১৫ আগস্ট ২০২২
`

দলীয় রাজনীতিতে গণতন্ত্রের অনুশীলন


রাজনীতি আমাদের অনেক দিয়েছে, অপরাজনীতি আবার অনেক কিছু আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে। বেইমানির রাজনীতি আমাদের পরাধীন করেছে। আবার রাজনীতিই আমাদের স্বাধীন করেছে। হাসি কান্নার মধ্য দিয়েই রাজনীতি ওঠাবসা। একজন শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তার ভাগ্যললাটে কী আছে তা সাথে নিয়েই জন্মগ্রহণ করে। শিশুটি এই রাজনীতির প্রভাবের শিকার হয়। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাজনীতিরই বহিঃপ্রকাশ। ভারত উপমহাদেশের পরাধীনতা, পাকিস্তানের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের স্বাধীনতা রাজনীতির গর্ভ থেকেই জন্মলাভ করা একেকটি বাস্তবতা এবং ইতিহাসের স্বাক্ষর।

রাজনীতির পথটা অত্যন্ত পিচ্ছিল এবং এ কারণেই শান্তিপ্রিয় পিতামাতা তার সন্তানকে রাজনীতিতে জড়াতে দিতে চান না। পক্ষান্তরে, তার পিএইচডি করা সন্তান যখন একজন রাজনীতিবিদের আজ্ঞাবহ হয়ে তারই অধীনে চাকরি করে তখন তিনি হয়তো বিষয়টি উল্টো পথে ভাবেন। মানুষ বিষয়টি যেভাবেই চিন্তা করুক না কেন রাজনীতিই একটি রাষ্ট্রের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। সে গতির সীমারেখার মধ্যেই সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সব নাগরিকের বসবাস। ভালো রাজনীতির ফলাফল মানুষের মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার, সুখ ও শান্তি বয়ে আনে। পক্ষান্তরে, আপসকামিতায় রাজনীতি মানুষকে করে রাখে অধিকার বঞ্চিত।

রাজনীতির মুখপাত্র হলো সমমতাবলম্বীদের সম্মিলিত একটি রাজনৈতিক দল। একটি দল সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জন্য একটি পাঠাগার, একটি গবেষণাগার, একজন অভিভাবক এবং যাত্রাপথের পাথেয় বটে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে একটি রাজনৈতিক দল কি তার সংশ্লিষ্ট কর্মী-সমর্থকদের সঠিক পথের পাথেয় হয়েছে?

‘সময়ের’ মানদণ্ডে যদি বিচার বিশ্লেষণ করা হয় তবে কি (কিছু মাত্র ব্যতিক্রম ব্যতীত) বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো আদর্শ কর্মী, কর্মী থেকে নেতা সৃষ্টি করার কোনো প্রয়াস সৃষ্টি করার কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘আমরা অঙ্গীকার করিতেছি যে, যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্ধৃত করিয়াছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতায় সেই সব আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।’

ওই প্রস্তাবনায় উল্লিখিত সব বিষয়ই রাজনীতির সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু যে মূলনীতি অনুযায়ী রাজনীতি পরিচালিত হওয়ার কথা, তা হলো গণতন্ত্র। বামধারায় গড়ে ওঠা দল বা কিছু ছোটখাটো রাজনৈতিক দল ছাড়া বাকিগুলোসহ দেশের বৃহৎ দলগুলো যারা বারবার ক্ষমতায় ছিল বা আছে বা ক্ষমতা যাদের জন্য অপেক্ষা করছে বলে মনে করা হয় সেসব দলে কি অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক ধারা চলমান রয়েছে? ব্যক্তিনির্ভর দল বা ব্যক্তি পূজারী দল ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতা দখলে রাখতে পারে বটে কিন্তু পরীক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত একটি কর্মীবাহিনী বেষ্টিত রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে না। দলে গণতান্ত্রিক ভাবধারার পরিবর্তে যদি ব্যক্তি পূজা শুরু হয় তবে সেখানে আদর্শের প্রতিযোগিতার পরিবর্তে শুরু হয় তেলবাজির প্রতিযোগিতা। তেলের বাটির আবির্ভাবে দলীয় নেতৃত্ব তখন অন্ধত্বের দিকে ধাবিত হতে থাকে, ফলে দলে সঙ্কট সৃষ্টি হয় যা শীর্ষ নেতা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ক্ষমতার মোহজনক বেড়াজালে ‘সঙ্কট’ মোকাবেলা তো দূরের কথা, ‘সঙ্কট’ কী তা-ই অনুধাবন করতে পারেন না। অর্থাৎ দলের সমস্যাটি কী তা নিয়ে কথা না বলায় সমস্যাই প্রকট আকার ধারণ করে, সমস্যা যত প্রকটই হোক, নেতা মাইন্ড করতে পারে এমন কথাও উচ্চারণ করা যাবে না, যা দলে গণতন্ত্র অনুশীলনের পরিপন্থী।

গণতন্ত্রকে যারা ধ্বংস করে তারা গণতন্ত্রকে রক্ষার নাম করেই গণতন্ত্রকে হত্যা করে। রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে দলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়া বাঞ্ছনীয়। অতিস¤প্রতি সৌদি আরবে ৯ বিচারপতিকে কর্মরত অবস্থায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেফতার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ মানে মৃত্যুদণ্ড। বাংলাদেশের একজন প্রধান বিচারপতিকে দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য করা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে যে, শারীরিকভাবে তাকে নাজেহাল করা হয়েছে। সৌদিতে গণতন্ত্র নেই বলেই ৯ বিচারপতি আত্মপক্ষ সমর্থন করার সূযোগ পাননি। বাংলাদেশেও কি একই অবস্থা বিরাজমান?

গণতন্ত্রের যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে তা হলো ক্ষমতার পূজা। দলীয় প্রধানই দলের সর্বময় ক্ষমতার মালিক। নেতাকর্মীর ভাগ্য নির্ভর করে একমাত্র দলীয় নেতার সুদৃষ্টির ওপর। সুদৃষ্টি এবং কুদৃষ্টি দুটোই যেন পাশাপাশি প্রবাহমান। অথচ আমেরিকা বা ব্রিটেনে রাজনৈতিক দলের প্রধানের নাম অনেকেই জানে না। সেখানকার প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর নমিনেশন নির্ধারিত হয় তৃণমূলের সরাসরি ভোটে। ফলে দল প্রধানের প্রভাব বিস্তার করার এখানে কোনো সুযোগ থাকে না, প্রাধান্য পায় তৃণমূল। তাই তেলের বাটি ব্যবহারের সংস্কৃতি সেখানে গড়ে ওঠেনি। পছন্দ অপছন্দের বা পক্ষে বিপক্ষে কথা বলা ও নিশ্চিন্তে মনের ভাব প্রকাশ করার সুযোগ এ দেশের রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। দলের অভ্যন্তরীণ কর্মীদের সভায় বলেই দেয়া হয় যে, সভায় নেগেটিভ কোনো কিছু বলা যাবে না, এসব কথা নিজ কানে শুনেছি।

বামপন্থী দলের বেশ কয়েকটি শিক্ষিত মেয়েকে দেখি যে তারা অফিসে অফিসে ঘুরে পার্টির পত্রিকা ভ্যানগার্ড বিক্রি করে। তাদের দলের সদস্য ও সমর্থক সংখ্যা বড় দলের চেয়ে নগণ্য। কিন্তু বাম দলের কর্মী-নেতাদের সাথে কথা বলে তাদের যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা মেধা দেখা যায়, বড় দলের নেতা-কর্মীদের সাথে কথা বলে রাজনৈতিক সে মাপের বিশ্লেষণ পাওয়া যায় না। কারণ কোথাও রাজনৈতিক কর্মী মানসিকভাবে প্রশিক্ষিত হচ্ছে এবং কোথাও হচ্ছে না। এভাবেই ভিন্নতর রাজনৈতিক সংস্কৃতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে অবাধ গণতন্ত্র নেই বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। প্রজাতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় বড় কর্মকর্তাদের আমেরিকা ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। আমেরিকার মান ভাঙ্গানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু আমেরিকা বলেছে যে, প্রশাসনিক আদেশে এ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া সম্ভব নয়। এ মর্মে রাজনৈতিক বাতাসে অনেক কথাই চাউর হচ্ছে। ইতোমধ্যে সেনাবাহিনীপ্রধান আমেরিকার সেনাপ্রধানের দাওয়াতে সে দেশে গিয়েছেন। সেনাপ্রধানের এ ভ্রমণটি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় অনেক ঘনীভ‚ত হচ্ছে। বিষয়টি যাই হোক রাষ্ট্রে যে গণতন্ত্র নেই তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মনোভাব এখন দৃশ্যমান।

গণতন্ত্রের প্রকার, ভেদ, রকম ও কলাকৌশল একেকজনের মগজে ভিন্নতর। ক্ষমতাসীনদের কাছে গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা এবং ক্ষমতাহীনদের কাছে গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা এক নয়। কিন্তু আশ্চর্য ও দুঃখজনক এই যে, দলীয় অভ্যন্তরীণ ব্যাখ্যা আরো নি¤œমানের হয় যখন দলের শীর্ষ নেতা তার কোনো কাজের সমালোচনাকে সহ্য করেন না। দলের গণতন্ত্রে নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি ঘোষণা থাকলেও সে পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করার অন্য কারো কোনো সুযোগ না থাকার সংস্কৃতিই এখন এ দেশে প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র।

“ইধহমষধফবংয জবভষবপঃরড়হ ড়হ ধিঃবৎ” নামক বইতে গণতন্ত্র সম্পর্কে ঔধসবং ঔ ঘড়াধ বলেছেন যে, “উবসড়পৎধপু ৎবয়ঁরৎবং ধহ বফঁপধঃবফ ধহফ ংড়ষাবহঃ ঘধঃরড়হ” ঔধসবং ঔ ঘড়াধ এর গণতন্ত্র সম্পর্কে মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয় যে, একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জনগণেরও দায়দায়িত্ব রয়েছে। এক দিকে বলা হয় যে, ‘হুজুগে বাঙালি’ তারা একদিকেই ছোটে। অন্যদিকে জনগণ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের দ্বারা প্রতারিত হতে হতে কারো ওপর আস্থা রাখতে পারে না। বর্তমানে জনগণের রাজনীতিবিমুখ হওয়ার এটি প্রধান কারণ। সরকারি দল বলে যে, দেশে রাজনীতির কোনো ইস্যু নেই। পক্ষান্তরে এটাই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে, দেশে প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চা নেই, যা চলছে তা হলো পদ-পদবি ও ক্ষমতার পূজা। ফলে নিজ ভিজিটিং কার্ডের ওজন বৃদ্ধি করার জন্য বাণিজ্য করে হলেও পদ-পদবি বা নমিনেশন সোনারহরিণের মতোই টেন্ডারে ওঠে, যা হয়তো সংশ্লিষ্ট মহল অস্বীকার করবে, কিন্তু বাস্তবতাকে তো আর উড়িয়ে দেয়া যায় না।

অনেক মনীষী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলেছেন, চ‚ড়ান্ত বিজয় ‘গণতন্ত্রেরই’ হয়ে থাকে। যেখানে গণতন্ত্র থাকে না সেখানেই স্বৈরতন্ত্রের উত্থান হয়। অভ্যন্তরীণ বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের যেখানেই হোক স্বৈরতন্ত্রকে বিদায় করার পথ অনেক কণ্টকময়। ফলে একটি টেকসই গণতন্ত্রকে ধারণ করতে প্রয়োজন একটি বিবেকসম্পন্ন জাতি।
লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement