০৭ ডিসেম্বর ২০২২, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

প্রাচীন কুরআনের সান্নিধ্যে বিরল মুহূর্ত

প্রাচীন কুরআনের সান্নিধ্যে বিরল মুহূর্ত - ফাইল ছবি

লন্ডনের উপকণ্ঠে ইউনিভার্সিটি অব ডার্বিতে ছিল মেয়ের গ্র্যাজুয়েশন অনুষ্ঠান। সেখানে সস্ত্রীক অংশ নেয়ার পর আমাদের মেয়ে শামা লন্ডন সিটি দেখানোর জন্য একটি ভ্রমণসূচি তৈরি করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ব্রিটিশ মিউজিয়াম ও ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে যাওয়া। এ দু’টি প্রতিষ্ঠান বিশ্বের জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। স্বল্প সময়ে এর সব কিছু দেখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, একমাত্র ব্রিটিশ মিউজিয়ামেই রয়েছে ১৩ মিলিয়নেরও বেশি নিদর্শন। আর ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে আইটেমের সংখ্যা দুই হাজার মিলিয়নেরও বেশি।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত প্রাচীন কুরআনের কথা জানা ছিল। তাই কুরআনুল কারিমের প্রাচীন কপি তালাশ করে চোখ জুড়ানোই ভ্রমণে আমাদের অগ্রাধিকার। প্রথমেই মিউজিয়ামের ইসলামবিষয়ক গ্যালারির ৪২ ও ৪৩ নম্বর কক্ষ ঘুরে দেখি। ইসলামী আর্ট ও সংস্কৃতির এক বিশাল সংগ্রহ রয়েছে ওখানে। মালয়েশিয়ার আল-বুখারি ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় কয়েক বছর আগে এ গ্যালারি চালু হয়।

এতে স্থান পাওয়া নিদর্শনের সংখ্যা দুই সহস্রাধিক। একটি জায়গায় কুরআনের কপি দেখা গেলেও প্রাচীন কুরআনের কপি দেখতে না পেয়ে অনেকটা হতাশ হয়ে পড়ি। মিউজিয়ামের ইনফরমেশন ডেস্কে গিয়ে খোঁজ নিলে সেখানকার সংশ্লিষ্ট নারীকর্মী কম্পিউটার সার্চ করে আমাদের জানান, প্রাচীন কুরআনের কপি ক্লাসিফাইড ডকুমেন্ট হিসেবে মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। তবে ডিসপ্লেতে নেই। কারণ ইতোপূর্বে অনেক কপি নষ্ট হয়ে গেছে। তাই তারা গবেষণার সুযোগদানের জন্যই শুধু এ কপি অনুমতি সাপেক্ষে দেখতে দেন। মিউজিয়ামকর্মী আমাদের ব্রিটিশ লাইব্রেরি ও বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে সবচেয়ে প্রাচীন কুরআন দেখার পরামর্শ দেন। তিনি আরো জানান, কয়েক বছর আগে হজকে সামনে রেখে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রাচীন কুরআনের একটি প্রদর্শনী হয়েছিল। সেখানে ওইসব প্রাচীন কুরআন প্রদর্শিত হয়।

বিটিশ লাইব্রেরি ও লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম এক সময় ব্রিটিশ মিউজিয়ামেরই অংশ ছিল। এ দু’টি প্রতিষ্ঠান এখন আলাদা। ব্রিটিশ লাইব্রেরি ও মিউজিয়ামে অষ্টম থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রায় ৩০০ কুরআন রয়েছে। মিউজিয়ামের একজন কর্মকর্তা কম্পিউটারে রাখা তথ্যভাণ্ডার সার্চ করে জানান, ওইসব কুরআন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সংগৃহীত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি উত্তর আফ্রিকা, স্পেন, মধ্য এশিয়া, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে সংগ্রহ করা হয় দুষ্প্রাপ্য এসব কপি। এর মধ্যে রয়েছে মেইল (mail) হিজাজি, কুফিক, মাগরিবি, নকশী, থুলুথ, মুহাকাজ, রেহানি, বিহারি লিপির পাশাপাশি চীনের সিনি আদলে লেখা কুরআনও রয়েছে। এক খণ্ডের কুরআন যেমন এখানে রয়েছে, তেমনি ৩০ ও ৬০ খণ্ডের কুরআনও আছে। মিউজিয়ামে কিছু বিরল কপি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় এখন আর সেগুলো দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়নি।

পরদিন আমরা গেলাম ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে। আগেই ইনফরমেশন ডেস্কে গিয়ে প্রাচীন কুরআন বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আমাদের ট্রেজারস গ্যালারি পরিদর্শনের পরামর্শ দেন। ওই গ্যালারিতে গিয়ে এক হাজার বছরের বেশি সময়ের ইংরেজি সাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম পাণ্ডুলিপি, শেক্সপিয়ারের নাটকগুলোর প্রথম দিকের সংস্করণ, উইলিয়াম ব্লেকের নোটবুক, ম্যাগনাকার্টা, বিভিন্ন ধর্মের প্রাচীন কপি, হাতে লেখা বিটলসের গান, গুটেনবার্গ বাইবেল, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নোটবুক ইত্যাদি দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখ পড়ে কাঙ্ক্ষিত সেই কুরআনের ডিসপ্লে। কাচের ভেতরে আমরা দেখতে পাই সাজানো বেশ কয়েকখানি কুরআন। প্রতিটির পাশেই আছে ব্যাখ্যামূলক নোট ও পরিচিতি। আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। অনুভব করি আমরা যেন মদিনার সেই সাহাবি যুগে বিচরণ করছি। অসাধারণ অনুভূতি!

একটি সেটের শিরোনাম ‘ইসলাম’। এতে বলা হয়েছে, ‘কুরআনের প্রাচীন কয়েকখানি কপি এখানে ডিসপ্লে করা হয়েছে। মুসলমানদের মতে, কুরআন আল্লাহর বাণী। ফেরেশতা জিবরাইল আ:-এর মাধ্যমে হজরত মুহাম্মদ সা:-এর ওফাতের আগ পর্যন্ত তিনি এসব ঐশী বাণী লাভ করেন মক্কা ও মদিনায়। প্রথম বাণীতে মুহাম্মদ সা:-কে বলা হয়, ‘পড়ো, তোমার প্রভুর নামে’। (সূরা ৯৬ : ১) কুরআনে ১১৪টি সূরা রয়েছে। মুহাম্মদ সা:-এর ওফাতের পর তার সচিব জায়েদ ইবনে সাবিত কুরআনকে গ্রন্থাকারে সঙ্কলিত করেন।’

ডিসপ্লের সবচেয়ে প্রাচীন যে কুরআন আমাদের চোখ আটকে যায় তা হলো- অষ্টম শতাব্দীর। এতে জের-জবর নেই। নেই স্বরবর্ণ। আরব থেকে আনা এই কুরআন পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন বলে পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়। এটি মেইল (সধরষ) লিপিতে লেখা। হিজাজি ও মেইল আরবি লেখার প্রথম দিকের রূপ। এই ডিসপ্লের দু’টি পাতায় ২৬ নম্বর সূরা শুআরা (কবি) এবং ২৭ নম্বর সূরা আল নমল (পিঁপড়া)। সূরা দু’টির পাতা লাল কালির লাইন দিয়ে পৃথক দেখানো হয়।

ডিসপ্লেতে প্রাচীন কুরআনের আরেকটি শিরোনামে লেখা হয় ‘সুলতান বাবর’স কুরআন। এই কুরআন মিসরের কায়রো থেকে আনা হয়েছে। পরিচিতিতে লেখা হয়, মিসরের কায়রোতে ১৩০৫-০৬ সালে হাতে লেখা এ কুরআন সংরক্ষিত ছিল। এর ক্যালিগ্রাফারদের একজন ছিলেন রুকন আল-দ্বীন বাবর, যিনি পরে মামলুক সুলতান বাবর দ্বিতীয় পদে উপনীত হন। এই কুরআন স্বর্ণ দিয়ে লেখা।

আরেকটি প্রাচীন কুরআন আমরা দেখতে পাই তা হচ্ছে- নবম শতাব্দীর কুফিক কুরআন। ইরাকের কুফার নামানুসারে এই নাম। পাতাগুলো সূরা আনকাবুত (মাকড়সা) এবং সূরা লুকমানের। কুফিক কুরআন এসেছে কুফা থেকে। ইরাকের কুফা একসময় ছিল ইসলামী জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। কুরআন ছাড়াও একই ডিসপ্লেতে রয়েছে মিলাদ শরিফে গাওয়া মোহাম্মদ সা:-এর প্রশংসাসূচক না’তে রাসূলের নান্দনিক পাণ্ডুলিপি। এটি ১৮৬৪ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাভায় সঙ্কলিত হয় এবং আরবিতে লেখা। ভারতীয় উপমহাদেশে মিলাদ শরিফের জনপ্রিয়তার কথা পরিচিতিতে উল্লেখ করা হয়।

তবে যে প্রাচীন কুরআন আরো বেশি মুগ্ধ করে তা হচ্ছে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে পাওয়া সবচেয়ে পুরনো কুরআন শরিফের দু’টি পাতা। এটি এখন ক্যাডবারি রিচার্স লাইব্রেরি, বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ। দু’টি পাতায় ১৮ নম্বর সূরা কাহাফ ও ২০ নম্বর সূরা ত্বাহার আয়াত লেখা আছে। এই কুরআনকে বলা হয়েছে অন্তত এক হাজার ৩৭০ বছর আগের হাতে লেখা কুরআন। ২০১৫ সালে এই দুর্লভ কুরআন উদ্ধার করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারে প্রায় ১০০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের তিন হাজারের বেশি বিভিন্ন ধরনের বইপত্র ও নথির সাথে কুরআনের ওই পাণ্ডুলিপিও সংরক্ষিত ছিল।

পিএইচডি গবেষক আলবা ফেদেলির নজরে আসে এই পাণ্ডুলিপি। তিনি সেটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পরে ঠিক কত বছরের পুরনো তা জানতে রেডিও কার্বন পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রেডিও কার্বন অ্যাক্সেলেরেটর ইউনিট ওই পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা করার পর জানায়, পাণ্ডুলিপিটি ছাগলের বা ভেড়ার চামড়ার ওপর লেখা হয়েছে। এটি কুরআন সবচেয়ে পুরনো পাণ্ডুলিপি।
ব্রিটিশ লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইসা ওয়ালির মতে, এটি এক দারুণ আবিষ্কার।

কুরআনের এই হাতে লেখা পাতা দেখে সারা বিশ্বের মুসলমান উদ্বেলিত। বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মতত্তে¡র অধ্যাপক ড. ডেভিস টমাসের মতে, এই পাণ্ডুলিপিটি আমাদেরকে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রকৃত সময়ের কাছাকাছির বছরগুলোতে নিয়ে যায়। খোঁজ পাওয়া পাণ্ডুলিপি যার হাতে লেখা তা সম্ভবত মুহাম্মদ সা:-এর সময় বেঁচেছিলেন। হয়তো তিনি এই নবীকে চিনতেন। তার কথা তিনি সরাসরি শুনেছেন। অধ্যাপক টমাস বলেন, শুরুর দিকে কুরআনের আয়াত পশুর চামড়া, পাথর, খেঁজুরগাছের পাতা, ডাল ইত্যাদিতে লেখা হতো। ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে কুরআন চ‚ড়ান্ত সংস্করণ সঙ্কলিত হয়। পাণ্ডুলিপির যে অংশটি পাওয়া গেছে তা আমাদের নবীর ওফাতের দুই দশকের কম সময়কালের হতে পারে। ওই পাণ্ডুলিপি হিজাজি হরফে লেখা অর্থাৎ সেটি আরবি লেখার প্রথম দিকের রূপ।

গবেষকরা বলেছেন, কুরআনের এই পাণ্ডুলিপির অংশটি ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর এর উদ্যোগে গঠিত কুরআন সঙ্কলন পরিষদ যে সঙ্কলনটি করেছিল, তারই একটি অংশ হতে পারে। রেডিও কার্বন পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি ৫৬৮ থেকে ৬৪৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ের। নবীকে দেখেছেন বা তার সংস্পর্শে ছিলেন এমন কোনো সাহাবির হাতেই এটি লেখা হয়েছে। হয়তো সেটি সাহাবি জায়েদ বিন সাবিতেরই হাতের লেখা। মিসরের প্রাচীনতম আমর ইবন আল আস মসজিদই হলো প্রাচীন এই কুরআনের আদি উৎস। ফ্রান্সের জাতীয় গ্রন্থাগারের মহাফেজখানায় প্রাচীন কুরআনের যে অংশটি সংরক্ষিত আছে, বার্মিংহামে পাওয়া অংশটি তারই আরেকটি অংশ। ইতোমধ্যে এই পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে ফ্রান্সের বিশেষজ্ঞ ফ্রাঁসোয়া দারুল সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি প্রায় নিশ্চিত, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যে থাকা কুরআনের পাণ্ডুলিপির দু’টি অংশ অভিন্ন কপি থেকে নেয়া।

কুরআনুল কারিম সঙ্কলন ও সংরক্ষণ
আল কুরআন হলো সর্বশেষ আসমানি কিতাব। বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থের বর্ণনায় এসেছে- মানবজাতির ইহজগতের কল্যাণময় জীবন ও পরজগতের মুক্তির সনদই হলো আল-কুরআন। এক কথায়, মহান আল্লাহ কুরআন অবতীর্ণ করেছেন মানবজাতির হেদায়েত ও কল্যাণের জন্য। সুস্থ সুন্দর সুখী জীবনের জন্য এবং আখিরাতের কল্যাণের জন্য যা প্রয়োজন কুরআনের পাতায় পাতায় রয়েছে তার দিকনির্দেশনা। শুরুতে কুরআন মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে পড়তে ও জানতে। কুরআন অজ্ঞতাকে অভিহিত করেছে মহাপাপ রূপে।

আল্লাহর কালাম কুরআন নাজিল হয়েছে আরবি ভাষায়। এর শব্দবিন্যাস, ছন্দ, সৌন্দর্য, ব্যঞ্জনা, এর অন্তর্নিহিত শক্তি ও গভীরতা অতুলনীয়। তাই আজ পর্যন্ত এর একটি ছোট্ট সূরার সমকক্ষ সূরা কেউ রচনা করতে পারেনি। তাই যুক্তরাজ্যে গিয়ে ইসলামের শুরুর সময়কার হাতে লেখা প্রাচীন কুরআনের কপি দেখতে পেয়ে আমাদের চোখ জুড়িয়ে গেছে। মন ভরে গেছে আনন্দে। নিজেদেরকে ধন্য মনে হয়েছে। মহান আল্লাহকে লাখো কোটি কৃতজ্ঞতা।

তাফসির গ্রন্থে পড়েছি, কুরআনের প্রথম আয়াত নাজিল হয় ৬১০ সালে আর শেষ আয়াত ৬৩২ সালে। ধাপে ধাপে, খণ্ডে খণ্ডে দীর্ঘ ২৩ বছরে পরিপূর্ণতা পায় কুরআন। কুরআনের প্রথম পঙক্তিমালাই বদলে দেয় হজরত মুহাম্মদ সা:-এর জীবন। এরপর নবীজী ও সাহাবিদের জীবন আবর্তিত হয় আল্লাহর কালাম এই কুরআনকে ঘিরেই। কুরআনের কোনো আয়াত বা আয়াতাংশ যখনই নাজিল হতো, তখনই নবীজী তা নিজে বারবার তিলাওয়াত করতেন, উপস্থিত সাথীদের শোনাতেন। সাহাবিরা তা বারবার তিলাওয়াত করে মুখস্ত করে ফেলতেন। আর কিতাব বা লিপিবদ্ধকারীরা তা লিপিবদ্ধ করতেন। বিভিন্ন পর্যায়ে ৪০এর অধিক সাহাবি কুরআন লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব পালন করেছেন। নবীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে সাহাবিরা মুখস্ত করা ও লেখার মাধ্যমে কুরআন সঙ্কলন ও সংরক্ষণের কাজ শুরু করেন। কুরআন লিখে রাখার জন্য মোটা কাগজ, চামড়া, পাথরখণ্ড, জন্তুর হাড় ও খেজুরপাতা ব্যবহার করা হয়।

জায়েদ বিন সাবিতকে নবী তার সামনে বসেই কুরআন লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কোনো আয়াত নাজিল হলেই তিনি তাকে ডেকে নিয়ে তিলাওয়াত করে শোনাতেন। আলী ইবনে আবু তালিব, উবাই ইবনে কাব, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদও লিবিপদ্ধকারী হিসেবে খ্যাতিলাভ করেন। অন্তত ৬৫ জন সাহাবির কাছে কুরআনের ১০০ সূরা লিখিত আকারে ছিল। অর্থাৎ পুরো কুরআনই নবীর জীবদ্দশায় সূরা আকারে বিন্যস্ত এবং লিপিবদ্ধ অবস্থায় ছিল। শুধু একত্রে ‘মসহাফ’ আকারে গ্রন্থিত হয়নি। নবীর ওফাতের পর বিভিন্ন এলাকায় ভণ্ড নবীর প্রাদুর্ভাব ঘটে। এদের বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে বহু হাফেজ শহীদ হন। তখন হজরত ওমর (রা:) এর পরামর্শ ও অনুরোধে প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর কুরআনকে একত্রে গ্রন্থাকারে সঙ্কলনের উদ্যোগ নেন। রাসূলুল্লাহ সা:-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কাতিব জায়েদ বিন সাবিতকে প্রধান করে তিনি একটি টিমকে এ কাজের দায়িত্ব দেন। নবীর ওফাতের এক বছরের মধ্যেই কুরআন গ্রন্থাকারে সঙ্কলিত হয়।

হজরত আবু বকর এর পর দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর মসহাফ সংরক্ষণ করেন। তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান এর সময় খেলাফতের বিস্তৃতি ঘটে। তিনি সব অঞ্চলে অভিন্ন পঠনপাঠন রীতি অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে কুরআনের কপি করার সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য জায়েদ বিন সাবিতসহ ১২ জন সাহাবির টিম করে দেন। নির্ভুল মসহাফের কপি প্রস্তুত হওয়ার পর হজরত উসমান (রা:) একটি কপি নিজের কাছে, একটি কপি মদিনার মহাফেজখানায় রেখে অবশিষ্ট কপি সত্যায়ন করে বিভিন্ন প্রদেশের শাসনকর্তার কাছে পাঠিয়ে দেন। আর মূল কপি ফেরত পাঠান হজরত হাফসা এর কাছে। ইতিহাসে এ মসহাফ পরিচিতি পায় ‘মসহাফে উসমানি’ নামে।

উজবেকিস্তানের তাসখন্দ মিউজিয়ামে, তুরস্কের ইস্তাম্বুলের টপকাপি মিউজিয়াম ও যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এর কপি রয়েছে। হরিণের চামড়ায় তৈরি কাগজে এই মসহাফের প্রতিলিপি মিসরে দারুল কুতুব সুলতানিয়ায়ও রয়েছে। তেমনি ওয়াশিংটনের লাইব্রেরি অব কংগ্রেস, আয়ারল্যান্ডের চেস্টার বিয়াটি মিউজিয়াম, লন্ডন মিউজিয়াম কায়রোর আল হোসেন মসজিদ ও ফ্রান্সের ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে রয়েছে কুরআনের পাণ্ডুলিপি। সাড়ে ১৪০০ বছর ধরে সারা বিশ্বের ঘরে ঘরে কুরআন পঠিত হচ্ছে। কুরআন একমাত্র গ্রন্থ যা তার মূল ভাষাকে ধরে রেখেছে এবং পঠিত ও চর্চিত হচ্ছে। কুরআনে আছে ১১৪টি সূরা এবং ছয় হাজার ২৩৬টি আয়াত। সূরা হিজরের ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এই কুরআন (ধাপে ধাপে) নাজিল করেছি এবং (সব প্রকার বিচ্যুতি থেকে) আমি একে রক্ষণাবেক্ষণ করব।’ কুরআন হিফজ শিক্ষা শুরু রাসূলুল্লাহ সা:-এর সময়। তাঁর মাধ্যমে শিখেছেন সাহাবিরা।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব
ইমেইল : abdal62@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement
সঙ্ঘাত নয়, আমরা সমঝোতায় বিশ্বাসী : প্রধানমন্ত্রী মরক্কোর তারকা আশরাফ হাকিমি ও তার মায়ের গল্প সরকার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সমুদ্রকে নিরাপদ রাখতে কাজ করছে : প্রধানমন্ত্রী জীবননগরে নাশকতার মামলায় বিএনপির ৭ নেতাকর্মী গ্রেফতার সরকার বিকল্প প্রস্তাব না দিলে নয়াপল্টনেই সমাবেশ : মির্জা আব্বাস এনামুলের পর লিটনের বিদায়, পাওয়ার প্লেতে সংগ্রহ ৪৪ হাবিব উন নবী সোহেলসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা রাশিয়ার বিমানঘাঁটিতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা দিনাজপুরে পৃথক দুর্ঘটনায় ৩ মোটরসাইকেল আরোহী নিহত শাহপরীর দ্বীপ সড়ক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী

সকল