এর জরুরি সরকারের কার্যক্রমকে বৈধতা দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন- এ বৈধতার জন্য কি কোনো আবেদন ছিল? এ বিষয়ে কি কোনো শুনানি হয়েছে? আবেদন না থেকে থাকলে এবং শুনানি না হয়ে থাকলে কেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সংসদের দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে জনগণের শেষ ভরসাস্থল খ্যাত সর্বোচ্চ আদালতকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন? এখানে যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হলো, রিট দায়েরের সময় ১/১১ এর অস্তিত্ব ছিল না। তাই রিটে সে বিষয়ের প্রতিকার চাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। রিটে যে বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই সে বিষয়টি কি করে ১৯তম সাবেক প্রধান বিচারপতির রায়ের আলোচনায় স্থান পেল? এমনকি আপিল বিভাগে শুনানি গ্রহণকালীন এ বিষয় অ্যামিকাস কিউরি বা রাষ্ট্রপক্ষের কেউ কোনো আলোচনা করেছেন সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। রিট দায়ের ও নিষ্পত্তি পর্যন্ত যে শিশুর জন্ম হয়নি সে কী করে আলোচনায় এলো?

১৯তম সাবেক প্রধান বিচারপতি সুস্পষ্টভাবে সপ্তম সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত আপিল মামলার রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, কোন্ সময়টি ক্রান্তিকালীন সময় হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই সময় ব্যতীত অপর কোনো সময়কে ক্রান্তিকালীন সময় হিসেবে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। দৃশ্যত, এ অভিমত দ্বারা ইতঃপূর্বে সংসদ পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে অসাংবিধানিক শাসনব্যবস্থাকে যেভাবে বৈধতা দিয়েছিল সে পথটি রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে যেখানে জনগণের সমার্থক সার্বভৌম সংসদের ক্ষমতা রুদ্ধ সেখানে কী করে ১৯তম সাবেক প্রধান বিচারপতি ১/১১ এর সরকারকে অযাচিতভাবে অবৈধ বলে এর কার্যক্রমকে মার্জনা দিয়ে সংসদের ঊর্ধ্বে আদালতকে স্থান দিলেন?

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশের প্রধান বিরোধী দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে ১৫৪টি আসনের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সংসদ গঠনবিষয়ক সংবিধানের সুস্পষ্ট বিধানে উল্লেখ রয়েছে, একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত ৩০০ সদস্য এবং তাদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভোটে নির্বাচিত ৫০ জন মহিলা সদস্য সর্বমোট ৩৫০ সদস্য সমন্বয়ে সংসদ গঠিত হবে। স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দেয়, যে সংসদের প্রত্যক্ষ নির্বাচনের জন্য উন্মুক্ত অর্ধেকেরও অধিক আসনের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত, সে সংসদটি সংবিধান নির্দেশিত পন্থায় গঠিত হয়েছে কি না? আর সংবিধান নির্দেশিত পন্থায় গঠিত না হয়ে থাকলে এর মাধ্যমে এ সংবিধান ও এর বিধানের প্রতি নাগরিকের আস্থা, বিশ্বাস বা প্রত্যয় পরাহত হয় যা প্রকারান্তরে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৭ক১(খ) কে আকৃষ্ট করে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় প্রত্যক্ষ করা গেছে যে, ভোটের দিন নির্ধারিত সময়ের ভোট গ্রহণ পর্বের আগের রাতে অধিকাংশ আসনের ভোটকেন্দ্রের ব্যালট বাক্স প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সহায়তায় অন্যায় অবৈধ পন্থা অবলম্বনে ব্যালট পেপারে সিল মেরে পূর্ণ করা হয়েছে। জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিন ও সময়কাল এতদবিষয়ক আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ দ্বারা নির্ধারিত। এ আইনের ব্যত্যয়ে ভোট প্রদান করে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করা হলে তা কোনোভাবেই বৈধ ও আইনসম্মত নয়। সুতরাং নির্ধারিত ভোট গ্রহণের দিনের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণের মাধ্যমে ভোট গ্রহণ কোনোভাবেই বৈধ হিসেবে গণ্য হওয়ার অবকাশ সৃষ্টি হয় না।

লক্ষণীয় যে, সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী প্রণয়নকালীন ওই সংশোধনীদ্বয়ের সুবিধাভোগী যথাক্রমে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ক্ষমতাসীন ছিল। কিন্তু উক্ত সংশোধনী দু’টি বাতিলকালীন সংশোধনী দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন ছিল। অনুরূপভাবে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় এটি প্রণয়ন করে। আর তাই এ সংশোধনীটি দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত দল ক্ষমতাসীন হলে এ সংশোধনীটি যে বহাল রাখবে না তা অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে অনেকটা স্পষ্ট। তা ছাড়া বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতা হতে বিদায় নিলে নবম, দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে যে প্রশ্নের উদয় হবে না তা অমূলক নয়।

নবম, দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংবিধান ও আইনের যে ব্যত্যয় ঘটেছে তা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের শাসনামলে আদালতের দোরগোড়া অবধি হয়তো পৌঁছাবে না; কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলে যে আদালতের সামনে প্রশ্নের মুখে পড়বে তা বোধকরি দেশের সচেতন জনমানুষ অনুধাবনে সক্ষম। সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে দেশের সব নাগরিক শ্রেণিপেশা, দল-মত নির্বিশেষে মেনে চলা অত্যাবশ্যক। এখানে কারা ক্ষমতাসীন আর কারা ক্ষমতাবিহীন এমন বিভাজনের সুযোগ নেই। সুতরাং সংবিধান মানার ক্ষেত্রেও ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদের মধ্যে বিভাজন কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail : iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement