০৫ জুলাই ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯, ৫ জিলহজ ১৪৪৩
`

রোজা সবার কল্যাণ বয়ে আনুক

-

বরকতময় মাস রমজান শুরু হয়েছে। এ মাস বান্দার জন্য মহান আল্লাহর শ্রেষ্ঠ উপহার। এটি মহান আল্লাহর অসীম দয়া ও ক্ষমা পাওয়ার এবং পাপমুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করে। এবার মাসটি এমন সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশের মানুষ অর্থনৈতিক সঙ্কটে প্রায় দিশেহারা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা দুঃসহ হয়ে পড়েছে। তবে যত কষ্টই হোক, এ মাসের পুণ্য থেকে বঞ্চিত হতে চান না ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। তাই ঘরে ঘরে রোজা পালন শুরু হয়েছে।

রমজান বা রমাদান শব্দের অর্থ প্রচণ্ড গরম, সূর্যের খরতাপে পাথর উত্তপ্ত হওয়া, সূর্যতাপে উত্তপ্ত বালু বা মরুভূমি, মাটির তাপে পায়ে ফোসকা বা ঠোসা পড়ে যাওয়া; পুড়ে যাওয়া; ঘাম ঝরানো, চর্বি গলানো; পাপ-তাপ ইত্যাদি। রমজানে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় রোজাদারদের পেটে আগুন জ্বলে; তাই এ মাসের নাম রমজান। (লিসানুল আরব)। আর রোজাকে আরবিতে বলা হয় ‘সিয়াম’। সিয়াম হচ্ছে বহুবচন, একবচন ‘সওম’। এর অর্থ বিরত থাকা।

ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম রোজা। রমজান কুরআন নাজিলের মাস। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনুল কারিমে একমাত্র এই মাসের নাম উল্লেখ করে একে সম্মানিত করেছেন। রমজান মাসের শেষ দশকেই রয়েছে পবিত্র লাইলাতুল কদর। এ রাতের মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও বেশি। ইবাদতের অনন্য মৌসুম এই রমজান মাস।

রোজার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করা, বদঅভ্যাস পরিত্যাগ করা এবং রমজানকেন্দ্রিক কুরআন-হাদিসের আমলগুলো যথা নিয়মে পালন করা। পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।’

বায়হাকির বর্ণনায় এসেছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: বলেছেন, ‘রমজানের প্রথম ১০ দিন রহমত বা দয়া-করুণার, দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাত বা ক্ষমার এবং শেষ ১০ দিন জাহান্নামের আগুন থেকে নাজাত বা মুক্তির। এ মাসে সব প্রকার পাপ-তাপ পুড়ে ছাই হয়ে রোজাদাররা নিষ্পাপ হয়ে যান।’ হাদিস শরিফে এই মাসকে বরকতময় ও মহিমান্বিত মাস বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সাহরি, ইফতার, তারাবিহ নামাজসহ নফল ইবাদতে এ মাসটি অনন্য। এ মাসে সিয়াম পালন আল্লাহ ফরজ করে দিয়েছেন। তারাবিহর সালাত আদায়ে রয়েছে অশেষ সওয়াব। নবীজী সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এ মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায়, একটি নফল ইবাদত করবে, সে অন্য মাসের ৭০টি নফল ইবাদতের সওয়াব লাভ করবে। এটা ধৈর্যের মাস আর ধৈর্যের প্রতিদান হচ্ছে জান্নাত।’ (বায়হাকি, মিশকাত শরিফ)

রমজানের আগমনে রাসূলুল্লাহ সা: অতিশয় আনন্দিত হতেন। সাহাবিদের বলতেন, ‘তোমাদের মাঝে বরকতময় রমজান মাস এসেছে’। এর ফজিলত বর্ণনা করে বলতেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্য রমজানের সিয়াম ফরজ করেছেন। এ মাসে আকাশের দ্বারগুলো খুলে দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। অভিশপ্ত শয়তানকে শিকল পরিয়ে বন্দী করা হয়। এ মাসে রয়েছে একটি রাত, যা হাজার রাতের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যে ব্যক্তি রমজানের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে মূলত সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো।’ (নাসায়ি)

রমজান মাস ক্ষমা লাভের মাস। তিরমিজির হাদিসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘ওই ব্যক্তির নাক ধুলায় ধূসরিত হোক, যার কাছে রমজান মাস এসে চলে গেল অথচ সে তার পাপগুলো ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না।’ রোজার ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘রোজা শুধু আমার জন্য। আমিই এর প্রতিদান দেবো।’ (মুয়াত্তা ইমাম মালেক-৬৭৪)

হজরত সালমান ফারসি রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সা: এ মাসে বিশেষ চারটি আমল বা কাজ বেশি বেশি করতে বলেছেন। এর মধ্যে দু’টি কাজ দ্বারা মহান আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা আর দু’টি কাজ এমনই যা নিজের জন্য। আল্লাহর জন্য দুই আমল- কালেমার সর্বোত্তম তাসবিহ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করা এবং আল্লাহর কাছে বেশি করে ইসতিফগার বা ক্ষমা তথা ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ পাঠ করা। নিজের দুই আমল হলো আল্লাহ তায়ালার কাছে জান্নাত প্রার্থনা করা এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি চাওয়া। এ জন্য আমরা ‘আল্লাহুম্মা ইন্না নাস আলুকার জান্নাতা ওয়া নাউজুবিকা মিনান নার’ অথবা ‘আল্লাহুম্মা আদখিলনাল জান্নাতা ওয়া আঝির না মিনান নার’ পাঠ করতে পারি। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আত্মশুদ্ধির নিয়তে রমজান মাসের রোজা রাখলে এবং ইবাদত-বন্দেগি করলে মহান আল্লাহ খুশি হন বলে হাদিসের বর্ণনা এসেছে।

রমজানে বেশি বেশি দান সাদাকা করাও উত্তম ইবাদত। রমজানে রোজাদারদের ইফতার করানো কিংবা খাওয়ানো অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। জায়েদ ইবনে খালেদ রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, একজন রোজাদারকে ইফতারের সময় যে আহার করালো, রোজা রাখার সমান সওয়াব সে পাবে, কিন্তু তাতে রোজাদারের সয়াবের কোনো ঘাটতি হবে না।’ (তিরমিজি) রমজানের সওয়াব মহান আল্লাহ সাথে সাথেই দিয়ে দেন। আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত- নবীজী সা: বলেছেন, ‘কর্মীর মজুরি কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই দেয়ার নিয়ম। সে মতে বান্দা যখন রোজা শেষ করে, তখনই তাকে এর পূর্ণ পারিশ্রমিক দিয়ে দেয়া হয়।’

রমজান আত্মশুদ্ধি ও সংযমের শিক্ষা দেয়। তাই সর্বক্ষেত্রে আমাদের সংযমী হওয়া উচিত। এই সংযম যেমন খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে, তেমনি কথাবার্তা, আচার-আচরণের ক্ষেত্রেও। সালামের প্রসার, সুন্দরভাবে কথা বলা এবং ইসলামী আচারগুলো এ মাসে আমরা বেশি চর্চা করতে পারি। এ মাসে অধিক মুনাফালোভী ব্যবসায়ী খাদ্যে ভেজালসহ নানা কারসাজির আশ্রয় নেন, কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেন, এটি গর্হিত অপরাধ, রমজানের শিক্ষাকে এটি ব্যাহত করে।

রোজা পালনের মধ্য দিয়ে শারীরিক সুস্থতা লাভেরও সুযোগ রয়েছে। প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা: এ বি এম আবদুল্লাহর মতে ‘আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সুচিন্তিত অভিমত হলো- রোজা স্বাস্থ্যের কোনো ক্ষতি তো করেই না, বরং শরীর ও মনের উন্নতি লাভেও সহায়ক। পেপটিক আলসার, ডায়াবেটিক, হৃদরোগী, বাত ব্যথার রোগীরাও সরাসরি রোজায় উপকার পান।’ তিনি আরো বলেন, ‘পাকস্থলীতে একধরনের উপকারী জীবাণু খাদ্য হজমে সাহায্য করে। বছরের ১১ মাস এসব জীবাণু অনবরত খাদ্য হজমের কাজে লিপ্ত থাকায় দুর্বল হয়ে পড়ে। দীর্ঘ এক মাস রোজার ফলে এ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য জীবাণুগুলো বিশ্রাম পায়। বিশ্রামের ফলে এরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ফলে বাকি ১১ মাস আবার খাদ্য হজমে ভালোভাবে সাহায্য করতে পারে।’

রোজার সুফল নিয়ে গবেষণা করে ২০১৬ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন জাপানি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ইউশিনোরি ওসুমি। রোজা পালনে যে বিপুল দৈহিক কল্যাণ রয়েছে তার গবেষণায় উঠে এসেছে। নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে তাকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করে বলা হয়, ‘দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে কিংবা কোনো কোনো রোগে আক্রান্ত হলে দেহের নিজস্ব প্রক্রিয়াতেই কোষ থেকে অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো সরিয়ে দিতে সাহায্য করার যে শরীরবৃত্তিয় ব্যবস্থা আছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অটোফেজি’ তা নিয়ে গবেষণার জন্যই ওসুমি এ পুরস্কার পান।

রমজান উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য অনেক কমিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে উল্টো। রমজান যেন আসে একশ্রেণীর ব্যবসায়ীর মুনাফা লাভের জন্যই। সরকারকে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে হবে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোও দায়িত্বশীল হতে হবে। রমজানের শিক্ষা হচ্ছে সংযমের। প্রতিটি ক্ষেত্রে সংযম দেখাতে পারলে সবাই পাবে মাহে রমজানের কল্যাণময় সুফল। মাহে রমজান সবার জন্য কল্যাণ বয়ে আনুক।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব
ই-মেইল : abdal62@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement
মিরসরাইয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে এসএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যু সিডনিতে বন্যা : ৫০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার নির্দেশ মণিপুরে ভূমিধসে নিহত বেড়ে ৪৭ বৃদ্ধের পায়ুপথে টর্চলাইট ঢুকিয়ে নির্যাতন : আরো ১ জন গ্রেফতার ইসরাইলের ‘ছোঁড়া গুলিতে’ নিহত হয়েছেন আবু আকলেহ : যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত ঈদযাত্রার প্রথম দিনেই দেড় ঘণ্টা দেরিতে ট্রেন লোডশেডিংয়ে দেশে কেন এই দুর্বিষহ পরিস্থিতি, প্রশ্ন রিজভীর ভারতে করোনার নয়া প্রজাতির হানা! দাবি ইসরাইলের বিজ্ঞানীর সামনে কোরবানির ঈদ, তাই ব্যস্ত লালমোহনের কামারশিল্পীরা চীনের আনহুই প্রদেশে ১৭ লাখ মানুষ লকডাউনে আফগানিস্তানে মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে বাংলাদেশ

সকল