১১ আগস্ট ২০২২
`

শ্রীলঙ্কা ও কিছু কথা

শ্রীলঙ্কা ও কিছু কথা - ছবি : সংগৃহীত

স্কুলে কয়েক ক্লাস নিচে পড়ত আমার এক ভাতিজা। তার সাথে স্থানীয় একটা ছেলে পড়ত যার পিতার কর্মস্থল ছিল শ্রীঙ্কার রাজধানী কলম্বো। সে ছুটির দিনে তার বাবার কাছে চলে যেত এবং আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে কলম্বোতে কাটাত। এবার সে দেশ দুনিয়ার সবার উদ্বেগপূর্ণ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটের দরুন। এমন অবস্থা সে দেশে যে, প্রায় জন্মগতভাবে হৃদরোগী শিশু মীরুর অতীব গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনও সারতে হয়েছে মোবাইল ফোনের আলোতে। কারণ বর্তমানে বিদ্যুৎ প্রায় পাওয়াই যায় না শ্রীলঙ্কায়।

শ্রীলঙ্কার এক স্কুলপড়–য়া ‘অর্ধশিক্ষিত’ ফল ব্যবসায়ীর সাথে কথা হয়েছিল। ইংরেজির ওপর তার দখল দেখে অবাক হতে হয়। অবশ্য, দক্ষিণ এশিয়ার যে দেশে শিক্ষিতের হার সর্বাধিক (৯৭ শতাংশেরও বেশি), সে দেশে এমনটাই স্বাভাবিক। শিক্ষার পাশাপাশি অর্থনীতির দিক দিয়েও তারা অগ্রণী (ছিল)। ঢাকায় প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা বসে। এতে তৃতীয় বিশ্বের যে ক’টি রাষ্ট্র অংশ নিয়ে থাকে, তার মধ্যে শ্রীলঙ্কা অন্যতম। তাদের স্টল দেখেই জানা যায়, তারা পণ্য উৎপাদনে কতটা এগিয়েছে। শিক্ষিত ও সচ্ছল লোকের সে দেশের আজ বেহাল দশা। কেন? আমাদের দেশে অক্ষরজ্ঞান ছাড়াই অনেকে স্বাক্ষর দিয়ে ‘সাক্ষর’ হয়েছেন। আর বাংলাদেশে সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, এ দেশে ৭০ শতাংশ লোকই শিক্ষিত। জনগণ তা কতটা বিশ্বাস করে? এদিকে, অনেক মূর্খ লোক ‘জনপ্রতিনিধি’ হচ্ছেন কথিত ‘স্বশিক্ষিত’ বলে নিজেদের দাবি করে।

‘গো গোটা গো হোম, গো গো’Ñ হাজার হাজার উত্তেজিত মানুষের এই ¯েøাগান শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর রাজপথ সরব করে তুলেছে। হয়তো প্রধানমন্ত্রী ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের পর খোদ বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও তার আপন ভাই গোতাবায়া রাজাপাকসেকেও বড় ভাইয়ের মতো বিদায় নিতে হচ্ছে ক্ষমতা থেকে। তিনি ছিলেন জাঁদরেল প্রতিরক্ষামন্ত্রী। অল্প সময়ের মধ্যে হয়েছেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, নির্বাহী প্রধানরূপে প্রেসিডেন্ট। আর কী চাই?
শ্রীলঙ্কান লেখক ও মানবাধিকার কর্মী সাঞ্জা দ্য সিলভা জয়তিলকা তাই বলেছেন, সে দেশের বিখ্যাত দ্য আইল্যান্ড পত্রিকায় ‘গোতাবায়া : একজন রাষ্ট্রপ্রধান যখন পুরো জাতির দুঃস্বপ্ন’ শীর্ষক লেখায়Ñ ‘জনগণের সামনে এখন অস্তিত্বের সঙ্কট। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়াকে এখন তাদের একটি প্রশ্নই করতে হবে, যদি শ্রীলঙ্কা ও জনগণের প্রতি তার শ্রদ্ধা থাকে, তাহলে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে তার এবং সরকার থেকে তার দলের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শ্রীলঙ্কার সব সঙ্কট সমাধানের শুরুটা এখানেই।’ ‘মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন’ হলো, আসলেই কি গোতাবায়া চান তার দেশের সব সঙ্কটের সুরাহা হোক? গোতাবায়া সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে কঠোরতার সাথে তামিলদের দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহ দমন করেছেন। কিন্তু একইভাবে কি জনগণকে মোকাবেলা সম্ভব? তাই ধরে নেয়া যায়, এখন দেশে জরুরি অবস্থা কিংবা কারফিউতে কাজ হবে না। জনগণ যখন রাস্তায় নেমেছে তখন তাদের মূল দাবি তথা প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ করা, এটা পূরণ হতে হবেই।
আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন সরকারের একজন দায়িত্বশীল যে, শ্রীলঙ্কা সরকার তার বর্তমান আন্তর্জাতিক ঋণ ‘শোধ করায় (৫১ বিলিয়ন ডলার) অপারগতা ব্যক্ত করেছে। এর সোজা অর্থ, শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্রটি নিজেকে একেবারে নধহশৎঁঢ়ঃ বা দেউলিয়া ঘোষণা করে দিয়েছে। এ আশঙ্কা ছিল এবার শুরু হতেই। অবশেষে দু’টি আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন ও উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠানও ঠিক একই কথা বলল। গত ১৭ এপ্রিল ‘ইকোনমিক টাইমস’ পত্রিকা এটা জানায়। সংস্থাদ্বয়ের একটি, ফিচ রেটিংসে বলেছে, ‘সে দেশে সরকারি ঋণখেলাপের প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়ে গেছে।’ শ্রীলঙ্কা সরকার স্বীকার করে নিয়েছে, দেশটা সব ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত অর্থসঙ্কটে পড়েছে। এটা, বলা যায়, দেশটির স্বাধীনতার (১৯৪৮) পর আর ঘটেনি। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এসঅ্যান্ডপি-ও সে কথা বলেছে। আন্তর্জাতিক ঋণ ও তার সুদ বাবদ শ্রীলঙ্কা সরকার কমপক্ষে ৬৯০ কোটি ডলার পরিশোধের কথা এই বছরে। কিন্তু এপ্রিল মাসের গোড়ায় জানা যায়, তার বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ মাত্র ২৩১ কোটি ডলারে নেমে গেছে যা দিয়ে শ্রীলঙ্কা বড়জোর একটি মাস যাবৎ আমদানি করতে সক্ষম; এর বেশি নয়।

পক্ষান্তরে সরকারি হিসাব মতে, এখনো বাংলাদেশের হাতে রয়েছে, ‘এর চেয়ে অনেক বেশি’ বৈদেশিক মুদ্রা। তাই প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে কথাটা জোর দিয়ে বলা হয়েছে বারবার। অবশ্য ভবিতব্য কার কেমন, তা কেবল আলেমুল গায়েব মহান আল্লাহ তায়ালাই জানেন। তাই কোনো অহঙ্কার না করে বরং সদা সতর্ক থাকাই উচিত। বাংলাদেশ কোনো দিন শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান হবে নাÑ এটা না বলে এটা না হওয়ার জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করাই উত্তম নয় কি? শ্রীলঙ্কার অবস্থা আমাদের তুলনায় বহু গুণ ভালো ছিল বৈকি। আর আজ? দেশটি বই-পত্রিকা পর্যন্ত ছাপাতে পারছে না কাগজ নেই বলে। কাগজ আমদানির ডলারও তার নেই। তা হলে কী করবে এখন? বাণিজ্য ঘাটতি চরমে, রিজার্ভ প্রায় শূন্য, রেমিট্যান্সে ধস নেমেছে, পর্যটন আয়ও সামান্য হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কা আজ দিশেহারা।

আরবিতে শ্রীলঙ্কা পরিচিতি ‘সরনদীব’ হিসেবে। অনেকে মনে করেন, ইংরেজি ভাষায় ঝবৎবহফরঢ়রঃু শব্দটা এসেছে আরবি কথাটি থেকে। এ শব্দের অর্থ, আকস্মিকভাবে বিপুল অর্থবিত্তসমেত সৌভাগ্যের অধিকারী হওয়া। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা প্রাচীনকাল থেকেই এর প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধির জন্য খ্যাত ছিল বিশ্বে। আর সেজন্য ইউরোপের বিদেশীরাও বারবার আকৃষ্ট হয়েছে এর প্রতি। আর এখন?

মালয়েশিয়াতে রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে কিছুটা দূরে পুত্রজায়াতে সে দেশের সরকারের সদর দফতর সরিয়ে নেয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে সরকারের অনেক কিছুই সরানো হয়েছে সাবেক একজন প্রেসিডেন্টের নামে রাখা ‘জয়াবর্ধন পুরা’তে। তবে মালয়েশিয়া আর শ্রীলঙ্কার প্রভেদ হলো, এক দেশে তা করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডা: মাহাথির মোহাম্মদ আজও জনপ্রিয়। আর শ্রীলঙ্কার শাসক ভ্রাতৃদ্বয়ের বেহাল অবস্থা তো সমগ্র দুনিয়াতেই স্পষ্ট। রাজাপাকসেদের পাকসে বা পাখা গুটিয়ে নিতে হচ্ছে।

দেশটার আজকের অবস্থার জন্য প্রধানত চীনকে দায়ী করেছে মহলবিশেষ। ব্যাপারটা তলিয়ে দেখা উচিত। শ্রীলঙ্কার ঋণের বোঝার জন্য মাত্র ১০ শতাংশ চীনের। অথচ তাকে ৯০ শতাংশ দায়ী করা হচ্ছে। এটা নিঃসন্দেহে চীনের প্রতিপক্ষ ভারত আর আমেরিকার লবির ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো। তবে চীন যতই অস্বীকার করুক এ নিয়ে, দেশটি সংশ্লিষ্ট প্রচারণা যুদ্ধে অনেকটা হেরেই গেছে।

আসলে রাজপাকসে সরকারের সমস্যা তিনটি। ক. উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত; খ. নিজস্ব অর্জিত এবং গ. বিশ্ব পরিস্থিতির কুফল। তৃতীয় ভাগে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কোভিড মহামারী, ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদ, ইউক্রেন যুদ্ধ প্রভৃতি বড় বড় কারণ। এটাকেই হয়তো বলা হয় ‘নেমেসিস’ বা নিয়তি। সব মিলে শ্রীলঙ্কার গোতাবায়া সরকারের অবস্থা বড়ই কাহিল হয়ে পড়েছে। এখন খতিয়ে দেখা দরকার, সঙ্কটের প্রকৃত কারণগুলো এবং সেগুলোর স্থায়ী প্রতিকারের পন্থা। অন্যথায়, রাজাপাকসে কিংবা চীনকে গালি দিয়ে কী লাভ? আমেরিকা বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালাতে পারে চীনকে নিয়ে; তাতে ফায়দা কী?
শ্রীলঙ্কার চলমান দুর্গতির সুযোগে মহলবিশেষ যেন প্রতিপক্ষকে একহাত ভালোভাবে দেখে নেয়ার সুযোগ পেয়ে গেছে। তাই চলছে প্রধানত চীনবিরোধী উদ্দেশ্যমূলক প্রপাগান্ডা। আর বাংলাদেশে রাজনীতির একপক্ষ ‘শ্রীলঙ্কা আইলো’ রব না তুলতেই বিপরীত শক্তি ‘লঙ্কাকে আসতেই দেবো না লঙ্কাকাণ্ড ঘটাতে।’Ñ এই ধনুর্ভঙ্গপণ ঘোষণা করছে বারবার তার স্বরে। দুটোই অবাস্তব।

প্রসঙ্গত, একজন কলামিস্ট বলেছেন, খোদ শ্রীলঙ্কার মূলধারার মিডিয়াগুলো জানাচ্ছে, বর্তমান সঙ্কটের মূল কারণ এমন প্রশাসনিক পদক্ষেপ যা কার্যকর হয়নি বা নয়। কিন্তু পাশ্চাত্য গণমাধ্যমের (তার দেখাদেখি বাংলাদেশসহ প্রাচ্যেও) প্রচারণা, ‘চীনের ঋণের ফাঁদ শ্রীলঙ্কা দেশটাকে আর্থিক সমস্যায় ফেলেছে।’ এটা সত্য দাবি নয়। শ্রীলঙ্কার সরকার জানায়, এ দেশে ঋণকাঠামোর জটিলতা আছে। বিশ্বের আন্তর্জাতিক ঋণবাজার হতে লঙ্কা সরকার সর্বাধিক ঋণগ্রস্ত এবং সেটা সর্বমোট ঋণের ৪৭ শতাংশ বা অর্ধেকের মতো। এডিবির ঋণ রয়েছে ১৩ শতাংশের মতো। জাপান ও চীন ১০ শতাংশ করে, বিশ্বব্যাংক ৯ শতাংশ এবং ভারতের ২ শতাংশ ঋণ। অতএব, কথিত ঋণের চীনা সঙ্কট কোনো বড় হেতু হতে পারে না।

আসলে এটা শ্রীলঙ্কার জনগণসহ আন্তর্জাতিক স¤প্রদায়কে বিভ্রান্ত করতে পশ্চিমাদের ‘মোক্ষম ফাঁদ’। সন্দেহ নেই, বাংলাদেশসমেত দুনিয়ার মিডিয়ায় বড় অংশই এতে পা দিয়ে ফেলেছে। ফাঁকতালে জাপান, এডিবি, বিশ্বব্যাংক প্রভৃতি বড় বড় ঋণদাতারা ‘বেঁচে যাচ্ছে’। তেমন অভিযুক্ত হচ্ছে না স্বয়ং উচ্চাভিলাষ, মেগা প্রকল্প, ক্ষমতার অপরাজনীতি, পরিবারতন্ত্র, কর্তৃত্ববাদী দুঃশাসন, শাসকের ব্যর্থতা আর গণতন্ত্রের নামে ভণ্ডামি। আসল কারণ হলো ক্ষমতার লোভ, নেতাদের উচ্চাভিলাষ ও অনর্থক মেগা প্রজেক্ট। না হয় নাটের গুরু মাহিন্দার বাড়ির কাছে হাম্বানটোটায় কেন ব্যয়বহুল গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প নেয়া হবে? এখন ঋণ শোধে ব্যর্থতায় তা চীনা কোম্পানিকে লিজ দিতে হয়েছে দীর্ঘমেয়াদে। দায় দেনাও সে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কারণেই। তবুও চীন সরকারকে গালি দেয়া চাই। কারণ, এটাই ‘ওদের’ চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারের মহাসুযোগ। শ্রীলঙ্কার নেতা যে, নিজ এলাকায় নিজের রাজনৈতিক মতলবে অপ্রয়োজনীয় অপপ্রকল্প নেন, সে কথা বলা হচ্ছে না। এর আরেকটি উদাহরণ, বিমানবন্দর প্রকল্প যা সাগরের বুকে জমি উদ্ধার করে বানানোর কথা। সিঙ্গাপুর, দুবাই, হংকংকে টেক্কা মারার জন্যই এতকিছু।

শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি সারা বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলছে। Bear in mind, Sri Lanka was now at the peak of its economic crisis. The entire island was swept with deep economic problems, fuel and power shortages among other things, while heavy protest were going on all over Colombo as well as other major cities. We painted through it all, including rain and one day, there was a nationwide state of emergency declared.

লিখেছেন একজন বাংলাদেশ মহিলা চিত্রশিল্পী। শ্রীলঙ্কায় বাংলাদেশের মতো ১৪ এপ্রিল নববর্ষ। এবার তা-ও ছিল ব্যাপক বিক্ষোভ দিবস।


আরো সংবাদ


premium cement