০৯ আগস্ট ২০২২
`

বাইডেনের মূল্যবোধ

বাইডেনের মূল্যবোধ - ফাইল ছবি

ন্যাটো- এটি ইউরোপ-আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর এক বৃহৎ সামরিক জোট যার পুরো নাম- ‘নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন’। ২৮-৩০ জুন ২০২২ স্পেনের মাদ্রিদে এর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে এত দিন যা প্রায় সবার অলক্ষ্যেই কোনোমতে সেরে ফেলা হয়ে আসছিল।

বারাক ওবামা আমল থেকেই বলা যায় আগের মতোই একের পর এক আমেরিকান নয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন, আর আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের আয়ু আর কত দিন থাকবে এ-জাতীয় প্রশ্ন আকার-ইঙ্গিতে জবাব দেয়া শুরু হয়েছিল। আর আমেরিকার এ যে গ্লোবাল নেতৃত্ব তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরিসমাপ্তিতে। চলতি শতকের শুরুতে সেসব সময় থেকেই আমেরিকার জন্য এসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন প্রবল হতে থাকে, যা প্রথম মুখোমুখি হয়েছিলেন ওবামা।

তখন অথবা এখন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট মানেই যেন চরম অবস্থান! তখন মানে ২০১৯ সালের কথা বলছি আর এখন মানে ২০২২ সালের চলতি সময়। আর তখন ও এখনো যে কমন প্রসঙ্গের কথা বলছি তা হলো এই ন্যাটো। ন্যাটো মানে আমেরিকা-ইউরোপ মিলে ১৯৪৯ সালে গঠিত এক যুদ্ধজোট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পরের নয়া পরিস্থিতিতে সোভিয়েত ও তার প্রভাবাধীন পূর্ব-ইউরোপ, এ অংশটি বাদ দিলে এর বাইরে আমেরিকার নেতৃত্বে বাকি ইউরোপীয় দেশের সামরিক জোট এটি। সংক্ষেপে বললে সেকালে (কোল্ডওয়ার আমলে) যা আমেরিকা-সোভিয়েত লড়াই প্রতিযোগিতা, তাকে কেন্দ্র করে গঠিত পশ্চিমের মূল সামরিক জোট।

সেকালে ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তার পক্ষে সাফাই দিতে অনেকে একালে বলে থাকে যে, সেকালের আমেরিকা-সোভিয়েত এ দুই জোটকে একটি কোল্ডওয়ারের মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব হয়েছিল এই ন্যাটো জোটের কারণে। মানে দুই পক্ষেই গোছানো সামরিক জোট-প্রস্তুতিতে ছিল বলেই নাকি ওই আমলে তারা মুখোমুখি কখনো যুদ্ধে নামেনি।

যা হোক, ১৯৯১ ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ায়, এর পর থেকে ন্যাটো নিজেই কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছিল; যদিও ওবামার দ্বিতীয়বারের প্রেসিডেন্সির আমল (২০১৩-১৬) থেকে ন্যাটো মুচড়িয়ে উঠেছিল- যেখানে মূল ইস্যুটা ন্যাটোর খরচ কে বইবে অথবা আমেরিকার জন্য এই খরচ তখন থেকে বিরাট বোঝা হয়ে গেছে। কারণ ন্যাটো জন্ম থেকেই এর খরচের প্রধান দায়ভার আমেরিকা একাই ব্যয় করে আসছে; যেন অনেকটা আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নেতা হিসেবে উত্থিত হওয়ায় ইউরোপের সবাই ধরে নিয়েছিল যে, ন্যাটো গঠনের সব উদ্যোগ ও খরচের ভার তো ‘ওস্তাদ’ আমেরিকাই নেবে।
আর তা নিয়েছিলও। আর সেই থেকে শুরু করে একেবারে ২০১৫ সালে ওবামার প্রথম প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল ন্যাটোর এক মিটিংয়ে ইউরোপকে খরচের দায় শেয়ার নেয়ার প্রসঙ্গ তুলে কড়া ভাষা ব্যবহার করেছেন, আর এতে পারস্পরিক খুবই মুখ কালো করা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল।

কিন্তু অতটুকুই নয়, আমেরিকার জন্য আসলে খারাপ দিন ও যুগ এসেই পড়ছিল। আর সেটি ওবামার পরে ট্রাম্পের আমলে এসে। ডোনাল্ড ট্রাম্প, তিনি সরাসরি ন্যাটো আর টিকিয়ে রাখার দরকার কী, এ প্রশ্নই তুলে বসেন; অন্য আরো অস্বস্তিকর বিভিন্ন প্রশ্নের মতো। এমনকি আফগানিস্তানের জন্যও আর নয় অথবা ‘ওয়ার অন টেররের’ জন্যও আর ন্যাটোর মতো প্রতিষ্ঠান রাখা ও এর খরচ বহনের প্রয়োজন তিনি দেখেন না বলে সরাসরি মন্তব্য করেছিলেন। পরে ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল লন্ডনে আরো মনকষাকষি তো বটেই।

ট্রাম্প পার্সোনাল এক আলোচনায় বলেছিলেন, তিনি ন্যাটো থেকে আমেরিকার সদস্যপদ প্রত্যাহার করতে চান। নিউ ইয়র্ক টাইমসে তার এক সহকারীর বরাতে খবর ছাপা হয়েছিল, সেখানে তিনি ন্যাটো সম্পর্কে বলেছিলেন, এটি অবসলিট বা ‘পরিত্যক্ত বোঝা’। লাগাতার পঁচাত্তর বছরের গ্লোবাল নেতা আমেরিকা-এরই এক প্রতিনিধি ট্রাম্পের কথা ভেবে এসব শব্দ হজম করতে অনেকেরই এ কথা মানতে কষ্ট হয়েছিল। তাই অনেকেরই মনে হয়েছিল, এটি হয়তো একটা পাগলা ট্রাম্পের ‘চরমবাদ’।

গত সপ্তাহে জুনের শেষ তিন দিনে এবার আমরা আবার আরেক চরমবাদের মুখোমুখি। এবার নায়ক জো বাইডেন- তিনি এবারের ন্যাটোর তিন দিনের সম্মেলনে আরেক চরমপ্রান্তে। ব্যাপারটা এক কথায় বললে, তা যেন আমেরিকার নেতৃত্বে ইউরোপ মানে সারা পশ্চিমা জগৎ যা চায়, এর বিরোধী বা তাদের পছন্দ নয় এমন কোনো কিছু চীন ও রাশিয়া করতে পারবে না। তাদের ভাবখানা এমন যে, তারা চাইলে তাদের ইচ্ছার বিরোধী সবাইকে তারা গ্লোবাল বাণিজ্যের বাইরে রেখে দিতেই পারে। এতই ক্ষমতা তাদের! যেনবা মাথায় করে এক ঝুড়ি গোবরও চীন-রাশিয়া চাইলেও বেচতে পারবে না!

ওই ন্যাটো সম্মেলন থেকে এই প্রথম ঘোষণা দেয়া হয়েছিল যে, ‘চীন ন্যাটোর জন্য হুমকি’! আলজাজিরা লিখেছে, ন্যাটো মনে করছে, চীন তার জন্য হুমকি তাই সে চীনকে স্ট্রাটেজিক গুরুত্ব দিয়ে বলছে ‘চীনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা’ ও ‘চাপে ফেলে বাধ্য করার নীতি’- এগুলো ‘পশ্চিমা ব্লকের রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, নিরাপত্তা ও মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করছে’।

এরই মধ্যে ইউক্রেনের যুদ্ধে প্রায় চার মাস হলো। এ প্রসঙ্গে বাইডেন পুরো ইউরোপকে তাতিয়ে রাশিয়াকেই এদের সবার শত্রু বলে হাজির করছিলেন। চীন এসব ক্ষেত্রেই আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। কিন্তু চীনকে আমেরিকার শত্রু করা বলা হতো না বা শত্রু আর প্রতিযোগী এক অর্থ নয়। অথচ কেন ন্যাটো সম্মেলনে কোনো এক উছিলায় চীনকে ন্যাটোর হুমকিদাতা-শত্রু বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে এ কথারও কোনো যথোপযুক্ত সাফাই ন্যাটো এখনো হাজির করেনি? আবার এত দিন শত্রু দেখানো হচ্ছিল রাশিয়াকে, অথচ এখন হঠাৎ করে খোদ চীনকেই হুমকিদাতা বলা শুরু হচ্ছে। এটি তো অস্বীকার করার কিছু নেই যে, চীনের থেকে আমেরিকা ওর ধারেকাছের অর্থনীতির প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নয়।
চীন বড় রাইজিং ইকোনমির দেশ। ফলে এখনো চীনে সবার চেয়ে পুঁজি সঞ্চয় ও সম্পদ গঠনের হার অনেক বেশি হবে। এর অর্থনৈতিক প্রকাশ ও প্রভাব তো প্রকাশিত হয়ে পড়বে এবং স্বভাবতই এর অর্থনৈতিক প্রতিদ্ব›দ্বীরা অসন্তুষ্ট হবে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও এটি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, তাই এটি ফেয়ার। এটি সামরিক তৎপরতা নয়। তাহলে চীন চ্যালেঞ্জটা কোথায় করল? আর চ্যালেঞ্জমাত্রই তো খারাপ নয়। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ কখনোই খারাপ নয়।

তার মানে দাঁড়াল, চীন ‘কেন ন্যাটোর হুমকিদাতা’ তা বর্ণনা বা ব্যাখ্যা দিয়ে বলার আগেই চীনকে শত্রু বানিয়ে দেয়া হলো? এ ছাড়া মতবিরোধ মানেই কি শত্রু? এমনকি কোনো কাজে গিয়ে চীনের সাথে মুখোমুখি বিরোধের কথা কেউ জানেনি! আবার যদি তা হয়ও চাইলে তা নিরসনের আইনি উপায়ও বের করে নেয়া সম্ভব। যদি চায়।

অথচ ন্যাটোর সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত বোলচালে মনে হচ্ছে, বাইডেনের নেতৃত্বে মানতে রাজি হওয়া ইউরোপ-আমেরিকা এসেছে যেনবা বাইডেনকে সারা দুনিয়ার পালনীয় কর্তা মানতে হবে!
বাইডেনের মনে রাখা উচিত ‘অবরোধ’ (মার্কিন ডলার ব্যবস্থার ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা) ও ‘হিউম্যান রাইটের’ কথা তুলে তিনি ইচ্ছামতো যেসব দেশের ওপর দাবড়ে বেড়াতে চাইছেন, তা আইনগতভাবে মানতে জাতিসঙ্ঘ-সদস্যপদপ্রাপ্ত কোনো দেশ মানতে বাধ্য? আইএমএফের চোখে এই অবরোধ বৈধ নয়, বড় জোর এটি আমেরিকার পড়ে পাওয়া অবৈধ কর্তৃত্ব। এটি আমেরিকা-রাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত কেবল। তাই এই অবরোধ আরোপ করতে গিয়ে যারাই অবৈধভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ফলে আমেরিকা যখনই ইচ্ছামতো আচরণ ও অপব্যবহার করবে, প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে, এর প্রতিটি আগামীতে আমেরিকার বিরুদ্ধে আরোপিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবেই।

আমেরিকান মূল্যবোধ
সবচেয়ে বড় কথা এটি কোনো, কারো একার ‘মূল্যবোধের প্রশ্ন’ একেবারেই নয়। অর্থনৈতিক অবরোধ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হিসেবে কখনো আরোপিত হয় বটে। কিন্তু বর্তমানে বাইডেন প্রশাসনের দেয়া অবরোধ একান্তই আমেরিকার আরোপিত। সুযোগ পেলে ও মুরোদে কুলালে তা উপড়ে অন্য দেশ ফেলে দেবেই!

ফিরে মূল্যবোধের কথা তুলতে, যদি জাতিসঙ্ঘের এই রাষ্ট্রের দুনিয়ার এক রাষ্ট্রের সাথে অপর রাষ্ট্রের মূল্যবোধের সঙ্ঘাত দেখা দেয় তাহলে কী হবে?

সব মূল্যবোধের পেছনে থাকে ভিন্ন ভিন্ন ইডিওলজি, যে কারণে মূল্যবোধের ভিন্নতা দেখা দিতেই পারে। আর মূল্যবোধে ভিন্নতা দেখা দিলেও ভিন্নদের মূল্যবোধটা খাটো আর নিজ মূল্যবোধটা শ্রেষ্ঠ এই আচরণ ও বয়ান এক কথায় বললে, তা এক রেসিজম বা ঘৃণিত জাতশ্রেষ্ঠত্ববোধ হতে পারে। আসলে এসব বকোয়াজ কথাবার্তা তাই সরিয়ে রাখাই ভালো! মূল কথাটা হলো, জাতিসঙ্ঘ জন্মের আগেই বা এর সদস্যপদ নেয়ার ক্ষেত্রে মৌলিক কি কোনো মূল্যবোধ আছে? থাকলে কী? বা আদৌ বাইডেনের মূল্যবোধ যা সবাইকে মানতে হবে এমন কিছু ছিল নাকি? তাহলে আসেন প্রশ্ন তুলি, যেমন ইরাকের ওপর ২০০৩ সালে বুশের হামলা ও দখল- এটি কোন মূল্যবোধ মেনে করা হয়েছিল? নিশ্চয় খুবই উন্নতমানের, বাইডেন বলতে পারবেন। বলা উচিত!

প্রথম কথা, বাইডেনের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো এককভাবে এমনকি একত্রে কি জাতিসঙ্ঘের মা-বাপ বা মালিক? একেবারেই নয়। তবে আমেরিকার বাইডেনের যদি মনে হয়, অমুক দেশ মূল্যবোধ মানছে না, তাহলে কী হবে? তাহলে জাতিসঙ্ঘের উপযুক্ত স্থানে গিয়ে, যদি থাকে, সেখানে গিয়ে বাইডেন নালিশ রুজু করতে পারেন। সেটিই সমীচীন হবে।

সেকালের সোভিয়েত ইউনিয়ন
সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৫ সালের আগে ১৯১৭ সাল থেকেই কমিউনিস্ট দেশ ও বিপ্লব করা দেশ ছিল। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এসব জানা সত্তে¡ও তিনি সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিনকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করেছেন এবং তার সাথে মিলেই হিটলারের বিরুদ্ধে বিশ্বযুদ্ধ করতে এগিয়ে গিয়েছিলেন। এখন কি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন বলবেন, তখন থেকেই মূল্যবোধের সঙ্ঘাত ছিল?

যুদ্ধ শেষে স্তালিনকে সাথে নিয়েই রুজভেল্ট ভেটো-সিস্টেম ওয়ালা এক জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং আলোচনায় স্তালিনকে রাজি করিয়ে জাতিসঙ্ঘ গড়ে নিয়েছিলেন। আর এতে জাতিসঙ্ঘ গড়ার যে ভিত্তি তখন উদ্যোক্তারা মিলে সেট করেছিলেন, সেটিই এখনো একই আছে। গ্লোবাল পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক সিস্টেমগুলোর মৌলিক কাঠামো হয়েই আছে; যদিও এতে এসব সিস্টেম ও কাঠামোগুলো সবই আমাদের একালের সব বিবাদ মেটাতে সক্ষম, তা নয়। খামতি আছে, ঘাটতি আছে, এসব নিয়ে আরো ও আবার কথা বলতে হবে, সামনে এগোতে হবে আর এসবই সবচেয়ে স্বাভাবিক।

কিন্তু আমেরিকা-ইউরোপ ভাব ধরছে, নেতা বাইডেনের সাথে তারা হলেন দুনিয়ার সবচেয়ে একচ্ছত্র মূল্যবোধ বা শ্রেষ্ঠ মূল্যবোধের কেউ একজন। এমন কথা ভিত্তিহীন ও গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল। জাতিসঙ্ঘ বা কোনো গ্লোবাল সিস্টেম গড়ে তোলার পথ কখনো এটি ছিল না, নয়ও। আগেভাগে নিজের মূল্যবোধকে শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করা। এরপর অন্যের ওপর এর আধিপত্য কায়েমের চেষ্টা করা- এটি একালের বাইডেনের ভুয়া পথ। অন্তত আমেরিকার অন্যতম ফোরফাদার রুজভেল্ট এমন নিকৃষ্ট কাজ বা পথে এগোননি- এসব নিয়ে তাদের পরামর্শকদের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।

সেকালের সোভিয়েত চীন
আবার চীনের প্রসঙ্গটাই দেখেন। আজকের শি জিনপিংয়ের চীনের প্রেসিডেন্ট। এতে একালে অর্থনীতিতে গ্লোবাল নেতার হকদার বা দাবিদার তিনি সে যাই হোক। কিন্তু এর উত্থান এই তো মাত্র ১৯৭৮ সাল থেকে, আমেরিকার সাথে এর কূটনৈতিক সম্পর্কের যাত্রা শুরু ১৯৭৮ এর ১ জানুয়ারি থেকে। মাওয়ের চীন ১৯৪৯ সাল থেকেই চীনে ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু তবু ১৯৭১ সালের অক্টোবরের আগে পর্যন্ত এই নয়া চীন জাতিসঙ্ঘের কেউ ছিল না। কারণ ১৯৪৯-৭১ এ বছরগুলোতে নয়া চীনের জাতিসঙ্ঘে সদস্যপদ ছিল না, স্বীকৃতি নেই। শুধু তা-ই নয়, চীনের নামে দেয়া জাতিসঙ্ঘের ভেটোওয়ালা সদস্যপদটা ছিল তাইওয়ানের হাতে।

আসলে মাওয়ের ক্ষমতা দখলের পর থেকেই বিতর্ক ছিল জাতিসঙ্ঘে চীনের হাতে থাকা (ভেটোসহ) সদস্যপদের হকদার কে? তাইওয়ান না মাওয়ের বিপ্লবী নয়া চীন? নয়া চীন- এটিকে এখনো অনেকে ‘মেনল্যান্ড চীন’ বলে থাকে। বস্তুত এই প্রশ্নে আমেরিকা তাইওয়ানকেই হকদার মনে করাতে আর এ ছাড়া আমেরিকার হাতে ভেটো ক্ষমতা ছিল বলে যেকোনো ভোটাভুটিতে আমেরিকার হকদার তাইওয়ান, নয়া চীন নয়- এই মনে করাটাকেই বাস্তবে কার্যকর করে চলত।

২৫ অক্টোবর ১৯৭১, জাতিসঙ্ঘের ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাব
১৯৭১ সালের অক্টোবরের জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ‘চীনা সদস্যপদটা কে পাবে’- এই প্রশ্ন আবার এক ভোটাভুটিতে তোলা হয়েছিল। সেটি সেবার কিন্তু হঠাৎ করে তোলা হয়নি। তবে কারণ বা অগ্রগতিগুলো ছিল বেশির ভাগ ছিল আন্ডারগ্রাউন্ডে।

ঘটনা সংক্ষেপে বললে-
১. মাওয়ের চীন কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব ১৯৫৮ সাল থেকে ‘ক্যাপিটালিজমের পথে’ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর এরই বাইরের ডাকনাম ছিল ‘১৯৫৮ সালের চীনা সাংস্কৃতিক বিপ্লব’। আমাদের এখনকার জন্য মূল প্রসঙ্গ- এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চীনে ব্যাপক বিদেশী পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছিল, যা বলাবাহুল্য। পশ্চিমা দেশের বা এক কথায় প্রতীকীভাবে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিটের জন্য ছিল এক বিরাট সুযোগ। আর এ সুযোগ দেয়ার আগে মাও এটি নিয়েই নিক্সন-কিসিঞ্জারদের সাথে দরকষাকষি করেন ও তাদের রাজি করান। মাও কী চেয়েছিলেন বিনিময়ে?

মাও জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ নয়া চীনের পক্ষে দেয়ার মাধ্যমে তবেই আমেরিকার জন্য তিনি চীনে বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দিতে রাজি হয়েছিলেন। এই ছিল ডিল!

জাতিসঙ্ঘের ওই ’৭১ সালের অক্টোবরে যে ভোটাভুটি হয়েছিল তাতে চীনা বাজার-বিনিয়োগের সুযোগ পাওয়ার লোভে আমেরিকা ভোটাভুটিতে ভোটদানে বিরত ছিল; অর্থাৎ ভেটো না দেয়া; এতটুকু হলেই নয়া চীনের চলে। এর আগে সবসময় সব ক্ষেত্রে আমেরিকা ভেটো দিয়ে তাইওয়ানকে টিকিয়ে দিত। আর নয়া চীনের পক্ষে প্রস্তাব উঠলে আমেরিকার এক ভেটোতেই সব শেষ হয়ে যেত। এ ছাড়া আমেরিকা তার প্রভাবাধীন জাতিসঙ্ঘের সাধারণ সদস্যদের সেবার আর বিরত থেকে নয়, বরং নয়া চীনের পক্ষে ভোট দিতে অনুরোধ রেখেছিল।

আর তাতেই মাও সেতুংয়ের চীনই আসল চীনের জাতিসঙ্ঘের (ভেটো ক্ষমতাসহ) সদস্যপদ একমাত্র হকদার, এ সিদ্ধান্ত পাস হয়েছিল ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাবে। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে সাত দিনের চীন সফরে গিয়ে সব আলাপ-আলোচনা শুরু করেছিলেন, যা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক স্বীকৃতি যাত্রা শুরু করেছিল ১৯৭৮, ১ জানুয়ারি থেকে।

তার সোজা মানে সেই ২৫ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭৫৮ নম্বর প্রস্তাব থেকে তাইওয়ান-ই হয়ে যায় নয়া চীন- এই মূল ভূখণ্ডের অংশ। আর স্বাধীন নয়, কোনো আলাদা প্রদেশ নয়। কোনো আন্তর্জাতিক ফোরামে তাইওয়ান স্বাধীন কোনো দেশ আর নয়।

এখন তাহলে তাইওয়ানকে নিয়ে বাইডেনের দরদ- এর অর্থ কী? এটি তো শঠতা! অবশ্যই তাই।
এমনকি ১৯৭১ সালের পর থেকে চীন যখনই কোনো দেশের সাথে স্বীকৃতি বিনিময় করে সেখানে সে শর্ত রাখে যে, তাইওয়ান যে চীনের অংশ, এটি সে স্বীকার করলে তবেই তারা পারস্পরিক স্বীকৃতি বিনিময় আরো আগিয়ে নিতে পারে। এটিকেই চীন ‘একচীন নীতি’ মেনে চলতে তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বলে থাকে। সেই থেকে আমেরিকা একচীন নীতিতে স্বাক্ষর করা দেশ। কিন্তু তবু বারবার এটা নিয়ে সে প্রায়ই উসকানি তৈরি করে চলছে। এমনকি বাইডেন ২০২১, ২০ জানুয়ারি ক্ষমতার শপথ নেয়ার পরও পিছলাপিছলি শুরু করেছেন। শেষে চীন হুমকি ও চাপ দেয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাইডেন আবার এবার সত্তরের দশকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে পাঠিয়েছিলেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com


আরো সংবাদ


premium cement