২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৩ আশ্বিন ১৪২৯, ১ রবিউল আওয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

ইবনে আরাবি, ওয়াহদাতুল ওজুদ ও অদ্বৈতবাদ

লেখক : মুসা আল হাফিজ - ফাইল ছবি

প্রখ্যাত মার্কিন মনোবিজ্ঞানী এবং দার্শনিক William James (১৮৪২- ১৯১০) তার বিখ্যাত The Varieties of Religious Experience গ্রন্থে সুফিবাদকে অদ্বৈতবাদের প্রভাবজাত হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। হাতিয়ার হলো মুসলিম স্পেনের সুফি ও খোদাতত্ত্ববিদ ইবনে আরাবির (১১৬৫-১২৪০) ওয়াহদাতুল ওজুদ বা সত্তার একত্ব দর্শন।

কিন্তু ইবনে আরাবি সৃষ্টিকেই স্রষ্টা বলে আখ্যা দেন না। ওয়াহদাতুল ওজুদ বা ইউনিটি অব বিং-এর মূল কথা হচ্ছে, যেহেতু সৃষ্টিকর্তা সবকিছুর ঊর্ধ্বে, সব কিছুর স্রষ্টা ও পরিচালক, তাই তিনি বিশ্বনিখিল থেকে আলাদা নন কিংবা বিশ্বসংসার তার থেকে আলাদা নয়। বরং, সমগ্র মহাবিশ্ব তার মাঝেই নিমগ্ন আছে। ইবনে আরাবির এই বয়ানকে সমকালীন অনেকেই নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।

তাকে সর্বেশ্বরবাদী উপাধি দেওয়া হয়েছে। এই অনুমানে যে, যেহেতু তিনি বলছেন, সর্বত্র সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি বিরাজমান, অতএব সবকিছুকেই মনে করছেন সৃষ্টিকর্তা।

ইবনে আরাবির বক্তব্য বহুঅর্থী, রূপক-পরিকীর্ণ এবং কাব্যময়। একে নানাভাবে ব্যাখ্যার অবকাশ থাকে। তাকে বুঝার আলাদা ব্যাকরণ এ কারণেই দাঁড়িয়েছে। তার শব্দাবলি কী অর্থ প্রকাশ করে, এর অভিধানও প্রণীত হয়েছে। তবে ইবনে আরাবিকে ভুল বোঝার হাত থেকে নিস্তার পেতে সহায়তা করে বিদ্যমানতা বলতে তিনি কী বুঝান, তার দৃষ্টান্তসমূহ। তার দর্শনে রয়েছে ইনসানে কামিল বা পূর্ণাঙ্গ মানুষের প্রস্তাবনা। সেখানে ইবনে আরাবি দেখান মানুষ তার কাজের মধ্যে বিরাজমান। তাহলে কি আমরা বলতে পারি, ইবনে আরাবি বলতে চাইছেন কাজই মানুষ? এটা বলা যায় না এবং এটাও বলা যায় না যে, ‘সৃষ্টিতে স্রষ্টা বিরাজমান’ এর মানে সৃষ্টিই স্রষ্টা! বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষকে পাওয়া যায় তার কাজের মধ্যে, ইনসানে কামিল দর্শন এটা দাবি করে। ওয়াহদাতুল ওজুদ দাবি করে খোদাকে উপলব্ধি ও প্রমাণ করা যায় তার সৃষ্টির মাঝে। সব সৃষ্টি নিমজ্জিত হয়ে আছে তার নিরন্তর সৃজন ও পরিপালক সত্তার মাঝে।

ওয়াহদাতুল ওজুদের দাবি হলো, আল্লাহ ছাড়া সব অস্তিত্ব ধ্বংসশীল এবং অসম্পূর্ণ। কেননা সেসব অস্তিত্ব অচিরেই ফানা বা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এসব অস্তিত্ব আপন অস্তিত্বের জন্য আল্লাহ পাকের মুখাপেক্ষী। তারা অস্তিত্বে আসে আল্লাহর কারণে ও ক্রিয়ায়। এর মানে হলো সব অস্তিত্বের পূর্বশর্ত হলো আল্লাহর অস্তিত্ব। এ অস্তিত্ব না থাকলে কোনো অস্তিত্বের প্রশ্নই আসে না। এ অস্তিত্ব আছে বলেই অন্য সব অস্তিত্ব সম্ভব হয়েছে। এ অস্তিত্বের ইচ্ছা ও সৃষ্টির ফলে সব অস্তিত্ব বিদ্যমানতা পেয়েছে। এ বিদ্যমানতা ও টিকে থাকা আবার তারই ব্যবস্থাপনা ও চালনার ফসল। ফলে তাদের অস্তিত্ব তারই অস্তিত্বের প্রমাণ ও সাক্ষ্য। কোনো অস্তিত্বই প্রকৃতপক্ষে অস্তিত্ব নয়। প্রকৃত অস্তিত্ব আল্লাহ। সব অস্তিত্বের অস্তিত্ব তিনি, সব অস্তিত্ব তারই মধ্যে নিমজ্জমান। তার বিপরীতে কোনো অস্তিত্বের কোনোই মূল্য নেই।

দিনের আকাশে সূর্য জ্বলজ্বল করে বলে অন্য নক্ষত্রদের দেখা যায় না। কিন্তু তারা আকাশেই আছে, আকাশেই জ্বলন্ত। সূর্যের উপস্থিতির তীব্রতা নক্ষত্রদের অস্তিত্বকে আমাদের দৃষ্টি থেকে আড়াল করে দেয়, চোখেই পড়ে তারা থাকলেও নাই হয়ে থাকে। তেমনিভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহর মারিফত লাভ করেনি, তিনি যখন বিশ্বের অস্তিত্বসমূহের প্রতি দৃষ্টি দেন, কারো অস্তিত্ব তার চোখে পড়ে না। কারণ আল্লাহর অস্তিত্বের জ্যোতির প্রকাশ সব কিছুর অস্তিত্বকে জ্যোতিহীন করে দেয়। কারণ তাদের কোনো নিজস্ব জ্যোতি নেই। হাকিকত বা সারসত্যে উপনীত সুফির দৃষ্টি তাই সব কিছুই দেখে, কিন্তু সবকিছুতেই দেখে পরম সত্তার আলোকে, তার প্রকাশকে, তার উপস্থিতিকে। তবে অদ্বৈতবাদ যখন বলে জগৎ ঈশ্বরকে ধারণ করে, তখন সরাসরি অদ্বৈতবাদই হাজির হয়। কিন্তু আল্লাহ জগৎকে ধারণ করেন বলার মধ্যে কোথাও কি প্রচ্ছন্ন ও অসচেতন অদ্বৈতবাদের জায়গা তৈরি হয় না? এ প্রশ্ন থেকে অনেকের বক্তব্য হলো আল্লাহ জগতের অতিবর্তী। জগতের সর্বত্র আল্লাহর একচ্ছত্র ক্ষমতা পরিব্যাপ্ত।

ইবনে আরাবি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলেন, যখন বলেন, সুফি হলেন পরিপূর্ণ বোধসম্পন্ন এমন একজন, যিনি উপাসনার প্রতিটি বস্তুতে সত্য প্রকাশ দেখেন, যার কারণে এটি উপাসিত হয়। তাই, তারা সবাই এর নির্দিষ্ট নামের সাথে একে প্রভু বলে ডাকে, তা সেটি পাথর, বৃক্ষ, জন্তু- জানোয়ার, ব্যক্তি বিশেষ, নক্ষত্র বা ফেরেশতা যা-ই হোক। একি প্রতিমা ও অশরীরীদের উপাসনাকে স্বীকৃতি দিচ্ছে না? যদিও তিনি প্রতিমা ও অশরীরীর উপাসনাকে প্রচণ্ডভাবে নিন্দা করেছেন। তাহলে এ বক্তব্যের কী মানে? বস্তুত এ জাতীয় হেঁয়ালি ও ধূম্রজাল ইবনে আরাবিকে ন্যায়ত সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল।
মুহাম্মদ ইবনে আলী শাওকানী (১৭৫৯-১৮৩৪) এমনতরো বক্তব্যের কারণে ইবনে আরাবিকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করলেও পরে লক্ষ করেন, অন্যান্য বক্তব্যের সাথে বিচার করে এসব কুহেলিকাপূর্ণ বক্তব্যের শরিয়াসম্মত ব্যাখ্যাও সম্ভব। যার উল্লেখ করেছেন ওয়াহিদুযযামান হায়দারাবাদী (১৮৫০-১৯২০), তার বিখ্যাত হাদিয়াতুল মাহদি গ্রন্থে।

মাওলানা আশরাফ আলী থানবি (১৮৬৩-১৯৪৩) তার তালিমুদ্দীন-এর দ্বিতীয় খণ্ডে ওয়াহদাতুল ওজুদের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, এর সার কথা হলো, “যাবতীয় গুণাবলী এবং ক্ষমতা প্রকৃত অর্থে একমাত্র আল্লাহর, এটা সুস্পষ্ট। তবে সৃষ্টজীবের ভিতরে কিছু ক্ষমতা বা গুণ পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু সেগুলো তাদের নিজস্ব নয়, অন্যের নিকট হতে ধার করা। যে জিনিসের অস্তিত্ব নিজস্ব নয়, অন্যের নিকট থেকে লভ্য, তার অস্তিত্বকে পরিভাষায় ‘ওজুদে যিল্লি’ বা ছায়া অস্তিত্ব এবং ‘ওজুদে আরেযী’ বা কৃত্রিম অস্তিত্ব বলে। ছায়া অস্থায়ী ও পরমুখাপেক্ষী। এ অস্তিত্বও অস্থায়ী, অন্যের মুখাপেক্ষী। ছায়া অস্তিত্বের মানে এই নয় যে, আল্লাহর ছায়া আছে, আর এতে তারা অস্তিত্ব পেয়েছে। বরং কথাটার অর্থ হলো তাঁর দানে এবং কৃপায় আমরা ওজুদ (অস্তিত্ব) পেয়েছি। তাঁর অনুগ্রহে বর্তমান আছি, ভবিষ্যতেও আমাদের থাকা তাঁর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি যেমন পারেন আমাদের রাখতে, তেমনি পারেন বিনাক্লেশে, বিলম্ব ছাড়াই ধ্বংস করে দিতে। যেমন আমাদের ভাষায়ও সচরাচর বলা হয় যে, কোনো গরিব লোক হয়তো কোনো ধনীর আশ্রয়ে বাস করে। সে বলে, ‘আমি তো অমুকের ছায়ায় বাস করি।’ এর অর্থ ছায়া নয় আশ্রয়। যখন সৃষ্টির এই কৃত্রিম অস্তিত্বকে হিসাবে না ধরা হয়, তখন একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্বই অস্তিত্ব হিসেবে থাকে।
একেই বলে ওয়াহদাতুল ওজুদ বা ‘হামাউস্ত’ (তিনিই সব) বা লা মাওজুদা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো অস্তিত্ব নেই)। অতএব তিনিই সব এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ, পশু, বৃক্ষ, পর্বত সবই খোদা বা খোদার সম্প্রসার। তার অংশ হিসেবে তারা বর্তমান আকার পেয়েছে। এই অর্থ সম্পূর্ণ ভুল। এই ভুলের কবলে পড়ে বহু লোক কাফের ও প্রতিমাপূজারি হয়ে গেছে। শুদ্ধ অর্থ হলো, মানুষ, পশু পর্বত, ইত্যাদির অস্তিত্ব প্রকৃত অস্তিত্ব নয়, নিজস্ব অস্তিত্ব নয়। এ অস্তিত্ব আল্লাহর অনুদান, ক্ষণস্থায়ী।”

হামাউস্ত বা সবই তিনি এক তর্কিত বিষয়। যদিও এর মূলে নির্দেশ করা হয় এক হাদিসে কুদসি।
আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, আদম সন্তান জমানা মন্দ বলে আমাকে কষ্ট দেয়, অথচ জমানা তো আমিই। (অর্থাৎ) আমারই আয়ত্তে সব কাজ। (যা জমানা ও কালের মাঝে সঙ্ঘটিত হয়)। রাত দিনকে (যা কাল সময়ের অংশ) আমিই তো পরিবর্তন করি। (যার সাথে মানুষ ঘটনাবলিকে সম্পৃক্ত করে। অতএব জমানা তো তার মধ্যকার যাবতীয় বিষয়সহ আমারই অধীন। তাই এসব কার্যকলাপ সবই আমারই। একে মন্দ বললে আমাকেই মন্দ বলা অবধারিত হয়।) (সহিহ বুখারি, হাদিস নং-৪৫৪৯, ৭০৫৩, ৫৮২৯, ৫৮২৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-৬০০০, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং-৫২৭৬)
এ হাদিস স্পষ্ট বলছে আল্লাহই সময়-কাল, অথচ সময় আল্লাহর এক সৃষ্টি। সময় ও আল্লাহ কোনোভাবেই এক নন। এক নয়, কিন্তু হাদিসে বলা হচ্ছে আমিই সময়। ফলে এখানে নিহিতার্থ তালাশ করতে হবে। তা হলো সময়ের স্রষ্টা, চালক ও এতে যা সঙ্ঘটিত হয়, সবই ঘটে আমার হুকুমে। সময়ে নিহিত সব ঘটনা ও বস্তু আপন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও আল্লাহ পাকের ক্ষমতাধীন।

হামাউস্ত দর্শনে নিহিতার্থ কী? তারা সৃষ্ট সত্তা ও পরম সত্তাকে কিভাবে অনুভব করেন? সুফি কবি শেখ সাদী (১২১০-১২৯১/৯২) একে বর্ণনা করেন রূপকে। লিখেন-
‘রাত্রিকালে যে জোনাকি প্রদীপের ন্যায় জ্বলে, তাকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, দিনের বেলা তুমি বাইরে আস না কেন? জোনাকি চমৎকার জবাব দিলো, আমি তো দিবানিশি মাঠে প্রান্তরেই থাকি, কিন্তু সূর্যের দীপ্তির সামনে আমার আলো প্রকাশ পায় না। এরই নাম ওয়াহদাতুল ওজুদ (হামাউস্ত)। এতে কোনো স্থানে শিরকের অর্থ আছে?’ শেখ সাদী বা তার মতো রহস্যজ্ঞানী তার নজরে শিরকের জায়গা নেই বটে। তবে সাধারণের জন্য এই ব্যাপারটা প্রহেলিকাপূর্ণ।

ইবনে আরাবির রহস্যজটিল ভাষা বিপদের গর্তে ভরপুর। একে নিজস্ব উপলব্ধির নিক্তিতে পরিমাপ করার ফলাফল হয়েছে আরো বিপজ্জনক। অনেকেই ওয়াহদাতুল ওজুদের মর্মকে হুলুল বা অদ্বৈতবাদের সাথে একাকার করে দিয়েছেন। এর পক্ষে ইবনে আরাবির বিভিন্ন কুয়াশাচ্ছন্ন বাক্য কাজে লেগেছে। এটি ঘটেছে ইবনে আরাবির কোনো অনুরাগী থেকে যেমন, তেমনি তার সমালোচকদের তরফেও। বিষয়টি ছিল তাওহিদ আর তাওহিদের মতো সর্বজনীন বিষয়কে এত জটিলতার আবর্তে ফেলা সমস্যাজনক বটে!

ইবনে আরাবির দ্ব্যর্থবোধক ও বহুতল রচনাপাঠের অনেক স্কুল আমরা সে কারণে দেখতে পাই। যেহেতু তিনি সরল-সহজে বলেন না, ফলে তার উক্তি পাঠ করার পরে যে ব্যাখ্যাই করা হয়, সেগুলোর অধিকাংশ হয়ে ওঠে পাঠকের ভাবকল্প। এরকম ভাবকল্প এমন ধারা ও ধরন তৈরি করেছে, যা ইবনে আরাবি সম্পর্কে বিপরীতমুখী বয়ান হাজির করে।

শায়খ তকিউদ্দীন ইবনে তাইমিয়া (১২৬৩-১৩২৮) ইবনে আরাবিকে সর্বেশ্বরবাদের জন্য সরাসরি অভিযুক্ত করেন। তার ভাবকল্পে ইবনে আরাবির দাবি হলো, অস্তিত্ব মাত্র একটি। সৃষ্টির অস্তিত্বই স্রষ্টার অস্তিত্ব। স্রষ্টা ও সৃষ্টি- এ দু’টো পৃথক সত্তা নয়। বরং স্রষ্টাই হলো সৃষ্টি আর সৃষ্টিই হলো স্রষ্টা।

ইবনে তাইমিয়া ওয়াহদাতুল ওজুদ ও সর্বেশ্বরবাদে বিশ্বাসী মতবাদের প্রকাশ্যে বিরোধিতা করাকে তাতারীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদের মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।

ইবনে তাইমিয়ার ধারায় ইবনে আরাবিকে প্রত্যাখ্যানকারীদের মধ্যে আছেন আবু জুরআ আল ইরাকি (১৩৬০-১৪২২), তকি উদ্দীন সুবকি (১২৮৪-১৩৫৫), আবু হাইয়ান উন্দুলুসী (১২৫৬-১৩৪৪), ইবনে হাজার আসকালানীসহ (১৩৭১/৭৩-১৪৪৯) বহু বিদ্যাবিশারদ।

ইবনে আরাবি-প্রশ্নে ইবনে তাইমিয়ার অবস্থান তার অনুসারীদের অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। যাদের অন্যতম হলেন নবাব সিদ্দিক হাসান খান (১৮৩২-১৮৯০), ওয়াহিদুজ্জামান হায়দারাবাদী। হায়দারাবাদী লেখেন, ‘মহাজ্ঞানী ইবনে তাইমিয়া শায়খ ইবনে আরাবির মতবাদকে খণ্ডন করেছেন। হাফিয যাহাবী (১২৭৪-১৩৪৮) এবং তাফতাযানীও (১৩২২-১৩৯০) এর অনুসরণ করেছেন। আমার মনে হয় তারা শায়খ ইবনে আরাবির কথার অর্থ বুঝতে পারেননি। তার কথার অর্থ উন্মোচনে তারা গভীর দৃষ্টিপাত করেননি। ইবনে আরাবির ‘ফুসুস’ (ফুসুসুল হিকাম) গ্রন্থে নিহিত বক্তব্যের বাহ্যিক অর্থ তাদের অপরিচিত মনে হয়েছে। (হাদিয়াতুল মাহ্দী, ওয়াহিদুযযামান, পৃষ্ঠা-৫০-৫১)

ইবনে আরাবির অনুরাগী ও সমর্থকদের মধ্যে আছেন আলাউদ্দীন কাসানী (মৃত্যু-১১৯১) শায়খ শিহাব উদ্দিন আবু হাফস উমর সিদ্দিকী সোহরাওয়ার্দী (১১৪৫-১২৩৪), জালালুদ্দীন রুমী (১২০৭-১২৭৩), সদর উদ্দীন কুনাবী (১২০৭-১২৭৪), ফখরুদ্দিন ইরাকি (১২১৩-১২৮৯), আবদুর রহমান জামী (১৪১৪-১৪৯২), মাজিদুদ্দীন ফিরোজাবাদী (১৩২৯-১৪১৪), জালালুদ্দীন সুয়ুতি (১৪৪৫-১৫০৫), আব্দুল ওহাব শারানী (১৪৯৩-১৫৬৫), আবদুল গনি নাবুলুসি (১৬৪১-১৭৩১) প্রমুখ। তারা তাকে একজন রহস্যজ্ঞানী ও অগ্রগণ্য সুফি হিসেবে অভিনন্দিত করেছেন। সুয়ুতির ভাষায় লক্ষ্য করা যেতে পারে অনুরাগীদের প্রশংসার নমুনা। তিনি লেখেন, মহিউদ্দীন ইবনুল আরাবি বিজ্ঞদের শিরোমণি, আল্লাহ তাঁকে সব রকম প্রজ্ঞা দিয়েছিলেন। অনুরাগীদের কাছে তিনি শায়খুল আকবর বা শ্রেষ্ঠতম দীক্ষাগুরু।

শায়খ আহমদ সেরহিন্দ (১৫৬৪-১৬২৪) ইবনে আরাবির সমালোচনা করেন শ্রদ্ধাসহ। ওয়াহদাতুল ওজুদের জটিলতা এড়িয়ে তিনি প্রবর্তন করেন ওয়াহদাতুশ শুহুদ বা সত্তার নৈকট্য তত্ত্ব। শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবি (১৭০৩-১৭৬২) আরো অগ্রসর হয়ে ওয়াহদাতুল ওজুদ ও ওয়াহদাতুশ শুহুদ এর মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়াস চালিয়েছেন।

উইলিয়াম জেমসের বিচার এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেই যেনতেন প্রকারে রায় দিয়েছেন। তিনি ইবনে তাইমিয়ার পাঠকেই মনে করেছেন সবকিছু। শঙ্করাচার্যের (মৃত্যু : ৭৫০ সাল) অদ্বৈতবাদ ও ইবনে আরাবির ওয়াহদাতুল ওজুদ বা হামাউস্তকে একাকার করে তিনি দেখাতে চেয়েছেন, সুফিবাদে আল্লাহর ধারণার মতো গুরুতর বিষয়ও হিন্দু দর্শন ও বেদান্তবাদের প্রভাবে আচ্ছন্ন। উভয়েই সর্বেশ্বরবাদের প্রচারক।

জেমসের এ ভাবকল্প খারিজ হয়ে যায় ইবনে আরাবির নিজস্ব বয়ানেই। তিনি লেখেন-
‘যে ব্যক্তি হুলুল বা অদ্বৈতবাদে বিশ্বাস রাখল, সে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত। কেননা হুলুলের আকিদা একটি চিরস্থায়ী রোগ। একইভাবে স্রষ্টা ও সৃষ্টিকে এক বলার কথা কেবল কাফেররাই বলে। অদ্বৈতবাদে যে বিশ্বাস রাখে, সে অজ্ঞ ও মূর্খ।’ (ফুতুহাতে মাক্কীয়া, আল-ইয়াকিত ওয়াল জাওয়াহির, ইমাম শা’রানী রহ. খ.১, পৃ.৮০-৮১) ‘নশ্বর বস্তু বিভিন্ন নশ্বর উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। অবিনশ্বর সত্তা আল্লাহ তায়ালা যদি নশ্বর বস্তুর মাঝে প্রবেশ করেন, তাহলে দেহবাদীদের বক্তব্য সঠিক হতো (অথচ তাদের এই বক্তব্য ভ্রান্ত)। সুতরাং অবিনশ্বর সত্তা কোন সৃষ্টির মাঝে প্রবেশ করেন না, তার সত্তাও কোনো নশ্বর সৃষ্টির মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটে না।’ (আল-ইয়াকিত ওয়াল জাওয়াহির, খ.১, পৃ.৮০-৮১)

‘সৃষ্টি বা মহাবিশ্ব কখনো হুবহু আল্লাহর সত্তা নয়; সৃষ্টির মাঝেও আল্লাহ প্রবেশ করেন না। আল্লাহ তায়ালা ও মহাবিশ্ব যদি একই হতো অথবা বিশ্বের মাঝে আল্লাহ যদি প্রবেশ করতেন, তাহলে আল্লাহ তায়ালা কখনো অবিনশ্বর ও তুলনাহীন স্রষ্টা হতেন না।’ (আল-ইয়াকিত ওয়াল জাওয়াহির, খ.১, পৃ.৮০-৮১)
দুঃখ শুধু জেমসের জন্য নয়, এমন সব পণ্ডিতের জন্যও, যারা জেমসের বয়ানের ওপর ‘ঈমান’ এনেছেন।

লেখক : কবি, গবেষক
71.alhafij@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement