০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯, ৬ জিলহজ ১৪৪৩
`

জাতীয় সরকার : নির্বাচনের আগে নাকি পরে!


রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জাতীয় সরকারের ধারণাটি নতুন নয়। রাষ্ট্র যখন কোনো গুরুতর সঙ্কট অতিক্রম করে, তখন সাধারণত জাতীয় সরকার গঠিত হয়। এই সরকারের আরো অনেক নাম আছে- অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচনকালীন সরকার বা যুদ্ধকালীন সরকার। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালে ব্রিটেনে এ ধরনের সরকার গঠিত হয়েছিল। জাতীয় সরকার গঠনের উদ্দেশ্য হলো- পুরো জাতির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক ময়দানে বিভিন্ন দলের বিভিন্ন কর্মসূচি থাকতে পারে; কিন্তু যখন জাতি কোনো সঙ্কট বা যুদ্ধ পরিচালনা করে তখন সব নাগরিকের ঐক্য প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। জাতীয় সরকার জাতির সব মন-মগজ, সম্পদ ও কৌশলকে গ্রহণ করে সঙ্কট মোকাবেলার চেষ্টা করে। সাধারণত জাতীয় সরকারের নেতৃত্বে থাকেন এমন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতা যিনি সব মহলের কাছে কমবেশি গ্রহণযোগ্য। তার নেতৃত্বের কুশলতার ওপর নির্ভর করে সফলতা। তাকে হতে হয় সব অনুরাগ ও বিরাগের ঊর্ধ্বের মানুষ। সেখানে দেশপ্রেমই মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র বিগত অর্ধশত বছরে অনেক সঙ্কট অতিক্রম করেছে। সঙ্কটের তারতম্য অনুসারে সরকারেও তারতম্য ছিল। ১৯৭৫-এ খন্দকার মোশতাকের সরকার সঙ্কট অতিক্রম করেছে। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে ওই আপৎকালীন সরকার গঠিত হয়নি বলে তা ছিল অস্থায়ী। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়। আবার জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রাথমিক সামরিক সরকার মোটামুটি সব দল ও মতের প্রতিনিধিত্ব থাকায় স্থিতিশীলতা অর্জন করে। ২০০৬ সালের তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জরুরি অবস্থা প্রদর্শন করেছে; কিন্তু একধরনের একপেশে হওয়ার কারণে এটি আরো দীর্ঘায়িত করার খায়েশ থাকলেও তা শিগগিরই বিতর্কিত হয়ে পড়ে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে নাম দেয়- জাতীয় ঐকমত্যের সরকার। সেখানে জাতীয় ঐকমত্যের উপাদান ছিল সামান্যই। আবার ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সংসদীয় বিধি বহিভর্র্‚তভাবে গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য নেতাকে নিয়ে যে সরকার গঠন করে, তাকেও জাতীয় ঐকমত্যের সরকার বা মহাজোট সরকার বলা হলেও জোটের অংশীদাররা ছিল তথাকথিত স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তি। সেখানেও বিরোধী মতামতের স্থান ছিল না। দেখা গেছে, ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য আওয়ামী লীগ হাসানুল হক ইনুর ভাষায়- এক আনা দু’আনা ও সিকি আধুলি নিয়ে ষোলআনা পূরণ করেছে। আসলে জাতীয় ঐকমত্যের বা জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে প্রতিফলিত হয়নি। এখন যে জাতীয় সরকারের কথা বলা হচ্ছে তাতে সত্যিকার অর্থেই একটি জাতীয় সরকারের প্রস্তাবনা বা আশাবাদ রয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকার উত্তোলক জাতীয় নেতা আ স ম রবসহ বাম ধারার কিছু রাজনীতিবিদ জাতীয় সরকারের কথা বলে আসছেন। তারা মূলত এই জাতির বিবিধ সঙ্কট মুক্তির বা সংস্কারের প্রত্যাশায় জাতীয় সরকারের কথা বলছেন। তারা অবশ্য নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় সরকারের কথা বলছেন না। তাদের প্রদর্শিত জাতীয় সরকার কিভাবে গঠিত হবে অর্থাৎ প্রতিনিধিত্ব কিভাবে নির্ধারিত হবে- তা পরিষ্কার নয়। অপর দিকে নিয়মতান্ত্রিকতার কথা বলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের বিকল্প নেই। সে ক্ষেত্রে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনের পরে যে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলেছেন, তার প্রায়োগিক বাস্তবতা রয়েছে। এই প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নির্বাচনে যদি বিএনপি জয় লাভ করে তাহলে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামরত সব ব্যক্তি ও দলকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠিত হবে। এই জাতীয় সরকারে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামশীলরা নির্বাচিত না হলেও প্রতিনিধিত্ব পাবে। সরকারে তাদের অংশগ্রহণ থাকবে। আমার কাছে প্রস্তাবটি চমৎকার মনে হয়েছে। এর মধ্যে একটি রাজনৈতিক কুশলতা ও দূরদৃষ্টির আভাস পাওয়া যায়। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামশীল সব দল ও মতের ভিত্তিতে সরকার পরিচালিত না হওয়ায় জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। ১৯৯০ সালে ত্রিদলীয় জোটের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এরশাদের পতন হলেও ঘোষিত ফর্মুলা অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হয়নি। রাজনৈতিক দল মানেই ক্ষমতায় অংশগ্রহণ করা। এ প্রস্তাবের মাধ্যমে ছোট-বড় সব মত ও পথের রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা থাকছে। এমন একটি বিরাট সম্ভাবনার জন্য সবাই আগ্রহভরে কাজ করবে এবং ভবিষ্যৎ সুফল লাভ করবে- এটা প্রত্যাশা করা যায়।
আ স ম রব প্রস্তাবিত জাতীয় সরকার ও তারেক রহমানের এই প্রস্তাবের মধ্যে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে ভিন্নতা নেই। তবে ভিন্নতা আছে প্রক্রিয়ায়। ক্ষমতাসীন সরকারের পতন হলে সব দল ও মতের ভিত্তিতে সরকার গঠিত হলে, সেখানে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়ে বিরোধের আশঙ্কা রয়েছে; কিন্তু একটি নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে যদি জাতীয় সরকার গঠিত হয় তাহলে আইন ও নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটবে না। স্বাভাবিকভাবেই একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল প্রাধান্য বিস্তার করবে। তখন যারা বিরোধী দলে থাকবে, তাদের নিয়েও জাতীয় সরকার গঠিত হতে পারে। তবে তখনকার অবস্থাই বলে দেবে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রাপ্ত ভোট ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের ভিত্তিতে সরকারটি গঠিত হতে পারে। ছোট ছোট দল বিশেষত বাম ধারার বুদ্ধিজীবীসুলভ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখানে স্থান পেতে পারে। তবে শর্ত হচ্ছে- তারা গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামশীল হবে। এখনো ক্ষমতাসীন সরকারের তাঁবেদার হিসেবে দু’আনা, চার আনার বাম ধারার লোকরা সরকারে ছিলেন বা আছেন। তা তারা নিশ্চয়ই গণতন্ত্রের পরিপূরক নন। ইসলামী দলগুলো কোনো আসন না পেলেও তাদের জনসমর্থনের ভিত্তিতে অনেকটা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ সরকারে অংশগ্রহণের আশা করতে পারবে। সে ক্ষেত্রে জাতীয় সরকারের আদর্শ হতে হবে দেশপ্রেম, গণতন্ত্র, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব।

জাতীয় সরকার যদি বলা হয় তাহলে তা নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থানকে নির্ণয় করে বলাই ভালো। নির্বাচন আগের সরকার অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক ধরনের নির্বাচনকালীন সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে। একে জাতীয় সরকার বলা যায় না। এমন অবস্থার যদি সৃষ্টি হয় যে, ক্ষমতাসীনদেরও জায়গা দিতে হয় আর যদি তারা গোঁ-ধরে যে, জাতীয় সরকার বলতে হবে- তাহলে তা মেনে নেয়াই শ্রেয়। কারণ গণতন্ত্রই জনগণের লক্ষ্য। আর সে লক্ষ্য কেবল নির্বাচনের মাধ্যমেই অর্জিত হতে পারে। একটি অপ্রিয় বাস্তবতা হচ্ছে, এই চলমান বিতর্কিত জাতীয় সংসদ জাতীয় সরকার অথবা নির্বাচনকালীন সরকারের কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে না। যেমন- বিএনপি সরকার সাংবিধানিক প্রয়োজনে ১৯৯৬ সালে ২৮ ফেব্রæয়ারির নির্বাচনের আয়োজন করেছিল। তবে বাধ্য করতে পারলে এই সংসদ সেই পুরনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। স্মরণ করা যেতে পারে, এই সরকার শুধু ক্ষমতার লোভে, শুধু ক্ষমতার লোভে এবং শুধু ক্ষমতার লোভে এই জাতির একটি শ্রেষ্ঠ অর্জন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ২০১৫ সালে বাতিল করে দেয়। সেখানে তারা অজুহাত হিসেবে তাদের মনোনীত প্রধান বিচারপতির রায়কে ব্যবহার করে। অথচ ওই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে আরো তিনটি নির্বাচনের জন্য রেখে দেয়ার সুপারিশ ছিল।

এই মুহূর্তে গোটা জাতির সামনে কঠিন বাস্তবতা হলো- আগামী নির্বাচন। সরকার হঠানোর নিয়মতান্ত্রিক উপায় হলো নির্বাচন। ক্ষমতাসীনরা ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে বোগাস নির্বাচন নির্বাচন খেলা করে। এখন ২০২৩ সালের নির্বাচনটি যাতে খেলায় পরিণত না করতে পারে সে জন্য সব বিরোধী দলকে একত্র হয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সে ক্ষেত্রে পেশাজীবীদের আন্দোলন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আন্দোলন, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির মতো বিষয়কে নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আন্দোলনের পর আন্দোলন করে সরকারকে দুর্বল করে তুলতে হবে। নানাভাবে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। শক্তি প্রয়োগের যে নীতি নির্মমভাবে এই সরকার গ্রহণ করছে, তাকে প্রতিরোধ করতে হবে।

অবশ্যই তা গণতান্ত্রিক ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়। কোনোরকম ভায়োলেন্স বা সন্ত্রাসের আশ্রয় নিলে সরকার বহির্বিশ্বে এটা দেখাতে পারবে যে, বিরোধীদের সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। গণ-আন্দোলনকে নির্বাচনের আগে এমন অনিবার্য করে তুলতে হবে যে, সরকার পদত্যাগে বাধ্য হবে। এই সরকারের একটি দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য এই যে, তারা ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে সব কিছু করতে পারে। তারা আন্দোলনের তোড়ে ভেসে যাওয়ার উপক্রম হলে সব কিছুই মেনে নেবে। যেমন- তারা কোটা আন্দোলন মেনে নিয়েছে। তারা নিরাপদ সড়ক আন্দোলন মেনে নিয়েছে। আন্দোলনকারীদের তারা কৌশলে পরবর্তীকালে নিপীড়ন, নির্যাতন করেছে। তবে এখানে যদি সরকার পতনের সম্ভাবনা প্রবল থাকে, তাহলে তারা সে সুযোগ পাবে না।

এটা লক্ষণীয় যে, রাজনৈতিক ব্যক্তি, দল ও গোষ্ঠী যারা এখন মাঠে-ময়দানে আন্দোলন সংগ্রাম করছে তাদের মধ্যে নির্বাচনপূর্ব সরকার নিয়ে কোনো দ্বিধা-দ্ব›দ্ব নেই। সে সরকারের নাম নির্বাচনকালীন সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এমনকি জাতীয় সরকারও যদি হয় তাহলেও হয়তো তাদের আপত্তি থাকবে না। এমনিতেই নির্বাচনের আগে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে তথাকথিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেখাতে চেষ্টা করেছে। তখন মন্ত্রিসভা সঙ্কুচিত হয়েছে। বলা হয়েছে- কোনো নীতিগত বিরাট সিদ্ধান্ত তারা নেবে না। এটি ছিল সংসদীয় রাজনীতি অনুশীলনের নমুনা দেখানোর অপচেষ্টা। যেমনটি ব্রিটেন বা ভারতে অনুষ্ঠিত হয়। ব্রিটেন তো সংসদীয় ব্যবস্থার উত্তম আদর্শ। তারা প্রকৃতপক্ষেই নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে। আর ভারতে আজকাল প্রবণতা হচ্ছে- কারচুপি, প্রতারণা ও প্রভাবিত করা। কিন্তু বাংলাদেশে বিগত প্রায় ১৫ বছরে যে নির্বাচনই হোক না কেন তা আসলে নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার নয়। বাংলাদেশে আগামী ২০২৩ সালের নির্বাচনে যদি আওয়ামী লীগ জয় লাভ করে তাতেও জনগণের আপত্তি নেই। কেয়ামত সে কেয়ামত তক তারা ক্ষমতায় থাকুক; কিন্তু অতি অবশ্যই জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে। শক্তির ভিত্তিতে নয়।

গোটা পৃথিবীতে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলোর পতন ত্বরান্বিত হয়েছে। ট্রাম্পকে হটিয়ে জো বাইডেন ক্ষমতাসীন হয়েছেন। ব্রিটেনে বরিস জনসনের গদি টলটলায়মান। পাকিস্তানে ইমরান খানের পতন হয়েছে। সেখানে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। সিংহলে রাজাপাকসে পরিবারের অবস্থান টলটলায়মান। তারা বিরোধীদের নিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। জনগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বাংলাদেশে কখন এ আহ্বানটি আসবে।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement