০৬ জুলাই ২০২২, ২২ আষাঢ় ১৪২৯, ৬ জিলহজ ১৪৪৩
`

ভারত-বাংলাদেশের ইউক্রেন ডিলেমা


এক.
এই কলাম লেখার সময় সর্বশেষ খবর ছিল রাশিয়ার সেনাবাহিনীর চতুর্দিকের অবরোধের মাঝে কিয়েভ একটি দুর্গ নগরীতে পরিণত হয়েছে। একসময়ের রুশ সাম্রাজ্যের রাজধানী কিয়েভে ইউক্রেনের সেনাবাহিনীও রুশ বাহিনীর বিধ্বংসী হামলা ঠেকানোর জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। ইউক্রেনের রাজধানী দখলে এই হামলা এবং এর প্রতিরোধের ধরন কেমন হবে সেটি স্পষ্ট নয়। তবে রাশিয়ার সেনাবাহিনী এর আগে সিরিয়ার আলেপ্পো ও চেচনিয়ার গ্রজনিকে যেভাবে স্থল ও বিমান হামলায় অনেকটা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল তেমন পরিস্থিতি কিয়েভের ক্ষেত্রেও হতে পারে। এরপরও এখানকার আবালবৃদ্ধ নাগরিক প্রতিরোধের জন্য একাট্টা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রেমলিনের হুমকি উপেক্ষা করে পাশ্চাত্যের অনেক দেশ সহায়তাও করছে ইউক্রেনকে।

সর্বব্যাপী আক্রমণ আর আলোচনা দু’টিই চালাচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে কেজিবি থেকে রাজনীতিতে আসা পুতিন আসলেই কী চান সেটি বলা মুশকিল। জীবাণু অস্ত্র গবেষণার যে ইস্যু রাশিয়া চীনকে সাথে নিয়ে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ পর্যন্ত তিনি গেছেন তাতে মনে হয় রুশ সামরিক বিধ্বংসী ক্ষমতা ইউক্রেনকে পদানত করার জন্য পুরো মাত্রায় পুতিন ব্যবহার করবেন। রাশিয়ার আক্রমণের ধরন যা-ই হোক না কেন ইউক্রেন শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার দখলে চলে যাবে বলেই মনে হয়। যদিও ইউক্রেনের এখনকার প্রতিরোধ যুদ্ধ একসময় গণযুদ্ধের রূপ নিতে পারে। হতে পারে এটি আফগান যুদ্ধের মতো দীর্ঘস্থায়ী।

ইউক্রেনের পরিণতি যা-ই হোক সেটি আজ আলোচনার বিষয় নয়। আজকের আলোচনা হলো ইউক্রেনকে কেন্দ্র করে বিশ্ব ফোরামের ভোটাভুটিতে বাংলাদেশ ও ভারত যে ভূমিকা নিচ্ছে তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কতখানি পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ব ফোরামে বিশেষত জাতিসঙ্ঘে ভারতের বক্তব্য ও অবস্থান আর বাংলাদেশের অবস্থান প্রায় একই। ২ মার্চের ভোটাভুটিতে নেপাল ও ভুটানের মতো দেশ ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের নিন্দা করে আনা সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ বিরত ছিল ভোট দানে। দেশ দু’টি কেন এই পদক্ষেপ নিলো এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে এর প্রভাব কতখানি কী পড়তে পারে সেটি নিয়ে আজকের আলোচনা।

দুই.
দ্বিমুখী বিপদে ভারত
এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো ভারত ইউক্রেনে আগ্রাসনের জন্য মস্কোকে নিন্দা করা নিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ভারত মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে যুদ্ধবিরতির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আহ্বানকে সমর্থন করে, ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি তার বিশ্বাস পুনর্ব্যক্ত করে আর সঙ্কট সমাধানের জন্য ক‚টনীতি ও সংলাপের প্রয়োজনের ওপর জোর দেয়। কিন্তু এ জন্য রাশিয়ার নিন্দা করতে দিল্লি সম্মত নয়। এই বক্তব্যে একধরনের স্ববিরোধিতা হয়তো রয়েছে তবে এই অবস্থানের অন্তর্নিহিত কারণ হলো, ভারত এই মুহূর্তে হয়তো রাশিয়াকে ছাড়তে পারছে না, আবার পশ্চিমা বলয়ের বিপরীতেও দাঁড়াতে চাইছে না। যদিও দৃশ্যত রাশিয়ার ইউক্রেন হামলা নিয়ে যে বৈশ্বিক মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে তাতে হয় আগ্রাসনের পক্ষে, নয়তো এর বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার কোনো বিকল্প থাকছে না।

জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে রাশিয়া ছাড়া মস্কোর অবস্থানের পক্ষে কেবলই চারটি দেশ ভোট দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, বেলারুশ আর ইরিত্রিয়া। এই প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থাকা ৩৫টি দেশের বেশির ভাগই হলো রাশিয়া ও চীনের মিত্র।

ইউক্রেন ইস্যুতে ভারতের বিশ্লেষকদের এক পক্ষের বক্তব্য হলো, নয়াদিল্লির মস্কোর সাথে সম্পর্ক বিভিন্ন কারণ দ্বারা সীমাবদ্ধ। নয়াদিল্লির পক্ষে ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে রাশিয়া-বিরোধী ইস্যুতে অনুসরণ করা সম্ভব নয়। কারণ ভারতের সামরিক সরঞ্জামের প্রায় ৮৫ শতাংশ রুশ উৎসের আর ভারত বিদ্যমান অস্ত্রাগারের রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য সহায়তার জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভর করে চলেছে। এস-৪০০ আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ব্রাহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল এবং নৌ পারমাণবিক প্রপালশনের মতো প্রযুক্তিগুলোকে দিল্লি তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখেছে। এসব হয় মস্কোর সাথে যৌথভাবে তৈরি করা হয়েছে অথবা রাশিয়ার কাছ থেকে কেনা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন-ভারত প্রতিরক্ষা বাণিজ্যে অগ্রগতি সত্তে¡ও, রাশিয়া নতুন অত্যাধুনিক সিস্টেমের জন্য ভারতীয় পছন্দের অংশীদার রয়ে গেছে। প্রধানত এর কারণ হলো অনেক ক্ষেত্রে রাশিয়াই একমাত্র রাষ্ট্র যা ভারতকে সবচেয়ে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি দিতে পারে। এই নির্ভরতার কারণে ভারতের মধ্যে এই ভীতি রয়েছে যে, নয়াদিল্লি ইউক্রেনের বিষয়ে মস্কোর অবস্থান মেনে না নিলে ক্রেমলিনের প্রতিশোধের শিকার হতে পারে। রাশিয়া জরুরি অস্ত্র সরবরাহ আটকে রেখে প্রতিশোধ নিতে পারে, যা ভারতের জন্য ব্যয়বহুল হবে কারণ দেশটি চীনের সাথে তাদের অভিন্ন সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে সামরিক উত্তেজনার মধ্যে রয়েছে।

অন্য দিকে বেইজিং ও মস্কোর ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতাও নয়া দিল্লির জন্য উদ্বেগের বিষয়। রুশ-চীন এমন এক জোট যা ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে এবং পুতিন বিশ্বব্যাপী আরো বিচ্ছিন্ন হওয়ার সাথে সাথে চীনা সম্পর্ক আরো গভীরতর হতে পারে।

নয়াদিল্লির প্রতি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সমর্থনের পরে রাশিয়ার বিপক্ষে ভোটদানকে মস্কো দৃষ্টিকটু মনে করতে পারে। কারণ মস্কো কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ চাওয়ার জন্য জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের প্রচেষ্টায় রাশিয়া ভেটো দিয়েছে বারবার। এ ছাড়া ভারতীয় দ্বিধা তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি এবং একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা বজায় রাখার ইচ্ছা থেকেও উদ্ভূত হতে পারে।

তবে এই গুরুতর এবং বোধগম্য সীমাবদ্ধতা সত্তেও, নয়াদিল্লির এই সঙ্কট থেকে সঠিক পাঠ গ্রহণ এবং তার স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে অনুভব করেন অনেক বিশ্লেষক। সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার মানদণ্ড সমর্থন করা এবং রক্ষা করা শুধু মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্যের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, এটি না করা সীমান্তে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের নিজস্ব অবস্থান দুর্বল করতে পারে। রাশিয়ার নিরাপত্তা দোহাই দিয়ে ইউক্রেনকে দখল করার বৈধতা দেয়ার অর্থ হলো চীনও তার নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ভারতের ভূমি দখল করতে পারে। আবার একই ধরনের ভয় ভারতের ক্ষুদ্র প্রতিবেশীদের নয়াদিল্লির ব্যাপারেও রয়েছে। এই ভয় থেকেই সম্ভবত নেপাল ও ভুটান প্রস্তাবটি সমর্থন করেছে। দু’টি দেশ এবং সেই সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশীদাররা এ কারণে রাশিয়ান আগ্রাসনের প্রতি ভারতের নিরঙ্কুশ সমর্থনে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে নয়াদিল্লির আচরণে সন্দেহ আনতে পারে।

অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, এই সঙ্কটটি ভারতের জন্য নিজের স্বার্থে রাশিয়ান অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করার একটি সুযোগ হিসেবে নেয়া উচিত। এটি করার প্রয়োজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমারা এটি চায় বলে নয়; বরং কয়েক দশক ধরে, নয়াদিল্লি রাশিয়ান অস্ত্র ও সরঞ্জামের নিম্নমানের কারণে উদ্বিগ্ন এবং এর অনেক সিস্টেম পুরনো ও ব্যয়বহুল হয়ে আছে। এখন রাশিয়ার ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইউক্রেনের ধ্বংসযজ্ঞ ভারতে নতুন অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহে বিলম্বের পাশাপাশি বিদ্যমান সিস্টেমগুলোকে আপগ্রেড করার প্রকল্পগুলোকে প্রভাবিত করবে। এর ফলে নয়াদিল্লি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। নয়াদিল্লির জন্য এটাই উপযুক্ত মুহূর্ত, যে সময়ে অন্য প্রতিরক্ষা অংশীদারদের কাছ থেকে অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা উৎপাদনের স্বদেশীকরণকে ত্বরান্বিত করা যাবে।

এসব বিশ্লেষকের ধারণাÑ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জন্য এই প্রধান প্রতিরক্ষা অংশীদারদের মধ্যে একজন হতে পারে, বিশেষ করে যেহেতু উভয়েই চীনের হুমকির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার পদক্ষেপের জন্য ভারতের প্রকাশ্য সমালোচনা না করাটা মার্কিন আইনপ্রণেতাদের হতাশ করেছে। এই অবস্থানটি নয়াদিল্লির উত্থানকে সমর্থন করার জন্য ওয়াশিংটনে দ্বিদলীয় সমর্থনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এমনকি কাউন্টারিং আমেরিকাস অ্যাডভারসারিজ থ্রু সাংশনস অ্যাক্ট (কাটসা)-এর অধীনে রাশিয়া থেকে এস-৪০০ সিস্টেম কেনার জন্য ভারতকে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার জন্য চাপও সৃষ্টি হয়েছে।

বলা হচ্ছে, বাইডেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রাশিয়ার সাথে ভারতের উত্তরাধিকার সম্পর্ক এবং এটি নয়া দিল্লিতে যে সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে তার প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে শক্তিশালী ভারতীয় বিবৃতি বা পদক্ষেপ না থাকায়, মার্কিন কংগ্রেস সদস্য এবং বাইডেন প্রশাসনের কর্মীদের জন্য ভারতের জন্য কাটসা মওকুফে প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ সমর্থন জোগাড় করা কঠিন হবে।

কাটসা নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের ওপর নজর রেখে, রাশিয়ান অস্ত্রের ওপর নির্ভরতার কারণে নয়াদিল্লির অবস্থান এবং এটি যে কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হচ্ছে তা ব্যাখ্যা করার জন্য ভারতীয় কর্মকর্তাদের মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের কাছে পৌঁছানো দরকার। আর বাইডেন প্রশাসন ভারতের জন্য একটি বড় বিদেশী সামরিক অর্থায়নের অস্ত্র বিক্রয় প্যাকেজ দেখতে পারে, যা রাশিয়ান অস্ত্রের ওপর তার নির্ভরতা কমাতে শুরু করবে। একই সাথে ভবিষ্যতে তার কৌশলগত পছন্দগুলোকে রাশিয়া থেকে স্বাধীন হতে দেবে। মার্কিন কর্মকর্তাদের এই প্যাকেজটি সমর্থন ও প্রস্তুত করতে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন দেয়ার জন্য ভারত বিদ্যমান মার্কিন এফ-২১ ফাইটার জেট অফারটির সাথে আরো উল্লেখযোগ্যভাবে জড়িত হওয়া এবং প্রিডেটর ড্রোন আলোচনা দ্রুত শেষ করতে এগিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে; কিন্তু এ নিয়ে নয়াদিল্লি এখনো সিদ্ধান্তহীন বলে মনে হয়।

ভারত এখনো অবধি ইউক্রেনে তার সামরিক পদক্ষেপের জন্য রাশিয়ার সমালোচনা এড়িয়ে গেছে। এ ছাড়া প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী এবং উচ্চ প্রযুক্তির অংশীদার হিসেবে রাশিয়ার সাথে তার সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না। ফলে ভারসাম্যের অংশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক চাপ কমানোর জন্য ভারত পোল্যান্ডের মাধ্যমে ইউক্রেনে ত্রাণ সরবরাহ করেছে।

প্রকৃতপক্ষে, ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ের সাথেই সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে চীনের সাথে ভারসাম্য ঠিক রেখে দু’টি শক্তিকে ব্যবহার করতে চায়। কিন্তু ইউক্রেন ইস্যুতে নিরপেক্ষ থাকার কারণে, অবশেষে উভয় শক্তির সমর্থন হারানোর আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে ভারতের সামনে। কারণ রাশিয়া একসময় চীনের দিকে অনেক বেশি মাত্রায় ঝুঁকবে আর তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের ব্যাপারে হতাশ হয়ে তার ফোকাস ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে দূরে সরিয়ে ইউরোপের দিকে রাখবে।

তিন.
বাংলাদেশ : অক্ষ বাছাইয়ের মূল্য হবে কতখানি
ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থা শ্যাম রাখি না কুল রাখি। ইউক্রেন দখলের জন্য রাশিয়ার হামলার নিন্দা করে আনীত জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবে বাংলাদেশ ভারত-চীনের মতো ভোটদানে বিরত ছিল। ইউরোপ আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান দেশগুলো যেখানে এই প্রস্তাবকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছে সেখানে বাংলাদেশকে নিরপেক্ষ থাকার জন্য যে মূল্য দিতে হবে তাতে সন্দেহের অবকাশ কমই রয়েছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষুদ্র দেশ লিথুয়ানিয়া বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতিবাদে চার লাখ ৪৪ হাজার ভ্যাকসিন সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিদল আসছে পোশাকশিল্পে শিশুশ্রম বন্ধসহ কমপ্লায়েন্সের বিষয় তদারকি করতে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে উন্নীত হওয়ার পর ইউরোপে আর জিএসপি সুবিধা পাবে না। কিন্তু ইউরোপীয় কমিশন বিশেষ বিবেচনায় ২০২৮ সাল পর্যন্ত জিএসপি প্লাস সুবিধা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে ঢাকায় ইইউ প্রতিনিধিদলের সফর গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইউক্রেণ ইস্যুতে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে যাওয়ার পর ঢাকা জিএসপি সুবিধা আদৌ আর পাবে কি না সেই সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

ইউক্রেনে আগ্রাসনের বিষয়টি এতটাই নিন্দনীয় ছিল যে রাশিয়াও প্রত্যাশা করেনি এই প্রস্তাবের বিপক্ষে দেশটিকে অনেক দেশ সমর্থন দেবে। এ কারণে মস্কো চেয়েছে রাশিয়ার নিন্দা জানানোর পক্ষে ভোট না দিয়ে যাতে অন্তত ভোটদানে বিরত থাকে মিত্র দেশগুলো। প্রস্তাব নিয়ে বিতর্কে জাতিসঙ্ঘে ভারতের প্রতিনিধি যা বলেছেন বা করেছেন বাংলাদেশও মূলত সেটিকে অনুসরণ করে মস্কোর পক্ষই নিয়েছে।

এটি ঠিক যে, রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সময় সম্পর্কের মাত্রাটা বেশ ঘনিষ্ঠ। বাংলাদেশে রাশিয়ার বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, যার নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। একক প্রকল্প হিসেবে এটি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ। এই অর্থের ৯০ শতাংশ রাশিয়া ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের জন্য রাশিয়ার একটি কোম্পানির সাথে চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন গ্যাজপ্রম বাংলাদেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বেশ আগে থেকেই কাজ করছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে রাশিয়ায় বাংলাদেশের মোট রফতানি ছিল প্রায় ৬৬৫ মিলিয়ন ডলার এবং আমদানি ছিল ৪৬৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে ইউক্রেনে বাংলাদেশের রফতানি ২৬ মিলিয়ন এবং আমদানি ৩১৯ মিলিয়ন ডলার। কিন্তু রাশিয়ার আগ্রাসনের ব্যাপারে জোরালো অবস্থান যারা নিয়েছে সেসব দেশের সাথে বাংলাদেশের নির্ভরতা বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক সেই তুলনায় অনেক বেশি। রুশ রাষ্ট্রদূত ইউক্রেনে হামলার পরে বাংলাদেশে বেশ সক্রিয় বলে মনে হয়। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মিডিয়া রুশবিরোধী খবর প্রচার করছে। তার এই সক্রিয়তার যে বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।

এ দিকে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের একই সময়ে চীনা রাষ্ট্র্রদূতের বক্তব্যও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়। তিনি বলেছেন, কোয়াডে যোগ না দেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ বেইজিংকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশকে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হাব করার ব্যাপারে তাৎপর্যপূর্ণ এক প্রশ্নের জবাবও তিনি দিয়েছেন। একটি জাপানি পত্রিকা এ নিয়ে প্রকাশ করা প্রতিবেদনে বলেছে যে, চীন বাংলাদেশে একটি ক্ষেপণাস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণের হাব তৈরি করছে। এই হাবে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব ব্যবস্থা থাকবে; কিন্তু এটি নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির জন্য ব্যবহার হবে না। এখানে কেবল রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের কাজ করা হবে। বাংলাদেশ চীন থেকে এর আগে স্বল্প মাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র কিনেছে। আর এখন এই ক্ষেপণাস্ত্র হাব তৈরির অর্থ হলো বাংলাদেশ পুরোপুরি চীন-রাশিয়া বলয়ে নিজেকে নিয়ে যাচ্ছে। এর সাথে চীনের মতো করে ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ভোট না দেয়ার বিষয়টি মেলালে নতুন এক কৌশলগত গতিপথ বাংলাদেশের অনুমান করা যাবে।

এই গতিপথে রাশিয়া ও চীন হবে বাংলাদেশের কৌশলগত বন্ধু। রাশিয়ার সাথে ভারতের কৌশলগত বোঝাপড়া থাকলে বাংলাদেশের সরকার ভারতকে একই ধরনের মিত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে চীনা উপস্থিতি এবং ঘনিষ্ঠতাকে কোনোভাবেই মেনে নিতে চাইছে না ভারত। এই অবস্থায় ভারত কোনো কারণে আমেরিকা ও পশ্চিমা বলয়ে চলে গেলে বাংলাদেশের জন্য মেরুকরণ আরো জটিল হতে পারে।

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের রফতানির ৯৫ শতাংশ ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, কোরিয়াতে যায় যারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবরোধে সরাসরি অংশ নিচ্ছে। বাংলাদেশ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে বছরে পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পায়। এর ৮০ শতাংশ জাপান, বিশ্বব্যাংক, কোরিয়াসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে আসেÑ যারা রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপের পক্ষে। এ ছাড়া বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের বড় একটা অংশ ইউরোপ থেকে আসে। বাংলাদেশের হাজার হাজার ছেলেমেয়ে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারি স্কলারশিপে পড়াশোনা করছে। রাশিয়ার পক্ষ নেয়ার অর্থ হলো ইউরোপ পক্ষ তখন বিপক্ষ হয়ে যাবে।

এটি ঠিক যে গ্লোবালাইজড বিশ্বে কোনো দেশ ইউক্রেন সঙ্কটের নিকটবর্তী অর্থনৈতিক প্রভাব থেকে রক্ষা পাবে না। আর প্রভাবটি কেবল যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ব্যাঘাতের ফলেই নয় বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইইউ, যুক্তরাজ্য, জাপান এবং আরো বেশ কয়েকটি রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত বহুমুখী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণেও পড়বে। বৈশ্বিক ব্যাংকগুলো বিদেশী পুঁজিতে রাশিয়ার প্রবেশাধিকার সীমিত করার নিষেধাজ্ঞার প্রভাবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে এবং বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডলার, ইউরো, পাউন্ড ও ইয়েনে পেমেন্ট প্রক্রিয়ায় রাশিয়ার প্রবেশাধিকার সীমিত করছে। সুইফট থেকে তার কয়েকটি ব্যাংক বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্তের পরে রাশিয়ান ব্যাংক এবং আর্থিক সংস্থাগুলোর জন্য বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় অংশ নো-গো জোন হয়ে যাচ্ছে।

এসব বিবেচনা করা হলে ইউক্রেন নিয়ে সরকারের কৌশলে অর্থনৈতিক স্বার্থকে কতটা সামনে আনা হয়েছে তা নিয়ে সন্দেহের কারণ দেখা যাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি ক্ষমতা হারানো অথবা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়লে সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার অর্থনৈতিক সক্ষমতা আদৌ বাংলাদেশের রয়েছে কি না সন্দেহ। ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক বিজয় হয়তো সম্ভব। কিন্তু এর জন্য মূল্য গুনতে হতে পারে অনেক বেশি। একই সাথে রুশ-চীন অক্ষে বাংলাদেশের আশ্রয় নেয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যটাও যে অনেক বেশি হবে তাতে সংশয় নেই। এখনো বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পাশ্চাত্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে এটি মনে হতে পারে যে ঢাকার অক্ষ বাছাইয়ের পেছনে অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রের স্বার্থের চেয়েও থাকতে পারে সরকারের ক্ষমতা রক্ষার স্বার্থ। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সাথে সরকারি দলের ছিল বিশেষ সম্পর্ক; কিন্তু বাইডেন প্রশাসনের কোর টিমে আওয়ামী লীগের পক্ষের কেউ সেভাবে নেই। ফলে র‌্যাবের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, ডেমোক্র্যাসি সম্মেলনে ডাক না পাওয়াসহ বিবিধ সঙ্কেত আওয়ামী লীগকে উদ্বিগ্ন করছে। তারা মনে করছে বোঝাপড়া নয় বরং আমেরিকার সাথে হার্ড লাইনে গেলেই দরকষাকষিতে কিছু পাওয়ার সুযোগ আছে। এই কারণেই বর্তমান সরকার একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাশিয়ার আগ্রাসনে নীরব থাকছে। যদিও সে আগ্রাসনের যুক্তি প্রয়োগ করা হলো বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বও বিপন্ন হতে পারে। এই ধরনের যুক্তি বিজেপি নেতা সুব্রাহ্মনিয়াম স্বামী বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ দখল করে সংখ্যালঘুদের জন্য আলাদা আভাসভূমি করে দিতে দিল্লির প্রতি দাবি জানানোর সময় ব্যবহার করেছিলেন।

এ কারণে মনে হয় আগ্রাসনের ব্যাপারে সামান্য নিন্দা না করার মধ্যে কোনো ভূরাজনীতি হয়তো সেভাবে নেই; বরং আছে সরকারের ক্ষমতাকে আরো পাঁচ বছর ভোটারদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে টিকিয়ে রাখার জন্য, চীন ও রাশিয়াকে পক্ষে রাখার প্রচেষ্টা। শাসকদল নন ডেমোক্র্যাটিক বৈশ্বিক অক্ষ শক্তির বলয়ে নিজেকে নিয়ে গেলে এই অক্ষ আগামী নির্বাচনে যেকোনোভাবে ক্ষমতা নবায়নে সরকারকে সহায়তা দেবে। গণতন্ত্রের পক্ষে পশ্চিমা হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে ভেনিজুয়েলার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেবে ক্ষমতাসীনরা। তাতে পাশ্চাত্যের নিষেধাজ্ঞা-অবরোধে রাষ্ট্র্রের ক্ষতি হলেও ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা যাবে; কিন্তু বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তাতে এ দেশ কি পাশ্চাত্যের অবরোধ বা নিষেধাজ্ঞার ধাক্কা সইতে পারবে? সম্ভবত এক কঠিন অনিশ্চয়তার পথে এগিয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্র। সার্বভৌমত্ব ও রাজনীতি যখন পরস্পরের বিপরীতে যাত্রা করে তখন সে পরিস্থিতি মোকাবেলা অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ভবিষ্যতে আরো কত কী হয় সেটিই দেখার বিষয়।
mrkmmb@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement