০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯, ৬ জিলহজ ১৪৪৩
`

কই লাট সাহেব কা শালা চোর...

-

মন্ত্রীর স্ত্রীর আত্মীয়, তার আত্মীয়ের আত্মীয় সব চোর। এমনি বিষয় নিয়ে ষাটের দশকে একটি সিনেমা হয়েছিল। এখন থেকে প্রায় ৪৫ বছর আগে সে সিনেমাটি আমি দেখেছিলাম। সিনেমার নাম ‘ভাই ভাই’ (১৯৫৬)। সে সিনেমার গান ‘ইস দুনিয়া মে সব চোর চোর।’ গানটি গেয়েছিলেন লতা মুঙ্গেশকর। অভিনেত্রী ছিলেন নিম্মি আরো ছিলেন কিশোর কুমার। হিন্দি ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে তখনো যেমন পিছনে ছিলাম, এখনো সে জ্ঞান তেমন কিছু বাড়েনি। কিন্তু গান শুনে একটা আইডিয়া তো করা যায় যে, লেখক বা গায়েক কী বলতে চান। আর বিদ্যা সে পর্যন্তই। গানটির একটি কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা- ‘ইস দুনিয়ামে সব চোর চোর।/কই পয়সা চোর, কই মুরগি চোর, আউর সই দিলকা চোর।/কই চুরি করে খাজানি কি, কই আনি আর দো আনি কি।/কই ছোট চোর কই বড়া চোর কই বইঠা চোর, কই খাড়া চোর। ইস দুনিয়া মে সব চোর চোর। কই ডকো ডালে রাতও মে, কই কাটে কয়জু বাথও মে। কই গোরা চোর, কই কালা চোর-কই লাট সাহেব কা শালা চোর। কই কোসিকো নিদ রাতা হায়। কেউ ঘুমের মধ্যে চুরি করে। আমিও ঘুমিয়ে ছিলাম। মেরে নিজ এলাকায় এসেছি। কই এসব দিলওয়ালা চোর। শেষ দিকে গানটা বুঝতে পারছিলাম না। তাই হিন্দির সঙ্গে বাংলা মিশেল দিলাম।

এই গানটির মমার্থ হলো- এই দুনিয়ার সবাই চোর, চোর। কেউ পয়সা চোর, কেউ মুরগি চোর আবার কেউ হৃদয় চোর। কেউ চুরি করে গুপ্তধন সব কিছু, আর কেউ আনি বা দোআনি। কেউ ছোট চোর, কেউ বড় চোর। কেউ চুরি করে বসে, আর কেউ দাঁড়িয়ে। চোরে ভরা এই দুনিয়া। কেউ রাতে ডাকাতি করে। মানুষ যখন ঘুমের মধ্যে থাকে তখন কেউ চুরি করতে বের হয়, বেড়া কাটে। কোনো চোরের রঙ ফর্সা, কোনো চোর আবার কালো রঙের। আবার কোথাও লাট সাহেবের শালা চোর। আমি রাতে ঘুমিয়ে থাকি কিন্তু আমাকে চুরি করে নিতে কোনো হৃদয়বান চোর তো এলো না।

মোটামুটি গানটার অর্থ আমার মতো অল্পবিদ্যার লোকের পক্ষে এর বেশি আর কিছু করা সম্ভব নয়। কিন্তু ৮ মে বাংলাদেশের রেলমন্ত্রীর শালারা দেখিয়ে দিয়েছেন, চুরি তো চুরি তার ওপর সিনাজুরি কাকে বলে। বিনা টিকিটে রেলভ্রমণ দণ্ডনীয় অপরাধ। তিন যাত্রী টিকিট ছাড়া সুন্দরবন এক্সপ্রেসের এসি কামরায় উঠেছিলেন। টিটিই (টিকিট চেকার) টিকিট পরীক্ষা করতে এসে দেখেন তারা বিনা টিকিটের যাত্রী। টিটিই নিয়ম অনুযায়ী তাদের জরিমানা করে সাধারণ আসনে বসিয়ে দেন। কিন্তু বাদ সাধেন বিনা টিকিটের যাত্রীরা। তারা রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের আত্মীয় বলে পরিচয় দেন। বিতণ্ডায় জড়ান রেলকর্মীদের সাথে। বৃহস্পতিবার রাতের এ ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয় টিটিই শফিকুল ইসলামকে।

এ ঘটনা জানাজানি হলে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয় ব্যাপক সমালোচনা। ক্ষুব্ধ হন রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। রেলমন্ত্রী অবশ্য জানিয়েছেন যে, যে যাত্রীদের সমস্যা, তারা তার আত্মীয় নন। যদিও স্থানীয় সব সূত্রের তথ্যানুুযায়ী, জড়িত তিন যাত্রী মন্ত্রীর স্ত্রীর আত্মীয়। সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্যানুযায়ী বিনা টিকিটের যাত্রীদের বিস্তারিত পরিচয়ও প্রকাশিত হয়েছে।

রেলওয়ের একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে টিকিট ছাড়াই পাবনা থেকে ঢাকামুখী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে এসি কামরায় বসেন তিন যাত্রী। ভ্রাম্যমাণ টিকিট পরিদর্শক টিকিট দেখতে চাইলে তারা রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলামের আত্মীয় পরিচয় দেন এবং সুলভ কামরার তিনটি টিকিট দিতে বলেন। একই সঙ্গে ট্রেনের এসি কামরার সিট খালি থাকায় সেখানে বসে ভ্রমণের আবদার করেন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছে যে, তারা ঘটনার জন্য একটি তদন্ত কমিটি করবে। টিটিই মো: শফিকুল ইসলাম তাদের জরিমানা ও সুলভের ভাড়া বাবদ এক হাজার ৫০ টাকা নিয়ে এসি কামরা ছাড়তে বলেন। বিষয়টি নিয়ে টিটিইর সঙ্গে ওই তিন যাত্রীর কথা কাটাকাটি হয়। তারা তাৎক্ষণিকভাবে ট্রেনে কোনো অভিযোগ না করলেও ঢাকা পৌঁছে রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে টিটিইর বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগ পেয়ে পাকশী বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন সংশ্লিষ্ট টিটিইকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন। বরখাস্তের আদেশের বিষয়টি ঈশ্বরদী টিটিই হেডকোয়ার্টারের ভারপ্রাপ্ত সিনিয়র টিটিই বরকতউল্লাহ আল আমিন ফোনে শফিকুল ইসলামকে জানান। পরে নাসির উদ্দিন বলেন, ওই ঘটনার লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে সুন্দরবন ট্রেনে বিনা টিকিটে ভ্রমণকারী তিন যাত্রী কর্তব্যরত টিটিই তাদের সঙ্গে অসদাচরণ করেছেন বলে মহাপরিচালককে ফোন করে অভিযোগ করেন। বিষয়টি আমাকেও জানানো হয়। সে পরিপ্রেক্ষিতেই তাকে বরখাস্ত করা হয়। সরকারি কাজে এ এক আজব ব্যাপার। কোথাও কোনো লিখিত অভিযোগ নেই। ফোনে ফোনে চাকরি চলে গেল। আহারে রেলওয়ে প্রশাসন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রেলমন্ত্রী সুজনের স্ত্রী শাম্মী আখতার মনির নানার বাড়ি ঈশ্বরদীতে। আলোচিত তিন ব্যক্তিই রেলমন্ত্রীর দূরসম্পর্কের আত্মীয়। বিনা টিকিটের যাত্রী ইমরুল কায়েসের মা ইয়াসমিন আক্তার নিশা। তিনি রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর আত্মীয়। ইতোমধ্যে রেলমন্ত্রীকে পাকশী বিভাগ থেকে তলব করা হয়। শফিকুল বলেন, আমি তাদের সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করিনি। তারাও করেননি। কোনো কথা কাটাকাটিও হয়নি।

যাই হোক, দেশবাসী এ ঘটনার নিন্দার পর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করে রেলওয়ে পশ্চিমের জিএম অসীম কুমার তালুকদার বলেছেন, ঘটনাটি দুঃখজনক। এদিকে গত শনিবার গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ওই তিন যাত্রী তার আত্মীয় নন। রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, ওই টিটিই বিনা টিকিটের যাত্রীদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেছেন। তিনি বলেন, তবে বিনা টিকিটের যাত্রী যদি তার আত্মীয়ও হন, তাহলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

শফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন ইমরুল কায়েস। তবে কার বরাবর তিনি অভিযোগটি করেছেন জানা যায়নি। রেলমন্ত্রীর আত্মীয়দের বিনা টিকিটে ভ্রমণের দায়ে জরিমানা করায় টিটিই বরখাস্ত হওয়ার ঘটনাকে ন্যক্কারজনক বলেছে টিআইবি। ন্যায়নিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালনের জন্য পুরস্কৃত হওয়ার পরিবর্তে ত্বরিত গতিতে বরখাস্তের সিদ্ধান্তে দেশবাসীর কাছে এই বার্তাটি পরিষ্কার হয়েছে যে, ক্ষমতাবানরাই শুধু নয়, তাদের প্রভাববলয়ের মধ্যে থাকা আত্মীয়-পরিজনদের জন্যও আইন প্রযোজ্য নয়। এ ঘটনার জন্য টিআইবি সাময়িকভাবে রেলমন্ত্রীর পদত্যাগের আহ্বান জানায়। টিআইবি এক বিবৃতিতে বলেছে, রেলমন্ত্রী তার আত্মীয় পরিচয়দানকারীদের অভিযোগই সামনে এনেছেন। ফলে শফিকুলকে বরখাস্ত করায় জনগণের কাছে এই বার্তাই পৌঁছেছে যে, ক্ষমতার দাপট ও অনিয়ম হচ্ছে বাস্তবতা।

সমাজের সত্যের ঠিকাদাররা কিন্তু এ ব্যাপারে একেবারে নিশ্চুপ হয়ে আছেন। জো হুকুমেরা কিছু তো বলুন। আসলে বাংলাদেশে ক্ষমতা মানেই অন্ধত্ব। সবারই ধারণা যে, ক্ষমতায় আছি বলে আমি যা খুশি তাই করতে পারি। এ ক্ষেত্রে রেলমন্ত্রীর উক্তিগুলোও দায়িত্বহীন। তিনিও তার অন্যায়কারী দূরসম্পর্কের আত্মীয়দের পক্ষ নিয়ে ফেললেন। আবারও ‘ভাই ভাই’ ছবির সেই গানের কথা সত্য হলো, ‘ইস দুনিয়া মে সব চোর চোর। কই গোরা চোর, এই কালা চোর। কই লাট সাহেব কা শালা চোর। রেলমন্ত্রী ও তার আত্মীয়রা বহাল আছেন। শফিকুলও চাকরি ফেরত পেয়েছেন। দেখা যাক, শফিকুলের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্তকারীরা কী করেন।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement