০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

আইনের দৃষ্টিতে এ রায়টি সমভাবে বিভক্ত

আইনের দৃষ্টিতে এ রায়টি সমভাবে বিভক্ত - ফাইল ছবি

সংবিধানে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারককে নিয়োগ দিতে হবে এ কথা বলা না থাকলেও দীর্ঘ দিনের অনুসৃত নীতি অনুযায়ী জ্যেষ্ঠতম বিচারকই নিয়োগ পেয়ে আসছিলেন। এর ব্যত্যয় দেখা দেয় ১৯তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে। ২০১০ সালে ১৮তম প্রধান বিচারপতির অবসর পরবর্তী ১৯তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগের প্রশ্ন দেখা দিলে দু’জন জ্যেষ্ঠ ও সার্বিক বিবেচনায় উৎকৃষ্ট বিচারককে অতিক্রান্ত করে একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেয়া হয়। প্রধান বিচারপতি হিসেবে তার ব্যাপ্তিকাল ছিল প্রায় আট মাস। পদে আসীন থাকাবস্থায় তিনি বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় দেন। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বৈধ ও সপ্তম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত মামলা দু’টির আপিল শুনানি।

আপিল মামলা দু’টির প্রথমটির ক্ষেত্রে তিনি পদে বহাল থাকাকালীন সংক্ষিপ্ত একটি আদেশ দেন এবং দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে পদে বহাল থাকাকালীন পূর্ণাঙ্গ আদেশ দেয়া হয়। প্রথমটির সংক্ষিপ্ত আদেশে তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তাই বেআইনি তবে পরবর্তী দু’টি নির্বাচন সংসদের অভিপ্রায় অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে। দ্বিতীয় আপিলটিতে সপ্তম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন যে, সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত ক্রান্তিকালীন বিধান বলতে ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ হতে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালকে বুঝাবে। এ সময়কালের বাইরের কোনো সময়কে ক্রান্তিকালীন সময় বলা যাবে না এবং বলা হয়ে থাকলেও তা অকার্যকর হবে।

সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর সংক্ষিপ্ত আদেশটি প্রদান করা হয় ২০১১ সালের ১০ মে, এরপর ওই বিতর্কিত প্রধান বিচারপতি একই বছরের ১৭ মে অবসর গ্রহণ করেন। অবসর গ্রহণের পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ত্রয়োদশ সংশোধনী সংক্রান্ত তার ৩৪২ পৃষ্ঠার রায়ে অবসর গ্রহণের ১৬ মাসেরও অধিক সময় পর স্বাক্ষর করেন।

এখন প্রশ্ন- উচ্চাদালতের একজন বিচারপতি বা বিচারক অবসর গ্রহণ পরবর্তী রায় লিখতে ও রায়ে স্বাক্ষর করতে পারেন কি না? উচ্চাদালতের বিচারপতি বা বিচারকগণ সাংবিধানিক পদধারী হিসেবে শপথ ও সংবিধানের ৯৬ নং অনুচ্ছেদের অনুবলে প্রস্তুতকৃত আচরণবিধি দ্বারা পরিচালিত। উচ্চাদালতের একজন বিচারপতি বা বিচারক বিচারপতি বা বিচারক পদে নিয়োগ পরবর্তী শপথ গ্রহণ ব্যতিরেকে পদে আসীন হন না এবং যে তারিখে তিনি বিচারপতি বা বিচারকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন সে তারিখ থেকে তিনি স্বপঠিত শপথ হতে অবমুক্ত হয়ে যান। তাই স্বভাবত প্রশ্ন জাগে উচ্চাদালতের একজন বিচারপতি বা বিচারক স্বপঠিত শপথ হতে অবমুক্ত হওয়ার পর তার পক্ষে পূর্বে শ্রুত বা পূর্বে আংশিক প্রদত্ত কোনো মামলার রায় বা পূর্ণাঙ্গ রায় লিখার বা তাতে স্বাক্ষর করার সুযোগ আছে কি না?

উপরোক্ত বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানসহ দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যবিধি, সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগ রুল এবং দেওয়ানি আদেশ ও কার্যাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আইন বা বিধিবিধানের কোথাও উচ্চাদালতের একজন বিচারপতি বা বিচারককে অবসর গ্রহণ পরবর্তী পূর্বে শ্রুত বা পূর্বে আংশিক প্রদত্ত মামলার রায় বা পূর্ণাঙ্গ রায় লিখার সমর্থনে ক্ষমতা প্রদানপূর্বক কোনো অধিকার দেয়া হয়নি। আর অধিকার দেয়া না হয়ে থাকলে আইনের অবস্থান দাঁড়ায় অবসর গ্রহণ পরবর্তী কোনো বিচারপতি বা বিচারক কর্মে বহাল থাকাকালীন শ্রুত বা আংশিক প্রদত্ত কোনো মামলার রায় বা পূর্ণাঙ্গ রায় লিখলে এবং তাতে স্বাক্ষর প্রদান করলে তা হবে আইনের পরিপন্থী। তাছাড়া উপরোক্ত আইন ও বিধানাবলিতে রায় ঘোষণা বিষয়ে স্পষ্টত যে কথাগুলো বলা হয়েছে তার মর্মার্থ হলো আদালত মামলার শুনানি সমাপ্ত হওয়ার পর তৎক্ষণাৎ অথবা অন্য কোনো ভবিষ্যৎ দিনে পক্ষগণ অথবা তাদের আইনজীবীদের অবহিত করে প্রকাশ্য আদালতে রায় ঘোষণা করবেন এবং রায় ঘোষণাকালে বিচারক তাতে স্বাক্ষর ও তারিখ দেবেন। একবার স্বাক্ষরিত হলে করণিক বা গাণিতিক ভুল অথবা আকস্মিক ফসকান (Accidental slip) বা বিচ্যুতি (Omission) ব্যতীত রায়ের মধ্যে কিছু সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই।

পূর্ণাঙ্গ রায় দেখে প্রতীয়মান হয়, আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি ও ছয়জন বিচারক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত আপিল মামলার শুনানি গ্রহণ করেন এবং পূর্ণাঙ্গ রায় লিখা ও তাতে স্বাক্ষর করার সময় একজন বিচারপতি অবসরে ছিলেন এবং একজন বিচারপতি ও পাঁচজন বিচারক স্ব স্ব পদে বহাল ছিলেন। অবসরে যাওয়া বিচারপতিসহ কর্মরত প্রধান বিচারপতি এবং দু’জন বিচারক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সন্নিবেশিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বেআইনি ঘোষণা করেন। অপর দিকে দু’জন বিচারক এটিকে সংবিধানসম্মত ঘোষণা করেন এবং একজন বিচারক সংবিধানসম্মত ঘোষণা করে এ বিষয়ে বিজ্ঞচিত সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার সংসদের ওপর ছেড়ে দেন। যেহেতু পূর্ণাঙ্গ রায় লিখা ও রায়ে স্বাক্ষরকালীন সময় সাবেক প্রধান বিচারপতি পদে বহাল ছিলন না তাই আইনের দৃষ্টিতে তিনি যে রায় প্রদান করেছেন তা এখতিয়ারবিহীন ও মূল্যহীন। এ বাস্তবতায় ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত রায়টি ৩:৩ এ বিভক্ত একটি রায়।

ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে আপিল আদালতের বিচারকরা সমভাবে বিভক্ত হলে যে বিধান অনুসৃত হয় তাতে বলা হয়েছে অভিমত প্রদানের ক্ষেত্রে আপিল আদালতের বিচারকগণ সমভাগে বিভক্ত হলে মামলার ওপর তাদের অভিমতসহ একই আদালতের অপর বিচারকের সম্মুখে মামলাটি উপস্থাপিত হবে এবং ওই বিচারক তার বিবেচনায় যথাযথ শুনানি গ্রহণের পর স্বীয় অভিমত প্রদান করবেন এবং রায় বা আদেশ ওই অভিমতের আলোকে প্রণীত হবে।

দেওয়ানি আপিলের ক্ষেত্রে দেওয়ানি কার্যবিধিতে বলা হয়েছে ভিন্নমত লিপিবদ্ধ করতে হবে এবং যে ক্ষেত্রে আপিলটি একাধিক বিচারক শ্রুত হয়, সে ক্ষেত্রে কোনো একজন বিচারক আদালতের রায়ের সাথে দ্বিমত পোষণ করে থাকলে আপিলে যে সিদ্ধান্ত বা আদেশ প্রদান উচিত বলে তিনি মনে করেন, তা লিখিতভাবে বিবৃত করবেন এবং এর ওপর তিনি তার যুক্তিও তুলে ধরবেন। অপর এক বিধিতে বলা হয়েছে ভিন্নমত পোষণকারী বিচারকের রায়ের ডিক্রিতে স্বাক্ষরের প্রয়োজন নেই। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত আপিল মামলাটির সাথে ডিক্রি কার্যকরণের বিষয় সম্পৃক্ত না থাকায় ভিন্নমত পোষণকারীদের রায়ের ডিক্রিতে স্বাক্ষর করা বা না করা বিষয়টি এখানে অপ্রাসঙ্গিক।

স্পষ্টত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বিষয়ে আপিল বিভাগের রায়টি সংবিধান ও অন্যান্য আইন এবং বিধিবিধানের আলোকে সমভাবে বিভক্ত গণ্য হওয়ায় আপিল বিভাগে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর শুনানির সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন বিচারক না থেকে থাকলে সংবিধানের ৯৮নং অনুচ্ছেদের আলোকে হাইকোর্ট বিভাগের কোনো বিচারককে যেকোনো অস্থায়ী মেয়াদের জন্য আপিল বিভাগে আসন গ্রহণের ব্যবস্থা করে শুনানি অন্তে তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন তার আলোকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায়ের ফলাফল নির্ণীত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত রিটটি দায়ের করা হয় ১৯৯৯ সালে। পরে এ রিটটি শুনানির জন্য তিনজন বিচারক সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হয় এবং ওই বেঞ্চ সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে ২০০৪ সালে বৈধ মর্মে ঘোষণা করে। অতঃপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল দায়েরের পর দীর্ঘ দিন আপিল মামলাটি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় ছিল এবং ১৯তম প্রধান বিচারপতি পদে আসীন পরবর্তী এ আপিলটি শুনানির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ওই সাবেক প্রধান বিচারপতি যে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদান করেছেন তা পর্যালোচনায় দেখা যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত রায়ে তিনি যে অভিমত দিয়েছিলেন তার সাথে পূর্ণাঙ্গ রায়ের ভিন্নতা রয়েছে।

সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়েছিল রাষ্ট্রের বৃহৎ স্বার্থ ও জনগণের নিরাপত্তার প্রয়োজনে আগামী দু’টি (দশম ও একাদশ) জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিদ্যমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিদায়ী প্রধান বিচারপতি অথবা আপিল বিভাগের বিচারকদের নিয়োগের বিধান বাতিলের বিষয়ে সংসদ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। অপর দিকে সাবেক প্রধান বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ রায়ে আগামী দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত হওয়ার বিষয়ে অভিমত ব্যক্ত করে নির্বাচনকালীন সরকারের চেয়ে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার ওপর। সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ রায়ের এ ভিন্নতাকে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা গুরুতর অসদাচরণ হিসেবে গণ্য করেছেন।

১৯তম সাবেক প্রধান বিচারপতির প্রদত্ত রায়ে দেখা যায় তিনি তার রায়ে আইন, বিধিবিধান ও নীতিনৈতিকতাকে উপেক্ষা করে অপ্রাসঙ্গিকভাবে ১/১১-এর জরুরি সরকারের কার্যক্রমকে বৈধতা দিয়েছেন। এখন প্রশ্ন- এ বৈধতার জন্য কি কোনো আবেদন ছিল? এ বিষয়ে কি কোনো শুনানি হয়েছে? আবেদন না থেকে থাকলে এবং শুনানি না হয়ে থাকলে কেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সংসদের দায়িত্ব নিজ কাঁধে নিয়ে জনগণের শেষ ভরসাস্থল খ্যাত সর্বোচ্চ আদালতকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন? এখানে যে বিষয়টি স্পষ্ট তা হলো- রিট দায়েরের সময় ১/১১-এর অস্তিত্ব ছিল না। তাই রিটে সে বিষয়ের প্রতিকার চাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। রিটে যে বিষয়ে কোনো আলোচনা নেই সে বিষয়টি কী করে ১৯তম সাবেক প্রধান বিচারপতির রায়ের আলোচনায় স্থান পেল?

এমনকি আপিল বিভাগে শুনানি গ্রহণকালীন এ বিষয় অ্যামিকাস কিউরি বা রাষ্ট্রপক্ষের কেউ কোনো আলোচনা করেছেন সে সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। রিট দায়ের ও নিষ্পত্তি পর্যন্ত যে শিশুর জন্ম হয়নি সে কী করে আলোচনায় আসল? যেকোনো দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের অনভিপ্রেত আলোচনা দুঃখজনক ও দুরভিসন্ধিমূলক যা শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের দৃষ্টিতে গুরুতর অসদাচরণের শামিল।

অভিযোগ রয়েছে যে সাবেক প্রধান বিচারপতি স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত রায় জমা দিয়ে তা ফেরত নিয়ে পরিবর্তন ও পরিমার্জন করে পুনঃদাখিল করেছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীদের দৃষ্টিতে এ ধরনের পরিবর্তন ও পরিমার্জন অসততা, অন্যায় ও প্রতারণা। এ ক্ষেত্রে জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে তাকে বিচারের আওতায় আনা হলে ভবিষ্যতে আশা করা যায় জাতিকে এ ধরনের অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে না।

১৯তম সাবেক প্রধান বিচারপতি সুস্পষ্টভাবে সপ্তম সংশোধনী বাতিলসংক্রান্ত আপিল মামলার রায়ে উল্লেখ করেছেন যে, কোন্ সময়টি ক্রান্তিকালীন সময় হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই সময় ব্যতীত অপর কোনো সময়কে ক্রান্তিকালীন সময় হিসেবে সংবিধানের চতুর্থ তফসিলের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। দৃশ্যত এ অভিমত দ্বারা ইতোপূর্বে সংসদ পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে অসাংবিধানিক শাসনব্যবস্থাকে যেভাবে বৈধতা দিয়েছিল সে পথটি রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। সে দৃষ্টিকোণ থেকে যেখানে জনগণের সমার্থক সার্বভৌম সংসদের ক্ষমতা রুদ্ধ সেখানে কি করে ১৯তম সাবেক প্রধান বিচারপতি ১/১১-এর সরকারকে অযাচিতভাবে অবৈধ বলে এর কার্যক্রমকে মার্জনা দিয়ে সংসদের ঊর্ধ্বে আদালতকে স্থান দিলেন?

ইতোপূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহালের দাবিতে জাতি অনেক আন্দোলন সংগ্রাম প্রত্যক্ষ করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকা বা না থাকার বিষয়টি সংসদের একক এখতিয়ার। আদালতের বিভক্ত রায়ে এটিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব সংসদের ওপর ছেড়ে দেয়াই শ্রেয়। এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকালীন সংসদ আদালতের সিদ্ধান্তকে উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করেছে। আদালত ও সংসদ জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলনে বাস্তবতার নিরিখে স্ব স্ব দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে আজ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে জাতিকে এ অনাহূত বিতর্কের সম্মুখীন হতে হতো না। এ অনাহূত বিতর্কের পেছনে যার কার্যকলাপ মুখ্য তিনি অপর কেউ নন ১৯তম সাবেক প্রধান বিচারপতি।

সংবিধান, আইন, বিধিবিধান ও নীতিনৈতিকতা পর্যালোচনা করে তিনি নিজেই বিবেচনা করে দেখতে পারেন অবসর গ্রহণ পরবর্তী তার রায় লিখার ও রায়ে স্বাক্ষর প্রদানের অবকাশ ছিল কি না, সংক্ষিপ্ত ও পূর্ণাঙ্গ রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়ে ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য কিনা, স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত রায় জমা দিয়ে তা ফেরত নিয়ে পরিবর্তন ও পরিমার্জন আইন দ্বারা সমর্থিত কি না এবং অপ্রাসঙ্গিকভাবে ১/১১-এর বিষয়টি আলোচনায় এনে সেটিকে অবৈধ বলে মার্জনা দেয়ার সুযোগ ছিল কি না? এ চারটি প্রশ্নের উত্তর যদি ‘না’ সূচক হয় তবে নিঃসন্দেহে বলা যায় এটি সমভাবে বিভক্ত রায়। আর সে ক্ষেত্রে যা কিছু করণীয় তা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদেরই নির্ধারণ করতে হবে।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement