১৯ আগস্ট ২০২২, sdsjdb sj, shaban
`

জিম ও’নিল : যে নায়ক এখন ভিলেন!

জিম ও’নিল : যে নায়ক এখন ভিলেন! - ছবি : সংগৃহীত

জিম ও’নিল মূলত যুক্তরাজ্যের এক অর্থনীতিবিদ। আমেরিকার নিউ ইয়র্ক সিটির ওয়াল স্ট্রিট পাড়ায় সবচেয়ে প্রভাবশালী এক বিনিয়োগ কোম্পানি ‘গোল্ডম্যান স্যাশে’Ñ আর এরই প্রধান অর্থনীতিবিদ ছিলেন তিনি; আর এর পুরো সময়কাল হলো ১৯৯৫-২০১৩ সাল। পরে ২০১৫-১৬ সালে তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেট’ নামে প্রবন্ধ সংগ্রহ ও মজুদের যে ওয়েবসাইটটা আছে সেখানে ২০০৮ সাল থেকেই নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।

গোল্ডম্যানের সাথে থাকার সময়ের তার কিছু কাজ দুনিয়ায় সবচেয়ে প্রভাব পড়া ঘটনা যা তাকে বিখ্যাত করেছিল বলে মনে করা হয়। ২০০১ সালে থেকে প্রথম আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সমান্তরাল নয়া ব্রিকসের ধারণা (যা থেকে পরে ব্রিকস ব্যাংক হয়) নিয়ে আসেন। কাজের অংশ হিসেবে তিনি তখন আসলে একটা নিবন্ধ বা পেপার লিখেছিলেন যার শিরোনাম ছিল ‘বিল্ডিং বেটার গ্লোবাল ইকোনমিকস ব্রিকস’। পরে সেই ধারণাটাই আরো সবিস্তার করেছিলেন ২০০৩ সালে সিরিজ আকারে লিখে। সেখানেই তিনি পরিসংখ্যান মূল্যায়নের ভিত্তিতে একটি পূর্বাভাস বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘২০৪০ সালের মধ্যে চীনা অর্থনীতি আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে’।

সেই ও’নিল ২০২১ সালের নভেম্বরে তার সেই প্রথম রচনার ২০ বছর পূর্তিতে এ নিয়ে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটেই একটি কলাম লিখেছিলেন। উইল দ্যা ব্রিকস এভার গ্রো আপ? যেখানে তার আরো কিছু আপডেট মূল্যায়ন যোগ করেছিলেন।

তবে তার ২০০১ সালের প্রথম মুখ্য মন্তব্যটা ছিল, তিনি ‘রাইজিং ইকোনমির’ দেশ বলে একটা নয়া শব্দ চালু করেছিলেন। সেকালেই দাঁড়িয়ে দেখে, শতকোটির উপরের জনসংখ্যার দুই দেশ চীন ও ভারতকে এদের অর্থনীতির গ্রোথ রেট দেখে তিনি ‘রাইজিং ইকোনমি’র দেশ বলে আলাদা এই ক্যাটাগরি করেছিলেন। সার কথায় বলেছিলেন, চীনা অর্থনীতি সবাইকে ছাড়িয়ে এক নম্বর অবস্থানে যাবে। আর ভারত সেকালের এশিয়ার জাপানকেও ছাড়িয়ে দ্বিতীয় আমেরিকার পরে, মানে তৃতীয় স্থানে উঠে যাবে। শুধু তা-ই নয়, তৎকালের বিবেচনায় সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির ব্লক বা গ্রুপের দেশ বলতে জি-৭ দেশগুলোকে বোঝানো হতো; সেই জি-৭ ভুক্ত (কানাডা বাদে) দেশগুলোর মোট প্রবৃদ্ধির চেয়ে একত্রে এই রাইজিং ইকোনমিগুলোর দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি যোগ করলে তা বেশি হবেÑ এই ছিল তার প্রধান দৃষ্টি-আকর্ষণী বক্তব্য! অর্থাৎ তিনি তুলনা করছিলেন সেকালের টপ ইকোনমিক ব্লক সাত দেশের সাথে রাইজিং ইকোনমিগুলোর প্রবৃদ্ধি যোগফলÑ এটি তুলনায় ভালো বলে দাবি উঠিয়ে।

স্বভাবতই জিম ও’নিল এর এই কাজ, এটি কোনো গণকের ভাগ্য গণনা ছিল না। ছিল বাস্তব পরিসংখ্যানগত ফ্যাক্ট ও ফিগারের উপরে দাঁড়িয়ে করা বিশ্লেষণ। তাই ওই প্রবন্ধ সেকালে ওয়াল স্ট্রিট জগতে অর্থাৎ গ্লোবাল বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারের জগতে ব্যাপক আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। মূল কারণ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে কখনো কম হারে প্রবৃদ্ধিও গ্লোবাল বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারের জগতে খুবই নেতি চোখে ও ব্যবসা খারাপ যাওয়ার ইঙ্গিত বলে বিবেচিত হয়। তাদের হিসাবটা সোজা; যে যত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ততই তা আরো বড় বিনিয়োগ পুঁজির জন্য বড় চাহিদার বাজার আর ততই তাদের ব্যবসা হবার সম্ভাবনা নিয়ে আসবে।
আর এখানেই একপর্যায়ে জাতিবাদ ব্যর্থ ও ভেঙে পড়া শুরু হয়ে যায়। কিভাবে, কেন?

‘ওয়াল স্ট্রিট’ বলতে এখানে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে :
‘ওয়াল স্ট্রিট’ বলতে এখন থেকে সেটি আর কেবল নিউ ইয়র্কের কোনো একটি পাড়া-মহল্লাই নয়, বরং প্রতীকী অর্থে এটিই গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ; এটিকেই বোঝানো হয়েছে। কারণ এ ধরনের কোম্পানির প্রধান অফিসগুলো বেশির ভাগই নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিট পাড়ায় অবস্থিত। অনেকটা যেমন খুবই ক্ষুদ্র-অর্থে হলেও বাংলাদেশের পুঁজি ও শেয়ারবাজার বলতে ‘মতিঝিল’ বোঝানো যায় যেখান থেকে তা হাঁটি হাঁটি পায়ে আগাচ্ছে-পড়ছে। একালে ওয়াল স্ট্রিট আর কেবল ওয়াল স্ট্রিটেই নয়, তা ছেড়ে একটি দুবাইয়ে ও আরেকটি সিঙ্গাপুরে কিন্তু ওয়াল স্ট্রিটেরই সহযোগী হিসেবে নয়া অঞ্চলে, গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজার হিসেবে যাত্রা শুরু করে দিয়েছে। তাই ‘ওয়াল স্ট্রিট’ বললে এখন থেকে বুঝতে হবে এর ব্যাপকার্থে গ্লোবাল বিনিয়োগ কোম্পানি ও গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের কথাই বলছি।

নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের জন্ম বা যাত্রা শুরু ধরা হয় ১৭৯৪ সাল। তখনকার গভর্নর পিটার স্টাইভেসেন্টের এক নির্দেশে ওয়াল স্ট্রিট গড়ে উঠেছিল মূলত নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জকে কেন্দ্র করে। আর এর প্রায় শত বছর পরে ১৮৮০ এর দশকে আমেরিকান অর্থনীতি তখনকার বড় ব্রিটেনকে প্রথম ছাড়িয়ে গিয়েছিল। যে ব্রিটিশ এম্পায়ার ছিল সবচেয়ে বড় কলোনি দখলদার যার সূর্য নাকি ‘কখনো অস্ত যায় না’ বলে গর্ব করা হতো। আর এরও পরবর্তীতে আরেক বিরাট ঘটনাটা হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-৪৫)। যে সময়ের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট, যাকে বলা হয় আমেরিকাকে দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা বানানোর নায়ক; সেই রুজভেল্ট ছিলেন আসলে প্রধানত ওয়াল স্ট্রিটেরই স্বার্থ মাথায় রেখে চলা প্রেসিডেন্ট। আর এভাবেই তিনিই প্রথম আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার স্তরে উত্তীর্ণ করেছিলেন। রাষ্ট্রের হাতে সঞ্চিত বিপুল উদ্বৃত্ত সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করে, মূলত ওয়াল স্ট্রিটের কোর স্বার্থে, তিনি আমেরিকাকে এই স্তরে উঠিয়েছিলেন। আর তাই এই প্রেসিডেন্টের আশপাশের প্রায় উপদেষ্টা-মন্ত্রী-পরামর্শদাতা বা দফতর পরিচালকরা যারা ছিলেন তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড হলো যারা এর আগে ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো চালাতেন, মানে ওর (ঠিক মালিক না) পরিচালন-কর্তা বা এক্সিকিউটিভ ছিলেন।

এখন যে প্রশ্নটা তুলব, সেটি হলো নিউ ইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ কি সবসময় আমেরিকা রাষ্ট্রের স্বার্থ ছিল? হয়ে আছে বা থাকতে পেরেছে? এর জবাব খুঁজব এখন।

জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমি’ বলে নয়া টার্মে কথা বলা শুরু করেছিলেন তখনকার চীনা অর্থনৈতিক উত্থান মানে ডাবল ডিজিট গ্রোথের প্রথম দশকটা (১৯৯০-২০০০) পার হয়ে গেছে। ও’নিল মূলত চীনের এই উত্থান দেখেই ‘রাইজিং ইকোনমি’ টার্মটা আনছেন, কারণ ভারতের তখনো তেমন নড়াচড়া শুরু হয়নি। তবে ভারতেরও চীনের মতোই বিপুল জনসংখ্যার দেশ শতকোটি ছাড়িয়েছে যা; যার সোজা মানে, একটা সঠিক নীতি-পলিসি বেছে নিতে পারলে এই জনশক্তিই হয়ে উঠবে সম্পদÑ আর তাতে বিপুল উদ্বৃত্ত ও সঞ্চিত সম্পদের এক রাষ্ট্র হতে পারে ভারত। তাই চীনকে দেখেই ভারতও সেই থেকেই হতে পারেÑ এমন সম্ভাবনাময় গোনায় ধরা দেশ বলে গণ্য হয়ে উঠেছিল।
সে সময় বলতে তা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট (২০০১-০৮) জুনিয়র বুশের শেষ আমল আর প্রেসিডেন্ট (২০০৯-১৬) ওবামা আমলের শুরুর কালÑ এই মিলিত সময়কাল ছিল সেটি।

সময়টা একই সাথে আরো অনেক কিছুর। যেমন আফগানিস্তানে বুশের ওয়ার অন টেররে পা আটকে যাওয়া টের পাবার সময় সেটা। মানে ২০০৫-০৬ সাল থেকেই এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তখন আর সোভিয়েত-আমেরিকা এই দুই মেরু দুনিয়া নয়, কাজেই একা আমেরিকা দুনিয়াতে যা খুশি করতে পারে বাধাহীন যা আগে ভাবা হয়েছিল, তখন বোঝা যায় যে তা ভিত্তিহীন। কারণ আমেরিকা তখন নিজেই এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে যেখানে বিজয় দূরে থাক যুদ্ধ-ফেলে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশু সম্ভাবনাটুকুও নেই। মানে নিরন্তর খরচের এক অন্তহীন যুদ্ধে আটকে গেছে আমেরিকা। আর এতে খরচ জোগাতে ব্যর্থ আমেরিকান অর্থনীতি শেষে এ থেকেই এক নয়া গ্লোবাল মহামন্দা (২০০৭-০৮) ডেকে এনেছিল। অথচ তুলনায় তখনো চীনের প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিট না হলেও ৭-৮ শতাংশ চালিয়ে যাচ্ছে। মহামন্দার প্রভাব পশ্চিমা দেশে ছিল সর্বোচ্চ অথচ যেটা চীন-কেন্দ্রিক এশিয়া দেশে ততটা অনুভ‚ত নয়।

আর এসব কিছু দেখে শেষে ওয়াল স্ট্রিট আর আমেরিকা-কেন্দ্রিক বা পশ্চিমাকেন্দ্রিক থাকতে পারেনি। বিদেশে যেখানেই আয় করুক, আমেরিকাতেই তাকে উদ্বৃত্ত সম্পদ ফেরত নিতে হবে, এই বাধ্যবাধকতা এই প্রথম সে ভুলতে শুরু করেছিল। এশিয়াতেই নয়া বিনিয়োগ বাজার, তাই নয়া চাহিদার দেশ অঞ্চলকেন্দ্রিক হয়ে যায় সে। আমেরিকান নিজস্ব সার্ভে রিপোর্টগুলোতেও তা প্রতিফলিত হতে থাকে। সার কথায়, ওয়াল স্ট্রিট আর জাতিবাদী থাকেনি। গ্লোবাল স্বার্থ হয়ে উঠেছিল। আবার এখানেই জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমি’ এই তত্ত¡ আনলেন এটিই আসলে তখন সাফাই হিসেবে ব্যবহৃত হতে থেকেছিল। এক কথায়, এই প্রথম ওয়াল স্ট্রিট আমেরিকার রাষ্ট্র স্বার্থ ফেলে চীনা ‘রাইজিং ইকোনমি’র ভেতরে নিজের ‘কোর’ মানে, গ্লোবাল বিনিয়োগের বাজার স্বার্থ খুঁজে পেয়েছিল!

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সংস্কার
সাথে আরেক উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা ছিল ২০০৯ সালের। ঘটনাটা বিশ্বব্যাংকের ঢেলে সাজানো। না, সবটা ঠিক বললাম না। আসলে এটি হলো ঘটনার কেবল বাইরের দিকটা দেখে বললে। বিশ্বব্যাংক জন্ম থেকেই এর অভ্যন্তরীণ তথ্য উন্মুক্ত নয় এভাবেই গড়ে উঠেছে। এর সম্ভাব্য দুটো কারণ আছে মনে করা হয়। এক. বিশ্বব্যাংক কোনো সাধারণ আম পাবলিককে সার্ভিস দেয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। তবে পাবলিকের যে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠান আছে মূলত এর সাথে তার কারবার ও ডিলিং। আর সেটিকেই সুযোগ হিসেবে নিয়ে কান্ট্রি অফিসগুলো (যেমন বাংলাদেশের) পাবলিক থেকে দূরে পাবলিক ডিলিং না করেও চলতে পারত। সাধারণ তথ্য যেমন কান্ট্রি প্রোফাইলÑ এ তথ্যও উন্মুক্ত ছিল না তখন। দুই. এরই সম্ভাব্য কারণ মনে করা হয়, কোল্ডওয়ার যুগ বলে ছিল কমিউনিস্ট ভীতি। এ ভীতির কারণে নিজেকে ঢেকেঢুকে কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের বহির্বিভাগ (ইআরডি বা এক্সটারনাল রিসোর্স ডিভিশন) আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (বাংলাদেশ ব্যাংক যেমন) সাথে যোগাযোগের মধ্য দিয়েই তৎপরতা চালিয়ে নিতে অসুবিধা হতো না। এই ঢেকেঢুকে চলা সিদ্ধান্ত ভেঙে নিয়ে বিশ্বব্যাংক উন্মুক্ত হয়ে যায় ২০০৯ সাল থেকে। এমনকি এখন তো কান্ট্রি অফিসেরও ফেসবুক পেজ আছে যেখানে অনেক ইস্যুতে ওপেন আলোচনাও দেখতে পাওয়া যাবে। প্রশ্নোত্তর ও তথ্য সেখান থেকে পাওয়া যাবে। এ ছাড়া প্রতিটি ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের কান্ট্রি অফিসগুলো বা হেড কোয়ার্টারের বহু কিছুই এখন নানা ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি যে কেউ নিজেই জানতে পারে। একালে ডিসকাশন বøগও আছে যার বুলেটিন পাওয়া বা সদস্য হওয়া যায়। কিন্তু কেন এই উন্মুক্ততা? সেটাও জিম ও’নিল-এর পরোক্ষ প্রভাব। কিভাবে সেটি?

আসলে রাইজিং ইকোনমির দেশগুলোর মোট প্রভাব চেয়ে জি-৭ উন্নত অর্থনীতিগুলোকেও ছাপিয়ে যাচ্ছেÑ এ কথার গুরুত্ব কেউ অস্বীকার বা ছোট করে আর দেখতে পারেনি। এ ছাড়া ওয়াল স্ট্রিট আপন স্বার্থেই এ তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনেছে। মূল কথা, এর আরো কিছু প্রভাব ছিল মারাত্মক।

যেমনÑ বিশ্বব্যাংকের নিয়ম হলো, নিজ অর্থনীতির সাইজ-প্রভাব অনুসারে সদস্য দেশকে চাঁদা দিয়ে শুরুতে বিশ্বব্যাংকের সদস্যপদ নিতে হয়। আর পরে যাদের অর্থনীতির সাইজ ব্যাপক বড় কিছু হয়ে যায় ততই বাড়তি চাঁদা দিতে হয়। এখন এই চাঁদা মানে কী আবার? চাঁদা মানে, বিশ্বব্যাংক এক শেয়ার হোল্ডিং কোম্পানির মতো আর সদস্য দেশগুলোর চাঁদাটাই আসলে সদস্য দেশের বিশ্বব্যাংকের শেয়ার কেনা হিসেবে দেখা হয়। কাজেই অর্থনীতি যত বড় হয়ে যাবে তত বড় শেয়ার কিনতে হবে। কিন্তু ব্যতিক্রম হলো, একেবারে বড় মালিকানাগুলোর বেলায়। যেমন এখন সবচেয়ে বড় মালিকানা আমেরিকার; তা ১৭.২৫ শতাংশ। পরে জাপান ৮.৯ শতাংশ। আর এরপর ইউরোপের বড় চারটি দেশ ৪-৫ শতাংশের বেশি কেউ নয়। তুলনায় বাংলাদেশ ১ শতাংশের শতভাগের এক অংশের মতো, এরকম।

কিন্তু বিরোধ বাধে চীন নিজের শেয়ার বাড়াতে চাইলে। চীন তার নয়া অর্থনীতির সাইজে শেয়ার মালিকানা বাড়াতে চাইলে তাতে আমেরিকা মানে তার সিনেট সেই ফাইলে অনুমোদন দেয়নি। মানে অভ্যন্তরীণভাবে বিশ্বব্যাংক টেকনিক্যালি প্রস্তাব পাস করে আমেরিকান মতামত চেয়ে পাঠালে সেই ফাইল আর সিনেট থেকে ফিরে যায়নি। ফলে চীনের শেয়ার ৩ শতাংশের নিচেই থেকে যায়। প্রায় এই একই পরিমাণ শেয়ার হলো ভারত বা কানাডা, ইতালি ও রাশিয়ারও।

আসলে এটি ছিল চীনের প্রতি আমেরিকার এক অব্যক্ত মেসেজ যে, আমি বিশ্বব্যাংকের মালিকানায় চীনের শেয়ার বাড়াতে দেবো না। নিজ নিয়ন্ত্রণেই রাখব। আমেরিকা জানত যে, চীন তা হলে নিজেই আলাদা ব্যাংক খুলবে। আর সে ক্ষেত্রে এটিই তুলনায় আমেরিকার স্বার্থের জন্য ভালো বলে আমেরিকার কাছে মনে হয়েছিল।

আসলে ততদিনে, মানে সেই ২০০৩ সাল থেকে জিম ও’নিল যখন ‘রাইজিং ইকোনমির’ তত্ত দিচ্ছেন, সম্ভবত পরোক্ষে তিনি চীনের রাইজিং অবস্থা দেখে আগে থেকেই চীনকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন যে, চীন যেন নিজ প্রভাবাধীন নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য প্রতিষ্ঠান দুটোই গড়ে নেয়।
পাঠককে মনে করিয়ে দেই, জিম ও’নিল-এর কথাগুলো কিন্তু আদতে ছিল ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে বলা কথা। অর্থাৎ যে কথা এখন সহজ করে বলতে পারি যে, আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট রাইজিং চীনা সরকার পরামর্শে দিয়ে বলে চলছিল যে, নিজ প্রভাবাধীন নয়া আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সমতুল্য প্রতিষ্ঠান খাড়া করে নাও। অর্থাৎ সেই থেকে ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থ আর জাতিবাদ আমেরিকান সীমায় থাকেনি, থাকতে চায়নি বা থাকলে নিজ অস্তিত্বের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে যেত।

অতএব সেই থেকে বিআরআইসি বা ব্রিক ধারণাটা সবল হচ্ছিল। আর ২০০৯ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সংস্কার এবং উন্মুক্ত করা আর সেই সাথে চীনকে প্রত্যাখ্যানের সেই বছরই ব্রিকস ব্যাংক নামে চীনা প্রভাবাধীন নয়া প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়ে যায়।

এখানে একটু তথ্যের কারেকশন আছে। জিম ও’নিলের প্রথম আইডিয়াটা ছিলÑ চীন, ভারত আর সাথে রাশিয়া ও ব্রাজিলকে নিয়ে ব্রিক। ২০০৯ সালে এই চার দেশ নিয়েই ব্রিক নামে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকাকেও সাথে নিয়ে এবার নয়া নাম হয়ে যায় ব্রিকস।

এখন একটা প্রশ্ন, তা হলে ব্রিকস ব্যাংক যদি বলে তা হলে তো এটি একটাই প্রতিষ্ঠান। বিপরীতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক তো প্রতিষ্ঠান হিসেবে আলাদা দুটো যদিও তাদের সমন্বয় আছে। এমনকি কোনো দেশের বিশ্বব্যাংকের সদস্য হতে হলে সেই দেশকে আগে আইএমএফের সদস্য হতে হয়। সেটি হয়ে থাকলে এবার বিশ্বব্যাংকের সদস্য হওয়ার যোগ্য হয়। তা হলে ব্রিকস ব্যাংক কার সমতুল্য? আসলে ব্রিকস ব্যাংকটাই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মিলিত ধারণা। আর এর ভেতরে ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক’ বলে বিশ্বব্যাংক সমতুল্য আরেকটি নয়া প্রতিষ্ঠান আছে।

কিন্তু জিম ও’নিল এখন অন্য কিছু বলছেন
গত ১৭ মে ২০২২ নিল আরেক কলাম লিখেছেন সেই প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ওয়েবেই। যার শিরোনাম হলোÑ ‘ফের গ্লোবাল মহামন্দা কী আসন্ন?’ এখানে পাঠককে একটু মনে করিয়ে দেই। এখানে ‘এখন’ মানে সুনির্দিষ্ট করে যখন বাইডেন তার নয়া ও শেষ অস্ত্র নিয়ে হাজির যেটাতে জিদ আছে কিন্তু সাফাই নেই। জিদটা হলো যে দুনিয়াতে সাদা চামড়ার (সাদা ককেশীয়) শাসন চলে আসছে, যা প্রায় ৫০০ বছর ধরে টিকে আছে। এটি যেভাবেই হোক তিনি আরো টিকিয়ে রাখবেন। চীনা উত্থানে জিদ করে হলেও টিকে থাকবেন! তাতে অবজেক্টিভ বাস্তবতা ভিন্ন কিছু বললেও তিনি জিদ ধরে বসবেন। একবার বলবেন অবরোধ আর মানবাধিকার দুটো অস্ত্র এনেছেন। এতে আর অর্থ-অস্ত্র লাগবেই না। আমেরিকা এমনিতেই জিতে যাবে। আবার প্রায় শেষ বা আপস হতে যাওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে নয়া ৪০ বিলিয়ন ডলার অর্থ-অস্ত্র ঢেলে সেটিকে আবার চাঙ্গা করছেন। এতে স্বভাবতই বড় যুদ্ধের খরচ তিনি ডেকে নিয়ে আসছেন, যা বইবার অর্থনৈতিক অবস্থা আমেরিকারই নেই, তা জানা সত্তে¡ও!

তাই এ অবস্থায় ও’নিল নিজের এ লেখার সারাংশ শুরুতেই লিখছেন এভাবে :
‘উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে আসল আয় ক্রমেই কমছে, ওদিকে চীনের দুর্বল বাইরের চেহারা আর সাথে ইউক্রেন যুদ্ধের সাথে লতিয়ে থাকে অনিশ্চয়তা এসব কিছুর মধ্যে করোনা মহামারীর ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার বদলে নিচে চলে যাওয়া দেখে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু তা সত্তে¡ও নীতিনির্ধারকদের এখনো অনেক কিছু করার সুযোগ আছে, যাতে ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠা যায়!

এ বক্তব্যের তাৎপর্যপূর্ণ দিকটা হলোÑ ও’নিল গ্লোবাল অর্থনীতি করোনা মহামারী ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার বদলে নিচে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন কিন্তু তাতে বাইডেনের বর্তমান অনুসৃত নীতি-পলিসিতে খারাপ ভ‚মিকা বা আপত্তির কিছু দেখছেন না তিনি। পুরো ব্যাপারটাই রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে হয়েছেÑ এই পশ্চিমা বায়াসড অবস্থানটাই গ্রহণ করেছেন। সাধারণত পলিটিক্সের চেয়ে যার আগ্রহের বিষয় অর্থনীতি হয় তিনি যেকোনো উপায়ে অর্থনীতির অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে খাড়া অবস্থান নেন। কিন্তু এখানে তিনি ব্যতিক্রম, তা করেননি।

আবার ও’নিল রাজনীতির প্রসঙ্গেই যদি ঢুকলেন তা হলে বাইডেন কেন বিনা অর্থ-অস্ত্রের যুদ্ধের কথা বলে শেষে প্রায় আপস হয়ে যাওয়া ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধকে টেনে অর্থ-অস্ত্রের যুদ্ধের মধ্যে ঢুকালেনÑ এটি ও’নিলের চোখে আমল পায়নি। তা হলে তিনিও কি এখানে চীনা উত্থানে সাদা শাসন হারানোর আশঙ্কার দ্বারা প্রভাবিত? অথচ তিনিই না অবলীলায় ওয়াল স্ট্রিটের স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে মানে, পরোক্ষে রাইজিং চীনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন, ফোরকাস্ট করেছিলেন এবং তার ফোরকাস্ট ২০৪০ সালে চীন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে, যা এখন ‘২০২৮ সাল’ বলছে ইন্ডিপেনডেন্ট পরিসংখ্যান স্টাডির লোকেরা। তিনি এখন তা হলে পিছাচ্ছেন কেন? এখানে তিনি নিজ পুরনো অবস্থানের বদল সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ছোঁয়ায় প্রভাবিত হয়েছেন কি?

আবার চীনের বর্তমান লকডাউন প্রসঙ্গে দুই রকম কথা বলছেন। এক দিকে বলছেন, ‘সেই দিক থেকে সংক্রমণ ঠেকাতে সতর্ক থাকার ব্যাপারে চীনের সমালোচনা খুব কমই করা যেতে পারে।’ আবার বলছেন, ‘কোভিডের বিরুদ্ধে এত কড়া অবস্থানের বদলে শিথিল করলে চীনা অর্থনীতি চাঙ্গা হবে; এটি চীনের জন্য ভালো, গ্লোবালিও ভালো!

শেষে বলছেন তিনটা ফ্যাক্টরের কথা, ফেডারল রিজার্ভসের সিদ্ধান্ত, চীনা নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত আর পুতিনের কথা। প্রথমত তিনি বাইডেনের ওপর যেন কিছুই নির্ভর করে না, এই মিথ্যা অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। কারণ এ তিনের মধ্যে বাইডেনের সিদ্ধান্ত-করণীয় কোনো ফ্যাক্টর নয়, তিনি ধরে নিয়েছেন। অথচ বাইডেন ৪০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ নিয়েছেন যেন তিনি ইউক্রেনকে অর্থ-অস্ত্র দিয়ে এই যুদ্ধ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর পর্যন্ত চালাতে পারেন। আর মরা যুদ্ধকে জাগিয়ে জীবিত-যুদ্ধ করে দেয়া মানেই সরাসরি অন্তত জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল আর গম বা খাদ্যের দাম কমার সব লক্ষণ অনিশ্চিত করে দেয়া। অথচ ও’নিল এখানে এসে সোজা কথায় তার নিজ কথা আর কাজের মধ্যে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন। তিনি কেন সাদা শ্রেষ্ঠত্ব বা বাইডেনের নীতির সমর্থক হচ্ছেন এর কোনো কারণ বলছেন না। এমনকি তিনি যে সমর্থক তা পাঠক যেন বুঝবে না বলে ধরে নিয়েছেন!

সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো, বাইডেনের হাতে এখন আরো ছয় মাস আরামে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার, টেনে নিয়ে যাবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অথচ ও’নিল এটাকে কোনো ফ্যাক্টর মনে করছেন না!! তার এ অবস্থানের মধ্যে ওয়াল স্ট্রিটের কোনো স্বার্থ কিভাবে লুকিয়ে আছে? তিনি নিশ্চুপ!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com


আরো সংবাদ


premium cement