০৭ জুলাই ২০২২, ২৩ আষাঢ় ১৪২৯, ৭ জিলহজ ১৪৪৩
`

গণকমিশনের তালিকাটি সাম্প্রদায়িক


হঠাৎ দৃষ্টিপটে আসা ‘মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস তদন্তে গণকমিশন’ নামক এক সংগঠন গত ১১ মে দেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামা মাশায়েখ ও ওয়ায়েজিনগণকে ‘ধর্ম ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে। ১১৬ জন বরেণ্য আলেমের এবং এক হাজার মাদরাসার বিরুদ্ধে ২২ শত পৃষ্ঠার এই শ্বেতপত্রে অর্থ পাচার, সন্ত্রাস উসকে দেয়া, নারীদের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা ইত্যাদি নানান ধরনের অভিযোগ উত্থাপন করে দুর্নীতি দমন কমিশনে তদন্তের জন্য আবেদন করা হয়। ‘গণকমিশনে’র এসব পদক্ষেপ দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই তালিকায় জামায়াতপন্থী পাঁচজন আলেমসহ হেফাজতে ইসলাম, শর্ষিনা, চরমোনাই এবং অন্য প্রায় সব ইসলামী দল, মত ও অরাজনৈতিক আলেমদের নামও রয়েছে বলে জানা যায়।

যতদূর জানা যায়, ওই শ্বেতপত্রে আলেম-ওলামার বিরুদ্ধে ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে মানুষকে উগ্রবাদের সবক দেয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়। কিন্তু আমরা দেখেছি, ওই আলেমগণ বরং সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সর্বদাই সরব থাকেন। বিগত দশকে যখন উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল তখন এই আলেমদের উগ্রবাদ বিরোধী শক্তি শক্ত অবস্থানের কারণেই সামাজিকভাবে দেশে আমদানি করা উগ্রবাদকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। দেশের দুই লাখ মসজিদ থেকেই সেই উগ্রবাদবিরোধী আওয়াজের যে খুতবা দেয়া হয়েছিল তা এসব দেশ বরেণ্য আলেমদের উৎসাহ ও ফতোয়ার কারণেই হয়েছিল। সেই সময় এই ‘গণকমিশনে’র ব্যক্তিবর্গের শুধুমাত্র লম্ফ-জম্ফ ছাড়া আর কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। শ্বেতপত্রে আলেমদের বিরুদ্ধে টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ দুই-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া এই আলেমগণ বিভিন্ন সময় বিনা স্বার্থে, বিনা শর্তে অর্থ অনুদান সংগ্রহ করেন শুধু নিজের পরিচালিত মাদরাসা-মসজিদ পরিচালনার জন্য। আর মাহফিলগুলো অর্থসংগ্রহ করে থাকে আয়োজক কমিটির মাহফিলের খরচ এবং স্থানীয় মসজিদ-মাদরাসার খরচ সঙ্কুলানের জন্য। আর ওয়ায়েজিনগণের সম্মানিও এই অর্থ থেকেই প্রদান করা হয়। কারণ, এই ওয়ায়েজিনরা ধর্ম প্রচারে ব্যস্ত থাকার কারণে নিজস্ব ব্যবসা-বাণিজ্য বা চাকরি করার সময় থাকে না। তাদের মধ্যে যারা সম্মোহনী শক্তিধারী বক্তা, তাদেরকে মানুষ নেহায়েত আবেগ থেকেই বেশি পরিমাণ সম্মানী দিয়ে থাকেন। এতে কোনো কোনো ওয়ায়েজিন অর্থ-বিত্তের মালিকও হতে পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তারা চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ক্যাসিনো ব্যবসায়, কাবিখার অর্থ, উন্নয়ন কার্যক্রমের কমিশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমিটির সভাপতির কমিশন বা নিয়োগ বাণিজ্যের অর্থে এই সম্পদের মালিক হননি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, ‘গণকমিশন’ ওইসব অবৈধ অর্থ উপার্জনকারী কিংবা কানাডা, আমেরিকা, মালয়েশিয়া বা ভারতে পাচারকারী অথবা বিদেশে বেগমপাড়া সৃষ্টিকারীদের ব্যাপারে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি। অথচ পিকে হালদার ৫,৫০০ কোটি টাকা, ডাক বিভাগের শুধাংশু শেখর ভদ্র ৫০০ কোটি টাকা, বাংলাদেশ ব্যাংকের এস কে সুর এক হাজার কোটি টাকা এবং ওসি প্রদীপ ৩০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানা যায়। ওয়ায়েজিনদের কেউ কেউ নাকি হেলিকপ্টারে চড়ে মাহফিলে যান। এই অভিযোগ নিছক ঈর্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়। মোল্লারা কেন হেলিকপ্টারে চড়বে! অথচ এই অভিযোগকারীরাই সমাজকে আধুনিকতা ও উন্নয়নের সবক দেন। একজন সুবক্তা যদি দ্রæতগতির যানে চড়ে সর্বাধিক সংখ্যক স্থানে গমন করতে পারেন আর জনগণই যদি সেই যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন তবে ‘গণকমিশনের’ গাত্রদাহের কারণ কী? তাদের অভিযোগ মতে, বক্তারা নারী বিদ্বেষী বক্তৃতা করেন। এই অভিযোগ তারা না জেনে, না বুঝে বা প্রতিহিংসামূলকভাবে করে থাকেন। ইসলামে নারী জাতিকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়েছে। আর সেক্যুলাররা এই নারী জাতিকে শিল্পের আবরণে ভোগ্যপণ্যে পরিণত করেছেন। আলেম-উলামা এই নারী জাতিকে তাদের হারানো সম্মানে অধিষ্ঠিত করার জন্য প্রাণান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইসলাম সার্বজনীন পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান হওয়ায় মানব সমাজের অর্ধাংশ নারীর কথা ওয়াজ-নসিহতের মধ্যে থাকতেই পারে। কিন্তু মূর্খের দল ওয়ায়েজিনদের বক্তব্যের খণ্ডিত অংশ উপস্থাপন করে, আর কিছু ইসলাম বিদ্বেষী চিহ্নিত মিডিয়া তা প্রচার করে পুরো বক্তব্যই ‘নারী বিদ্বেষী’ বলে প্রচার-প্রচারণা চালায়। এরা আধুনিকতা, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, উন্নয়ন, নারী-জাগরণ ইত্যাদি নানান প্রলেপ দিয়ে নারীকে ভোগ্যপণ্য হিসেবেই দেখতে চান বা রাখতে চান। সুতরাং এদের অধিকাংশের ব্যক্তিজীবনের মতো করেই তারা সমাজকে গড়তে চান বলে গুণীজনরা মনে করেন। নইলে এমসি কলেজের গণধর্ষণ, নোয়াখালীর ভোটের পর গণধর্ষণ, কলেজছাত্রী মুনিয়ার হত্যাকারী শিল্পপতির অপরাধ, তনু ধর্ষণ, নারী সাপ্লাইয়ার পাপিয়া ইত্যাদি অপরাধের বিষয়ে তাদের অনুসন্ধান বা শ্বেতপত্র কোথায়? তা ছাড়া আজ পর্যন্ত কি ‘গণকমিশনের’ লোকেরা ওই তালিকাভুক্ত ওলামা-মাশায়েখের কারো বিরুদ্ধে কোনো অর্থপাচার, নারীকেলেঙ্কারি, সন্ত্রাসী তৎপরতা ইত্যাদি বিষয়ে কোনো সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছেন? দু-একটি ব্যতিক্রম থাকতেই পারে। মানুষ ভুল বা অপরাধের ঊর্ধ্বে নয়। তবে কিছু কিছু আলেমকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে শুধু রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্য! আর মাদরাসার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে মূলত সন্ত্রাসী সৃষ্টির শিক্ষা দেয়ার জন্য! বাংলাদেশে ‘হলি আর্টিজান’ সহ বিভিন্ন সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে কি কোনো মাদরাসা ছাত্র ছিল? বরং দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং অন্যান্য পেশার ব্যক্তিবর্গের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পুলিশি তদন্তে প্রকাশ করা হয়েছে। ‘গণকমিশন’ কি হিসাব নিয়েছে, যেখানে স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২৫১ জন ছাত্র বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাসের বলি হয়েছে সেখানে কোনো মাদরাসায় কি এসব হত্যাকাণ্ড সঙ্ঘটিত হয়েছে? কোনো মাদরাসায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, শিক্ষককে মারধর, অপমান করেছে ছাত্ররা? কাকের মতো চোখবুঁজে লুকালে সবাই দেখে, শুধু নিজে ছাড়া! অথচ আবহমানকাল থেকে এ দেশের মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি নৈতিকতা, মননশীলতা, ন্যায়বোধ, সাম্প্রদায়িক সহঅবস্থান ইত্যাদির শিক্ষা এসব মাদরাসা এবং ওয়ায়েজিনগণ দিয়ে সমাজে স্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভ‚মিকা রেখে আসছেন। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তালিকাভুক্ত ওই সব ওলামা-মাশায়েখের সবাই দেশের সর্বোচ্চ সম্মানিত, মাননীয় এবং জনপ্রিয়। অথচ ‘গণকমিশনের’ কর্তাব্যক্তি যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের কেউ কেউ সমাজে নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত এবং বিতর্কিত। তাদের কারো কারো বিরুদ্ধেই বরং বিভিন্ন সামাজিক অভিযোগ রয়েছে। এই সব বিতর্কিতরাই জাতির সম্মানিত ও দেশবরেণ্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।

এই সময় কেন এই ধরনের একটি তৎপরতা, সেই বিষয়ে সমালোচকগণ অনেক প্রশ্ন তুলছেন। সামনে নির্বাচনকে সামনে রেখেই কি এই অভিযোগ? এটা কি দেশে কোন উগ্রবাদকে উসকে দেয়ার পাঁয়তারা? তারা কি ভেবেছেন, তারা এভাবে মোল্লাদের ক্ষেপিয়ে তুলে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে বিশ্বমোড়লদের দেখাবেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ কায়েম হতে যাচ্ছে, যাকে দমন করার জন্য ক্ষমতায় সেক্যুলার সরকার দরকার! নাকি দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শ্রীলঙ্কান ফোবিয়া ইত্যাদি থেকে জনগণের মনোযোগ সরানোর জন্য এই অভিযোগ? নাকি ৫ মে ২০১৩ সালের মতো আরো একটি সঙ্কটকে উসকে দিয়ে জেলহাজতের বাইরে থাকা আলেম-ওলামাদের নিয়ন্ত্রণ রাখার একটি কৌশল!

এসব যাবতীয় সমালোচনা বা পাবলিক পারসেপশন বা গুজব স্পষ্ট করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। এ ধরনের তৎপরতা দিন শেষে সরকারের ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণœ করবে বলে বিশ্লেষকগণ মনে করেন। ‘গণকমিশনের’ এই তালিকায় সত্যিকার কোনো অপরাধী থাকলে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে যারা অপরাধী নয়, তাদের সম্মান হানির জন্য অভিযোগকারীদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। জাতির কাছে তাদেরকে এই অপতৎপরতার জন্য ক্ষমা চাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ যে জাতি তার সম্মানীয় ব্যক্তিদের সম্মান দেয় না, সেই জাতির উন্নতি থমকে দাঁড়ায়। ‘গণকমিশনের’ প্রকৃত উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে হবে। তারা কি এ ধরনের তদন্তের এখতিয়ার রাখে? তাদেরকে কে বা কারা এই তদন্তের জন্য নিয়োগ দিল, আর্থিক সহায়তা দিল? দুই হাজার দুইশত পৃষ্ঠার প্রতিবেদন তৈরি করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়েছে। সেই অর্থের জোগানদাতা কে ? এই তদন্ত কি বস্তুনিষ্ঠ ছিল নাকি মনগড়া, তাও খতিয়ে দেখতে হবে। এ ধরনের ‘কমিশনের’ কি আইনগত বৈধতা রয়েছে? দেশে কি আইন আদালত অনুপস্থিত? দুদক কি নিজেদের কাজে ব্যর্থ হয়েছে যে, ভূইফোঁড় কোনো সংগঠন এসব নিয়ে দুদকের কাছে যাবে? নাকি ‘গণকমিশন’ নিজেদের জাতি ও সরকারের ফোকাসে আনার জন্য এ কাজটি করেছেন? ‘ঘাদানিক’ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার কারণে তারা কি বিকল্প পন্থায়, বিকল্প নামে সরকারের কাছে মূল্যবান হয়ে উঠতে চাইছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর সরকারকেই দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সব ওলামা-মাশায়েখের শিকড় এ দেশের জমিনে গভীরভাবে প্রোথিত। তাদের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে দেশ ও সমাজে। তাদের কথা তৃণমূলের মানুষ শুনে ও ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। তাদের অনেকেই আন্তর্জাতিকভাবেই স্বীকৃত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আর যারা এসব তালিকা করেছেন তাদের কেউ কেউ মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক জগতের একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া সাধারণভাবে সবার কাছেই ধিকৃত ও নিন্দিত। কাজেই এ ধরনের অপতৎপরতা সার্বিকভাবে ক্ষমতাসীন সরকারের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকগণ মনে করেন।

তবে দেশের ওলামা-মাশায়েখের জন্য এটা একটি ‘সতর্কবাণী’। প্রথমে জামায়াতকে শায়েস্তা করা হয়েছে, তারপর হেফাজতকে নীরব করা হয়েছে। এবারের তালিকায় কেউ আর বাদ যায়নি। কাজেই ছোট-খাটো বিষয়ে তারা নিজেদের বিভেদ ভুলে ঐক্যে না এলে অচিরেই দ্বিমত করার মতো আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না। টুপিটা গোল না কিস্তি হবে, পাঞ্জাবি কলিদার না প্লেইন হবে, ‘দোয়াল্লিন’ বলব না ‘জোয়াল্লিন’ বলব, শর্ষিনা না ফুরফুরা না চরমোনাই না জামায়াত না খেলাফাত ইত্যাদি ভুলে গিয়ে ন্যূনতম তাওহিদ, রেসালাত ও আখেরাতের বিশ্বাসের ভিত্তিতে এক না হলে এ দেশে তাদের জন্য দিন দিনই ময়দান সঙ্কীর্ণ হয়ে পড়বে। কারণ, এই ষড়যন্ত্র শুধু ‘গণ কমিশনের’ নয়, বরং এটা বিশ্ব ইসলামবিরোধী ষড়যন্ত্রেরই একটি মঞ্চস্ত নাটক মাত্র। উল্লেখ্য, বিশ্লেষকগণ মনে করেন, জাকির নায়েককে ভারত থেকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্র এ দেশেরই একটি মিডিয়ার সংবাদকে ভিত্তি করেই হয়েছিল!

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক
Email: maksud2648@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement