০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`
অশান্ত সময়ের স্মৃতিমন্থন : পর্ব-২

রেহমান সোবহানের লেখায় বাকশাল ও রক্ষীবাহিনী প্রসঙ্গ

রেহমান সোবহানের লেখায় বাকশাল ও রক্ষীবাহিনী প্রসঙ্গ - ছবি : সংগৃহীত

খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান ‘আনট্রাঙ্কুইল রিকালেকশন্স অর্থাৎ উতল (অশান্ত) সময়ের স্মৃতিমন্থন শিরোনামে তিন খণ্ডে আত্মজীবনী লিখেছেন। প্রথম খণ্ড আগেই প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে গত মার্চ মাসে। আর তৃতীয় খণ্ডটি প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। দ্বিতীয় খণ্ডটি, ‘আনট্রাঙ্কুইল রিকালেকশন্স : ফ্রম ডন টু ডার্কনেস’ গ্রন্থে বাকশাল ও রক্ষীবাহিনী নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। বাকশালকে তিনি একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং রক্ষীবাহিনীকে ‘কুখ্যাত’ বলে মন্তব্য করেছেন।

বইটির চতুর্দশ অধ্যায়ে (৩৩৩ পৃষ্ঠায়) তিনি লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র বদল করে একদলীয় ব্যবস্থা চালু করেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েন করেন। তিনি প্রশাসন এবং এর প্রশাসনের বাইরের অপরাধীদের পাকড়াও করার ক্ষমতা দেন সেনাবাহিনীকে। তখন নাগরিকদের হাতে বিপুল অস্ত্রশস্ত্র, খাদ্য মজুদ ও সীমান্তে চোরাচালানের মতো সঙ্কট ছিল লাগামহীন।

নিজ দলে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতায় অসন্তুষ্ট ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সেনাবাহিনীকে দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের পাকড়াও করার নির্দেশ দেন। রেহমান সোবহানের সাবেক ছাত্র এবং তখন জেলা প্রশাসক বা ডিসি হিসেবে কর্মরত অনেকে তাকে জানিয়েছেন যে, তাদের বলা হয়, মন্ত্রীদের ফোন পেলেও অপরাধীদের যেন ছাড় দেয়া না হয়। সেনাবাহিনী তখন রাজনৈতিক সমর্থনপুষ্ট অপরাধীদের নির্মমভাবে দমন করে। এ প্রসঙ্গে রেহমান সোবহান একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেছেন বইয়ের ৩৩৪ পৃষ্ঠায়।

তিনি পরিকল্পনা কমিশন থেকে বিদায় নেয়ার সিদ্ধান্তের পর বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে তার কার্যালয়ে গেলে একজন খ্যাতনামা ছাত্রনেতা অনুমতি ছাড়াই সেখানে ঢুকে পড়েন। এতে বঙ্গবন্ধু ক্ষিপ্ত হয়ে গেলে সেই ছাত্রনেতা তার পা জড়িয়ে ধরেন এবং বলতে থাকেনÑ তার নিজ এলাকার দলীয় কর্মীদের ওপর সেনাবাহিনী দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু যেন তাদের রক্ষা করেন। বঙ্গবন্ধু এতটাই ক্ষিপ্ত ছিলেন যে, তাকে কার্যত লাথি মেরে তার রুম থেকে বের করে দেন।

রেহমান সোবহান লিখেছেন, এ সময় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে এবং অনেক দুর্নীতিবাজ ও ‘কুখ্যাত’ আওয়ামী লীগ নেতাকে গুলি করে হত্যা করে। সন্ত্রাস দমনে ১৯৭৪ সালে ‘কুখ্যাত’ রক্ষীবাহিনী মোতায়েন করা হয়। এ বাহিনী সরকারদলীয় অস্ত্রধারীদের পাশাপাশি সরকারবিরোধী ‘অহিংস’দেরও কঠোরভাবে দমন করে।

১৯৭২ সালে রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয় মূলত ‘মুজিববাহিনী’র সদস্যদের নিয়ে। কারণ তাদেরকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বা তখনকার বাংলাদেশ রাইফেলসে (বিডিআর) আত্তীকরণ করা সম্ভব হয়নি। স্বাধীনতা পরবর্তীতে বামপন্থী বিদ্রোহীদের সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের কথা মাথায় রেখে মুজিববাহিনী গঠন করেছিল ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা, রিসার্চ অ্যান্ড এনালাইসিস উইং ‘র’। সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থান ঠেকাতে রক্ষীবাহিনী গঠন করেন বঙ্গবন্ধু। এ জন্য নিয়মিত সশস্ত্রবাহিনী রক্ষীবাহিনীকে সুনজরে দেখত না।

বঙ্গবন্ধু সরকারের শেষ বছরে রক্ষীবাহিনী সরকারবিরোধীদের নির্মমভাবে দমন করে। তবে তাদের হাতে অনেক খুনিও মারা যায় যারা আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যায় জড়িত ছিল।

রেহমান সোবহান লিখেছেন, এ সময় নৈরাজ্য বেড়েই চলছিল এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির জন্য সরকারি দলের ভ‚মিকাও কম দায়ী ছিল না। তখন ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড সরকারের ভাবমর্যাদার ক্ষতি করে। এ সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকে। বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনির সমর্থকরা ঢাকা বিশ^দ্যিালয়ের ছাত্রলীগ নেতা শফিউল আলম প্রধানের সমর্থকদের সাথে গোলাগুলিতে লিপ্ত হয়। শফিউল আলম প্রধান ছিলেন তোফায়েল আহমেদ ও আবদুর রাজ্জাকের সমর্থক। ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে এভাবে দ্ব›দ্ব চরম আকার ধারণ করলে বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।

বাকশাল গঠনের সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করেন সিরাজুল আলম। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি জাসদ ন্যাপ (ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি), মণি সিংহের কমিউনিস্ট পার্টি ও কিছু বেইজিংপন্থী বাম দলকে নিয়ে বাকশাল গঠনের আলোচনা চলে। এর মধ্যে রাশেদ খান মেনন ও কাজী জাফরের দলও ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তারা বাকশালে যোগ দেয়নি। জেএসডি বা জাসদ একদলীয় ব্যবস্থার বিরোধিতা করে এবং বঙ্গবন্ধুকে জোট সরকার গঠনের পরামর্শ দেয়।

রেহমান সোবহান লিখেছেন, ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এতে মর্জিমাফিক গ্রেফতারের ক্ষমতা পায় সরকার। এর এক মাসের মাথায় ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী এনে একদলীয় শাসন বাকশাল কায়েম করা হয়। তখন শুধু দু’জন সংসদ সদস্য এর বিরোধিতা করেন। তারা হলেন জেনারেল ওসমানী ও ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। তারা বাকশালের প্রতিবাদে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২৪ ফেব্রæয়ারির মধ্যে দেশের সব রাজনৈতিক দলকে বিলুপ্ত (নিষিদ্ধ) করা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগও বিলুপ্ত হয়ে যায়। পরিবর্তে গঠন করা হয় ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ বা বাকশাল। আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, মস্কোপন্থী ন্যাপ ও কয়েকটি ক্ষুদ্র দলের সদস্যদের বাকশালে নেয়া হয়।

তিনি লিখেছেন, বাকশাল গঠনের পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। একদলীয় সর্বময় ব্যবস্থায় গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ ও সব রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া হয়। নিরাপত্তাবাহিনীকে দিয়ে নির্মমভাবে প্রতিরোধ আন্দোলনকে দমন করা হয়। বর্তমানে কথিত ক্রসফায়ারের আদলে তখন সিরাজ শিকদারকে হত্যা করা হয়।

রেহমান সোবহান লিখেছেন, এ সময় কৃত্রিম শান্তি বিরাজ করছিল। সরকারের কঠোর সমালোচক ‘ফায়ারব্র্যান্ড’ তরুণ ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও এনায়েতুল্লাহ খানকে সাময়িক সময়ের জন্য আটক করা হয়। মওদুদকে আটকের পর বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি মওদুদকে আদর করেন এবং বলেন, ‘আবার যেন দুষ্টুমি করো না’।

সব সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়। সোভিয়েত মডেল অনুসরণ করে সশস্ত্রবাহিনীর প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটিতে রাখা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আবদুল মতিন চৌধুরী তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বাকশালে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। ১৫ আগস্ট ঢাবিতে এক অনুষ্ঠানে বাকশালে যোগদানকারী শিক্ষকদের নাম বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেয়ার কথা ছিল।’

রেহমান সোবহান লিখেছেন, ঢাবির বিপুলসংখ্যক শিক্ষক এই ‘বিব্রতকর প্রকল্পে’ স্বাক্ষর করেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্যের অংশ হিসেবে নয়, বরং ক্যারিয়ারের সুবিধার জন্য তারা এটি করেন। তবে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, আনিসুজ্জামান, রওনক জাহান, সালমা সোবহান বাকশালে যোগদান থেকে বিরত ছিলেন। সে সময় বিআইডিএসে কর্মরত রেহমান সোবহানকেও বাকশালে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এতে তিনি ‘মর্মাহত’ হন।

রেহমান সোবহান লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর তাসের ঘরের মতো বাকশালও ধসে পড়ে। বাকশালের পর নৈতিকভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় খোদ আওয়ামী লীগ। তাই বঙ্গবন্ধু হত্যার পর আওয়ামী লীগ তার জানাজার আয়োজনও করতে পারেনি।

তিনি লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠনের উদ্যোগ নিলে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা, এমনকি মন্ত্রীও পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যদের অনুরোধ করেন, তারা যেন এ ধরনে রাজনৈতিক ক্ষতিকর কাজ থেকে তাকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু মন্ত্রিসভার কোনো সিনিয়র সদস্য বঙ্গবন্ধুকে এ কথা বলার সাহস দেখাননি যে, তার এ পদক্ষেপ বিজ্ঞচিত নয়।

এ সময় রেহমান সোবহান, অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম ও ড. কামাল হোসেন বাকশালের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকে বোঝাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু রেগে যান এবং বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সীমানার মধ্যে থাকো’। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোমরা অর্থনীতিতে পিএইচডি আর আমি বাস্তব রাজনীতিতে পিএইচডি’।

নুরুল ইসলাম তার স্মৃতিকথা ‘অ্যান ইকোনমিস্ট টেল’ গ্রন্থে লিখেছেন, তিনি একবার বিদেশে সফরে একান্তে বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা বলার সুযোগ পেলে বাকশাল প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেন, আপনি গণতন্ত্রের জন্য বহু বছর সংগ্রাম করেছেন আর এখন তাকে ত্যাগ করছেন।’ এতে বঙ্গবন্ধু ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এর আগে বঙ্গবন্ধুকে কোনো অপ্রীতিকর প্রশ্ন করলেও তিনি রাগতেন না। সংসদে বাকশাল প্রতিষ্ঠার আইন পাসের দিন কৌশলে ড. কামাল হোসেন অক্সফোর্ডে থেকে যান। এর মাধ্যমে তিনি বাকশালের বিরুদ্ধে ভোটদানের মতো চ্যালেঞ্জ থেকে রক্ষা পান।

রেহমান সোবহান লিখেছেন, বাকশালের শেষ পরিণতি ছিল একদলীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ করতাম, গণতান্ত্রিক পথ থেকে বঙ্গবন্ধুর এই বিচ্যুতি তাকে নি:শেষ করে দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। তাকে শেষ করে দিয়ে বলা হবে, তারা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছে। বাস্তবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ১৬ বছর গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হয়নি। ১৬ বছর ক্যান্টনমেন্টে বন্দী ছিল বাংলাদেশ।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব।
ই-মেইল : abdal62@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement