২৯ নভেম্বর ২০২২, ১৪ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া রুখবে কে

লেখক : সালাহউদ্দিন বাবর - ফাইল ছবি

রাষ্ট্রকে হতে হয় বহমান নদীর মতো। নদী যেমন সমুদ্র মোহনায় পৌঁছতে সুদূর যাত্রাপথে বিরামহীনভাবে ছুটে চলে, আর সেই চলার পথে দুই ক‚লের জনপদকে নানাভাবে উপকৃত করে। রাষ্ট্রযন্ত্রের উদ্দেশ্য সেটিই হতে হবে। তাকে দূর লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে, যাত্রাপথের দু’পাশের মানুষকে সুখ আনন্দ স্বাচ্ছন্দ্যের ফল্গুধারায় নিত্য অবগাহন করিয়ে নিতে হবে। তখনই কেবল কোনো রাষ্ট্রকে সফল, সক্ষম বলা চলে। অন্যথায় যে গ্লানিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে তার দায়ভার কিন্তু সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হয়।

এমন বিবেচনায় বিশ্বের দেশগুলোকে দুই কাতারে ফেলা যায়। এক কাতারে শামিল থাকছে সক্ষম কিছু রাষ্ট্র, যার কারিগররা দক্ষতার সাথে জনগণের ন্যায্য প্রাপ্তি পূরণের জন্য কাজ করে বহুলাংশে সফল। আর অন্য কাতারে রয়েছে এমন সব রাষ্ট্র যার অধিপতিদের অক্ষমতার জন্য নাগরিকদের হাল ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানোর’ মতো। এসব দুর্ভাগা দেশের বেশির ভাগ মানুষের অপ্রাপ্তি, অভাব, বৈষম্য বঞ্চনা আছে। সেই সাথে আছে ছেলেভুলানোর মতো বিপুল আশ্বাসের ফুলঝুরি, যার পেছনে ছুটতে ছুটতে মানুষ হয়ে পড়ে ক্লান্ত শ্রান্ত। একটা সময় মিথ্যা আশ্বাসের রঙিন ফানুস চুপসে গেলে আশাভঙ্গের বেদনায়, বিষণ্ণতায় ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ে তারা। সে কারণে ক্ষোভ, উত্তাপ উত্তেজনা সেখানে লেগেই থাকে। অথচ রাষ্ট্রের কর্ণধারদের মুখে তখনও কথার ফুলঝুরি ঝরতে থাকে; কিন্তু কাজের বেলা ঠনঠনা।

বাংলাদেশের মানুষ বয়োসন্ধিকালে বা বোধশক্তি হওয়ার পর থেকেই অপ্রাপ্তিজনিত ব্যথায় নিয়ত কাতর ও কষ্টবোধে ভোগে। হালে এই দুঃখ বেদনা বহুগুণে বেড়ে যাওয়ায় তারা হতবিহ্বল ও বিস্ময়ে বিমূঢ়। এই জনপদের কোটি কোটি মানুষ, কোথায় যাবে, কার কাছে দুর্গতির কথা শোনাবে, কষ্ট উপশমের জন্য কোন দুয়ারে কড়া নাড়বে! এখানে কর্তারা তো এখন কানে তুলো গুঁজে বসে আছেন।

গত পঞ্চাশ বছরেও কোনো কর্তৃপক্ষই জনগণের দুঃখ কষ্ট লাঘবের কোনো সঠিক পথ পন্থা বের করতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু কর্তৃত্ব দেখাতে সবাই এক কাঠি সরেস। আর কর্তৃত্ব করার স্বাদ আহ্লাদ এতটা যে সে জন্য ন্যায়-অন্যায় এবং শুদ্ধাচারের কোনো নীতির তোয়াক্কা তারা করে না।

সম্প্রতি দেশে জনশুমারি হয়েছে এবং তার প্রাথমিক ফলাফলও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে শুমারির শুদ্ধতা নিয়ে নানা সন্দেহ সংশয় ও অভিযোগ আছে। বলা হচ্ছে, সঠিক তথ্য প্রকাশ করা নিয়ে রাখঢাক করা হয়েছে। আমরা সে দিকে না গিয়ে ভিন্ন কিছু কথা বলতে চাই। কোনো কোনো মহল থেকে প্রচ্ছন্নভাবে বলার চেষ্টা আছে যে, ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই ভূখণ্ডে এখন জনাধিক্যের জন্যই বহু সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন। যেসব বিজ্ঞজন এমন তত্ত্ব প্রচার করছেন, তাদের উদ্দেশে বিনয়ের সাথে বলতে চাই, অতিরিক্ত জনসংখ্যা এখন আর কোনো দেশেই সমস্যা হিসাবে দেখা হয় না। বরং জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে পারলে তা সত্যিকারের আশীর্বাদ বলে ধরা হয়।

বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল রাষ্ট্র চীনের জনসংখ্যা এখন ১৪৪ কোটিরও বেশি। তারপরও তাদের জিডিপি ১৬.৬৪ ট্রিলিয়ন, যা বিশ্বে দ্বিতীয়। মাথাপিছু আয় ১১,৮১৯, মানব উন্নয়ন সূচক উচ্চতর।

লোকসংখ্যা বিপুল হওয়ার পরও চীন এখন বলছে, উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে তাদের আরো জনশক্তির প্রয়োজন। চীন জনতাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার সক্ষমতা অর্জন করেছে বলেই তারা এখন আরো মানুষ চায় এবং জন্মহার বাড়াতে নাগরিকদের উৎসাহিত করছে। আমরা সেটি করতে পারছি না বলে দোষ স্খলনের জন্য এপাশ ওপাশ থেকে দেশের জনাধিক্যের কথা বলানো হচ্ছে। আসলে এ দেশে জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপ দিতে কোনো সরকারেরই উদ্যোগ আয়োজন তথা পরিকল্পনা ছিল না, এখনো নেই। কিন্তু এসব কার্যক্রম না নিয়ে দেশ এগিয়ে নেয়া কি সম্ভব?

আমরা বিদেশে জনশক্তি নয়, আদম পাঠাচ্ছি। বিনিময়ে যৎসামান্য কিছু অর্থ তারা পায় মাথার ঘাম পায়ে ফেলে। আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, চীনে মানুষের পাঁচ মৌলিক চাহিদার সবটাই তাদের সরকার নিশ্চিত করেছে। অনেকেই হয়ত প্রশ্ন করবেন, চীনে কি গণতন্ত্র আছে? আমাদের কথা হচ্ছে, নিজেদের দিকে তাকান, এখানে আজ গণতন্ত্রের ‘শ্রী’টা কেমন? গণতন্ত্র বলতে মধ্যরাতের ভোটের প্রচলন হয়েছে, আরো কত কৌশল আঁটা হয়।

সংবাদপত্রে এখন প্রায়ই ছাপা হচ্ছে ডিগ্রির পর ডিগ্রি নিয়েও কাজ না পেয়ে বহু যুবক নিজ-উদ্যোগে কর্মসংস্থান করছেন। আমরা সেই উদ্যমী যুবকদের শ্রদ্ধা জানাই। সেই সাথে কর্তৃপক্ষের কাছে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞাসা করতে চাই, আপনারা লাখ লাখ শিক্ষিত বেকারের বুকের জ্বালা, বেকারত্বের গ্লানি দূর করতে এখন কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন? জনতা আর কতকাল শুধু জনতাই থেকে যাবে! তাদের কবে জনশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি মিলবে।

মনে রাখা সমীচীন, জনগণ যদি জনশক্তি হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ না পায়, তাহলে কোনো একদিন ক্ষুব্ধ জনতা হয়ত উচ্ছৃঙ্খল ‘মবে’ পরিণত হবে। বাংলাদেশের সংবিধান জনগণের পাঁচ মৌলিক চাহিদা পূরণের দায়িত্ব রাষ্ট্র তথা সরকারকে দিয়ে রেখেছে। সেটি জনগণকে বুঝিয়ে দেয়ার জন্য কি উদ্যোগ আয়োজন আমাদের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ করছে? এ জন্য কি জনগণকে অনন্তকাল অপেক্ষা করতে বলা যায়। পক্ষান্তরে ভাগ্যের বহু বরপুত্র এরই মধ্যে বিপুল বিত্তবৈভবে ফুলে ফেঁপে উঠেছে, এটি কোন বৈষম্যের ভেলকিবাজি?

এ দিকে মাত্র কিছুদিন আগে দেশে শতভাগ বিদ্যুতায়নের এক ঘোষণা এসেছিল সরকারের পক্ষ থেকে। সেটি নিয়ে সরকারি মহলে উৎসাহ উচ্ছ্বাস যেমন ছিল তেমনি কান ফাটানোর মতো বাগাড়ম্বরও ছিল। তখন কিন্তু ইউক্রেনে যুদ্ধজনিত কারণে বিশ্ব ছিল সঙ্কটে। আমাদের এখানে তার পরিণাম কী হবে সেটি ভেবে দেখার মতো দূরদৃষ্টির অভাব থাকায় কর্তৃপক্ষ ভাবতেই পারেনি, খুব শিগগিরই জ্বালানি তেল গ্যাস নিয়ে মহাসঙ্কট দেখা দিতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এখন শতভাগ বিদ্যুতায়নের আনন্দ স্ফূর্তি সবই ফুটো হয়ে যাওয়া বেলুনের মতো চুপসে গেছে। তেল গ্যাসের অভাবে এখন চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় সারা দেশে মারাত্মক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

দেশে অনেকটা যেন যুদ্ধকালীন সময়ের মতো ‘ব্লাক আউট’ করা হচ্ছে আর যার নাম দেয়া হয়েছে ‘লোডশেডিং।’ এ নিয়ে শুধু যে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে তা নয়, কলকারখানাসহ বিভিন্ন সেক্টরে উৎপাদনের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। অর্থনীতিতে যার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়া পড়বে, বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্য আসবে না, বর্তমানের অসহনীয় মূল্যস্ফীতি আরো তীব্রতর হবে। অন্য দিকে তেল ডিজেলের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করায় অবস্থা আরো গুরুতর হয়ে উঠেছে। হেন স্থান নেই যা তেলের বাড়তি দামের করাল গ্রাসে পড়েনি। দেশের অর্থনীতিবিদরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের ঘোরতর প্রতিবাদ জানিয়ে হুঁশিয়ার করেছেন যে, এর পরিণাম অকল্পনীয় হতে বাধ্য। সরকারের নির্বাচনী শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি প্রধান রাশেদ খান মেনন এই মূল্যবৃদ্ধির আসল কারণটা বলে দিয়ে ঝুলির কালো বিড়াল বের করে দিয়েছেন। সেটি হলো জনগণ নয়, ঋণদাতাদের সন্তুষ্ট করে আরো ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কেননা সরকারের কোষাগার বলতে গেলে শূন্য হতে চলেছে। সেই সঙ্কট ঋণ করে দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আসলে এখন সব কিছু ম্যাসাকার হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।

ঋণ করা হচ্ছে বটে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেটি শোধ করবে কে? তার সহজ উত্তর এ দেশের নিরন্ন মানুষ। তাদের কাছ থেকে কি অনুমতি নেয়া হয়েছে? ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ হলেও দেশে একটা সংসদ রয়েছে, সেখানে এসব নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার কি দরকার ছিল না? দেশে ‘গণতন্ত্রের শ্রী’ স্বরূপ নিয়ে প্রশ্ন আছে। এভাবে সংসদকে পাশ কাটানোসহ সরকারের অনেক কিছু নিয়েই বহু প্রশ্ন তোলা যায়।

বহুদিন থেকে লক্ষ করা যাচ্ছে, আমাদের যে মনন মেধা তা বহু ক্ষেত্রে দুর্বল। আমাদের ‘ফারসাইটনেস’ ব দূরদৃষ্টির প্রচুর ঘাটতি রয়েছে। দূরদৃষ্টির ঘাটতির কারণে আমাদের প্রশাসন বারবার বহু ক্ষেত্রে মানুষকে দুর্ভোগের প্রান্তসীমায় ঠেলে দিচ্ছে। বিজ্ঞান পুস্তকে সরলভাবে বলা হয়েছে, শক্তির একটি প্রধান উৎস হচ্ছে সূর্য। প্রতিদিন প্রত্যুষে সূর্য ওঠে, মধ্যাহ্নে এর তেজে গা পুড়ে যায়, ব্যাস এতটুকু দেখছি এবং তাতেই হয়ত আমরা সন্তুষ্ট।

অথচ যুগের পরিবর্তনে, প্রযুক্তির কল্যাণে এখন বিশ্বব্যাপী মানুষ সূর্যের আলো প্রয়োজনানুসারে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সোলার প্যানেল বা সৌরবিদ্যুৎ। মহাকাশ থেকে জমিনে এর ব্যবহার শুরু হয় গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে। কিন্তু এ দেশে এই বিপুল শক্তির যথাযথ ব্যবহার এখনো শুরু হয়নি। অথচ বিজ্ঞানীদের মতানুসারে, সূর্য প্রতি বর্গমিটারে এক হাজার ওয়াট শক্তি বর্ষণ করে। যাই হোক, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সময় মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে নজর দিলে আজকের এই সঙ্কটের সময় তা অনেক কাজে আসত। এখন যে প্রচলিত বিদ্যুতের দেড়-দুই হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি রয়েছে, তা নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সহজেই মেটানো সম্ভব হতো। তাহলে আজকে দেশে আর জ্বালানি আমদানি নিয়ে সঙ্কটে পড়তে হতো না।

পরিসংখ্যান বলছে, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোর ছাদ ব্যবহার করে আড়াই হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব। দেশের প্রায় দেড় লাখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাই স্কুল ও কলেজ রয়েছে। তা ছাড়া তিন লাখের মতো ধর্মীয় উপাসনালয় রয়েছে। এগুলোতে যদি মাত্র এক কিলোওয়াট করেও সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে দিতে পারত তাহলে দুই-আড়াই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করা সম্ভব হতো বলে বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস। জানা গেছে, ২০২০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদনের ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের উৎস থেকে আহরণের পরিকল্পনা ছিল। ইতোমধ্যে ওই সময়সীমার পর আরো দুই বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খুব বেশি দূর অগ্রসর হওয়া যায়নি।

সাম্প্রতিক একটি খবর নিশ্চয়ই সচেতন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বৃষ্টি নেই কৃষক পাটগাছ ‘জাগ’ দিতে পারছেন না। কৃষকরা তাতে মানসিক যাতনা আর আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি। সেই সাথে ভাবা দরকার, দেশের কী অবস্থা হবে! কেননা পাট দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল, পাটের ভালো চাহিদা দেশের ভেতর রয়েছে এবং রফতানি হয় প্রচুর পাট। তাতে একটা ভালো অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। পাটের বর্তমান বিপর্যয়, দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির ওপর মূলত ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে পড়বে। আর গোটা আবহাওয়ার বৈরিতা ও পরিবেশের ভয়ঙ্কর ছোবল তো আছেই। ভবিষ্যতে তা আরো প্রকট হবে; এটি আশঙ্কা নয়, বাস্তবতা।

আজকের মতো অতীতে পানির এত সঙ্কট না থাকা সত্ত্বেও গত শতাব্দীর আশির দশকে দেশের এক রাষ্ট্রপতি সারা দেশে স্বেচ্ছাশ্রমে হাজামজা বহু খাল সংস্কার ও খননের কর্মসূচি হাতে নিয়ে দেশে একটা আলোড়ন তুলেছিলেন। তখন ভূপৃষ্ঠের পানি সংরক্ষণের জন্য শত শত খাল খনন করে পানির প্রাপ্যতা সহজ করা হয়েছিল। এর দ্বারা কৃষক, মৎস্যজীবীদের এবং পরিবেশ সংরক্ষেণ করতে উদ্যোগী তরুণদের মনে প্রচুর আশাবাদ জাগিয়েছিল। কিন্তু সেই খাল কাটা নিয়ে কদাকার রাজনীতি দংশন করেছিল। নানা মন্দ কথা বলে সেই মহৎ উদ্যোগ নিয়ে হাসাহাসি করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ এমন করেছিল মূলত রাজনীতিক বিবেচনায়; কিন্তু অনুতাপের বিষয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া সংগঠন বিএনপি পর্যন্ত এই দেশ হিতকর কর্মসূচিটি হাতে তুলে নেয়নি।

এখানেই জিয়ার গতিশীল ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন কার্যক্রমের তার উত্তরসূরিদের পার্থক্য। জিয়ার মূল লক্ষ্য ছিল দেশোদ্ধারের। কিন্তু তার রাজনৈতিক উত্তরসূরিরা কেবল রাজনীতিই করেছে। যদি সেই কর্মসূচি আজো বহাল ও বিস্তৃত হতো তবে ভূ-উপরিস্থিত পানির বিরাট সংরক্ষণাগার দেশে সৃষ্টি হতো।

পানি যে জীবন, জীববৈচিত্র্যের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ তা এখনো আমাদের রাজনীতিবিদদের কাছে নিছক তত্ত্বই। তা নিয়ে চিন্তাভাবনা, পরিকল্পনা কিছুই নেই। অথচ বাংলাদেশের তিনটি অববাহিকা, যথা মেঘনা, ফেনী ও কর্ণফুলী দিয়ে প্রতি মুহূর্তে কোটি কোটি কিউসেক মিষ্টি পানি সমুদ্রের নোনা জলে মিশে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ছে। কেবল ভারতের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো, তারা এ ধার থেকে নদীর পানি ওধারে নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে সবুজ শস্যের সমারোহ সৃষ্টি করেছে। সেখানে যেন ক্যানেলের জাল বিস্তার করে শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে অসাধ্যকে সাধন করে তুলেছে।

অধ্যাপক ড. আইনুল নিশাতের মতো বিখ্যাত পানি বিশেষজ্ঞ এ দেশে আছেন, তা ছাড়া আমরা নাম পরিচয় জানি না এমন বহু খ্যাতিমান পানি বিশেষজ্ঞ বর্তমান। যাদের চিন্তা গবেষণা, অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের জন্য ব্যাপকভিত্তিক একটি পানি পরিকল্পনা গ্রহণ ও সে আলোকে কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করা হলে কৃষি, মৎস্য, পরিবহন ও পরিবেশের ক্ষেত্রে একটা আমূল পরিবর্তন আনা খুব কঠিন হওয়ার নয়। পর্যায়ক্রমে এবং ধারাবাহিকভাবে সেই কর্মপরিকল্পনা সফল করতে উদ্যোগ নেয়ার এখনই শ্রেষ্ঠ সময়। সময় হাতের মুঠো থেকে বেরিয়ে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া যাবে না এবং আমাদের দেশের ক্রমাগত পিছিয়ে যাওয়া রোখা যাবে না।

ndigantababor@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement

সকল