১৬ আগস্ট ২০২২
`

নামের পূর্বে ও পরে পেশার উপাধির যথার্থতা

নামের পূর্বে ও পরে পেশার উপাধির যথার্থতা। - ছবি : সংগৃহীত

আমাদের পৃথিবীতে মানুষের আগমনের পর থেকে মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে শুরু করে। বিভিন্ন পেশার মানুষকে নিয়ে একটি সমাজ গঠিত হয়। যেকোনো সমাজকে পূর্ণতা পেতে হলে সব পেশার মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মাধ্যমে বসবাস আবশ্যক।

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাগের ফলে পাকিস্তান ও ভারত নামক দু’টি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হলে অবিভক্ত বাংলার বিভাজনের মাধ্যমে পূর্ব-বাংলা পাকিস্তানের অংশ হিসেবে পূর্ব-পাকিস্তান নামে অভিহিত হয় এবং পশ্চিম-বাংলা ভারতের অংশ হিসেবে রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে। অবিভক্ত বাংলায় বিগত প্রায় ৮০০ বছর ধরে হিন্দু ও মুসলিম দু’টি পৃথক সম্প্রদায় নিজ নিজ শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, এতিহ্য প্রভৃতিকে সমুন্নত রেখে বসবাস করে আসছে। মূলত পূর্ব-বাংলায় মুসলিম জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় পূর্ব-বাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। অপর দিকে পশ্চিম-বাংলায় হিন্দু জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় পশ্চিম-বাংলা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। পূর্ব-পাকিস্তান ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে আত্মপ্রকাশ করে। বাংলাদেশে বসবাসরত মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের জাতীয়তা এক হলেও উভয় সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিসাধারণের নিজ নিজ ধর্মীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী নামকরণ করা হয়ে থাকে।

হিন্দু শাস্ত্র মতে পিতা-মাতা, অভিভাবক, বংশ বা গোত্রের পেশা স্রষ্টার নির্ধারিত এবং প্রতিটি পেশার অন্তর্ভ্ক্তু ব্যক্তিসাধারণের নামের শেষাংশ পেশার পরিচয় বহন করে। যেমন- নামের শেষে শীল থাকলে বুঝে নিতে হবে সে নরসুন্দর পেশার, আবার নামের শেষে সূত্রধর থাকলে ধরে নিতে হবে সে কাঠমিস্ত্রি পেশার আর যদি নামের শেষে কর্মকার থাকে তখন ধরে নিতে হবে সে কামার অথবা স্বর্ণকার।

অর্ধশতাব্দী আগেও হিন্দুরা নিজ পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশা গ্রহণের সুযোগ পেত না। সার্বিকভাবে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকলে প্রতিটি পেশায় কর্মক্ষম মানুষের আধিক্য দেখা দেয় কিন্তু সে অনুযায়ী জীবিকা নির্বাহের পর্যাপ্ত সুবিধার অনুপস্থিতিতে বাধ্য হয়েই অনেককে পেশা পরিবর্তন করতে হয়। এ পরিবর্তনের ধারা বর্তমানেও অব্যাহত আছে। এ কারণে হিন্দুদের নামের শেষাংশ বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রেণিভুক্তি নিশ্চিত করলেও পেশার পরিচয় বহন করে না। আবার অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় পেশার পরিচায়ক নাম বর্জন করে এমন নাম গ্রহণ করেছেন যা পিতৃ বংশ বা শ্রেণী অথবা গোত্র নামের সঙ্গে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়। শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে ধর্মীয় কুসংস্কার থেকে হিন্দুরা বেরিয়ে আসতে শুরু করে এবং এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকতর হওয়ায় পৈতৃক পেশার বাইরে অন্যান্য পেশায় তাদের কর্মসংস্থানের দুয়ার অবারিত হয়েছে।

বাংলাদেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মুসলমান। এ সম্প্রদায়ের নামকরণ ইসলামী ঐতিহ্যের অনুসরণে করা হয়। এদের নামের আগের বা পরের অংশ কদাচিৎ পেশার পরিচয় বহন করে। এ ধর্মীয় শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে মাওলানা বলা হয়। এ ছাড়া মাওলানা একটি সম্মানসূচক সম্বোধন। একজন ব্যক্তি ইসলাম ধর্মীয় শাস্ত্র অধ্যয়নের পর অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এমন পেশা গ্রহণ করেছেন যা কোনোভাবে ধর্মীয় শাস্ত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। এ ধরনের ব্যক্তির নামের আগে নামের অংশ হিসেবে ‘মাওলানা’ শব্দটির ব্যবহার ধর্মীয় শাস্ত্রকে অবমাননা করে। অনুরূপভাবে অনেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায় পবিত্র হজব্রত পালনের পর নামের আগে নামের অংশ হিসেবে ‘আলহাজ’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশের একজন বিতর্কিত রাষ্ট্রপ্রধান যার বিরুদ্ধে চারিত্রিক ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগ সুবিদিত তিনি রাষ্ট্রপ্রধান পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায় এবং রাষ্ট্রপ্রধান পদ থেকে বিদায় নেয়ার পরও তার নামের আগে সামরিক পদবির পাশাপাশি আলহাজ পদবিটিও ব্যবহার করেছিলেন। রাষ্ট্রপ্রধান পদটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ। একজন ব্যক্তি রাষ্ট্রপ্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালীন অথবা রাষ্ট্রপ্রধান পদ থেকে বিদায় নেয়ার পর রাষ্ট্রপ্রধানের অনেক নিম্নের সামরিক পদ কেন তার নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ব্যবহার করবেন এটি বোধগম্য নয়। একইভাবে হজব্রত পালনের পর নামের আগে আলহাজ শব্দের ব্যবহার ধর্মীয় অনুশাসন সমর্থন না করলেও আলোচ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বিপরীতধর্মী আলহাজ শব্দটি নামের সাথে ব্যবহার করে জনগণের সামনে নিজেকে নিষ্কলুষ হিসেবে উপস্থাপনের ব্যর্থ প্রয়াসে সচেষ্ট ছিলেন। যে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একজন হাজীর নামের আগে আলহাজ লেখা সমর্থনীয় নয়, সে একই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে একজন রোজাদার, নামাজি ও পরহেজগারের নামের আগে উপরোক্ত যেকোনো বিশেষণ ব্যবহার সমর্থনীয় নয়।

আমাদের মহান মুক্তি সংগ্রামে যেসব ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক-জনতা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা ‘মুক্তিযোদ্ধা’ নামে অভিহিত। কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় এ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকে পুঁজি করে নামের আগে নামের অংশ হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা শব্দটি ব্যবহার করছেন। এ ধরনের ব্যবহারের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন ব্যক্তির অবদানকে খাটো করে দেখার অবকাশ সৃষ্টি হয়। উল্লেখ্য, আলহাজ ও মুক্তিযোদ্ধা শব্দ দু’টি কোনো পেশার উপাধি নয়। উভয় শব্দ নিছক সম্মানের পরিচায়ক।

বাংলাদেশের সংবিধান যেকোনো নাগরিককে যোগ্যতা সাপেক্ষে পেশা গ্রহণের অধিকার প্রদান করেছে। বাংলাদেশের যেসব নাগরিক চিকিৎসকের পেশায় নিয়োজিত তাদের নামের আগে ডাক্তার শব্দটি ব্যবহার করেন। একজন চিকিৎসক তখনই নামের আগে ডাক্তার শব্দ ব্যবহার করতে পারেন, যখন তিনি কোনো মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর অনেকে চিকিৎসক পেশা ও জ্ঞানের উৎকর্ষতার জন্য দেশ ও বিদেশ থেকে অন্যান্য উচ্চতর ডিগ্রি গ্রহণ করলেও নামের আগে ডাক্তার লেখার বিষয়টি সবার ক্ষেত্রে অভিন্ন থাকে। কর্মের প্রয়োজনে একজন চিকিৎসককে কখনো মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে দেখা যায়, কখনো মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ হতে দেখা যায়, কখনো মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিক্যাল কলেজের অধ্যাপকের পদ গ্রহণ করতে দেখা যায়, কখনো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা পরিচালকের পদ গ্রহণ করতে দেখা যায়, কখনো জেলাতে সিভিল সার্জনের প্রশাসনিক পদ গ্রহণ করতে দেখা যায় আবার কখনো থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স অথবা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মেডিক্যাল অফিসারের পদ গ্রহণ করতে দেখা যায়। চাকরির প্রয়োজনে পদের অবস্থান যত উচ্চ বা নিম্নই হোক না কেন এ অবস্থান নামের আগে ডাক্তার লেখার ক্ষেত্রে সবার জন্যই সমরূপ থাকে।

এমন অনেক চিকিৎসক আছেন যারা সরকারি চাকরিতে যোগদান না করে বেসরকারিভাবে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত থাকেন। সাধারণত দেখা যায় এ ধরনের চিকিৎসক কর্মক্ষম থাকা সাপেক্ষে আমৃত্যু চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত থাকেন। সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত অধিকাংশ চিকিৎসককে পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায় অফিস সময়ের পর বেসরকারি চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত হতে দেখা যায়। একজন ব্যক্তি চিকিৎসা শাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রিধারী হওয়ার পর তিনি সরকারি বা বেরসকারি চিকিৎসক হিসেবে চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত থাকলে তার নামের আগে পেশার উপাধি ডাক্তার শব্দটির সংযুক্তি নামের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে কোনো ব্যক্তি চিকিৎসা শাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর অন্য পেশা গ্রহণ করলে তার ক্ষেত্রে নামের আগে ডাক্তার শব্দটি না লেখাই শ্রেয়।

আমাদের দেশে সরকারি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে যারা অধ্যাপনা করেন তাদের সাধারণ অর্থে অধ্যাপক নামে অভিহিত করা হয়। কার্যত বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে নবীন হিসেবে একজন ব্যক্তি যখন অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত হন, তখন তাকে যে পদটিতে নিয়োগ দেয়া হয় সেটিকে বলা হয় প্রভাষক। এরপর একজন প্রভাষক ক্রমান্বয়ে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক পদে নিয়োগ লাভ করেন। একজন ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত থাকাকালীন তিনি বাস্তব ক্ষেত্রে অধ্যাপক না হলেও তার নামের আগে অধ্যাপক উপাধি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি খুব একটা অস্বস্তি বোধ করেন না। এমনো দেখা গেছে একজন ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে স্বল্পকালীন প্রভাষক হিসেবে চাকরি করার পর পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশা যেমন রাজনীতি বা ব্যবসায় চলে এলেও তার নামের আগে গর্বভরে অধ্যাপক শব্দটির ব্যবহারের ক্ষেত্রে তার বিবেকবোধ কখনো বাঁধা হিসেবে দাঁড়ায় না। আমাদের সমাজে বর্তমানে এমন অনেক রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা বহু আগেই অধ্যাপনা পেশার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেছেন এবং প্রকৃত অর্থে সম্পর্ক ছেদকালীন তারা অধ্যাপকের এক দুই বা তিন স্তর নিম্নের পদে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু নামের আগে অধ্যাপক উপাধির স্থায়ী অলঙ্করণ তাদের কাছে আত্মমর্যাদার হানি হিসেবে দেখা না দিয়ে বরং আত্মসন্তুষ্টি লাভের সহায়ক হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বর্তমানে পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত ও সভ্য রাষ্ট্রে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের নামের আগে পিএইচডির সংক্ষিপ্ত রূপ W. (Dr.) লিখতে দেখা যায় না। তারা যেটি করেন তা হচ্ছে নামের শেষে পিএইচডি কথাটি সংক্ষেপে লেখেন। যেমন Lionel Lavert, Phd. কিন্তু আমাদের দেশে এখনো বেশির ভাগ পিএইচডি ডিগ্রিধারী নামের আগে পিএইচডির সংক্ষিপ্ত রূপ W. (Dr.) লেখার পাশাপাশি অধ্যাপনা পেশায় নিয়োজিত থাকলে বা কোনো এককালে অধ্যাপক পদে থেকে থাকলে অধ্যাপক বা প্রফেসর শব্দটিও লিখতে কুণ্ঠিতবোধ করেন না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, প্রফেসর ড. ইয়াদ আলী বা অধ্যাপক ড. ইয়াদ আলী। এটি এক ধরনের আত্মশ্লাঘা। এ ধরনের আত্মশ্লাঘা থেকে আমাদের নোবেল বিজয়ীর মতো আরো অনেকে মুক্ত নন।

সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্কুলে যারা শিক্ষাদান করেন তারা শিক্ষক বা মাস্টার নামে অভিহিত। এমন অনেক ব্যক্তি আছেন যারা কখনো সরকারি বেসরকারি মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষকতা না করে বিভিন্ন বাড়িতে লজিং (জায়গির) থেকে নিজের পড়াশুনা চালানোর পাশাপাশি লজিং বাড়ির শিশুদের শিক্ষাদান করে নামের শেষে মাস্টার উপাধি গ্রহণ করেছেন এবং এ উপাধি গ্রহণের পর পেশার পরির্তন হলেও নামের শেষাংশ থেকে উপাধিটি আর অবলুপ্ত হয়নি। আমাদের সমাজে বর্তমানে এমন অনেক নামকরা রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা কোনো এককালে স্বল্পকালীন সরকারি বেসরকারি মাধ্যমিক ও প্রাথমিক স্কুলে অথবা লজিং মাস্টার হিসেবে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু এ পেশা ত্যাগ তাদের ক্ষেত্রে নামের সাথে মাস্টার শব্দটির সংযুক্তির ছেদ ঘটাতে পারেনি।

প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে যারা কারিগরি বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন তাদের ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার নামে অভিহিত করা হয়। ’৮০-এর দশকের পর থেকে ইঞ্জিনিয়ার ও ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার উভয়ের ক্ষেত্রে নামের আগে ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী উপাধি ব্যবহারের প্রবণতা দেখা দেয় এবং এ প্রবণতা বর্তমানে উভয়ের ক্ষেত্রে সর্বজনীন রূপ লাভ করেছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীরা প্রকৌশলীদের অনুরূপ নামের আগে কৃষিবিদ শব্দটি ব্যবহার করেন এবং অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় পেশার পরিবর্তন হলেও নামের আগে কৃষিবিদ লেখা অব্যাহত থাকে।

সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীতে কর্মরত কর্মকর্তারা চাকরিতে নিয়োজিত থাকাকালীন নামের আগে যেসব পদবি ব্যবহার করেন, তারা চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পরও নামের আগে ওই পদবিগুলো ব্যবহার অব্যাহত রাখেন। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হচ্ছে তারা অবসরের পর পদবির শেষে বন্ধনির ভেতর (অব:) শব্দটি ব্যবহার করেন। যদিও বাস্তব ক্ষেত্রে টেলিফোনে বা অন্য যেকোনোভাবে নিজেকে উপস্থাপনের সময় কদাচিৎ অব: উল্লেখ করতে শোনা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে কর্মজীবন শুরুর পর কর্মজীবনের শেষপ্রান্তে এসে রাষ্ট্রদূত বা অ্যামবাসেডর পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর একজন ব্যক্তির কূটনৈতিক পেশার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ ঘটলেও তিনি নামের আগে অ্যামবাসেডর শব্দটি ব্যবহার করছেন। এ ধরনের ব্যবহার কোনো আইন ও বিধিবিধান দিয়ে যে সমর্থিত নয়, তা একাধিক কূটনীতিক জিজ্ঞাসিত হওয়ার পর স্বীকার করলেও তাদের অনেকে নামের আগে শব্দটির ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন।

আইন পেশায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করার পর একজন ব্যক্তি বাংলাদেশ বার কাউন্সিল পরিচালিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাকে আইন পেশায় নিয়োজিত হওয়ার জন্য অ্যাডভোকেট হিসেবে সনদ দেয়া হয়। আইন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা তাদের নামের আগে অ্যাডভোকেট পদবি ব্যবহার করেন। এমন অনেক আইনজ্ঞ আছে যারা যুক্তরাজ্য থেকে বার এট ল’ ডিগ্রি লাভ করেছেন। এরা বার কাউন্সিল কর্তৃক আইন পেশায় নিয়োজিত হওয়ার জন্য সনদপ্রাপ্ত হলেও নামের আগে ব্যারিস্টার উপাধি ব্যবহার করেন। আবার এদের দু’একজন আইন পেশায় না এসেও দিব্যি নামের আগে ব্যারিস্টার লিখে নিজেকে কুলীন ভাবতে থাকেন। একজন অ্যাডভোকেট বা ব্যারিস্টারের আইন পেশার কর্মক্ষেত্র এক ও অভিন্ন নয়। এমন অনেক আইনজীবী বা ব্যারিস্টার আছেন যারা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে কার্য পরিচালনায় অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন আবার এমন অনেক আইনজীবী বা ব্যারিস্টার আছেন যারা জেলা আদালতে আইন পেশায় মনোনিবেশে আগ্রহী হয়ে থাকেন। জেলা আদালতের বাইরে থানা বা উপজেলা শহরে যেসব আদালত রয়েছে এগুলোকে চৌকি বলা হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে এ ধরনের ১৪টি চৌকি রয়েছে। এসব চৌকি আদালতে যারা আইন পেশায় নিয়োজিত তারাও অ্যাডভোকেট হিসেবে পরিচিত।

বর্তমানে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতগুলো জেলা জজ আদালতের অন্তর্ভুক্ত। ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যারা আইন পেশায় নিয়োজিত তারাও অ্যাডভোকেট বা ব্যারিস্টার হিসেবে অভিহিত। পাকিস্তান শাসনামলে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতগুলো জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল এবং তখন অধিকাংশ অ্যাডভোকেটের কাছে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত হওয়া আত্মমর্যাদার জন্য হানিকর বিবেচিত হতো। সে সময় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মোক্তারদের একচেটিয়া প্রাধান্য ছিল। বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পর মোক্তার পেশার অবসান ঘটিয়ে সব মোক্তারকে অ্যাডভোকেট হওয়ার সুযোগ দেয়া হয়। একজন অ্যাডভোকেটের আইন পেশার কর্মক্ষেত্র ভিন্ন হলেও উপরোক্ত সব কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত আইনজীবীরা একক শব্দ অ্যাডভোকেট বা ব্যারিস্টাররূপে অভিহিত হন এবং এ একক শব্দটি তাদের নামের আগে ব্যবহৃত হয়ে পেশার পরিচয় বহন করে।

সরকারের উচ্চতর চাকরি কাঠামোর বেসামরিক সর্বোচ্চ পদধারীরা সচিব নামে অভিহিত। একজন সচিব পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায় তার নামের শেষে পদবিটি ব্যবহার করেন এবং সচিবদের ক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যবহার কখনো নামের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসেনি। একজন সচিব চাকরি হতে অবসরের পর নামের আগে বা পরে নামের অংশ হিসেবে সচিব পদবি ব্যবহার করেছেন, এরূপ শোনাও যায়নি দেখাও যায়নি।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান। সংবিধানে উচ্চাদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারককে প্রধান বিচারপতি নামে অভিহিত করা হয়েছে এবং উচ্চাদালতের উভয় বিভাগের বিচারকদের বিচারক নামে অভিহিত করা হয়েছে। সংবিধানে অধস্তন আদালত বলতে বিচার-কর্ম বিভাগকে বুঝানো হয়েছে এবং সংবিধানে বিচার-কর্ম বিভাগের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, বিচার-কর্ম বিভাগ অর্থ জেলা বিচারকের অনূর্ধ্ব কোনো বিচার বিভাগীয় পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত কর্ম বিভাগ। জেলা বিচারক বলতে সংবিধানে বলা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা বিচারকও জেলা বিচারকের অন্তর্ভ্ক্তু হবেন।

ইংরেজি Judge শব্দটিকে আভিধানিক বাংলায় বিচারপতি ও বিচারক উভয়রূপে বোঝানো হয়েছে। অনুরূপভাবে অভিধানিক বাংলায় Justice অর্থ বিচারপতি ও বিচারক উভয়ই। আমাদের সন্নিকটবর্তী রাষ্ট্র ভুটানে নিম্ন আদালত ও উচ্চাদালতের বিচারকরা পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায় নামের আগে Justice শব্দ ব্যবহার করেন। য্ক্তুরাজ্যে Lay Magistrate iv যে ম্যানুয়ালটি ব্যবহার করেন সেটি Stouts Justice Manual নামে অভিহিত। আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধিতে উচ্চাদালতের সব বিচারককে সমগ্র বাংলাদেশের জন্য পদাধিকার বলে Justices of the peace নামে অভিহিত করা হয়েছে। এর বাইরে সব দায়রা জজ, সব জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং সব মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের জন্য পদাধিকার বলে Justices of the peace নামে অভিহিত করা হয়েছে। পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশে নিম্ন আদালতের বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটরা পদে বহাল থাকাকালীন নামের আগে Justice শব্দটি ব্যবহার করলেও আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এরূপ ব্যবহার প্রত্যক্ষ করা যায়নি।

আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায় উচ্চাদালতের বিচারকের পদে স্থায়ী হতে না পেরে আগের নিজ পেশায় ফিরে এসে উচ্চাদালতে আইনজীবী হিসেবে পুনঃনিয়োজিত হয়ে নামের আগে বিচারপতি শব্দটি ব্যবহার করছেন। আবার ক্ষেত্র বিশেষে দেখা যায় উচ্চাদালতের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে অবসরে যাওয়া বিতর্কিত বিচারক আপিল বিভাগে আইন পেশায় নিয়োজিত হয়ে নামের আগে অ্যাডভোকেট না লিখে বিচারপতি শব্দটি লিখে আইন ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছেন। উচ্চাদালত থেকে অবসরে যাওয়া অত্যন্ত বিতর্কিতরা অবসর পরবর্তী আইন পেশা, আইনি পরামর্শক ও আরবিট্রেটর হিসেবে নিয়োজিত হয়ে নামের আগে বিচারপতি শব্দটি ব্যবহার করে সামগ্রিকভাবে বিচার বিভাগের মর্যাদার যে হানি ঘটাচ্ছেন এ বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। আমাদের উচ্চাদালতের প্রধান বিচারপতি ব্যতীত অপরাপর বিচারকগণের ক্ষেত্রে পদে বহাল থাকাকালীন অবস্থায় নামের আগে বিচারপতি শব্দের ব্যবহার সংবিধান বা আইন দ্বারা সমর্থিত না হলেও তাদের ভাষ্যমতে দীর্ঘদিনের প্রথার কারণে এটি অনেকটা তাদের নামের অংশে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নামের এ অংশটিকে উচ্চাদালতের বিচারকদের পদ থেকে অবসরে যাওয়ার পরও কেউ যদি অব্যাহতভাবে ব্যবহার করতে থাকেন তবে তা কতটুকু আইনানুগ এ প্রশ্নটি আজ অনেকের মুখে উচ্চারিত হচ্ছে।

একজন ব্যক্তি পদে বা পেশায় বহাল বা নিয়োজিত থাকাকালীন নামের আগে অথবা পরে পদ বা পেশার পদবি বা উপাধি ব্যবহার তার জন্য যথার্থ। কিন্তু পদ বা পেশায় বহাল না থেকে কেউ যদি নামের আগে বা পরে পদ বা পেশার পদবি বা উপাধি ব্যবহার করেন, তবে তার জন্য তা হবে নীতিজ্ঞান ও নৈতিকতা পরিপন্থি যা প্রকারান্তরে আত্মপ্রবঞ্চনার শামিল।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement