২০ আগস্ট ২০২২
`

বন্যার প্রকোপ ও এর প্রতিরোধ

বন্যার প্রকোপ ও এর প্রতিরোধ - ছবি: সংগৃহীত

বন্যা হলো পানির মাত্রাতিরিক্ত প্রবাহ, যা কোনো নদী বা জলাশয়ের প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম তীর অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়। নদী, হ্রদ, হাওর-বাঁওড় বা সমুদ্রের মতো প্রাকৃতিক জলাশয়ের আধার থেকে মাত্রাতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হওয়ার কারণে বন্যা হয়।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। মৌসুমি জলবায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয়। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বর্ষাকালে এ দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। ভারত থেকে প্রবাহিত ৫৪টি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। হিমালয় অববাহিকায় ভারতের যেসব রাজ্য রয়েছে এ রাজ্যগুলোতে বর্ষা মৌসুমে ভারী বর্ষণ হলে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোতে পানির প্রবাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। উভয় দেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর উপর ভারত একতরফা বেশ কয়েকটি বড় বাঁধ নির্মাণের কারণে বেশির ভাগ নদীর বাংলাদেশ অংশে পলি জমে এর নাব্য হ্রাস পেয়ে নদীগুলো পানি ধারণক্ষমতা মারাত্মকভাবে সঙ্কোচিত হয়েছে। উজানে বাঁধ নির্মাণ পরবর্তী শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আইন অনুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হয়, অপর দিকে বর্ষা মৌসুমে বাঁধের উপরের দিকে পানির চাপের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটলে ভারত বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দেয়।

এতে মাত্রাতিরিক্ত পানির প্রবাহের কারণে নদীর দু’কূল উপচে ফসলের ক্ষেত, গ্রাম, জনপদ, রাস্তাঘাট প্লাবিত হয়। অনেকসময় দেখা যায় সামুদ্রিক ঝড় থেকে সৃষ্ট জোয়ারে দেশের উপকূলবর্তী জেলাগুলো প্লাবিত হয়ে বন্যার সৃষ্টি করে। আবার অমাবস্যার সময় জোয়ারের পানির বৃদ্ধি ঘটলে বন্যা দেখা দেয়।
প্রতি বছরই বাংলাদেশের কোনো না কোনো অঞ্চলে বন্যা হয়; তবে স্বাধীনতা-পরবর্তী ব্যাপক বিধ্বংসী বন্যার কারণে পুরো দেশের বেশির ভাগ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন বন্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ১৯৭৪, ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৮ সালের সংগঠিত বন্যা। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে ১৯৮৫, ১৯৯১, ২০০৭ ও ২০০৯ সালে বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল প্লাবিত হয়ে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রতি বছরই বন্যায় দেশের কোনো না কোনো অঞ্চলের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যার প্রকোপ থেকে ফসল ও জনপদের সম্পদ রক্ষায় সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করলেও তা কার্যকরভাবে ফসল ও সম্পদের ক্ষতি হ্রাসে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রধান নদীগুলোর মধ্যে কিছু নদীর দু’কূলে বাঁধ নির্মাণ করে শহরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত নদীর বন্যার পানির ক্ষতি থেকে ফসল ও জনপদকে রক্ষা করা গেলেও বেশির ভাগ নদীর দু’কূলে ও সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করার কারণে বন্যার ক্ষতি থেকে ফসল ও জনমানুষের ক্ষয়-ক্ষতির লাঘব ঘটছে না।

রাজশাহী ও কুমিল্লা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া পদ্মা ও গোমতী নদীতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করে যেভাবে শহর দু’টিকে বন্যার প্রকোপ থেকে রক্ষার সর্বাত্মক প্রয়াস নেয়া হয়েছে অনুরূপ পদক্ষেপ অপরাপর জেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর ক্ষেত্রে নেয়া হলে ব্যাপকতর বন্যার কবল থেকে জেলাগুলোর জনপদ ও তদসংলগ্ন ফসলের ক্ষেত রক্ষা পেত।

এ বছরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে বিগত ১২২ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়। ১২-১৭ জুনের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ভারী বর্ষণের পানি উজানের পাহাড়ি ঢল হিসেবে সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা জেলার নদী ও হাওরাঞ্চলের পানির ধারণক্ষমতার মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় তা আশপাশের জনবসতি ও ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে বিস্তীর্ণ এলাকায় জনমানুষের আকস্মিক দুর্ভোগের কারণ হিসেবে দেখা দেয়।

সিলেট বিভাগের উপর দিয়ে প্রবাহিত সুরমা ও কুশিয়ারা নদী হয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বৃষ্টির পানির বাংলাদেশে প্রবেশ করে। উভয় নদীর তলদেশে পলি জমে ভরাট হওয়ায় পানির প্রবাহ ও ধারণক্ষমতা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এ কারণে নদী দু’টির উজানে অধিক মাত্রায় বর্ষণ হলে দু’কূল ও হাওরাঞ্চল অতিক্রম করে পানি জনপদ ও ফসলের ক্ষেতে প্রবেশ করে। নদী দু’টিতে নিয়মিত খননকার্য পরিচালিত হলে ও নদী দু’টির দু’কূলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হলে প্রায় প্রতি বছর এক বা একাধিকবার যে আকস্মিক বন্যার প্রাদুর্ভাব ঘটে তা থেকে নদীর কূলবর্তী শহরগুলোর মানুষজন রক্ষা পেত।

সিলেট বিভাগের চারটি জেলা যথা- সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার ও ময়মনসিংহ বিভাগের দু’টি জেলা যথা- নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ, এ ছয়টি জেলায় যে ব্যাপক হাওরাঞ্চল রয়েছে এগুলো বর্ষা মৌসুমে প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে আবহমানকাল থেকে পানির জোগান দিয়ে চলেছে। হাওরগুলোর কোনো কোনো অংশের পানির উচ্চতা বর্ষা মৌসুমে ৩০-৪০ ফুট অবধি হয়ে থাকে। সে সময় হাওরগুলোতে পানির প্রবল স্রোত থাকায় নৌযানকে সাবধানতা অবলম্বন করে চলাচল করতে হয়। এসব হাওরের বিস্তীর্ণ অংশ শুষ্ক মৌসুমে সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের স্থান চেরাপুঞ্জির অবস্থান ভারতের মেঘালয় রাজ্যে। চেরাপুঞ্জির বৃষ্টির পানি সুনামগঞ্জ-বাজিতপুর হয়ে কিশোরগঞ্জের ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রামের হাওর দিয়ে প্রবাহিতের পর ধলু নদী হয়ে মেঘনায় পতিত হয়। সম্প্রতি ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম হাওরের মধ্যে বছরব্যাপী চলাচলের জন্য ‘অল ওয়েদার সড়ক’ নির্মাণ করা হয়েছে।

পরিবেশবিদদের অভিমত, এ সড়কটি নির্মাণের কারণে এলাকার জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়েছে এবং এর পাশাপাশি পরিবেশগত দুর্ভোগ এলাকাটির উপর দীর্ঘমেয়াদি অনিষ্টের উদ্ভবের শঙ্কার কারণ হিসেবে দেখা দেবে। অল ওয়েদার সড়কটির সপক্ষের ব্যক্তিদের যুক্তি- এ সড়কের মাধ্যমে তিনটি উপজেলার মধ্যে বছরব্যাপী সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে যা সড়ক নির্মাণ পূর্ববর্তী বর্ষাকালে দুরূহ ও দুর্গম ছিল।

তাদের দাবি, সড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি প্রবাহের জন্য সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে এবং এ সড়কটি কোনোভাবেই সড়কের অপর পাশের পানির প্রবাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে না। পরিবেশবিদরা এসব যুক্তি মানতে নারাজ।

তাদের সুস্পষ্ট অভিমত- এ সড়কের কারণে পানির প্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়ে সড়কের একপাশে দীর্ঘমেয়াদে পলি জমে পানির ধারণক্ষমতার হ্রাস ঘটাবে এবং তা প্রতি বছর পার্শ্ববর্তী এলাকায় বন্যার জন্য এককভাবে দায়ী হবে। এ প্রকল্পটি বাস্তবানের আগে যদিও একনেকের অনুমোদন নেয়া হয়েছিল; কিন্তু পরিবেশবিদসহ অর্থনীতিবিদদের একাংশের অভিমত- এরূপ প্রকল্পের চেয়ে অধিক উপযোগী হলো দেশের বিদ্যমান নাব্য হারানো নদীগুলোর খনন ও নদীগুলোর উভয় তীরে বাঁধ নির্মাণ। এই বাঁধ সড়ক হিসেবে ব্যবহার ও বাঁধের উভয় পাশে ফলদ, বনজ ও ঔষধি এবং শোভা বর্ধনকারী ফুলগাছ রোপণ করে এক প্রকল্প থেকে বহুমুখী সুফল মিলত।

বাংলাদেশের মধ্যভাগ ও উত্তরাঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত যমুনা, তিস্তা ও পদ্মা নদী ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এ নদী তিনটির উজানে ভারত বাঁধ নির্মাণ করায় শুষ্ক মৌসুমে তা পানির প্রবাহ কমিয়ে দিয়ে নৌ-চলাচলে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। নদী তিনটির বিভিন্ন অংশে পলি জমার কারণে নদীর তলদেশের উচ্চতা এক দিকে যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, অপর দিকে নদীগুলোর উভয় পাশে বিস্তৃতি ঘটেছে।
তিস্তা ও যমুনা নদীর বাংলাদেশ অংশে ব্যাপক খননের মাধ্যমে নাব্য ফিরিয়ে এনে উভয় তীরে বাঁধ নির্মাণ করে বিস্তীর্ণ ভূমি উদ্ধারে চীন ও বিশ্ব ব্যাংকের সাথে আলোচনা অনেকদূর এগিয়ে গেলেও অজানা কারণে ভারতের আপত্তির মুখে প্রকল্প বাস্তবায়নে অশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে। এ নদী দু’টির উভয় তীরে বাঁধ নির্মাণ করে নদীর ভূমি উদ্ধার পরবর্তী তাতে কৃষিকাজ ও উপশহর গড়ে শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠা করা যায়। এর ফলে নদী নাব্য ফিরে পাবে, নৌ-চলাচল সহজতর হবে। যা দেশের অর্থনীতিতে আশানুরূপ অবদান রাখবে।

যদিও প্রকল্প বাস্তবায়নে চীন ও বিশ্ব ব্যাংকের সহায়তা চাওয়া হয়েছে কিন্তু বর্তমানে আমাদের জাতীয় বাজেটের যে আকার প্রকল্পের মেয়াদ বিবেচনায় তা থেকে প্রতি বছর স্বল্প পরিমাণ অর্থ ব্যয় করলেই নিজস্ব অর্থায়নে পাঁচ-সাত বছরের মধ্যে উভয় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব।

বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রাখতে ও খাদ্যের জোগান নিশ্চিতে অন্য যেকোনো বড় ধরনের প্রকল্পের চেয়ে অধিক জরুরি বন্যা নিয়ন্ত্রণ। আর বন্যা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে নদী খনন করে এগুলোর পানির ধারণক্ষমতা বৃদ্ধিসহ সারা বছর নৌ-চলাচলের উপযোগী ও অব্যাহত ভাঙনের কারণে অস্বাভাবিক বিস্তৃত নদীগুলোর দুপাশে বাঁধ নির্মাণ করে উদ্ধারকৃত ভূমিতে চাষাবাদ করা হলে উৎপাদিত বাড়তি ফসল দেশের খাদ্যচাহিদা পূরণে ইতিবাচক অবদান রাখবে।

প্রতিটি নদীর দু’পাশ ও দেশের উপকূলবর্তী এলাকায় নির্মিত বাঁধের দু’পাশে বৃক্ষরোপণ করা হলে এবং বাঁধগুলো সড়ক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হলে দেশের যোগাযোগব্যবস্থা এবং ফলফলাদি ও কাঠের চাহিদা পূরণে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হবে যা প্রকারান্তরে শেষোক্ত পণ্য দু’টির আমদানি হ্রাস ঘটিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সুফল বয়ে আনবে। আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা দেশের সাম্প্রতিক ও বিগত বছরগুলোর বিপর্যয় বিবেচনায় নিয়ে দেশের সম্পদ দিয়েই দীর্ঘমেয়াদে বন্যার প্রকোপ থেকে উত্তরণে কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আগামী এক দশকের মধ্যে সঙ্কটের সমাধান ও এর সুফল যে আসবে তা নিয়ে দ্বিমতের কোনো অবকাশ কোথায়!

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
e-mail: iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement

সকল