১৬ আগস্ট ২০২২
`

ক্ষমতার অপব্যবহার : গ্রেফতার রিমান্ড ও নির্যাতন

-

গ্রেফতার ও রিমান্ড নিয়ে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। পৃথিবীব্যাপী পুলিশ সাধারণ নাগরিকের ওপর নির্যাতন করে। এ নির্যাতন বন্ধ করার উদ্দেশ্যে পৃথিবীর সচেতন মানুষ সোচ্চার হয়। ফলে জাতিসঙ্ঘের উদ্যোগে ১৯৮৪ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পুলিশ নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক, লজ্জাকর ব্যবহার অথবা দণ্ডবিরোধী একটি সনদ নিউ ইয়র্কে স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৯৮ সালের ৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ওই সনদে স্বাক্ষর করে সম্মতি জ্ঞাপন করে। জাতিসঙ্ঘ সনদের ২(১) ও ৪ অনুচ্ছেদে নির্যাতন, নিষ্ঠুর, অমানবিক আচরণ ও লাঞ্ছনা আইনগত অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের ওই সনদের অঙ্গীকারগুলো কার্যকর করতে আইনি বিধান প্রণয়ন সমীচীন ও প্রয়োজন হওয়ায় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার ও নির্যাতন বন্ধ করার জন্য ২৭ অক্টোবর-২০১৩ তারিখে ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ২০১৩’ পাস ও কার্যকর করা হয়। কিন্তু এতদসত্ত্বেও সাধারণ নাগরিকের ওপর পুলিশ নির্যাতন কমে নেই এবং ক্ষমতায় অপব্যবহারের প্রশ্নে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাষ্ট্র যেন একটি ওপেন চেক প্রদান করেছে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা মোতাবেক যেকোনো সন্দেহভাজন ও তথ্যের ভিত্তিতে যেকোনো নাগরিককে গ্রেফতার করার ক্ষমতা পুলিশকে দেয়া হয়েছে বটে, কিন্তু সে ক্ষমতা প্রয়োগের প্রশ্নে আইনে বলা হয়েছে যে, সন্দেহ হতে হবে জবধংড়হধনষব ঝঁংঢ়রংরড়হ এবং তথ্য হতে হবে নির্ভরযোগ্য (Crediable information)। ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারা মোতাবেক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত সমাপ্ত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে যদি তদন্ত সমাপ্ত করা না যায় তবে কার্যবিধির ১৬৭(২) ধারা মোতাবেক পুলিশের আবেদন অনুযায়ী যেকোনো মামলায় অনূর্ধ্ব ১৫ দিন পর্যন্ত রিমান্ড মঞ্জুর করার জন্য ম্যাজিস্ট্রেটকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু রিমান্ডে নিয়ে যাতে নির্যাতন নিপীড়ন করা না হয় এ জন্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশন ও হাই কোর্ট ডিভিশন কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া সত্ত্বেও তা কার্যকর হচ্ছে না। বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও বিচারপতি শরীফউদ্দিন চাকলাদার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন ০৪/৮/২০০৩ সাইফুজ্জামন আনীত মামলায় ১১টি দিকনির্দেশনা জারি করে। ওই দিকনির্দেশনায় বলা হয়েছে :
(১) কাউকে গ্রেফতারের সময় পুলিশ একটি স্মারক তৈরি করে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর গ্রহণ করবে।
(২) গ্রেফতারের অনূর্ধ্ব ০৬ (ছয়) ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিকটাত্মীয় ও বন্ধুদেরকে গ্রেফতারের বিষয়টি জানাতে হবে।
(৩) গ্রেফতারের কারণ, বাদী বা তথ্য দাতার নাম, ঠিকানাসহ কোনো পুলিশ অফিসারের তত্ত্বাবধানে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি অবস্থান করছে তার নাম ঠিকানা লিপিবদ্ধ করতে হবে।
(৪) রিমান্ড পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হাজির করতে হবে।
(৫) নির্যাতন করে কারো কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা যাবে না।
(৬) গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ৩ ধারা মোতাবেক ডিটেনশন প্রদান করার জন্য পুলিশ যদি আবেদন করে তবে ম্যাজিস্ট্রেট সে আবেদন গ্রহণ করবেন না। এ ধরনের ১১টি দিকনির্দেশনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হাইকোর্ট প্রদান করে (সূত্র : ৫৬ ডিএলআর হাই কোর্ট/৩২৪)।

বাংলাদেশ লিগ্যাল এইউ অ্যান্ড সার্ভিস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আবেদনক্রমে (রিট পিটিশন নং-৩৮০৬/১৯৯৮) ০৭/৪/২০০৩ তারিখে বিচারপতি হামিদুল হক ও বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা কোন ক্ষেত্রে এবং কোন পদ্ধতিতে প্রয়োগ করা যাবে এ মর্মে ১৫টি দিকনির্দেশনা দেন এবং ছয় মাসের মধ্যে তা কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন (সূত্র : ৫৫ ডিএলআর-৩৬৩/২০০৩)। ওই নির্দেশাবলিও এখনো আইনে পরিণত হয় নাই এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা কার্যকর করছে না।

২৪/০৫/২০১৬ প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাছান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মীর্জা হোসাইন হায়দার সমন্বয়ে গঠিত অ্যাপিলেট ডিভিশন বেঞ্চ গ্রেফতার ও রিমান্ডে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহার প্রতিরোধকল্পে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ০৭টি দিকনির্দেশনাসহ ১০টি গাইড লাইন প্রদান করা ছাড়া বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি দিকনির্দেশনা প্রদান করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতারকৃতদের প্রতি কী ধরনের আচরণ হওয়া আইনত বাঞ্ছনীয় তা নির্ধারণ করেছেন (সূত্র : ৬৯ ডি.এল.আর, এডি-৬৩)। উল্লেখ্য, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন হাইকোর্ট বিভাগের জন্য এবং সুপ্রিম কোর্টের যেকোনো বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন অধস্তন সব আদালতের অবশ্য পালনীয় হইবে।’

সাধারণ মানুষের ওপর আইন প্রয়োগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বেচ্ছাচারিতা রোধ করার জন্য অ্যাপিলেট ডিভিশন ও হাইকোর্ট যে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ মোতাবেক তা পালন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নিম্ন আদালত বাধ্য। তা সত্ত্বেও প্রতিনিয়তই জনগণ হয়রানির শিকার হওয়াসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ হয়নি। তদুপরি সংবিধানের ৩৩ ও ৩৫ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে যে,

সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৩৩
“(১) গ্রেফতারকৃত কোনো ব্যক্তিকে যথাসম্ভব শীঘ্র গ্রেফতারের কারণ জ্ঞাপন না করিয়া প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না এবং ওই ব্যক্তিকে তাহার মনোনীত আইনজীবীর সহিত পরামর্শের ও তাহার দ্বারা আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার হইতে বঞ্চিত করা যাইবে না।
(২) গ্রেফতারকৃত ও প্রহরায় আটক প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে গ্রেফতারের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে (গ্রেফতারের স্থান হইতে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আনয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যতিরেকে) হাজির করা হইবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ব্যতীত তাহাকে তদতিরিক্তকাল প্রহরায় আটক রাখা যাইবে না।’

সংবিধানের অনুচ্ছেদ-৩৫
“(১) অপরাধের দায়যুক্ত কার্য সংঘটনকালে বলবৎ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবে না এবং অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ সেই আইনবলে যে দণ্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাহাকে তাহার অধিক বা তাহা হইতে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাইবে না।
(২) এক অপরাধের জন্য কোনো ব্যক্তিকে একাধিকবার ফৌজদারিতে সোপর্দ ও দণ্ডিত করা যাইবে না।
(৩) ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচার লাভের অধিকারী হইবেন।
(৪) কোনো অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বাধ্য করা যাইবে না।
(৫) কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।
(৬) প্রচলিত আইনে নির্দিষ্ট কোনো দণ্ড বা বিচারপদ্ধতি সম্পর্কিত কোনো বিধানের প্রয়োগকে এই অনুচ্ছেদের (৩) বা (৫) দফার কোন কিছুই প্রভাবিত করিবে না।”

সংবিধান রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের ‘প্রস্তাবনার’ চতুর্থ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘আমরা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করিতেছি যে, আমরা যাহাতে স্বাধীন সত্তার সম্পৃক্তি লাভ করিতে পারি এবং মানবজাতির প্রগতিশীল আশা-আকাক্সক্ষার সহিত সঙ্গতি রক্ষা করিয়া আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে পূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারি, সেই জন্য বাংলাদেশের জনগণের অভিপ্রায়ের অভিব্যক্তিস্বরূপ এই সংবিধানের প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখা এবং ইহার রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধান আমাদের পবিত্র কর্তব্য।’

বাংলাদেশে বর্তমানে আইনের শাসন আছে, কিন্তু সুশাসন নেই। আইনের শাসন একপেশেভাবে চলছে। একই আইন ক্ষমতাসীনদের প্রতি কার্যকর হয় একভাবে এবং সাধারণ নাগরিক যাদের ‘মামার’ জোর বা খুঁটির জোর নেই বা যারা উপরতলার কারো রেফারেন্স ব্যবহার করতে পারে না তাদের জন্য আইন প্রয়োগ হয় ভিন্নভাবে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসাবে সবার দায়িত্ব সংবিধানকে সমুন্নত রাখা। সংবিধান যদি কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে তবে রক্ত দিয়ে কেনা স্বাধীনতার চেতনা হবে মূল্যহীন।

লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement