০১ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬ অগ্রহায়ন ১৪২৯, ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

মুসলিম বিশ্বে অনাগ্রাসন চুক্তি

মুসলিম বিশ্বে অনাগ্রাসন চুক্তি - ফাইল ছবি

বর্তমানে বিশ্বব্যবস্থা এক নতুন ক্রান্তিকালে এসে দাঁড়িয়েছে। ঠাণ্ডাযুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার পর, তার প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়নি। পেশা, আয় বণ্টনে বৈষম্য ও বাস্তুচ্যুত মানব প্রবাহে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের পরিস্থিতি মনে করিয়ে দেয়। বিদ্যমান একমেরু ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমের যে একতরফা আধিপত্য রয়েছে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে চীন ও রাশিয়া।

এই চ্যালেঞ্জ শুধু সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বা আধিপত্যের ক্ষেত্রে সীমিত নেই। চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেটি শুরু হয়েছিল এবং যার পথ ধরে বৈশ্বিক বিনিময় মুদ্রা হিসাবে ডলারের একচ্ছত্র প্রাধান্য ও বাণিজ্য লেনদেনে তথ্য পরিষেবা ব্যবস্থা সুইফটের নিয়ন্ত্রক ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

২০০৩ সালে ব্রিকসের যাত্রার পরবর্তী দশক থেকে বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা নির্মাণের উদ্যোগ গতি লাভ করে। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখলের পর রাশিয়ার উপর পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করার পর এই রূপান্তর প্রক্রিয়া দ্রুততা লাভ করে এবং রাশিয়া ও চীনের মধ্যে কৌশলগত মৈত্রী দৃঢ়তা পায়। রাশিয়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা দেশগুলো চরম অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিশ্বশক্তিগুলোর সুস্পষ্ট বিভাজন ও মেরুকরণ হয়। ৫ মাস ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তির কোনো লক্ষণ এখনও নেই। তবে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় একটি ফাটল ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় মুসলিম দেশগুলো :
বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় মুসলিম দেশগুলোর জোরালো উপস্থিতি নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মুসলিম দেশগুলো মূলত দু’টি শিবিরে বিভক্ত হয়ে যায়। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উদ্যোগ ছিল ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি গঠন এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা। বিশ্বের সব মুসলিম দেশ ওআইসির সদস্য হিসাবে একধরনের ঐক্যের সুতায় বাঁধা থাকলেও ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে এমনই বিভাজন রেখা টেনে গেছে যাতে এক দেশের সাথে আরেক দেশের শত্রুতার বীজ বপন হয়ে আছে। জাতিরাষ্ট্র হিসাবে অধিকাংশ দেশই উম্মাহর স্বার্থকে জাতি স্বার্থের পরে স্থান দেয়। এতে এক দেশের সাথে আরেক দেশের ভৌগোলিক সীমারেখা, নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস এবং জাতিগত ধারণা ও বিশ্বাসের সূত্রে বিরোধ আরো গভীরে শিকড় ছড়ায়। এই বিভাজন এমনভাবে বজায় রাখা হয়েছে যাতে বৈরিতা মাঝে মধ্যে বৈশ্বিক সমরাস্ত্রশিল্প চাঙ্গা থাকার মতো যুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়। আর জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিকাশের পরিবর্তে এসব দেশ পশ্চিমের উপর নির্ভরশীল থেকে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকান ও এশীয় দেশগুলোর স্বাধীনতা লাভের সুযোগ ছিল, কারণ ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্স দুর্বল হয়ে ঔপনিবেশিক শক্তি হারিয়েছিল। এসব অঞ্চলে পশ্চিমা প্রভাব হ্রাস পাচ্ছে। উপনিবেশবাদীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব দুর্বল। পশ্চিমের নেতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যে দেশেই হস্তক্ষেপ করেছে সেখানেই কখনো শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেনি। সঠিকভাবে কোনো কর্মসূচিও পরিচালনা করতে পারেনি। আফগানিস্তান বা ইরাকের অভিজ্ঞতা ছিল বিপর্যয়কর।

ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃবিরোধ এসব দেশে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব ও দখল সহজতর করে। বর্তমানে সৌদি আরব ও ইরান পরস্পরকে হুমকি হিসেবে দেখছে। ইরান এবং তুরস্কের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে হলেও তাদের মধ্যে আঞ্চলিক শক্তি হওয়ার লড়াই সবসময় চলে। পাকিস্তানের সমস্যা ভারত থেকে উদ্ভূত। উপসাগরীয় দেশগুলো রয়েছে সৌদি আরবের অন্তস্তলে। কয়েক বছর আগে কাতার সঙ্কটে তারা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। কুয়েতে ইরাকের আক্রমণ ও মার্কিন দখলদারিত্ব তাদের কারো পক্ষেই যায়নি। আফ্রিকার বেশির ভাগ দেশে স্থিতিশীলতার সমস্যা আছে, প্রশাসনে রয়েছে দুর্বলতা।

ইসলামী বিশ্বের জন্য দু’টি অস্তিত্বগত বিপদ অপেক্ষা করছে। প্রথমটি হলো ইসলামী বিশ্বের অভ্যন্তরীণ পতন। দ্বিতীয়টি হলো ইসলামের অভ্যন্তরীণ ‘পতন’। এর সাথে ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা উৎস, যেমন কুরআন এবং নবী মুহাম্মদ সা:-এর ঐতিহ্যের সাথে সংযোগ দুর্বল করা এবং সময়ের সাথে সাথে সম্পূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন করা জড়িত। অভ্যন্তরীণভাবে ইসলামিক বিশ্বকে ভেঙে ফেলার লক্ষ্যে নেয়া প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো সুন্নিবিশ্ব এবং শিয়াবিশ্বকে একে অপরের বিরুদ্ধে নিয়ে আসা। দেশগুলোকে মুখোমুখি দাঁড় করানো। ইসলামের মূল বিশ্বাস আদর্শের সুতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে আত্মপরিচয় ভুলিয়ে দেয়া।

মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে অনাগ্রাসন চুক্তি :
এমনই অবস্থায় একটি গুণগত পরিবর্তনের জন্য ২০১৮ সালে তুরস্ক যখন ওআইসির সভাপতির দায়িত্বে ছিল তখন তুর্কি শিক্ষাবিদ লেখক ও ইস্তাম্বুল মেডিপোল ইউনিভার্সিটির যোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক ইহসান আকতাস মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি অনাগ্রাসন চুক্তির প্রস্তাব করেন। সম্প্রতি কাতারের আমির তুরস্ক ও ইরানের কাছে একই ধরনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এর পথ ধরে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক বা অঞ্চলভিত্তিক এই অনাক্রমণ চুক্তি হতে পারে।

অধ্যাপক ইহসান আকতাস উল্লেখ করেন, প্রথম ধারণা হিসাবে, শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্রগুলো একত্র হতে পারে এবং একটি অ-আগ্রাসন চুক্তি গঠন করতে পারে। তুলনামূলকভাবে নিরাপদ তুর্কি রাষ্ট্রগুলো এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, লিবিয়া গৃহযুদ্ধে টুকরো টুকরো হবার উপক্রম হয়। তখন লিবিয়া ইস্যুতে পাঁচটি মুসলিম দেশ তুরস্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তুরস্ক সক্রিয় ভূমিকা না নিলে লিবিয়া আজ সিরিয়ায় পরিণত হতে পারত। অনেক পশ্চিমা দেশ হানাদার হয়ে আসত; লিবিয়ানরা হয়তো আরো ৫০ বছর ধুঁকতে থাকত।

অনাগ্রাসনের একটি ইসলামী চুক্তির ধারণা প্রথম নজরে অনেকের বিরক্তিকর মনে হতে পারে। কারণ ২০০ বছর ধরে, পশ্চিমারা বিশ্বব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা স্থাপত্যের অবয়ব দিয়েছে। মুসলিম দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে পশ্চিমাদের দখলদারিত্ব, শোষণ বা কারসাজির শিকার হয়েছে। এ ধরনের চুক্তি মুসলমানদের একে অপরের সাথে সম্পর্কিত নিরাপত্তা উদ্বেগ হ্রাস করবে এবং একইভাবে তারা পশ্চিমাদের অবাঞ্ছিত প্রভাব থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখতে সক্ষম হবে।

একটি বিষয় স্মরণীয়, ইসলামের উত্থান ও প্রাধান্য যে এশিয়ায়, সেই মহাদেশটিই ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় বিশ্ব শাসন করেছে। উপরন্তু, অটোমান রাষ্ট্র ৪০০ বছর ধরে ইউরোপীয় ব্যবস্থার মধ্যে দৃঢ়ভাবে বিদ্যমান ছিল। বিশ্বের ঐতিহ্যগত নিরাপত্তা দৃষ্টান্ত আজ ভেঙে পড়েছে। এখন ন্যায়বিচার ও সহানুভূতিভিত্তিক একটি নতুন ব্যবস্থা প্রয়োজন। নতুন বিশ্বব্যবস্থাকে অবশ্যই উন্নত মানব মনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আধুনিক সমাজের নিরাপত্তা ও কল্যাণের চাহিদা পূরণে সক্ষম হতে হবে।

ইউরোপের পক্ষে এমন নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আর সম্ভব বলে মনে হয় না। এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য মুসলমানদেরকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। ইসলামিক দেশগুলোর অনাগ্রাসন চুক্তি প্রতিষ্ঠা তৃতীয় মুসলিম পুনর্জাগরণের সূচনাও হতে পারে- কারণ এই জাতীয় ধারণাগুলো কেবল নিরাপদ পরিবেশে বিকাশ লাভ করে। ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে দ্বন্দ্ব পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর এসব দেশের উপর প্রভাব ও শোষণকে শক্তিশালী করে। অনেকের মতে, পশ্চিমা দেশগুলো এই ধরনের পরিস্থিতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে। ধারণা হিসাবে এটি ওআইসিতে সভায় গৃহীত হলে পরে পর্যায়ক্রমে বা অঞ্চলভিত্তিক তা বাস্তবায়ন হতে পারে।

পশ্চিমা ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসলামী দেশগুলোর ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করেছে। বর্তমানে ইরান, সৌদি আরব, ইয়েমেন, মিসর, লেবানন, কাতার, সিরিয়া প্রভৃতি ইসলামী দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ তাদের দুর্বল করে দিচ্ছে। ফলে এসব দেশের প্রায় সব সম্পদই অস্ত্রের জন্য পশ্চিমাদের কাছে চলে যাচ্ছে। তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, আফ্রিকার সমস্ত সম্পদ- যে অর্থ মানব কল্যাণে ব্যয় করার কথা তা অস্ত্র এবং স্বৈরশাসকদের উচ্ছৃঙ্খলতায় ব্যয় করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা তার প্রতিপক্ষ শক্তি প্রকৃতপক্ষে মুসলিম বিশ্বে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্র চায় না, যার মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, ইরান বা সৌদি আরব। ফলে তারা এসব রাষ্ট্রের বিরোধ নানাভাবে জাগিয়ে রাখতে চায়।

ইসলামী সম্মেলনে ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রগুলো অর্থাৎ তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিসরের ক্ষমতাবান হওয়া ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। আগে তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলো বেশি কার্যকর ছিল। এখন এর সাথে প্রযুক্তি ও সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক অগ্রসর দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এখন, ওআইসি, বিশেষ করে শক্তিমান ইসলামী দেশগুলো একটি অনাগ্রাসন চুক্তির উদ্যোগ নিতে পারে। তুরস্ক, ইরান, পাকিস্তান, মিসর এবং সৌদি আরব যদি একটি অনাগ্রাসন চুক্তিতে স্বাক্ষর করে তবে ক্ষমতাধর পশ্চিমা কোনো দেশ এদের শাসকের দিকে আঙুল নাড়তে অক্ষম হবেন এবং বলতে পারবেন না, এটি যদি আমার জন্য না হয় তবে আপনি ১৫ দিনের বেশি সময় টিকে থাকতে পারবেন না। অথবা অন্য কোনো দেশের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগে সাতবার ভাবতে হবে।

২০১১ সালে তুর্কি অর্থনীতি একটি মডেল অর্থনীতি ছিল। আরব বসন্তের সময় যে যুবকরা রাজপথে সমবেত হয়েছিল, তারা বিদ্রোহ করেছিল, তুরস্কের মতো দেশে থাকতে চায়। অর্থনীতি, গণতন্ত্র এবং চিন্তা ও বিশ্বাসের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তুরস্কের অর্জন আরবকে প্রভাবিত করেছিল। একইভাবে, ইরানও অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করে। আজ তুরস্ককে বাধা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, ২০১১ সালে তুরস্কের অর্থনীতিতে আক্রমণ করে দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইরানের উপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে। যেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ভেবেছিল যে তারা বিশ্বকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করছে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের রক্ত চুষে তাদের পঙ্গু করে দিয়েছে। এই দিন থেকে, মুসলিম দেশগুলো যদি প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে একটি অনাগ্রাসন চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে, তবে একটি গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান হতে পারে, অন্তত বড় কিছু শুরু করার জন্য এই স্বস্তির বিশেষ প্রয়োজন।

যুদ্ধ নয় আলোচনায় সমাধান :
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এমন একটি সমস্যা যা তুরস্ক এবং ইরান সমাধান করতে পারে। কিন্তু পরাশক্তিরা সিরিয়াকে এমন এক এলাকায় পরিণত করেছে যেখানে মুসলমানদের হত্যা করে মুসলিম ভূমিতে একে অপরের সাথে লড়াইয়ের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। এখন তুরস্ক সেদেশে আশ্রিত সিরীয় শরণার্থীদের জন্য উত্তর সিরিয়ায় একটি বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইরান সরাসরি এর বিরোধিতা করছে। আস্তানা প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর চার বছরেও এর কোনো সমাধান হয়নি। তেহরানে তিন নেতার শীর্ষ বৈঠকেও এর সমাধান সূত্র এসেছে বলে মনে হয় না। ইরান বা তুরস্ক কেবলই জাতীয় স্বার্থ দেখলে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান হবে না। আন্তরিকভাবে প্রধান প্রধান মুসলিম দেশ অনাগ্রাসন চুক্তি স্বাক্ষর করলে তারা বিরোধের ক্ষেত্র একপাশে সরিয়ে ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে সামনে এগোতে পারে। আর সংবেদনশীল বিরোধগুলোর ক্ষেত্রে ছাড় দিয়ে সমাধান করতে হবে। সিরিয়ার মতো একইভাবে, যদি এই অনাগ্রাসন চুক্তি হয় তবে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ সম্ভবত আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাবে।

গত দুই শতাব্দী ধরে ইসলামী বিশ্ব তার শারীরিক ও মানসিক স্বাধীনতা হারিয়েছে। একটি সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার পরিস্থিতিতে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে এখনো মুসলিম দেশ বলে মনে হচ্ছে। ‘ইসলামী বিশ্ব’-এর মতো কোনো জায়গা পৃথিবীতে নেই যাদের জনগণকে মানসিকভাবে ক্রীতদাস করা হয়েছিল, পরে নির্মূল করা হয়েছিল, যাতে সাম্রাজ্যবাদীরা সহজেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তারা যেখানে খুশি সেখানে দখল কায়েম করে, তারা যে দেশে চায় সেখানেই অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং যেকোনো নেতাকে তারা ক্ষমতাচ্যুত করে। ইরাক আগ্রাসনের পর মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকান ও এশিয়ান দেশগুলোর ঘটনার দিকে তাকালেই বোঝা যায় যে, শুধু ইসলামী বিশ্বই নয়, পশ্চিমারা ছাড়া বাকি বিশ্বের মানুষও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের স্বাধীনতা হারিয়েছে!

সম্প্রতি, তুরস্কের নিরাপত্তা দৃষ্টান্ত এবং বড় রাষ্ট্রগুলোর সাথে মোকাবেলা করার বা সমান স্তরে আলোচনা করার ক্ষমতার পরিবর্তনগুলো ইসলামী বিশ্ব, আফ্রিকান এবং দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই দেশগুলো তুরস্কের সাথে একটি পরমাত্মিক অংশীদারিত্ব তৈরি করেছে এবং তাদের ভবিষ্যৎ ও তুরস্কের ভাগ্যের মধ্যে মিল খুঁজে পেয়েছে। তুরস্কের ঐতিহাসিক পটভূমি এই ধরনের প্রতীকী মূল্য গঠনে ভূমিকা পালন করে। তুরস্কের এই শক্তিশালী ভাবমর্যাদা তৈরির আরেকটি কারণ, নেতৃত্বের প্রভাব। রাষ্ট্রপতি রজব তৈয়ব এরদোগান একটি মহান তুরস্কের প্রতীকী মূল্য উত্থাপন করেছেন।
পৃথিবীর কোনো দেশ একা থাকে না। জোটবদ্ধ হয়ে সহাবস্থান করে। বিরোধ জিইয়ে রেখে কোনো দেশই উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে না। বর্তমান ক্রান্তিকালে অভিন্ন মুসলিম স্বার্থের ব্যাপারে এক হতে পারলে অদূর ভবিষ্যতে ইসলামী বিশ্ব একটি সমান্তরাল শক্তি হিসাবে আবিভর্‚ত হতে পারে।

mrkmmb@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement