০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯, ৬ জিলহজ ১৪৪৩
`

ওদের স্বপ্নের কলি ফোটাতে কেউ আসবেন কি

ওদের স্বপ্নের কলি ফোটাতে কেউ আসবেন কি - ছবি : নয়া দিগন্ত

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞান হচ্ছে, জীবনটা খুব দীর্ঘ কোনো অভিযাত্রা নয়। তবে সবাই এই অভিযাত্রায় একটা পরিণত কাল পর্যন্ত পৌঁছতে চায়। এর পরেও একটি জীবনের যবনিকা সব সময়ই স্বজন, সুহৃদের কাছে বেদনাবিধুর। তাদের দুঃখ ও বেদনার কোনো শেষ থাকে না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিশিষ্ট গীতিকার গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের একটি গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সে রাজ্যের খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী শ্যামল মিত্র। মৃত্যু নিয়ে মানুষের অনুভূতি রয়েছে ওই গানে। ক’টি চরণ এরকম : ‘এই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে মন যেতে নাহি চায়, তবু মরণ কেন এখান থেকে ডেকে নিয়ে যায়, ... না না না যাবো না, মন যেতে নাহি চায়, মনে হয় মানুষেরই সুখে দুঃখে মিশে থাকি, তাদের কাছে ডাকি কণ্ঠ জড়ায়ে ধরে বলি, যেতে দিও না আমায়।’ আক্ষেপ, সেটা হবার নয়। বিধাতার এ অমোঘ বিধান, ফিরে যেতেই হবে। আবার বলি, এই যাওয়াটা তখন কিছুটা সহনীয় হয়তো হয় যখন বিদায়টা পরিণত মুহূর্তে আসে।

কিন্তু আমাদের দেশের পরিস্থিতি ও দুর্যোগ দুর্বিপাকের জন্য অসংখ্য মানুষকে অপরিণত সময়েই এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়। এ জন্য দায়ী এ সমাজেরই কিছু মানুষ। এমন দুঃসহ বেদনা ফেরানো যেত যদি তারা সক্রিয় হতো। এমন দায়িত্ব যাদের, তারা এ নিয়ে কতটুকু দায়বোধ করেন বা সচেতন, সেটাই ভগ্নহৃদয়ের প্রশ্ন, তাদের মনমস্তিষ্কে, আচার আচরণে মানুষের প্রতি সহানুভূতি, মমত্ববোধের চেতনা কতটুকু, এসব মানবিক গুণের চর্চা কতটা হচ্ছে! দেশের দুস্থ, নিপীড়িত ও বৈষম্যের শিকার, মানুষকে ভালো রাখতে কতটা সক্রিয় সচেতন আমাদের কর্তৃপক্ষ? কেউ কি মনে রাখেন যে, দেশের অধিকাংশ মানুষ কষ্টেসৃষ্টে দিনযাপন নয়, দুর্ভাবনায় কাল কাটায়। এমন কথা সম্প্রতি শোনা গেছে, দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় নাকি বেড়েছে। হ্যাঁ, বেড়েছে; যাদের ঘাড়ে চর্বি জমায় আগে থেকেই মাথা ঘোরাতে পারেন না, তাদের নিশ্চয় বেড়েছে। কিন্তু তাদের কি বেড়েছে, সত্তরোর্ধ্ব পক্বকেশ রিকশা চালকের, নুয়ে পড়া দেহ নিয়ে যারা ঢাকার রাজপথে রিকশা টানেন? খুব শখ করেই কি তিনি রিকশার প্যাডেল চালান? আয় বৃদ্ধির সব কাহিনী কি সেই সব মানুষের প্রতি উপহাস নয়?

যা হোক, আমরা যা বলতে চাই, সেটা অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে, আচম্বিত সেই মৃত্যু এককভাবে শুধু ব্যক্তি বিশেষের জীবন ব্যর্থ করে দিয়ে যায় এমন তো নয়; তার পরিবার পরিজনকে ফেলে রেখে যায় মারাত্মক মর্মপীড়ায় আর অর্থকষ্টে। তাকে ঘিরে সম্মুখে কত সুন্দর সব স্বপ্ন ছিল, সে স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়, তাদের বাকি জীবন কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাতে হয়। তাছাড়া আশাহত এসব মানুষের কাহিনী কে শুনবে! যারা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছে, শুধু আশার ডানায় ভর করে, যারা সক্ষম হয়ে দুস্থ মানুষকে সেবা দেয়া কত প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে, শত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে, পরিবারের হাত ধরে এগিয়েছে। এখন সম্মুখে পর্বতপ্রমাণ বাধা। কে তাকে সে পাহাড় ডিঙ্গাতে সাহায্য করার জন্য হাত বাড়াবে? যদি সেই সাহায্য তাকে কেউ না করে তবে সে কি তাকে সারাজীবন জীবন্মৃত হয়েই অতিবাহিত করতে হবে? এমন বেদনার গল্প আজকের নয়, বহুকাল ধরে শুনে আসছি।

জানা গেছে, দেশে বায়ুদূষণের কারণে বছরে মৃত্যু হয় আড়াই লাখ মানুষের। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্ব সংস্থার প্রতিনিধি বর্ধন জং রানা এ তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি আরো জানান, ধারণা করা হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া ও হিটস্ট্রোকে ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আরো বহু মানুষের মৃত্যু ঘটবে। এ দেশের স্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর তালিকায় প্রথমে রাখা হয়েছে বায়ুদূষণকে। ‘হু’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশের ১০ জনের ৯ জন বায়ুর সাথে গ্রহণ করছে নানা দূষণ। এই মানুষের বেশির ভাগই রাজধানীতে। ঢাকাকে এখন বলা হয় একটা গ্যাস চেম্বার। বায়ুদূষণই স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবেশগত ঝুঁকি।

বাতাসের আণুবীক্ষণিক দূষিত কণা শ্বাসযন্ত্র এবং সংবহনতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে। ক্ষতি হয় ফুসফুস, হৃৎযন্ত্র এবং মস্তিষ্কের। দেশে প্রতি বছর বহু লোক মারা যান ক্যান্সার, স্ট্রোক, হৃৎযন্ত্র এবং ফুসফুস রোগে। মৃতদের ৯০ শতাংশই নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের। এমন মরণ তো স্বাভাবিক নয়। সবচেয়ে অবাক হতে হয় এই ভেবে যে, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এমন দূষণ থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল রক্ষায় তেমন পরিকল্পনার কথা শোনা যায় না।

পরিবেশ দূষণের জন্য হৃদরোগ, ক্যান্সার, ফুসফুসে সংক্রমণজনিত কারণে ও আরো বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত মানুষ চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতি বছর প্রায় ৬৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। ডক্টরস প্লাটফর্ম ফর পিপলস হেলথের সদস্যসচিব ডা: গোলাম রব্বানী সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে এ তথ্য প্রকাশ করেন। সেমিনারে ডা: রব্বানী বলেন, রোগ প্রতিরোধ, দীর্ঘায়িত জীবন ও স্বাস্থ্য- এই তিনটি জনস্বাস্থ্যের মৌলিক উপাদান, যা রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে আমরা কি বলতে পারি, এই দেশের নাগরিকরা সুস্বাস্থ্য উপভোগ করতে ও মনকে ভালো রাখতে পারছেন। স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ নিরাপদ পানির সঙ্কট, অনিরাপদ খাদ্য, সংক্রামক ব্যাধি, করোনা পরিস্থিতি, পুষ্টি-সমস্যা, সড়ক দুর্ঘটনা, পানি-বায়ু-শব্দ দূষণ, অপ্রতুল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পয়োনিষ্কাশন। এখন প্রশ্ন, এমন কষ্টকরভাবে মানুষের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার জন্য দায়ী কে? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি দায়ী? না, এই দায়ের বড় অংশই নিতে হবে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও সংগঠনকে। জানা গেছে, দেশে চারজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হচ্ছে দূষণের কারণে।

এখন তো পুরো দেশে সচেতন মানুষের মাতম চলছে সড়কে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু নিয়ে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আন্দোলনের পর পরিস্থিতি এতটুকুও হেরফের হয়নি, উল্টো গত বছরের চেয়ে দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার বেড়েছে। গত ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ছয় হাজার ২৮৪ জন। নিহতদের মধ্যে ৮০৩ জনই শিক্ষার্থী। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় গত বছর যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের ১৩ শতাংশই ছাত্র-ছাত্রী। সড়ক দুর্ঘটনায় এমন মৃত্যুকে হত্যা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুসারে, ২০২১ সালে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে পাঁচ হাজার ৩৭১টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ছয় হাজার ২৮৪ জন এবং আহত হয়েছেন সাত হাজার ৪৬৮ জন। উল্লিখিত সংস্থার তথ্যমতে, ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে সড়ক দুর্ঘটনার হার বেড়েছে ১৩ শতাংশ আর মৃত্যু বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ।

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ হচ্ছে, গত বছরে মোট দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ২৫ শতাংশই ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। ১৮ শতাংশ চট্টগ্রাম বিভাগে। সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে রংপুর বিভাগে। সংগঠনটির তথ্যানুযায়ী, রাজধানীতে গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৩৭ জন। নিহতের মধ্যে পথচারী সাড়ে ৫২ শতাংশ এবং মোটরসাইকেল আরোহী সাড়ে ২৮ শতাংশ। রাজধানীতে পণ্যবাহী যানবাহন বেপরোয়া গতিতে চলাচল করে; ফলে ভোরে ও রাতে পথচারীদের নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে বেশি। সড়ক দুর্ঘটনায় গত বছর ক্ষতি হওয়া সম্পদের আনুমানিক আর্থিক মূল্য ৯ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা যা জিডিপির ৩ শতাংশ। দুর্ঘটনায় যে পরিমাণ যানবাহনে ক্ষতি হয়েছে, সে তথ্য না থাকায় সম্পদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাপ নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের মত, সড়ক দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দেশের জিডিপির প্রায় দেড় শতাংশের মতো।

গত বছর যত দুর্ঘটনা ঘটেছে তার ৬২ শতাংশের কারণ যানবাহনের বেপরোয়া গতি বলে জানা গেছে। এ ছাড়া চালকের অদক্ষতা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের চলাচল, ফুটপাথ হকারদের দখলে থাকা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সরকারি সংস্থা বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটছে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’ সুষ্ঠু বাস্তবায়ন, গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করা, দক্ষ চালক তৈরি, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, বিআরটিএ’র সক্ষমতা বৃদ্ধি, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচলের জন্য সার্ভিস মোড় নির্মাণ করাসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরো জানা যায়, সড়কে যারা দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করছে তাদের বেশির ভাগই শিশু, কিশোর, যুবক এবং মধ্যবয়সী শ্রেণীর মানুষ। বেদনা এখানে, জীবনে পরিণত বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকতে না পারার সব অনিয়মের কারণে। এসব মৃত ব্যক্তির প্রিয়জনদের চোখের পানি বন্ধ করার জন্য সান্ত্বনা কে দেবে? তাতে কি ক্ষতি পোষাবে? মানুষের অভাব কি অর্থ সম্পদ দিয়ে পূরণ সম্ভব?

দেশে আত্মহত্যা সম্প্রতি বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তারা নিজেদের জীবনে পরিসমাপ্তি ঘটায় এভাবে। নানা বঞ্চনা, ব্যর্থতার কারণে যারা এই জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে আত্মহননের পথ ধরে, এর নেপথ্যে বহু কারণ অবশ্যই আছে। ব্যক্তির এমন মৃত্যুর পর আত্মহননকারীকে নিয়ে স্বজনদের শোক তাপের শেষ থাকে না। কিন্তু বেঁচে থাকাকালে আত্মহননকারীর যে মর্মজ্বালার খবর, সমাজ সংসারে কেউ কি তাকে নিয়ে ভেবেছে? পরিবার সমাজ সংসার কেউ তার বিষয়ে ভেবে দেখলে চিত্র অন্যরকম হতে পারত। সম্প্রতি দু’জন কৃষক এবং মেধাবী ছাত্র আত্মহত্যা করেছেন। তাদের এ সিদ্ধান্ত নেয়ার কার্যকারণ কত বেদনাদায়ক, সংবাদ পাঠকমাত্রই উপলব্ধি করবেন। কিন্তু এমন অপমৃত্যু ঠেকানোর কি কোনো পথ ছিল না? উন্নত দেশগুলোতে এসবের প্রতিকার আছে: বিষণœ ব্যক্তিদের কাউন্সেলিং করা, খোঁজখবর রাখা কে কোথায় এভাবে বিষণ্নতায় ভুগছে।

করোনাকালের পর থেকে এক বছরে দেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন নর-নারী। এর মধ্যে নারীর আত্মহত্যার ঘটনা আট হাজার ২২৮টি এবং পুরুষের আত্মহত্যার ঘটনা ছয় হাজার ২০৮। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার! তথ্য সূত্রে জানা গেছে, পারিবারিক জটিলতা, সম্পর্কের অবনতি, পড়াশোনা নিয়ে হতাশা, আর্থিক সঙ্কটÑ এসব আত্মহত্যার মূল কারণ। তরুণদের সংগঠন ‘আঁচল’ ফাউন্ডেশন এক প্রতিবেদনে দেশে আত্মহত্যার এমন চিত্র জানিয়েছে। ২০২০ সালের ১৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনটি জাতীয় দৈনিক, ১৯টি স্থানীয় পত্রিকা, হাসপাতাল ও থানা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

আঁচল দাবি করেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে আত্মহত্যা ৪৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। তারা তুলনা করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর গত বছরের এ সংক্রান্ত সংখ্যার সঙ্গে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০১৯ সালে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। পারিবারিক সমস্যার কারণে আত্মহত্যা করেছে ৩৫ শতাংশ নর-নারী। এর বাইরে, সম্পর্কের টানাপড়েনে এবং অজানা কারণে ৩২ শতাংশ মানুষ আত্মহত্যা করেন; আর্থিক ও লেখাপড়ার কারণে আত্মহত্যা করেন যথাক্রমে ৪ ও ১ শতাংশ।

আসলে এমন অসময়ে মৃত্যুবরণ তথা আত্মহত্যা সম্পর্কে মানসিক রোগ নিয়ে সচেতনতা বাড়ানোসহ ১১টি কারণ তুলে ধরা হয়েছে আঁচলের প্রতিবেদনে। এর মধ্যে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলর নিয়োগ অন্যতম।
আজকে আমাদের সমাজে মাদক সম্পর্কে অবহিত নন, এমন কেউ কি আছেন? মাদকের ভয়াবহতা লিখে বা বলে শেষ করা যাবে না। মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হলেও বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মাদকের সর্বাত্মক আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হয়েছে। মাদকের স্বর্গরাজ্য গোল্ডেন ক্রিসেন্ট আমাদের দেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এবং আন্তর্জাতিক মাদকদ্রব্য উৎপাদনকারী অঞ্চল মিয়ানমার, লাওস এবং থাইল্যান্ডের সমন্বয়ে গ্লোন্ডেন ট্রায়াঙ্গলের উত্তর-পূর্ব কোণে আমাদের অবস্থান। এসব দেশ থেকে আন্তর্জাতিকভাবে মাদক পাচারের জন্য অভ্যন্তরীণ ট্রানজিট হিসাবে ব্যবহারের কারণে এদেশে মাদকের বিস্তার বোধ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

মাদকের হাতছানি : সারা বাংলাদেশে প্রায় ৭.৫ মিলিয়ন মানুষ মাদকাসক্ত। দেশের বেকার জনসংখ্যারও বড় অংশ মাদকাসক্ত। মোট মাদকাসক্তদের ৪৮ শতাংশ শিক্ষিত এবং ৪০ শতাংশ অশিক্ষিত। মাদকাসক্তদের প্রায় ৫৭ শতাংশ যৌন অপরাধী যাদের ৭ শতাংশ হলো এইচআইভি ভাইরাসে সংক্রমিত। সূত্র জানায়, দেশে প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার ছোট বড় মাদক ব্যবসায়ী রয়েছে, যাদের মধ্যে ২৭ হাজার ৩০০ জনের মতো মহিলা। ২০১৯ সালের এক তথ্য সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন ১১৪ জন রোগী সরকারি ও বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের চিকিৎসা গ্রহণ করে থাকে। আরও অবাক হওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে, ২০১৯ সালে মহিলাদের মাদকসেবীদের সংখ্যা চারগুণ বেড়েছে। মাদক শুধু পরিবারকেই নয়, মাদকের কালো থাবা ধ্বংস করছে পুরো সমাজকে ও একটি জাতিকে। মাদকসেবীদের অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে অকাল মৃত্যু। বহু সম্ভাবনাময় জীবন এভাবে ঝরে পড়ছে সমাজ থেকে।

অসংখ্য মানুষের অকালে এবং অল্প বয়সের মৃত্যুর অন্যতম কারণ ভেজাল খাদ্য। বহু ক্ষেত্রে ভেজাল খাবার খেয়ে অর্ধ জীবন পার হতে না হতেই মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। বিশেষজ্ঞ অভিমত, ভেজাল খেয়ে ৮০ শতাংশ মানুষের লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভেজালের জাল সারা দেশে এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে, সে জাল কারো পক্ষেই ছিন্ন করা সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট তিন বছর খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করে ৫০ শতাংশ ভেজাল দ্রব্য পেয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার ওলিংগং বিশ্ববিদ্যালয় যৌথভাবে গবেষণা জরিপ করে দেখেছে যে, দেশের মোট খাদ্যের ৩০ শতাংশেই ভেজাল রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকার ৬৬ শতাংশ রেস্তোরাঁয় খাবার, ৯৬ শতাংশ মিষ্টি, ২৪ শতাংশ বিস্কুট, ৫৪ শতাংশ পাউরুটি, ৫৯ শতাংশ আইসক্রিম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি হয়। এসব খেয়ে দেশের মানুষ সুস্থ থাকতে পারে কিভাবে? সেজন্য মানুষের কিডনি নষ্ট হচ্ছে; ক্যান্সার আর হার্টস্ট্রোক অহরহ হচ্ছে। গবেষণা সূত্রে প্রকাশ, রাসায়নিক ও বিষাক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতি বছর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন দুই লাখ মানুষ। দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় মারা যাচ্ছে ১৪ জন। আর ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রতি বছর সর্বস্বান্ত হচ্ছেন বহু মানুষ। দেশে প্রায় দুই কোটির অধিক মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত।
নানা কারণে হতাশাগ্রস্ত তরুণ-তরুণীরা জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ হয়ে পড়ছেন। তাদের অনেকে এতটা ভেঙে পড়েন যে, জীবনকে অর্থহীন মনে করে স্বেচ্ছায় তার অবসান ঘটান। সম্প্রতি সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে, সারা দেশে ডজনেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রী, যাদের অভিভাবক সমাজের একেবারে অসচ্ছল মানুষ, তাদের সন্তানসন্ততি হাজার প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে বিভিন্ন সরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে মেধার বিচারে। কিন্তু এখন কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য বিপুল অঙ্কের টাকার প্রয়োজনের কথা ভেবে তাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। এখন কি এসব ছেলেমেয়ের জীবনের সব স্বপ্ন মিসমার হয়ে যাবে? সরকার, কলেজ কর্তৃপক্ষ ও সমাজের বিত্তবানরা এসব ছাত্র-ছাত্রীর স্বপ্নের ফুলকলি কি পরিস্ফুট করতে এগিয়ে আসতে পারেন না?

ndigantababor@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement