০৫ জুলাই ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯, ৫ জিলহজ ১৪৪৩
`

কারণ দর্শানো ছাড়া শাস্তি প্রদানের ব্যাপ্তি

-

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত এক উপসহকারী পরিচালককে কারণ দর্শানো ছাড়াই নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করায় কমিশনে কর্মরত তার বিভিন্ন পর্যায়ের সহকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ পরিলক্ষিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিশনের প্রধান কার্যালয়সহ বেশ কিছু বিভাগীয় ও জেলা শহরের কার্যালয়ের সহকর্মীরা মানববন্ধনের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষের বিষয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রয়াস নেন। সহকর্মীরা দাবি করেন, অপসারণের আদেশপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কিছু প্রভাবশালীর অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে কঠোর ও শক্ত অবস্থান গ্রহণ করায় তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী উপসহকারী পরিচালকও সংবাদমাধ্যমে তার প্রদত্ত বক্তব্যে অনুরূপ দাবি করেন। তাদের অভিমত, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে দুর্নীতিমূলক কার্য প্রতিরোধে দুর্নীতি এবং অন্যান্য সুনির্দিষ্ট অপরাধের অনুসন্ধান এবং তদন্ত পরিচালনার জন্য ২০০৪ সালে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয় তা ব্যাহত হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ১৯৫৭-এর মাধ্যমে দুর্নীতি দমন ব্যুরো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। একজন মহাপরিচালক এবং একাধিক পরিচালক সমন্বয়ে ব্যুরো গঠিত হয়েছিল। ব্যুরোর মহাপরিচালক এবং পরিচালকরা সরকারের বিভিন্ন বিভাগ প্রধানত- প্রশাসন, পুলিশ ও বিচার বিভাগ হতে প্রেষণে (Deputation) নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন।

ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৯৭ তে উল্লেখ রয়েছে যে, বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ কোনো সরকারি কর্মচারী যারা সরকারের অনুমোদন ব্যতিরেকে অপসারণযোগ্য নন তারা সরকারি দায়িত্ব পালন করার সময় কোনো অপরাধ করে থাকলে সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে কোনো আদালত তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিচারার্থে গ্রহণ করতে পারবে না। ফৌজদারি কার্যবিধির এ বিধানটি ব্যুরো কর্তৃক তদন্ত কার্য সমাপনান্তে অভিযোগপত্র বিচারার্থে গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করায় কোনো আদালত ব্যুরো কর্তৃক দাখিলকৃত অভিযোগপত্র সরকারের পূর্বানুমোদন ব্যতিরেকে বিচারার্থে গ্রহণ করতে পারত না। ব্যুরো কর্তৃক তদন্তের ক্ষেত্রে অভিযোগপত্র দায়ের পরবর্তী সরকারের পূর্বানুমোদনের বিধান ব্যুরোর স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে বিবেচিত হতো এবং এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ব্যুরোর বস্তুনিষ্ঠ তদন্ত কার্যক্রমকেও প্রশ্নের মধ্যে ফেলে দিত।

পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পর প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭ প্রণীত হয়। পরবর্তী সময়ে এ আইনসহ দণ্ডবিধির অধীনে কৃত কিছু অপরাধ দুর্নীতি দমন আইন, ১৯৫৭-এর অধীনে শাস্তিযোগ্য করা হয়। সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যুরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে না পারায় এবং কার্যকর ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদন বাধা হিসেবে দেখা দেয়ায় দীর্ঘ দিন ধরে দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রমকে সার্থকভাবে প্রতিরোধের লক্ষ্যে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা অনুভূত হতে থাকে। এরই ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর মাধ্যমে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠা করা হয়।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন দ্বারা সৃষ্ট একটি সংবিধিবদ্ধ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এ স্পষ্টভাবে বলা আছে যে, এ কমিশন একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কমিশন হবে। এ আইনে কমিশনার অর্থ- কমিশনের চেয়ারম্যান বা অন্য কোনো কমিশনার। আইনে বলা আছে যে, কমিশন তিনজন কমিশনার সমন্বয়ে গঠিত হবে এবং তাদের মধ্য হতে রাষ্ট্রপতি একজনকে চেয়ারম্যান নিয়োগ করবেন। এর অর্থ দাঁড়ায় কমিশনের চেয়ারম্যান মূলত একজন কমিশনার এবং কমিশনের সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য তিনজন কমিশনারের মধ্য থেকে একজন রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

দুর্নীতি দমন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান না হলেও সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারককে যেরূপ কারণ ও পদ্ধতিতে অপসারণ করা যায়, সেরূপ কারণ ও পদ্ধতি ব্যতীত কমিশনের কোনো কমিশনারকে অপসারণ করা যায় না।

সংবিধান দেশের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের বিধানাবলি দেশের অপর সব আইনের বিধানাবলির ওপর প্রাধান্য পায়। যেকোনো আইনের অধীন প্রণীত বিধিমালার অবস্থান আইনের নিম্নে। যেকোনো আইন সংসদ কর্তৃক প্রণীত হলেও বিধিমালার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনের অধীন প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতির পূর্বানুমোদনক্রমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থা বিধিমালা প্রণয়ন করে থাকে।

সংবিধান ও আইন মেনে চলা যে প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য এ বিষয়টি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১(১) দ্বারা স্বীকৃত। যেকোনো আইন সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক হলে আইনটির যতখানি সাংঘর্ষিক ততখানি বাতিল হওয়ার বিষয়েও সংবিধানে অবস্থান সুস্পষ্ট। আমাদের সংবিধানে যেসব মৌলিক অধিকারের বিষয় উল্লেখ রয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন বারিত সত্ত্বেও এরূপ কোনো আইন প্রণীত হলে তার যতটুকু সাংঘর্ষিক তা বাতিল মর্মে গণ্য হওয়ার কথাটি সংবিধানে সুবিদিত।

প্রজাতন্ত্রের কর্ম অর্থ অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার সংক্রান্ত যেকোনো কর্ম, চাকরি বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম হিসেবে ঘোষিত কোনো পদ। দেশের সংবিধানে প্রদত্ত প্রজাতন্ত্রের কর্মের বর্ণিত সংজ্ঞাটি এত বিস্তৃত যে সর্বোচ্চ পদধারী রাষ্ট্রপতি এবং সর্বনিম্ন পদধারী অফিস সহায়ক এর মধ্যে স্থিত সব পদধারী প্রজাতন্ত্রের কর্মের অন্তর্ভুক্ত। সংবিধানের ১৩৫ অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের অসামরিক সরকারি কর্মচারীদের বরখাস্তের ক্ষেত্রে যে বিধান অনুসৃত হবে তার উল্লেখ রয়েছে। অনুচ্ছেদটিতে বলা হয়েছে- (১) প্রজাতন্ত্রের কর্মে অসামরিক পদে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ অপেক্ষা অধস্তন কোনো কর্তৃপক্ষের দ্বারা বরখাস্ত বা অপসারিত বা পদাবনমিত হবেন না।

(২) অনুরূপ পদে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তিকে তার সম্পর্কে প্রস্তাবিত ব্যবস্থা গ্রহণের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর যুক্তিসঙ্গত সুযোগদান না করা পর্যন্ত তাকে বরখাস্ত বা অপসারিত বা পদাবনমিত করা যাবে না; তবে শর্ত থাকে যে, এ দফা সেসব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না, যেখানে (অ) কোনো ব্যক্তি যে আচরণের ফলে ফৌজদারি দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, সে আচরণের জন্য তাকে বরখাস্ত, অপসারিত বা পদাবনমিত করা হয়েছে; অথবা (আ) কোনো ব্যক্তিকে বরখাস্ত, অপসারিত বা পদাবনমিত করবার ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো কারণে যা ওই কর্তৃপক্ষ লিপিবদ্ধ করবেন ওই ব্যক্তিকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দান করা যুক্তিসঙ্গতভাবে সম্ভব নয়; অথবা (ই) রাষ্ট্রপতির কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে ওই ব্যক্তিকে অনুরূপ সুযোগদান সমীচীন নয়।

(৩) অনুরূপ কোনো ব্যক্তিকে এ অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত কারণ দর্শানোর সুযোগ দান করা যুক্তিসঙ্গতভাবে সম্ভব কি না, এরূপ প্রশ্ন উত্থাপিত হলে সে সম্পর্কে তাকে বরখাস্ত, অপসারিত বা পদাবনমিত করবার ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। (৪) যে ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি কোনো লিখিত চুক্তির অধীন প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত হয়েছেন এবং ওই চুক্তির শর্তাবলী অনুযায়ী যথাযথ নোটিশের দ্বারা চুক্তিটির অবসান ঘটানো হয়েছে, সে ক্ষেত্রে চুক্তিটির অনুরূপ অবসানের জন্য তিনি এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে পদ থেকে অপসারিত হয়েছেন বলে গণ্য হবেন না।

দুর্নীতি দমন কমিশনের উপসহকারী পরিচালককে দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০০৮-এর ৫৪(২) বিধি অনুযায়ী চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। বিধি ৫৪-এর উপবিধি (২)-এ বলা হয়েছে- এ বিধিমালায় ভিন্নরূপ যা কিছু থাকুক না কেন, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ না দর্শিয়ে কোনো কর্মচারীকে ৯০ দিনের নোটিশ প্রদান করে অথবা ৯০ দিনের বেতন নগদ পরিশোধ করে তাকে চাকরি থেকে অপসারণ করতে পারবে।

অপসারণের আদেশপ্রাপ্ত উপসহকারী পরিচালকের প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনায় দেখা যায় তাতে বলা হয়েছে- প্রজ্ঞাপনটি জারির দিন থেকে অপসারণের আদেশ কার্যকর হবে এবং বিধি অনুযায়ী অপসারণের আদেশপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ৯০ দিনের বেতন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা পাবেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের উপসহকারী পরিচালক তার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অপসারিত হওয়ায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩৫ দফা (১) এর কোনো ব্যত্যয় হয়নি। এখন প্রশ্ন- কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৫৪ উপবিধি (২)-এর বিধান অনুযায়ী প্রদত্ত অপসারণ আদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩৫ দফা (২) উপদফা (আ)-এর বিধান অনুসরণপূর্বক প্রদান করা হয়েছে কি না।

অপসারণের আদেশপ্রাপ্ত উপসহকারী পরিচালকের অপসারণ পরবর্তী তার সহকর্মীদের মধ্যে যে অসন্তোষ পরিলক্ষিত হয় তদপ্রেক্ষিতে কমিশনের সচিব কর্তৃক একাধিকবার সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সাংবাদিকদের কমিশনের গৃহীত ব্যবস্থার যথার্থতা সম্পর্কে অবহিত করার প্রয়াস নেয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নবাণে জর্জড়িত কমিশনের সচিবকে খানিকটা বিচলিত ও মলিন দেখা যায়। উপসহকারী পরিচালকের অপসারণের আদেশটি যে, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৩৫ দফা (২) উপদফা (আ)-এর বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সচিবের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায় এর সন্তোষজনক ব্যাখ্যা অনুপস্থিত।

সংবিধান পর্যালোচনায় দেখা যায় যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা প্রদানসাপেক্ষে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ একজন অসামরিক সরকারি কর্মচারীকে কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে চাকরি থেকে বরখাস্ত, অপসারণ বা পদাবনমিত করতে পারেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালা, ২০০৮-এর বিধি ৫৪ উপবিধি (২)-এ কমিশনকে কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে ৯০ দিনের নোটিশ বা বেতন প্রদানপূর্বক অপসারণের ক্ষমতা অর্পণ করা হলেও এ ক্ষমতাটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই অপসারণের আদেশ ও তদসংশ্লিষ্ট নথিতে যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যার সপক্ষে সন্তোষজনকভাবে সমর্থিত প্রমাণাদির উপস্থিতি অত্যাবশ্যক। পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণে পরিলক্ষিত হয় সংবিধানের নির্দেশনার ব্যত্যয়ে অপসারণের কার্যটি সমাধা হওয়ায় জনমনের অসন্তোষ নিরসনে এটির সন্তোষজনক ও গ্রহণযোগ্য সুরাহা প্রত্যাশিত।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail : iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement