১৫ আগস্ট ২০২২
`

পোস্টার সন্ত্রাস ও নগরীর সৌন্দর্য

-

‘পোস্টার’ একধরনের প্রচারপত্র। পোস্টারের মাধ্যমে ছবিসম্বলিত বা ছবিবিহীন বক্তব্য প্রকাশ করা হয়। রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এবং অধিকার বা দাবির সমর্থনে পোস্টারের ব্যবহার হয়। পৃথিবীর যেকোনো উন্নত দেশে যত্রতত্র পোস্টার লাগানো যায় না। আমাদের দেশে এ বিষয়ে ২০১২ সালে ‘দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন’ প্রণীত হলেও আইনটি কার্যকর বিষয়ে তারিখ নির্ধারণ করে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না হওয়ার কারণে এটি এখনো কার্যকর হয়নি। এ আইনে পোস্টারের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তাতে বলা হয়েছে- ‘পোস্টার’ অর্থ কাগজ, কাপড়, রেক্সিন বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমসহ যেকোনো মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত কোনো প্রচারপত্র, প্রচারচিত্র, বিজ্ঞাপনপত্র, বিজ্ঞাপনচিত্র এবং যেকোনো ধরনের ব্যানার ও বিলবোর্ডও পোস্টারের অন্তর্ভুক্ত।

‘সন্ত্রাস’ শব্দটি ‘ত্রাসের’ সম্প্রসারিত রূপ। ত্রাস সৃষ্টিকারী ব্যক্তিকেই সন্ত্রাসী বলা হয়। সন্ত্রাসীরা তাদের সন্ত্রাসী কাজে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি করে দেশ এবং সমাজের শান্তি ও শৃঙ্খলা যেমন বিপন্ন করে অনুরূপ যত্রতত্র পোস্টার লাগিয়ে আত্মপ্রচারে নিমগ্ন ব্যক্তি নগরীর সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা বিপন্ন করে জনজীবনে অস্বস্তির সৃষ্টি করে।

আমাদের দেশে জনসাধারণের ও গণপরিবহনের চলাচলের সুবিধার জন্য বর্তমানে প্রধান শহরগুলোতে ফুট ওভারব্রিজ, উড়াল সড়ক, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে রয়েছে। আবার কিছু এখন নির্মাণাধীন রয়েছে।

এগুলো এক দিকে যেমন জনসাধারণের নির্বিঘ্নে চলাচলের সহায়ক অপর দিকে নগরীর সৌন্দর্য বর্ধন করে। কিন্তু উভয়ই উদ্দেশ্যই বিফল হয় যখন এগুলোতে কোনো ধরনের বাছবিচার না করে রুচিহীনভাবে পোস্টার লাগিয়ে সৌন্দর্যের ও পরিচ্ছন্নতার হানি ঘটানো হয়। সম্প্রতি দেশের কিছু রুচিবোধসম্পন্ন মার্জিত সংবাদকর্মী নগরীর সর্বত্র নতুন ও পুরনো পোস্টারের সংমিশ্রণে ভবনের দেয়াল, ল্যাম্প পোস্ট, বিদ্যুতের খুঁটি, উড়াল সড়ক ও মেট্রোরেলের পিলার, ফুট ওভারব্রিজ, ফুটপাথের যাত্রীছাউনি, রাস্তার পাশের গাছ, সড়ক দ্বীপের বহির্বেষ্টনী ও অভ্যন্তর প্রভৃতি আবৃত হয়ে যাওয়ায় এতই ব্যথিত ও বিচলিত যে, এসব পোস্টার লাগানোর পেছনের ব্যক্তিকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে এটিকে সামাজিক উপদ্রব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ থেকে পরিত্রাণে তারা সচেতনতামূলক প্রতিবেদন প্রচার করে এ কাজে জড়িতদের নিবৃত্ত রাখতে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা ও তদারকির ওপর গুরুত্ব দিয়ে চলেছেন।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে পোস্টার লাগানোর জন্য সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থান রয়েছে। যেকোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এসব স্থানে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে পোস্টার লাগিয়ে তার বক্তব্য প্রচার করতে বা তুলে ধরতে পারে। নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হলে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পোস্টার সরিয়ে নেয়া হয় এবং সেখানে অপর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অপেক্ষায় থাকা পোস্টার লাগিয়ে দেয়া হয়। আবার অপেক্ষায় কোনো পোস্টার না থাকলে পোস্টার লাগানোর স্থানটি খালি রাখা হয়। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে সিটি করপোরেশন কর্তৃক পোস্টার লাগানোর যে ব্যবস্থা করা হয় এর মাধ্যমে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আহরণ হয়ে থাকে। উন্নত দেশে পোস্টারের মতো ব্যানার ও বিলবোর্ড সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত স্থানে টানানো বা স্থাপন করা হয়। উভয় ক্ষেত্রে সময়ের হিসাবে সিটি করপোরেশনকে অর্থ দিতে হয়।

আমাদের দেশে পোস্টার ও দেয়ালে লিখন আইন কার্যকর না হওয়ায় এবং এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো নীতিমালা বা সিটি করপোরেশন কর্তৃক স্থান নির্ধারণ করে না দেয়ায় যত্রতত্র পোস্টার ও ব্যানার লাগানোর ছড়াছড়ি চলছে। বিলবোর্ডের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে পৃথিবীর উন্নত দেশের মতো একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অর্থ প্রদান সাপেক্ষে তা স্থাপনের অনুমোদন দেয়া হয়।

আমাদের দেশে বাণিজ্যিক অথবা অধিকার বা দাবিসম্বলিত পোস্টারের চেয়ে রাজনৈতিক পোস্টারের আধিক্য দেখা যায়। জাতীয় নির্বাচনের সময় পুরো দেশব্যাপী পোস্টার ও ব্যানারের ছড়াছড়ি আরো বেশি দেখা যায়। উপনির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনের সময় পুরো নির্বাচনী এলাকা পোস্টার ও ব্যানারে সয়লাব হয়ে যায়। নির্বাচনকালীন যেসব পোস্টার লাগানো বা টানানো হয় এগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ প্রার্থীর বড় আকারের ছবিসমেত দলের প্রতীক এবং দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উত্তরসূরি ও পূর্বসূরির ছবির সমন্বয় ঘটে। এটি দেশের বড় দু’টি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হলেও অপরাপর দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে দেখা যায় না। উল্লিখিত তিনটি দলের অঙ্গসংগঠনে একজন রাজনৈতিক কর্মীর পদ প্রাপ্তির পর দেখা যায় তার বড় আকারের ছবিসহ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের উত্তরসূরি ও পূর্বসূরির ছবির সমন্বয়ে যত্রতত্র পোস্টার লাগিয়ে জনসাধারণের মাঝে ব্যাপক প্রচারণার প্রয়াস চালানো হয়।

দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন-২০১২-এ দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানোর স্থান নির্ধারণ বিষয়ে বলা হয়েছে- আইনটির উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, কোনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষ দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানোর জন্য প্রশাসনিক আদেশ দ্বারা স্থান নির্ধারণ করে দিতে পারবে এবং উক্তরূপ নির্ধারিত স্থানে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে; তবে শর্ত থাকে যে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে, উল্লিখিত নির্ধারিত স্থান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে বিধি দ্বারা নির্ধারিত শর্ত ও পদ্ধতিতে এবং নির্দিষ্ট ফি প্রদান সাপেক্ষে, দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে।

এ আইনটির সাথে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অনুরূপ আইন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেখানে কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত স্থান ও অর্থ প্রদান ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানো যায় না। কিন্তু আমাদের দেশের আইনটিতে শর্ত যুক্ত করে অন্যান্য স্থানেও অর্থ প্রদান সাপেক্ষে দেয়াল লিখন বা পোস্টার লাগানোর বিধান রাখা হয়েছে। আমাদের ঢাকা শহরের একটি উড়াল সড়কের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এর পিলারগুলোকে পোস্টার লাগানো থেকে রক্ষার জন্য পিলারের চতুর্দিক কৃত্রিম ঘাসের কার্পেট দিয়ে আবৃত করা হয়েছে। এর ফলে যদিও পিলারকে পোস্টার লাগানো থেকে রক্ষা করা গেছে; কিন্তু উড়াল সড়কের যেসব জায়গা উন্মুক্ত ও পোস্টার লাগনোর জন্য পোস্টার সন্ত্রাসীদের কাছে উপযোগী বিবেচ্য এমন সব জায়গাকে পোস্টার লাগানো থেকে রক্ষা করা যায়নি।

আমাদের বিভিন্ন শহরের সড়কের দু’পাশের যেসব স্থানে পোস্টার লাগালে তা সড়ক দিয়ে চলাচলকারী জনমানুষের দৃষ্টিতে পড়বে এমন সব স্থানে পোস্টার লাগাতে পোস্টার সন্ত্রাসীরা সবসময় উদগ্রীব। এসব স্থান সবসময় নতুন ও পুরনো পোস্টারে আবৃত থাকে এবং একটির উপর আরেকটি পোস্টার লাগানোর কারণে অনেকসময় এ নিয়ে পক্ষগণের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে পোস্টার লাগানোর পর তা খুব বেশি সময় অক্ষত থাকে না। টোকাইদের দেখা যায় লাগানো পোস্টার ছিঁড়ে বা তুলে তা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য নিয়ে যায়। এতে শহরের পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন হওয়াসহ পোস্টার লাগানো স্থানের সৌন্দর্যহানি ঘটে।

যত্রতত্র পোস্টার লাগানোর মতো দেয়াল লিখনও সামাজিক উপদ্রব। শহরের সড়কের দু’ধারের যেসব দেয়ালে রাজনৈতিক দলের বক্তব্য লিখলে তা অতি সহজেই জনমানুষের নজরে আসবে এমন সব দেয়ালকে রাজনৈতিক দলের কর্মীরা দেয়াল লিখনের জন্য বেছে নেয়। কোনো ধরনের নিয়মনীতি না মেনে আনাড়িদের দিয়ে দেয়াল লিখনের কাজ সমাধা করার কারণে তা দেয়ালের সৌন্দর্য নষ্ট করে এবং দৃষ্টিকটু ঠেকে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বাড়িওয়ালাদের পক্ষ থেকে দেখা যায় সদ্য রঙ করা দেয়ালকে পোস্টার ও দেয়াল লিখন থেকে রক্ষার জন্য ‘পোস্টার লাগানো ও দেয়ালে লিখন নিষেধ’ এমন অনুরোধসম্বলিত বাক্যের প্রতি দৃষ্টি আকৃষ্ট করা হয়; কিন্তু কে শুনে কার কথা। এর বিপরীতে দেখা যায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ভবন মালিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও ভবনের দেয়ালে কুরআন, হাদিস ও মনীষীদের বাণী সুন্দরভাবে চিত্রকর দিয়ে লিখে জনমানুষের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করছেন এবং দেয়ালের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করছেন। দেখা যায় এসব দেয়াল এলোমেলোভাবে পোস্টার লাগানো ও লিখন থেকে অনেকটা মুক্ত।

উন্নত দেশে কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত স্থানে বিলবোর্ড স্থাপন করতে হলে বছরের হিসাবে নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ দিতে হয়। আমাদের দেশেও এ প্রথাটি চালু রয়েছে এবং অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিলবোর্ডের মাধ্যমে তাদের পণ্যের প্রচারণা চালায়। অনেকসময় দেখা যায় সড়কের পাশে অথবা ভবনের ছাদে স্থাপিত ইলেকট্রনিক বিলবোর্ড যান্ত্রিক বাহনের চালকদের স্বাভাবিক দৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করে দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দেখা দেয়। উন্নত দেশে এ বিষয়টিকে মাথায় রেখে সড়ক থেকে নির্ধারিত দূরত্বে নির্ধারিত স্থানে বিলবোর্ড স্থাপনের অনুমতি দেয়া হয়। আমাদের দেশে এমন কোনো বিধিনিষেধ না থাকায় বিলবোর্ড স্থাপনও সুশৃঙ্খল নয়।

নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব স্থানীয় কর্তৃপক্ষ যেমন- সিটি করপোরেশন অথবা মিউনিসিপ্যালিটির ওপর ন্যস্ত হলেও শহরে বসবাসকারী নাগরিকরাও এ দায়িত্ব থেকে মুক্ত নন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের সম্মিলিত প্রয়াসেই একটি শহর বা নগরের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা অক্ষুণ্ণ থাকতে পারে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের শীর্ষ ব্যক্তি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কারণে তার দায়িত্ব নাগরিকসুবিধা বৃদ্ধি করে নগরকে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখা। আর নগরের সচেতন জনমানুষ তার সহযোগী। উভয়ে এক লক্ষ্যে কাজ করলে যেকোনো নগর বা শহর অযাচিত পোস্টার লাগানো ও দেয়ালে লিখন থেকে রক্ষা পাবে। প্রণিধানযোগ্য যে, ২০১২ সালে পোস্টার ও দেয়ালে লিখন নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণীত হলেও এটি কার্যকরে গেজেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশে ইতোমধ্যে ১০ বছরের অধিক সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে- কারা এত প্রভাবশালী যে, একটি আইনের প্রয়োগ ১০ বছর আটকে রেখে পোস্টার সন্ত্রাসীদের অন্যায়কে দীর্ঘায়িত করে সামাজিক উপদ্রব জিইয়ে রাখছে?

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement