১১ আগস্ট ২০২২
`

তুরস্কের বিরুদ্ধে গ্রিস এক পশ্চিমা হাতিয়ার

গ্রিস-তুরস্ক সীমান্ত - ছবি : সংগৃহীত

তুরস্ক যাতে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে না পারে সে লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগাতে চায়। বিশ্বের পরিবর্তিত গতিশীলতা ও মধ্যপ্রাচ্যের স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়ার পরে তুরস্ক ও বেশির ভাগ আঞ্চলিক নেতা নতুন ভারসাম্য অনুযায়ী তাদের মধ্যকার সম্পর্ক সামঞ্জস্য করতে নিজের বৈদেশিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করেছেন ও করে চলেছেন।

তুরস্ক নানা প্রেক্ষাপট থেকে বিভিন্ন হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে, তবে তা সফলভাবে কাটিয়ে উঠতেও শিখেছে। যেমন- দ্বিতীয় কারাবাখ যুদ্ধের পর তুরস্ক ককেশাসে আঞ্চলিক পরিবেশকে তার পক্ষে পরিবর্তন করেছে। আজারবাইজানের সাথে একত্রে, তুরস্ক এখন আর্মেনিয়ার বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তার করেছে, আবার আর্মেনিয়ার সাথেও বিরোধ কমিয়ে এনেছে। দ্বিতীয়ত, তুরস্ক সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরাইল, সৌদি আরব ও কিছুটা মিসরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন শুরু করেছে। তৃতীয়ত, তুরস্ক অন্তর্ভুক্তিমূলক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বলকান অঞ্চলে রাজনৈতিক আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অবদান রাখছে, যদিও সেটি টেকসই বলার সময় এখনো আসেনি। তুরস্ক এরই মধ্যে বলকানের সব দেশে পৌঁছে গেছে এবং তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা-সমর্থন করছে। চতুর্থত, তুরস্ক সফলভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সক্রিয় নিরপেক্ষতার ভূমিকা পালন করছে। এখন পর্যন্ত তুরস্ক এ সঙ্ঘাতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে এবং উভয়পক্ষের সম্মান অর্জন করেছে। পঞ্চমত, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল না হওয়ায় তুরস্ক সফলভাবে তার দক্ষিণ সীমান্তে যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেছে। ষষ্ঠত, সন্ত্রাসী লালন পালনের জন্য সুইডেন ও ফিনল্যান্ডকে ন্যাটো অন্তর্ভুক্তিতে বাধা দিলে সুইডেন তুরস্কের শর্ত মেনে নিয়ে ন্যাটোতে যোগদান করছে।

বর্তমানে তুর্কি পররাষ্ট্রনীতিতে সমস্যাযুক্ত অঞ্চল হলো পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে গ্রিসের সাথে দ্বন্দ্ব। দুই দশক ধরে তুরস্কের পক্ষে এ অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়েছে। উপরের আলোচনা প্রমাণ করে তুরস্ক এখন ভূ-রাজনীতির সফল খেলোয়াড়, ফলে গ্রিসে আরো উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও তুরস্ক শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানোর জন্য গ্রিসকে আলোচনার টেবিলে আমন্ত্রণ জানালে গ্রিস একেক সময় একেক কথা বলে সামরিক ক্ষমতায়নের জন্য ফ্রান্স ও জার্মানির দ্বারস্থ হয়েছে এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বকে একত্রিত ও উসকে দেয়ার চেষ্টা করছে। গ্রিক সরকার সম্প্রতি ওই অঞ্চলে তুরস্কবিরোধী কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, পশ্চিমা জনমতকে একত্রিত করাসহ প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তুর্কিবিরোধী নীতি তৈরি করছে এবং এভাবে প্রতিবেশী সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

পশ্চিমা দেশগুলো গ্রিকদের তুর্কিবিরোধী অবস্থানকে উৎসাহিত করছে। গ্রিকদের প্রতিরক্ষাসামগ্রী ক্রয় গ্রিক সমস্যার সমাধান না করে এটি কেবল তুরস্কের সাথে উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলবে। তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হুলুসি আকার সম্প্রতি মিডিয়ায় বলেছেন, ‘অস্ত্রশস্ত্র কেনা হচ্ছে, কার বিরুদ্ধে? কিসের জন্য এই অস্ত্র? স্বাভাবিক প্রতিরক্ষার জন্য এত বেশি অস্ত্রের প্রয়োজন নেই। এজিয়ান সাগরে আঞ্চলিক জলসীমা সম্প্রসারণে ওপর গ্রিক উদ্যোগ নিয়েছে, সীমা লঙ্ঘন করছে। তুরস্ক এসব মেনে নেবে না।’

গ্রিক আইনপ্রণেতা ক্লিয়ন গ্রিগোরিয়াদিস হেলেনিক পার্লামেন্টে জানান, সংবাদমাধ্যমে তুরস্কের সাথে যুদ্ধের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। ‘এ মুহূর্তে মার্কিন সেনারা, ক্রিট, আলেকজান্দ্রোপোলি, লারিসা ও অন্যান্য অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছে; আসুন আমরা পরিষ্কার করে বলতে চাই, গ্রিস এখন একটি বিশাল মার্কিন ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।’ গ্রিস কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মান ঘাঁটি নয়, রাশিয়ারও।

নির্দিষ্ট স্বার্থ অর্জিত হলে পশ্চিমা দেশগুলো যেকোনো রাষ্ট্রকে পরিত্যাগ করতে পারে। তুরস্কের সাথে তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের ক্ষতি করা উচিত নয়। গ্রিসের উচিত খুব দেরি হওয়ার আগে তুরস্কের সাথে একটি ইতিবাচক-সমষ্টি মিথস্ক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়া। যদি গ্রিক পক্ষ আন্তর্জাতিক চুক্তির দ্বারা নির্ধারিত শর্তগুলো পরিবর্তন করতে থাকে এবং এভাবে এজিয়ান সাগরের প্রধান প্রতিবন্ধকগুলো সরিয়ে নেয়, তবে এটি এসব পাথরের নিচে আটকে যেতে পারে। সর্বোপরি এটি স্পষ্ট যে, পাশ্চাত্যের গ্রিক প্রেমবাদকে বাস্তববাদী রাজ্যে স্থানান্তরিত করা হবে না এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিক লবি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে তার সঙ্কীর্ণ স্বার্থের জন্য জিম্মি করতে পারে না।

প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান আবারো এজিয়ান সাগরে অধিকার রক্ষায় তার দৃঢ সঙ্কল্পের কথা উচ্চারণ করেছেন। গ্রিস ১৯৬০-এর দশক থেকে অসামরিক মর্যাদাসম্পন্ন মোট ২৩টি দ্বীপের মধ্যে ২১টি দ্বীপকে অস্ত্রসজ্জিত করে সামরিকীকরণ করে আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এর মধ্যে কৌশলগত সশস্ত্র দ্বীপগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক্রিট, লেমনোস, চিওস, সামোস, কোস, রোডস ও লেসবস। দ্বীপগুলো গ্রিসের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল এই শর্তে যে, দ্বীপগুলো ‘ডিমিলিটারাইজড’ থাকবে। এথেন্সের পক্ষ থেকে বলা হয়, কয়েক দশক ধরে যে দ্বীপগুলো গড়ে উঠেছে, তুরস্কের বৃহৎ নৌবহর খুব কাছেই রয়েছে, তাই এসব অবিন্যস্ত রাখা যাবে না।

১৯১৩ সালে লন্ডনের চুক্তি থেকে শুরু করে পূর্ব এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জের সামরিকীকরণ সীমিত করা হয়েছিল এবং ১৯২৩ সালে লুসান চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে তাদের অসামরিকীকরণের স্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছিল। লুসান চুক্তিটি এজিয়ানসহ গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে এক রাজনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৯৪৭ সালের প্যারিস চুক্তি, যা ডোডেকানিজ দ্বীপপুঞ্জকে ইতালি থেকে গ্রিসের কাছে হস্তান্তর করেছিল, তারাও তাদের ডিমিলিটারাইজড অবস্থা নিশ্চিত করেছিল। গ্রিস এখন এসব ভঙ্গ করছে।

আঙ্কারা তার অধিকার ও স্বার্থের সাথে আপস না করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আঙ্কারা বলেছে- দ্বীপগুলো, যার অসামরিক মর্যাদা থাকা উচিত ছিল, তাই থাকবে। লুসান ও প্যারিস চুক্তি ছাড়াও, গ্রিস পূর্ব এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জে সশস্ত্রবাহিনী রেখে আন্তর্জাতিক আইনের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। যার মধ্যে ১৯১৪ সালের ছয়-রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও ১৯৩২ সালে স্বাক্ষরিত আরেকটি চুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তুরস্ক জাতিসঙ্ঘকে জানিয়েছে, সশস্ত্র দ্বীপগুলোর মর্যাদা লঙ্ঘিত হয়েছে, গত মে মাসে আঙ্কারা এক চিঠিতে জোর দিয়ে বলেছে, গ্রিস আঞ্চলিক শান্তি বিঘ্নিত করেছে।

আঙ্কারার আপত্তি সত্ত্বেও গ্রিস সামরিক জাহাজ ও বিমান উড্ডয়নের মাধ্যমে ৯৫৩ বার নিরাপত্তা সীমানা লঙ্ঘন করেছে। বিভিন্ন সামরিক সফর, বিমান পর্যবেক্ষণ ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে নিয়মিত গ্রিস দ্বিপগুলোতে যাতায়াত করে বিধি লঙ্ঘন করে চলেছে।

ন্যাটোর দুই মিত্র দেশের মাঝে অনেকগুলো বিষয় নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। যেমন- পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণের ওপর প্রতিযোগিতামূলক দাবি, সামুদ্রিক সীমানা, আকাশসীমা, সাইপ্রাসের জাতিগত বিভক্তি ও দ্বীপের নানা সমস্যা, এজিয়ান সাগরের দ্বীপগুলোর অবস্থা নিয়ে বিরোধ ও অভিবাসী সমস্যা।

গত ৫০ বছরে দুই দেশ তিনবার যুদ্ধের কাছাকাছি এসেছিল, সর্বশেষটি ১৯৯৬ সালে একটি জনবসতিহীন পূর্ব এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মালিকানা নিয়ে। কিন্তু আঙ্কারা সম্প্রতি জনবসতিপূর্ণ গ্রিক দ্বীপগুলোর ওপর গ্রিসের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে-বিশেষ করে রোডস, কোস ও লেসবোসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ নিয়ে। সমরবিদরা মনে করেন, গ্রিস আগে যেভাবে আচরণ করেছে, তা এখন করতে পারে না। তুরস্ক আগের অবস্থানে নেই। গ্রিক সেনাবাহিনী এক শ’ বছর আগে পশ্চিম তুরস্ক আক্রমণ করেছিল। এখনো তার পুনরাবৃত্তি হলে শুধু অনুশোচনা করতে হবে।

এরদোগান সতর্ক করে বলেন, তুরস্ক এজিয়ান অঞ্চলের অধিকার কখনো ত্যাগ করবে না। তাই দ্বীপপুঞ্জের অসামরিকীকরণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো থেকে উদ্ভূত তার অধিকারগুলো ব্যবহার করতেও দ্বিধা করবে না। গ্রিস বলছে, তুরস্ক ইচ্ছাকৃতভাবে এসব চুক্তির ভুল ব্যাখ্যা করেছে ও বলেছে, আঙ্কারার বৈরী পদক্ষেপের পর তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের আইনি ভিত্তি রয়েছে।

তুরস্ক পশ্চিমা বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত ও শক্তিশালী মিত্র সেই ১৯৫০-এর দশক থেকে। তুরস্কও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে একীভূত হওয়ার চেষ্টা করে যুক্ত হয় ন্যাটো জোটের সাথে, চেষ্টা করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার। পশ্চিমা দেশগুলোও বিভিন্ন সময়ে তুরস্কের ভূমিকার প্রশংসা করেছে। তবে ইইউর সদস্যপদ মুলার মতো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সাথে সাথে তুরস্কের পশ্চিমা দৃষ্টিকোণ পরিবর্তিত হতে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব ও প্রভাব হ্রাস করার চেষ্টা চালায়। আফগানিস্তানে ন্যাটোর নেতৃত্বাধীন মিশন যেমন- ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি ফোর্স মিশন (আইএসএএফ) ও রিসোলিউট সাপোর্ট মিশন (আরএসএম) সমর্থন করার জন্য তুরস্ক সামরিক বাহিনী পাঠায়। পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে তুরস্কের মতপার্থক্য বাড়তে থাকে। পশ্চিমা দেশগুলো তুরস্ককে ভিন্ন দিকে পরিচালিত করতে চায়। সামরিক ক্ষমতায়নের জন্য আঙ্কারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করে, প্রতিরক্ষা শিল্পে আরো বেশি করে বিনিয়োগ করতে শুরু করে এবং কৌশলগত অস্ত্রও তৈরি করতে থাকে, যা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে।

তুরস্ক তার আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার জন্য রাশিয়ার মতো অন্যান্য উৎসের দিকে ঝুঁকে। তবুও এক শক্তিশালী সদস্য হিসেবে ন্যাটো জোটকেও অনুসরণ করে এবং অনেকে ক্ষেত্রে পশ্চিমা ডিকটেশন ছাড়া স্বাধীন নীতি অনুসরণ করতে শুরু করে।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলো মনে করে তুরস্ক এখনো ন্যাটোর মূল্যবান সদস্য। ইউক্রেনের সাথে তুরস্কের অস্ত্র চুক্তি এবং বিশেষ করে রুশ লক্ষ্যবস্তুতে তুর্কি ড্রোনের কার্যকর ব্যবহার পশ্চিমাদের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছে। রাশিয়া ওয়্যার মেশিন যত বেশি আগ্রাসী হবে, পশ্চিমা দেশগুলো তত বেশি উদ্বিগ্ন হবে। সুইডেন-ফিনল্যান্ডের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে এরদোগানসহ তুর্কি কর্মকর্তারা ঘোষণা করেছেন, তুরস্ক নীতিগতভাবে ন্যাটোর সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে নয় এরদোগান বলেন, ন্যাটোর সম্প্রসারণের ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি গোঁড়ামি বা শত্রুতা থেকে নয়, বরং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের নীতিগত অবস্থান থেকে উদ্ভূত হয়েছে। সব মধ্যস্থতাকারীর কাছে ন্যাটোর সম্প্রসারণের বিষয়ে তুরস্কের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ও জোটকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি ‘ন্যাটোর সদস্যদেরও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে না চলার’ আহ্বান জানিয়েছি। তবে এটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে এক কূটনৈতিক আক্রমণ।

পশ্চিমা দেশগুলো চায় তুরস্ক একটি সহায়ক রাষ্ট্র হোক বা ডিকটেশন অনুসারে চলুক এবং পশ্চিমাদের নিরাপত্তায় অবদান রাখুক। সম্প্রতি তুরস্ককে পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত যেকোনো হুমকি প্রতিরোধ করার আহ্বান জানিয়েছে। যদিও তুরস্কের নিরাপত্তা নিয়ে প্রায় দেশ উদাসীন থাকে।

পশ্চিমা দেশগুলো দাবি করে, তারা পিকেকে সন্ত্রাসী সংগঠনের সিরীয় শাখা ওয়াইপিজিকে সমর্থন করছে, কারণ দায়েশের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তার ভূমিকা রয়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়ে তুরস্কের জন্য একটি বড় হুমকি।

সাম্প্রতিক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তুরস্ককে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যার মধ্যে দায়েশও রয়েছে। পশ্চিমারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকে তুরস্কবিরোধী নীতির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে। এরা এমন এক শক্তিশালী ও স্বাধীন তুরস্ক চায় না, যা বাহ্যিক হুমকি প্রতিহত করতে সক্ষম। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো আঙ্কারাকে পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভরশীল রাখার চেষ্টা করে।

তুরস্কের ভূকৌশলগত অবস্থান ও এর সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি বিবেচনা করে পশ্চিমারা তুরস্ককে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছে, আঙ্কারাকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে যত বেশি সময় বিচ্ছিন্ন করবে, ততই ন্যাটো জোটের প্রাসঙ্গিকতা হারানোর সম্ভাবনা বাড়বে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যা, পাশাপাশি বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্থানের সাথে সাথে সহযোগিতামূলক বহুপক্ষীয় নীতিগুলোকে হ্রাস করবে।

তুরস্ক এজিয়ান সাগরে তার অধিকার ত্যাগ করবে না এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে উদ্ভূত তার ক্ষমতা ব্যবহার করতে দ্বিধা করবে না। এরদোগান গত ৯ জুন এজিয়ান উপকূলে অনুষ্ঠিত এফেস-২০২২ সামরিক মহড়ায় চূড়ান্ত ঘোষণা দেন।

গ্রিসের উচিত অসামরিক মর্যাদার দ্বীপপুঞ্জকে সামরিকভাবে সজ্জিত করা বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো মেনে চলা। এরদোগান আরো বলেন, ‘আমি গ্রিসকে সতর্ক করে দিচ্ছি, তারা যেন স্বপ্ন, কাজ ও বিবৃতি এড়িয়ে চলে; যেন পরে অনুশোচনা না হয়।’ তিনি বলেন, ‘তুরস্ক এজিয়ান অঞ্চলে তার অধিকার ত্যাগ করবে না এবং দ্বীপপুঞ্জকে অস্ত্র দেয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক চুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত অধিকারগুলো ব্যবহার করা থেকে পিছপা হবে না।

তুরস্ক আর প্রতিবেশী গ্রিসের সাথে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা নাও করতে পারে বলে সতর্ক করেছে। গত বছর, ন্যাটোর এই দুই সদস্য পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে খনিজ অনুসন্ধান ও এজিয়ান সাগরে দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলোর ওপর তাদের পার্থক্য সমাধানের জন্য ফের আলোচনা শুরু করেছিল। এরপর তুরস্ক গ্রিসের সাথে উচ্চ পর্যায়ের কৌশলগত কাউন্সিল নামে একটি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা প্লাটফর্ম বাতিল করে দেয়।

তুর্কি নেতারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন, আঙ্কারা আন্তর্জাতিক আইন, ভালো প্রতিবেশী সম্পর্ক, সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে এ অঞ্চলের অমীমাংসিত সমস্যার সমাধানের পক্ষে। আলোচনার মাধ্যমে আঙ্কারার সাথে সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরিবর্তে এথেন্স বেশ কয়েকবার আলোচনার টেবিলে বসতে অস্বীকার করেছে এবং তুরস্কের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার জন্য ব্রাসেলসকে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ও গ্রন্থকার


আরো সংবাদ


premium cement