০৪ জুলাই ২০২২, ২০ আষাঢ় ১৪২৯, ৪ জিলহজ ১৪৪৩
`

জীবনের শুদ্ধতায় রমজান


পবিত্র মাহে রমজানের এক মাস সিয়াম সাধনা মানব জীবনে শুদ্ধতা লাভের এক সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। মহত্তর চারিত্রিক গুণাবলি অর্জন ও সত্যবোধকে জাগ্রত করতে সংযম ও কৃচ্ছ্রতার ভূমিকা ব্যাপক। সাওম মানে বিরত থাকা। কুকর্ম ও কুচিন্তা ও ইন্দ্রিয় পরিচর্যা পরিহার করে সংযমী হওয়াই রোজার শিক্ষা। রমজানের শাব্দিক অর্থ- দগ্ধ করা। সিয়াম সাধনার উত্তাপে; ধৈর্যের অগ্নিদহনে মুসলমান মাত্রই এ মাসে কুপ্রবৃত্তিকে দগ্ধ করে শুদ্ধ পরিশোধিত মানুষে পরিণত হয়। তাই রমজানুল মুবারক দৈহিক, আত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক পরিশুদ্ধির প্রশিক্ষণের মাস। দিনের বেলা রোজা ও রাতের বেলা ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ দেহ-মনকে পরিশুদ্ধ করতে পারে এ রমজান মাসে। পবিত্রতা ও পরিশুদ্ধতায় সিয়াম পালিত হয়ে থাকে। সিয়াম পালিত হয়- ১. চিত্তশুদ্ধির জন্য; ২. পরিচ্ছন্নতার জন্য; ৩. সত্যবোধকে জাগ্রত রাখতে; ৪. পার্থিব আকাক্সক্ষাকে নিবৃত্ত রাখতে; ৫. বিনয় এবং নম্রতা প্রতিষ্ঠায়, সহমর্মিতার ও সৌহার্দের চেতনা উজ্জীবনে এবং ৬. সর্বোপরি মহান প্রভু আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশে।

সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতা অর্জন করে থাকে। আল্লামা ইবনুল কায়্যিম বলেন, ‘মানুষের আত্মিক ও দৈহিক শক্তি সংরক্ষণে রোজা অত্যন্ত কার্যকর। এক দিকে তা মানুষের পাশবিক চাহিদার প্রাবল্য থেকে মুক্ত করে তার দৈহিক স্বাস্থ্যসুরক্ষার নিশ্চয়তা বিধান করে; অপরদিকে নৈতিক উৎকর্ষের মাধ্যমে আত্মিক সুস্থতা সাধন করে।’ মাসব্যাপী রোজার মাধ্যমে মানুষের জৈবিক চাহিদা ও পাশবিক প্রবৃত্তি দুর্বল হয়ে যায়, মনুষ্যত্ব ও রূহানিয়াত সজীব ও জাগ্রত হয়। রিপুর তাড়নামুক্ত হয়ে মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত বিবেক ও প্রজ্ঞার সদ্ব্যবহার করে সুউচ্চ মর্যাদার অধিকারী হতে পারে। সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ সৎকর্মের প্রতি ধাবিত হওয়ার প্রণোদনা লাভ করে। অসদুপায়ে সম্পদ পুঞ্জীভূত করার মানসিকতা লোপ পায়। ‘আমরা সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে চিত্তশুদ্ধির কথা বলেছি। চিত্তশুদ্ধি কাকে বলে? মানুষের চিত্ত সততই চঞ্চল। আমাদের চিত্তে নানা ধরনের ইচ্ছা জাগে। সেসব ইচ্ছার ভালো-মন্দ দুই-ই আছে। কিন্তু চিত্তকে শাসনে রেখে অপরাধের আগ্রহ থেকে মুক্ত রাখা অত্যন্ত কঠিন। এখন এই কঠিন কাজ কিভাবে সাধন করতে হবে? তার একটি প্রথাগত দিক-নির্দেশনা আমরা সিয়াম সাধনার মধ্যে পেয়ে থাকি। রমজানের ব্যবহারিক নিয়ম-কানুনগুলো যদি পরিপূর্ণভাবে পালন করি তাহলে তার মধ্য দিয়ে চিত্ত শাসন সহজেই কার্যকর হয়। একজন মানুষ যদি সারাদিন আহার্য এবং পানীয় গ্রহণ না করে এবং সে সময়টুকুতে যদি সে মহান প্রভু আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে সর্ববিধ কার্যক্রম গ্রহণ করে তাহলে তার চিত্তে পার্থিব আকাক্সক্ষা জাগবে না এবং অশুদ্ধ ও বিকল চিন্তায় চিত্ত ভারাক্রান্ত হবে না।’ ( ড. সৈয়দ আলী আহসান)

ইসলামের ইতিহাসে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা রমজানে সংগঠিত হয়েছে। যেগুলো একেবারে ‘চ‚ড়ান্ত নিষ্পত্তিকারী’ ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। মুসলমানরা রোজা রেখে সামরিক অভিযান চালিয়েছেন। হিজরি তৃতীয় সালের ১৭ রমজান বদরের প্রান্তরে মহানবী সা:-এর নেতৃত্বে ৩১৩ জন রোজাদার যোদ্ধা এক হাজার কুরাইশ বাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হন। এ রোজাদাররা জান বাজি রেখে এক হাজার বৈরী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে বদরের প্রান্তরে ইসলামের ঝাণ্ডা বুলন্দ করেন। হিজরি অষ্টম সালের ২০ রমজান রোজা রেখে মহানবী সা: ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে মক্কা বিজয় সম্পন্ন করেন। এরকম রক্তপাতহীন মহাবিজয় পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। আর এটাও ছিল পবিত্র রমজান মাসে। হিজরি প্রথম শতাব্দীতে স্পেনে যখন ইহুদিরা সে দেশের জনগণের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালাচ্ছিল, তখন ১০ হাজার যোদ্ধা নিয়ে রমজান মাসেই ৯০ হাজার খ্রিষ্টান বাহিনীর বিরুদ্ধে জিব্রাল্টার প্রণালি অতিক্রম করে স্পেনের ভূমিতে তারা অভিযান চালান। এ অভিযানের ফলে স্পেনে মুসলমানদের সাতশ’ বছরের শাসনের সোনালি যুগের সূচনা হয়। এটাও ছিল রমজান মাসে।

৫৮২ হিজরির রমজানে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি বহু বছর ধরে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সিরিয়া ও তার সন্নিহিত অঞ্চল শত্রæমুক্ত করেন। এটিও ছিল রমজান মাস। এই যোদ্ধারা রোজা রেখেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে মঙ্গোলিয়রা এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ধ্বংসলীলা ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। ৬১৭ হিজরিতে সমরকন্দ-হামাদান প্রভৃতি এলাকায় তারা আগ্রাসন চালিয়ে বহু মানুষ হত্যা করে। ইতিহাসের বর্ণনা মতে, সাত লাখ মানুষ মঙ্গোলিয়দের হাতে প্রাণ হারায়। ৬৫৬ হিজরিতে চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খান বাগদাদ দখল করে এমন ধ্বংসযজ্ঞ চালায় যে, ১৬ লাখ মানুষ হালাকু খানের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। বলা হয়ে থাকে, বাগদাদের রাস্তায় কুকুর ও পেঁচা ছাড়া কোনো প্রাণী অবশিষ্ট ছিল না।

মুসলমানদের পাঁচশ’ বছরের ঐতিহ্যসমৃদ্ধ পাঠাগারে আগুন ধরিয়ে ভস্মীভূত করে দেয়া হয়। হালাকু খানের অনুসারীরা বাগদাদের মতো ইসলামী সভ্যতার লালন কেন্দ্রে আজান বন্ধ করে দেয় এবং মুসলমানদের মদ পানে ও শূকরের মাংশ ভক্ষণে বাধ্য করে।

মুসলমানরা যাতে মসজিদের ভেতরে নামাজ পড়তে না পারেন, সে জন্য তারা মসজিদের ভেতর শরাব ছিটিয়ে দেয়। ৬৫৮ হিজরির ২৫ রমজান মামলুক সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুব বিপুল সংখ্যক সেনাবাহিনী নিয়ে ‘আইনে-জালুতের’ যুদ্ধে মঙ্গোলিয়দের পরাস্ত করেন। এসব যোদ্ধারা ছিলেন ‘রোজাদার’। (শ্রুতিলিখন : তাকরিম আহমদ চৌধুরী)
অতি ভোজন স্নায়ুকোষে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। রোজা দেহের জন্য প্রতিষেধকের কাজ করে থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, উপবাসব্রতের কারণে দেহাভ্যন্তরে এন্টিবায়োটিক এক বিরাট শক্তি সৃষ্টি হয় যার মাধ্যমে বহু ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও জীবাণু মারা পড়ে। এক মাসের সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্যে দিনের বেলা যখন পানাহার বন্ধ থাকে, তখন পাকস্থলী ও অন্ত্রের ঝিল্লি দেহযন্ত্র থেকে জীর্ণ পদার্থগুলো বের করে দেয়। সারা বছর জৈব রসজাত যে বিষ দেহে জমা হয়, সিয়ামের আগুনে তা পুড়ে নিঃশেষে রক্ত বিশুদ্ধ হয়, বিষমুক্ত হয়। হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটাল ওয়েট সেন্টারের অ্যাসোসিয়েট ডাইরেক্টর ড. অ্যাঞ্জেলা ফিচ বলেন, ‘বিরতিহীন উপবাস (রোজা) মানে একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা যখন আপনি খাবেন না। এটি খাদ্যকে আরো ভালোভাবে শরীরে বিপাক করতে দেয় এবং রোগীদের ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে। এর অন্যান্য সুবিধাও আছে, যেমন ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস করে, অটোইমিউন রোগ নিয়ন্ত্রণ করে এবং এমনকি ব্যক্তির জীবনে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা জোগায়। অটোইমিউন রোগ এমন একটি অবস্থা যেখানে ইমিউন সিস্টেম ভুলভাবে শরীরকে আক্রমণ করে। ইমিউন সিস্টেম সাধারণত ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাসের মতো জীবাণু থেকে রক্ষা করে। যখন এটি এই বাইরের আক্রমণকারীদের টের পায়, তখন এটি তাদের আক্রমণ করতে ফাইটার সেলের একটি বাহিনী পাঠায়। ১২ ঘণ্টা উপবাসের পর রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা কমে যায়, যা শরীরকে জ্বালানি হিসেবে আরো চর্বি পোড়াতে দেয়। এটি এমন রোগীদের জন্য সহায়ক যারা ইনসুলিন প্রতিরোধী, যার অর্থ তাদের শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ইনসুলিন তৈরি করে। একজন রোজাদার রমজান মাসে তার প্রতিটি অঙ্গ বিশেষত হাত, পা, চোখ, মুখ, উদরকে অবৈধ ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রেখে সংযমী হয়। দেহের ওপর রোজার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। ইচ্ছাশক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রেখে দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিচালিত করার শিক্ষা দেয় মাহে রমজান।

‘যখন রমজান মাস শুরু হয়, মহান আল্লাহ জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেন, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেন এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করে রাখেন।’ যার কারণে ইবাদত, জিকির, তিলাওয়াত, কৃচ্ছ্রতা সাধন ও আল্লাহর একনিষ্ঠ আনুগত্যের স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। কেবল পানাহার ও পাপাচার ত্যাগ করলেই রোজা পালন হয় না। সেই সাথে সর্বপ্রকার অন্যায় ও পাপকাজ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং অন্তরকে করতে হবে পরিচ্ছন্ন, তবেই রোজা মুমিনের জীবনে নিয়ে আসবে অফুরন্ত রহমত ও বরকত। এ প্রসঙ্গে মহানবী সা: বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রোজা রাখে সে যেন কোনো রকম অশ্লীলতা ও হইহুল্লোড় না করে। কেউ যদি তাকে গালাগাল করে বা তার সাথে ঝগড়া করে সে যেন বলে- ‘আমি রোজাদার’। (বুখারি ও মুসলিম) রোজা ধৈর্য, সংযম ও নৈতিক উৎকর্ষের জন্ম দেয়। শিষ্টাচারের মাধ্যমে নৈতিক চরিত্র গঠন রমজানের সিয়াম সাধনার একটি মৌলিক শিক্ষা।

শুদ্ধতার এ অমোঘ মাসটিতে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করার সুযোগ অবারিত হয়। সিয়ামের অর্থ হচ্ছে তাকওয়ার অনুশীলন আর তাকওয়ার অনুশীলনই অপরাধমুক্ত সমাজ তৈরির অন্যতম হাতিয়ার। রমজান মানুষের মধ্যে মানবিকতাবোধের উন্মেষ ঘটায়। মহানবী সা:-এর ভাষায় ‘সহমর্মিতা ও সৌহার্দের মাস মাহে রমজান’। (বায়হাকি) কেননা ধনী ও বিত্তশালীরা সারা দিন রোজা রেখে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জটরজ্বালার দহন-বেদনা বুঝতে সক্ষম হন, ফলে তাদের মধ্যে সমাজের বঞ্চিত ও অবহেলিত মানুষের প্রতি সহমর্মিতার অনুভূতি জাগ্রত হয়। রমজান মাসে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের কল্যাণের অর্থ ব্যয় করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

মহানবী সা: বলেন, ‘হে আয়েশা! অভাবগ্র্রস্ত মানুষকে ফেরত দিও না। একটি খেজুরকে টুকরো টুকরো করে হলেও দান করো। দরিদ্র মানুষকে ভালোবাস এবং কাছে টানো। কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তোমাকে কাছে টানবেন।’ সমাজের প্রতিটি সদস্য সিয়াম সাধনার ফলে অর্জিত সহমর্মিতার শিক্ষা বছরের বাকি ১১ মাস যদি অনুশীলন করতে পারে তাহলে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত পৃথিবী গড়া সম্ভব। রমজান মাস এলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যসামগ্রী মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে অত্যধিক মুনাফা লাভের আশায়। এটি অত্যন্ত গর্হিত ও অন্যায় কাজ। মহানবী সা: বলেন, ‘মজুদদার অভিশপ্ত’।

রমজানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা প্রভৃতি অন্যায় আচরণ পরিহার করে অতি মানবীয় জীবনের দীক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ করে থাকে। অতএব মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা আল্লাহ পাকের এক অপূর্ব নিয়ামত, যা অফুরন্ত কল্যাণের পথ উন্মোচিত করে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
drkhalid09@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement