১৫ আগস্ট ২০২২
`

ডুগিন-পুতিনের স্বপ্নসাম্রাজ্য ও ভবিষ্যৎ পৃথিবী

আলেক্সান্ডার ডুগিনের সাথে পুতিনের হ্যান্ডশেক। - ছবি : সংগৃহীত

ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযানের পর পুতিনের ডকট্রিন এবং রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোচনা ও বিশ্লেষণ হচ্ছে। অভিযানের এক মাস পরও স্পষ্ট নয় এ অভিযানের ভবিষ্যৎ কী, পুতিন আসলে কী লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছেন আর তার কতটা অর্জন করতে পারছেন। যুদ্ধ শুরু হলে নানা বাস্তব অবাস্তব প্রচার প্রচারণা চলে। ইউক্রেনে রুশ অভিযান নিয়ে এটি খানিকটা বেশিই হচ্ছে।

যুদ্ধক্ষেত্র ইউক্রেন হলেও এটি স্পষ্ট যে লড়াইটা হচ্ছে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার, যার পেছনে আরেক মহাশক্তি চীনের সমর্থনের কথা বলা হচ্ছে। যেকোনো যুদ্ধ শুরু করা যত সহজ শেষ করা ততটাই কঠিন। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে এটি বিশেষভাবে দেখা গেছে। রাশিয়ার ইউক্রেন অভিযান এখন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করা হচ্ছে যেটি হতে পারে পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধ।

সর্বশেষ খবর অনুসারে ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে রাশিয়ার বিশেষ সামরিক অভিযানের প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘোঘণা করে বলেছেন, দ্বিতীয় পর্বে তিনি ডনবাস অঞ্চলের স্বাধীন ঘোষিত লুহানক্স ও ডনেটস্কে জোরদার অভিযান চালাবেন। ইউক্রেন অভিযানের সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়নের সময় হয়তো এখনো আসেনি। এক মাস আগে ইউক্রেন অভিযান শুরুর সময় ধারণা করা হচ্ছিল অনধিক এক সপ্তাহের মধ্যে কিয়েভের পতন ঘটবে। এক মাসের বেশি সময় পরও সেভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো শহরের পতন ঘটাতে পারেনি ক্রেমলিন বাহিনী। এখন মস্কো ভাড়াটে সৈন্য খুঁজছে ইউক্রেনে যুদ্ধ করতে।

এর একটি কারণ হতে পারে রাশিয়ার যে সামরিক শক্তিমত্তা হিসাব করা হয়েছিল বাস্তব অবস্থা হয়তো সে রকম ছিল না। আর ইউক্রেনের প্রতিরোধ শক্তি সম্পর্কে যে ধারণা করা হয়েছিল বাস্তবে তা অনেক বেশি।

রাশিয়ার চাপ বা হুমকির মুখে ইউক্রেনকে শেষ পর্যন্ত ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য করা হয়নি। অথবা ইউক্রেনে ন্যাটো সরাসরি সেনা প্রেরণ বা দেশটির আকাশকে নো ফ্লাই জোনও ঘোষণা করা হয়নি। তবে রাশিয়াকে ঠেকানোর জন্য পশ্চিমারা সর্বাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একই সাথে ইউক্রেনকে অকৌশলগত অস্ত্র সহায়তাও দিচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, পুতিন এর আগে ক্রাইমিয়া দখল করেছেন, জর্জিয়ার দু’টি অঞ্চলে রুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন, কাজাখস্তানে সেনা পাঠিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে যে মাত্রার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল সে তুলনায় ইউক্রেন আগ্রাসনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা বলয় কেন অনেক বেশি সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিচ্ছে? ইউক্রেন যুদ্ধের আসল রহস্য কোথায়?

পুতিন ডকট্রিন ও পুরনো প্রভাব ফেরানো
ভ্লাদিমির পুতিন তার পূর্বসূরি বরিস ইয়েলৎসিন থেকে বেশ খানিকটা আলাদা। ২০০২ সালে রাশিয়ার ক্ষমতার সর্বময় কর্তৃত্ব গ্রহণের পর দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি কিভাবে রাশিয়া চালাবেন তার প্রাথমিক ইঙ্গিত দেন। এ সময় তিনি মুসলিম অধ্যুষিত চেচনিয়ার রাজধানী গ্রোজনিকে বোমা মেরে একপ্রকার মাটির সাথে মিশিয়ে দেন।

রাষ্ট্রিক ক্ষমতার সাথে ভূ-রাজনৈতিক দর্শনের সম্মিলন ঘটলে ক্ষমতাধর রাষ্টগুলোর কর্মকাণ্ডে তার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর স্যামুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার দ্বন্দ্ব তত্ত্বকে গ্রহণ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ যখন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে নেমে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে একের পর এক অভিযান চালান তখন আমেরিকান প্রশাসনের রাডার থেকে বেশ খানিকটা বাইরে থেকে যায় পুতিনের কর্মকাণ্ড ও রাশিয়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। অথচ পুতিন কেবল দেশ চালানোর জন্য ক্ষমতায় আসেননি। তিনি রুশ সাম্রাজ্য বিস্তারের এক আগ্রাসী মতবাদে বিশ্বাস নিয়ে ক্ষমতায় বসেন। পুতিনের এই ডকট্রিনের গুরু হলেন ষাটোর্ধ্ব বয়সী আলেকজান্ডার ডুগিন। ওয়াশিংটন পোস্টে গত ২২ মার্চ প্রকাশিত এক কলামে ভ্লাদিমির পুতিনের ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে রুশ কৌশলবিদ ও দার্শনিক আলেক্সান্ডার ডুগিনকে। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ‘ফাউন্ডেশন অব জিওপলিটিক্স’-এ তিনি রাশিয়ার ভবিষ্যৎ মহাপরিকল্পনার রূপরেখা প্রকাশ করেন। এরপর ডুগিন ২০০৯ সালে ‘ফোর্থ পালিটিক্যাল থিওরি’, ২০১৯ সালে ‘পলিটিক্যাল প্লাটোনিজম’ এবং ২০২১ সালে ‘গ্রেট এওয়াকেনিং ভার্সেস দি গ্রেট রিসেট’ বই প্রকাশ করেন।

ডুগিনের কার্যক্রম যদি কেবলই তত্ত্বের মধ্যে সীমিত থাকত তাহলে এর প্রভাব বিশ্বপরিস্থিতিতে তেমন একটা পড়ত না। পুতিনের নেতৃত্বাধীন রাশিয়া ডুগিনকে দেশটির ভবিষ্যৎ তাত্ত্বিক গাইড হিসেবে গ্রহণ করেছে। ডুগিনের বই রাশিয়ান সামরিক, পুলিশ এবং বৈদেশিক নীতি অভিজাতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে এবং রাশিয়ান সামরিক বাহিনীর জেনারেল স্টাফ একাডেমিতে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ডুগিন একাডেমি অব দ্য জেনারেল স্টাফের জেনারেল নিকোলাই ক্লোকোটভকে সহ-লেখক এবং তার প্রধান অনুপ্রেরণা বলে উল্লেখ করেন।

ক্লোকোটভ বলেছিলেন, ভবিষ্যতে বইটি ‘(রাশিয়ার) একটি নতুন সামরিক কমান্ড প্রস্তুত করার জন্য একটি শক্তিশালী আদর্শিক ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে’। ডুগিন দাবি করেছেন, বইটি রাশিয়ার অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে গৃহীত হয়েছে। রাশিয়ান স্টেট ডুমার প্রাক্তন স্পিকার, গেন্নাদি সেলেজনিভ ডুগিনের ভূ-রাজনৈতিক মতবাদকে স্কুল পাঠ্যক্রমের একটি বাধ্যতামূলক অংশ করার আহ্বান জানান।

ডুগিন যে কর্মকৌশল ও লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেগুলো একটার পর একটা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন ভ্লাদিমির পুতিন। আলজাজিরার সাথে এক সাক্ষাৎকারে সেটি তিনি উল্লেখও করেছেন।

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন অভিযান শুরুর আগের দিন পুতিন ঘণ্টাব্যাপী এক দীর্ঘ বক্তৃতা করেন। এই বক্তব্যে ইউক্রেনের আলাদা কোনো রাষ্ট্রের ইতিহাস নেই এবং ইউক্রেন রুশ জাতি ও ইতিহাসের অংশ বলে উল্লেখ করেন তিনি। এতে করে ইউক্রেনের স্বাধীন দেশ হিসেবে অস্তিত্ব লাভের বিরুদ্ধে পুতিন হুবহু ফাউন্ডেশন অব জিওপলিটিক্সে উল্লেখিত ডুগিনের বক্তব্যই তুলে ধরেন। ডুগিন উল্লেখ করেন, ‘ক্রাইমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ইউক্রেনকেও অংশ বানাতে হবে রাশিয়ার।’ পুতিন ডুগিনের প্রথম পরামর্শ ২০১৪ সালে বাস্তবায়ন করেন। একই সাথে ডনবাস অঞ্চলে রুশ বংশোদ্ভূত প্রক্সিকে দিয়ে লুহানস্ক ও ডনেটক্সের একটি অংশ দখল করে নেয়া হয়। আর এবার ইউক্রেনে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরু করার প্রাক্কালে এই দুই অঞ্চলকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন পুতিন।

ডুগিনের পরিষ্কার কথা ছিল, ‘ইউক্রেনকে রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত করা উচিত; কারণ একটি রাষ্ট্র হিসেবে ইউক্রেনের কোনো ভূ-রাজনৈতিক অর্থ নেই, কোনো বিশেষ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বা সার্বজনীন তাৎপর্য নেই, কোনো ভৌগোলিক স্বাতন্ত্র্য নেই, কোনো জাতিগত বৈশিষ্ট্য নেই। এর নির্দিষ্ট আঞ্চলিক উচ্চাকাক্সক্ষা সমগ্র ইউরেশিয়ার জন্য একটি বিশাল বিপদের কারণ হতে পারে। ইউক্রেনীয় সমস্যা, মহাদেশীয় রাজনীতি নিয়ে কথা বলা সাধারণভাবে অর্থহীন। ইউক্রেনকে স্বাধীন থাকার অনুমতি দেয়াই উচিত নয়।’ পুতিন এসব কথাই তার প্রাকযুদ্ধ ভাষণে বলেছিলেন।

ককেশাস তুরস্ক ও ইরান সমীকরণ
ককেশাস ও মধ্য এশিয়া নিয়ে ডুগিনের চিন্তা এক কথায় ভয়ঙ্কর। ডুগিন জর্জিয়ার আবখাজিয়া ও সাউথ ওশেটিয়াকে রুশ নিয়ন্ত্রণে আনার পরামর্শ দেন। তার মতে জর্জিয়াকে টুকরো টুকরো করা উচিত। আবখাজিয়া এবং ‘ইউনাইটেড ওসেটিয়া’ (যার মধ্যে জর্জিয়ার দক্ষিণ ওসেটিয়া অন্তর্ভুক্ত) রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।

ককেশাস অঞ্চলের প্রজাতন্ত্রগুলোতেও রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন ডুগিন। এ ব্যাপারে একটি অক্ষ গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। তার প্রস্তাবিত অক্ষ হলো রুশ-ইরান-আর্মেনিয়াকে নিয়ে। ককেশাস ও নিকটবর্তী অঞ্চলের জন্য যে পরিকল্পনা ডুগিন প্রকাশ করেন তাতে উল্লেখ করা হয়, আজারবাইজান দখল করে এর একটি অংশকে ইরানের হাতে দিয়ে বাকি অংশ রাশিয়ান নিয়ন্ত্রণে নিতে হবে। এই পরিকল্পনায় ইরানি, আর্মেনিয়ান ও কুর্দিদের আর্য বংশোদ্ভূত হিসেবে বর্ণনা করা হয়। একই সাথে আরো বলা হয়, এই তিন জাতিগোষ্ঠীকে তুরস্কের ভেতর অস্থিরতা তৈরির জন্য কাজে লাগাতে হবে। আর রাশিয়াকে তুরস্কের মধ্যে ‘ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা’ তৈরি করতে হবে। কুর্দি, আর্মেনিয়ান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুকে এ কাজে নিয়োগ দিয়ে লক্ষ্য অর্জন করা যেতে পারে।

ডুগিন কাস্পিয়ানের পূর্ব এবং উত্তর উপকূল (কাজাখস্তান এবং তুর্কমেনিস্তানের অঞ্চল) এবং মধ্য এশিয়াসহ (কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান এবং তাজিকিস্তান) ককেশাসকে একটি রাশিয়ান অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করেন। এই অঞ্চলের রুশ কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে ক্রেমলিনের এই ধরনের একটি পরিকল্পনা এগিয়ে নেয়ার ব্যাপারে কিছু কার্যক্রমের অস্তিত্ব দেখা যাবে।

প্রথমত, আজারবাইজানের নাগরনো-কারাবাখ অঞ্চল আর্মেনিয়া দখল করে নিয়েছিল রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তায়। পরবর্তী সময়ে আজারবাইজান রাশিয়ার সাথে বিভিন্ন সামরিক ক্রয় ও অন্যবিধ চুক্তির মাধ্যমে মস্কোকে নিরপেক্ষ জোনে আনার চেষ্টা করে। অবশেষে নাগরনো-কারাবাখের একটি অংশ আজারবাইজান জয় করতে সক্ষম হয়। পরে রাশিয়ান মধ্যস্থতায় একটি শান্তিচুক্তি হয় যার আওতায় এই অঞ্চলে রুশ ও তুর্কি সেনাদের অবস্থান তৈরি করা হয়। কিন্তু তুরস্কের সাথে মহাসড়ক সংযোগসহ এই চুক্তির অনেক বিষয় রাশিয়া পরবর্তী পর্যায়ে বাস্তবায়ন করতে দেয়নি। বরং আজারবাইজানের সাথে বিশেষ চেষ্টা সত্ত্বেও শান্তি প্রতিষ্ঠার আঞ্চলিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। কয়েক দিন আগে রুশ শান্তিরক্ষীদের ওপর আজারবাইজানের ড্রোন হামলার অভিযোগ আনে মস্কো। এর রেশ ধরে আজারবাইজানে কোনো রুশ সামরিক অভিযান পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনা ইউক্রেন অভিযানের পর কোনোভাবেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।

আলেকজান্ডার ডুগিন যে কৌশলগত লক্ষ্যের রূপরেখা রাশিয়ার জন্য তৈরি করে দিয়েছেন সেটিকে সংক্ষিপ্তভাবে বলা যাবে স্টালিনের আমলের সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ও শক্তিমত্তা ফিরিয়ে আনা, যার শক্তির উৎস হবে কমিউনিজমের পরিবর্তে অর্থোডক্স খ্রিষ্টবাদ ও উগ্র রুশ জাতীয়তাবাদ। ভ্লাদিমির’ নামে একজন শাসক রাশিয়ায় অর্থোডক্স সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পুতিনের নামের সাথেও ‘ভ্লাদিমির’ রয়েছে। আর একসময় অর্থোডক্স খ্রিষ্টবাদের প্রাণকেন্দ্র ছিল কনস্টান্টিনিপল বা আজকের ইস্তাম্বুল। এই ইস্তাম্বুলের প্রতি ওসমানীয় শাসন এবং এর পরেও রুশ ও সোভিয়েত নেতাদের বিশেষ নজর ছিল। ডুগিন তার কৌশলপত্রে তুরস্ককে দুর্বল করতে আর্মেনীয়, কুর্দি ও ইরানিদের ব্যবহারের কথা বলেছেন। এ কারণে সিরিয়া ও ইরাকে ইরানিদের বিশেষ মিলিশিয়া উপস্থিতি এবং সিরিয়ায় রাশিয়ানদের সামরিক উপস্থিতি তৈরিকে একেবারে হালকাভাবে দেখার অবকাশ সম্ভবত নেই।

ইউরোপের উৎকণ্ঠা ও এডলফ হিটলার
পুতিনের মস্তিষ্ক হিসেবে উল্লেখিত ডুগিনের আরেকটি পরিকল্পনা ইউরোপীয়দের বিশেষভাবে উৎকণ্ঠিত করে তুলেছে। ডুগিন বলেছেন, এডলফ হিটলার রাশিয়া আক্রমণের ভুলটি না করলে যুক্তরাজ্য ভেঙে যেত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের নেতৃত্বে বসতে পারত না। যুক্তরাষ্ট্র ঘরেই বিচ্ছিন্ন এবং বিভক্ত হয়ে থাকত। আর জাপান রাশিয়ার জুনিয়র অংশীদার হিসেবে চীনকে শাসন করত।

ডুগিনের রূপরেখায় রুশ সরকারকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে জার্মানির সাথে বিশেষ অক্ষ তৈরি করে ইউরোপকে ফিনল্যান্ডের মতো দন্তহীন নিরপেক্ষতায় নিয়ে যেতে। ডুগিন আরো প্রস্তাব করেছেন, জার্মানির হাতে ক্যাথলিক ও প্রটেস্টান্ট ইউরোপীয় বলয়ের কর্তৃত্ব তুলে দিতে। এ জন্য ১৯৯৭ সালেই ডুগিন রুশ সরকারের জন্য প্রস্তাব করেছিলেন যুক্তরাজ্যকে যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে আলাদা করতে গোপন তৎপরতা চালানো হয়। এ জন্য যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয় ব্রিটেন সব সময় আমেরিকান পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চায়। যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে আলাদা হয়ে গেলে ন্যাটোর প্রতি ফ্রান্সের আপত্তিকে কাজে লাগিয়ে জার্মানি-ফ্রান্স একটি অক্ষ তৈরির প্রচেষ্টা নিতে বলা হয়।

ঘটনাক্রমে অথবা কৌশলগত দাবা খেলার পরিণতিতে ব্রেক্সিটের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিদায় নেয়। জার্মানির সাথে রাশিয়ার তৈরি হয় বিশেষ সম্পর্ক। এ সম্পর্ক আরো এগিয়ে নিতে নর্থ স্টিম পাইপ লাইন-২ তৈরি হয়। এমনকি ইউক্রেন উত্তেজনা শুরু হওয়ার পরও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ও জার্মান চ্যান্সেলর শুলজ পৃথকভাবে রাশিয়া সফর করেন। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইউরোপের মধ্যে এই দু’টি দেশ সবচেয়ে বেশি উদ্যোগী ভূমিকায় রয়েছে।

এই কথা সত্যি যে, ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক সামরিক আগ্রাসনের পর জার্মানি ফ্রান্স ন্যাটোর প্রতি বৈরিতার পরিবর্তে সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা ব্যয় ও সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে। পুতিন এক এক করে ডুগিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগুনোর কারণে রুশ সীমান্তবর্তী দেশগুলো এখন নিজেদের স্বাধীনতার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সংহতির ব্যাপারে যে ধরনের ভাঙন বা শৈথিল্য তৈরি হয়েছিল সেটিও এখন আর দেখা যাচ্ছে না।

চীন কি আসলেই রাশিয়ার মিত্র?
চীনের সাথে রাশিয়ার কৌশলগত সম্পর্ককে এখন অনেকে অবিচ্ছেদ্য হিসাবে দেখতে চান। দু’দেশের শীর্ষ নেতাদের কথায়ও সেরকমই মনে হয়। কিন্তু আলেকজান্ডার ডুগিন চীনকে রাশিয়ার আধিপত্যের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, চীন রাশিয়ার জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। এ জন্য অবশ্যই সর্বোচ্চ মাত্রায় ভেঙে ফেলা উচিত চীনকে। ডুগিন পরামর্শ দেন, রাশিয়া যেন তিব্বত-জিনজিয়াং-অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়া-মাঞ্চুরিয়াকে নিরাপত্তা বেল্ট হিসেবে গ্রহণ করে। রাশিয়ার উচিত চীনকে দক্ষিণ দিকে- ইন্দোচীন (ভিয়েতনাম ব্যতীত), ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়াকে ভূ-রাজনৈতিকভাবে সাহায্য করা। একই সাথে রাশিয়ার উচিত জাপানকে কুরিল দ্বীপপুঞ্জ অফার করে এবং আমেরিকা-বিরোধিতা উসকে দিয়ে জাপানি রাজনীতিতে পরিবর্তন আনা। এ ছাড়া মঙ্গোলিয়াকে ইউরেশিয়া-রাশিয়ায় বিলীন করা উচিত।

এ কারণে পশ্চিমা সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য ডুগিনের রহস্যময় মেগালোম্যানিয়াকে গুরুত্বসহকারে নেয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, চীনের শি জিনপিংয়ের জন্য এটি তার চেয়েও বেশি জরুরি মনে হয়। শি এবং পুতিন যুক্তরাষ্ট্রকে আটকাতে গত মাসে একটি অংশীদারিত্ব ঘোষণা করেন। তবে ডুগিনের মতে, চীনকেও পতনের মুখে পড়তে হবে। ডুগিন লিখেছেন, ‘এশিয়ায় রাশিয়ার উচ্চাকাক্সক্ষার জন্য আঞ্চলিক বিচ্ছিন্নকরণ, বিভক্তি এবং (চীনা) রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভাজনের প্রয়োজন হবে’। ডুগিনের মতে, ‘দূরপ্রাচ্যে রাশিয়ার স্বাভাবিক অংশীদার হলো জাপান।’

ইউরোপের সাথে সঙ্ঘাতে জ্বালানি বাজার সঙ্কুচিত ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে চীনের বাজার ও অর্থনৈতিক সহায়তার বিকল্প নেই এখন মস্কোর সামনে। কিন্তু চীন ও রাশিয়া কোনো পক্ষই এই মৈত্রীকে অবিচ্ছেদ্যতার পর্যায়ে নিচ্ছে বলে মনে হয় না। বেইজিং ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানকে সরাসরি সমর্থন করেনি। জাতিসঙ্ঘে এই ইস্যুতে ভোটদানে বিরত থেকেছে। সুইফট নিষেধাজ্ঞার পর চীনের নিয়ন্ত্রণে চলা বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাশিয়া ও বেলারুশের সাথে আর্থিক লেনদেন বন্ধ রেখেছে। অন্য দিকে চীনের সাথে ভারতের সর্বাত্মক সঙ্ঘাতের সময় মস্কো দিল্লিকে এস ৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করেছে। ডুগিনের মতবাদ ও পুতিনের কর্মকাণ্ডে মনে হতে পারে চীন-রাশিয়া সহযোগিতার সম্পর্ক কেবলই প্রয়োজনের সম্পর্ক। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ বৈরিতা দুই শক্তিকে মাঝে মধ্যে একই বিন্দুতে ঠেলে দেয়।

প্রধান লক্ষ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
আলেকজান্ডার ডুগিনের মতবাদে প্রধান লক্ষ্যই হলো যুক্তরাষ্ট্র। পুতিনের ঘোষিত অঘোষিত লক্ষ্যের সাথে এর কোনো পার্থক্য নেই। ডুগিন বলেছেন, ‘রাশিয়ার উচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে অস্থিতিশীলতা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদে ইন্ধন দিতে আফ্রো-আমেরিকান বর্ণবাদীদের উসকে দেয়া’। তিনি আরো বলেছেন, ‘রাশিয়ার উচিত, আমেরিকার অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপে ভূ-রাজনৈতিক ব্যাধি প্রবর্তন করা, সব ধরনের বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং জাতিগত ও সামাজিক দ্বন্দ্ব উৎসাহিত করা, চরমপন্থী, বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীসহ সব ভিন্নমতের আন্দোলনকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করা। এভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।’

ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশ হওয়া গত ২২ মার্চের এ-সংক্রান্ত এক কলামেও ট্রাম্পের বিদায়কালে ক্যাপিটল হিলের ঘটনার সাথে আমেরিকান রাজনীতিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতাকে সমর্থন করার ডুগিনের পরামর্শ বাস্তবায়নের যোগসূত্র থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়। এতে বলা হয়, মার্কিন কংগ্রেসের করিডোরে জানালা ভাঙা দাঙ্গাবাজ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের ব্রেক্সিট এবং রাশিয়ান প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর জার্মানির ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা দেখে ডুগিন অবশ্যই অনুভব করেন যে, পুতিন শাসনে জিনিসগুলো ঠিকঠাক এগিয়ে চলছে।

আমেরিকান ফাইভ আই (ইংরেজি ভাষাভাষী পাঁচ দেশ) এর বিপরীতে জার্মান-ফ্রান্স অক্ষ তৈরির প্রচেষ্টার পেছনে একই লক্ষ্য সক্রিয় থাকতে পারে। ডুগিন আমেরিকান বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রভাব খর্ব করতে দেশটির অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী উগ্রপন্থা উসকে দিয়ে দেশটিকে রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত করে রাখার পাশাপাশি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা তৈরির কথাও বলেছেন, যার মধ্যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত। পুতিন এখন চীনা নেতা শি জিন পিংয়ের সাথে মিলে সেটি বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছেন। এই এজেন্ডায় চীন ও রাশিয়ার স্বার্থ একই বিন্দুতে। রাশিয়ার মতো চীনও তাইওয়ানকে ঘিরে একসময় একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে। নিষেধাজ্ঞার এই অস্ত্রকে ভোঁতা করতে সুইফটের বিকল্প টিপস এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল মুদ্রা প্রচলন ও জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন করার ব্যবস্থা নিয়ে বেইজিং কাজ করছে। এতে চীনের চেয়ে রুশ স্বার্থও কোনো অংশে কম নয়।

তবে এই উদ্যোগ বিশ্বব্যবস্থায় আমেরিকা তথা পশ্চিমা বলয়ের আধিপত্য অবসানের এক চূড়ান্ত প্রয়াস, যা ওয়াশিংটনের জন্য কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ পুতিনের অভিযানে আমেরিকা বা পাশ্চাত্যের একাধিপত্যে ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টা দেখতে পাচ্ছেন। তারা ভাবছেন এর মাধ্যমে স্নায়ুযুদ্ধকালীন ভারসাম্য আবার ফিরে আসবে; কিন্তু রুশ সাম্রাজ্যের স্বপ্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে রাশিয়ার প্রতিবেশী কোনো দেশ স্বাধীনতা নিয়ে নিরাপদ থাকবে না। নানা সঙ্কট দেখা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তার বাড়ির কাছের কিউবা বা ভেনিজুয়েলাকে সহ্য করে গেছে। পুতিনের মনোভাবে সেই সহনশীলতার দেখা মেলে না। অনেকে আগ্রাসী শক্তি হিসেবে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে এককাতারে ফেলতে চান; কিন্তু তারাও অভিবাসন গ্রহণের প্রস্তাব পেলে চীন-রাশিয়ার কথা না ভেবে বেছে নেন আমেরিকা বা ইউরোপের কোনো দেশকেই। গণতন্ত্র উদারতা মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়ের বিবেচনায় বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে কাছাকাছি ভাবতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র না হলেও দেশটির আগ্রাসনে চূড়ান্তভাবে কারো রাষ্ট্রিক অস্তিত্ব বিলোপ হয় না। কিন্তু রুশ আগ্রাসনে সে অভিজ্ঞতা হচ্ছে আশপাশের দেশগুলোর। পুতিনের ‘মস্তিষ্ক’ ডুগিনের মতবাদের পুরোটা বাস্তবায়ন হলে যা দাঁড়াবে তা কেবল কল্পনাতে আনলেও গা শিউরে ওঠে।

mrkmmb@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement