০৫ জুলাই ২০২২, ২১ আষাঢ় ১৪২৯, ৫ জিলহজ ১৪৪৩
`

প্রাইমারি স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ এখনো হয়নি


২০১০ সালের জানুয়ারিতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তার সরকার সারা দেশে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। (প্রথম আলো : ২১ জানুয়ারি, ২০১০) ৪ অক্টোবর, ২০১৮ সালে গণভবনে আয়োজিত ওলামা মাশায়েখ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এই উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছিল মাদরাসা শিক্ষা দিয়ে। অনেকেই অনেক কিছু মনে করতে পারেন। তবে আমি মনে করি, ধর্মীয় অনুভ‚তির বাইরে আমরা কেউ না। আমরা ধর্মকে অস্বীকার করতে পারি না।

আবার ধর্মের অপব্যবহার হোক, এটাও আমরা চাই না। জীবন-জীবিকার শিক্ষার পাশাপাশি যখনই আমরা ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, তখনই শিক্ষা পূর্ণাঙ্গ হয়।’ (যুগান্তর : ৪ অক্টোবর, ২০১৮) প্রধানমন্ত্রীর এসব বক্তব্য যুক্তিসিদ্ধ ও ইতিহাসনির্ভর। এর তাৎপর্য ও গুরুত্ব বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সরকারের কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তি মাঝে মধ্যে মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন এবং ইসলামী শিক্ষাকে সঙ্কুচিত করার প্রবণতা লালন করেন। কওমি মাদরাসাগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণের নেয়ার কথাও শোনা যায় তাদের বক্তব্যে। এটি প্রধানমন্ত্রীর উপলব্ধি ও মননশীলতার সাথে সাংঘর্ষিক। আমরা সবসময় বলে আসছি, ধর্মের সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার কোনো বিরোধ নেই।

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ঘোষণার ১২ বছর হতে চলল, কিন্তু এ ঘোষণা আজো বাস্তবায়িত হয়নি, নেয়া হয়নি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ। প্রধানমন্ত্রীর অনেক ঘোষণা এরই মধ্যে আলোর মুখ দেখেছে। অ্যাফিলিয়েটিং আরবি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বিপুল স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার এমপিওভুক্তি, প্রতিটি উপজেলায় বেসরকারি কলেজকে জাতীয়করণ, কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস সনদের মাস্টার্সের স্বীকৃতি, এনটিআরসিএর মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে ৩৮০টি মক্তব চালু, সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ বর্তমান সরকারের ইতিবাচক অর্জন। এ ছাড়া ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর ১৫টি বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘ধর্ম ও নৈতিকতার ওপর সঠিক শিক্ষা প্রদান’।

পর্যাপ্ত ধর্মশিক্ষকের অভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রাইমারি স্কুলে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। অনেক স্কুলে হিন্দু শিক্ষকরা পড়াচ্ছেন ইসলাম ধর্মশিক্ষা। কারণ ওই সব স্কুলে কোনো মুসলমান শিক্ষক নেই। অন্য দিকে একই কারণ ও পরিস্থিতিতে মুসলিম শিক্ষকরা পড়াচ্ছেন হিন্দু ধর্মশিক্ষা। কিছু স্কুলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষকের অভাবে ধর্মশিক্ষার ক্লাসও নিয়মিত হয় না। দায়সারা গোছের পাঠদানের ফলে কোমলমতি শিশুরা ধর্মের মর্ম উপলব্ধি ও নৈতিকতার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইসলাম ধর্ম পড়াচ্ছেন হিন্দু শিক্ষক। কোথাও বা বছরের পর বছর ধরে ‘ইসলাম শিক্ষা’ পাঠদান ব্যাহত। রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির বারুগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১২ বছর ধরে ‘ইসলাম শিক্ষা’ ক্লাস নিচ্ছেন হিন্দু শিক্ষক। বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান গুরুত্ব পেলেও ইসলাম শিক্ষা উপেক্ষিত। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ধর্মীয় শিক্ষাকে আমরা যতই উপেক্ষা করছি, ততই বাড়ছে মাদকাসক্তি। এর নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি পড়ছে দেশের সব সেক্টরে। ধর্মীয় শিক্ষা না থাকায় দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশকে মাদক গ্রাস করে নিয়েছে। (যুবায়ের আহমাদ, কালের কণ্ঠ, ঢাকা, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯) মন্ত্রণালয় বা অধিদফতরের কোনো নির্দেশনা না থাকার অজুহাতে জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা শিক্ষক বদলি ও পোস্টিংয়ে ধর্মশিক্ষার ব্যাপারটি বিবেচনায় আনছেন না। বিশ্বাস, বোধ ও চর্চার বাইরে যে কেউ ধর্মশিক্ষা দিতে গেলে তা যথার্থ হয় না; শিক্ষার্থীদের ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে না। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মর্মকথা পড়াতে গেলে বিকৃতি ও বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রতি বছর বিপুল শিক্ষার্থী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে কামিল ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি, ইসলামিক স্টাডিজ, দাওয়াহ ও কুরআনিক সাইন্স ডিসিপ্লিন থেকে মাস্টার্স এবং কওমি মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস ডিগ্রি নিয়ে বেরোচ্ছেন। তাদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ধর্মশিক্ষক নিয়োগ করা হলে সঙ্কট উত্তরণের পথ সহজ হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিটি শিশুর প্রধান ও মৌলিক অধিকার। এটি শিশুর চরিত্র গঠনের প্রথম ধাপ। প্রাথমিক শিক্ষার ভ‚মিকা হলো শিশুর বিস্তৃত শিক্ষা নিশ্চিত করা। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক, শাস্ত্রীয়, সাংস্কৃতিক, মানসিক ও শারীরিক দক্ষতার বিকাশ। ধর্মশিক্ষার অভাবে শিশু বয়সেই অনেকে নৈতিকতা হারিয়ে অন্যায় অপকর্মের সাথে জড়িয়ে পড়ছে। সমাজে বাড়ছে শিশু অপরাধ। নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রতিও আসক্ত হচ্ছে তারা। ধর্ম সম্পর্কে শেখা এবং ধর্ম থেকে শেখা সব শিক্ষার্থীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ধর্মীয় শিক্ষা ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের এবং অন্যদের বোঝার ব্যাপারে সাহায্য করে। এটি ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক, নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশধারাকে ত্বরান্বিত করে থাকে।

ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা একটি শিশুকে মানবতা, ভালো আচরণ এবং অন্যদের সাথে কিভাবে আচরণ করতে হয় তা শিখতে সাহায্য করে। শৈশবকালে শিক্ষার গুরুত্ব আরো বেশি; কারণ এটি শিশুদের সামাজিক ও মানসিক দক্ষতা বিকাশের জন্য সুযোগ্য সময়; যা তাদের বৃদ্ধি ও সাফল্যে সহায়তা করবে। আদর্শবাদ অনুসারে শিক্ষার লক্ষ্য ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি এবং স্থানে স্থানে সংস্কৃতির চর্চা, প্রচার ও সংরক্ষণের সাথে সম্পর্কিত হওয়া উচিত। আদর্শিক শিক্ষা মানুষের নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নান্দনিক ক্রিয়াকলাপ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধ সংরক্ষণ ও বিকাশে সহায়তা করে।

শিক্ষা হলো মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের উপলব্ধি এবং শরীর ও আত্মার সমন্বয়। শিক্ষা অবশ্যই নৈতিকতা ও নীতিজ্ঞানের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। নীতিবোধ ও নৈতিকতা জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। মানুষের সব চিন্তা, কাজ ও আচরণ এই দু’টি ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। নৈতিক শিক্ষা সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে সাহায্য করে; ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটায়; ব্যক্তি ও পেশাগত জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করে; জীবন থেকে হিংসা, অসততা, ঈর্ষা প্রভৃতি সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে; সমাজে সহিংসতা, অপরাধ, শিশু নির্যাতন, নারীদের অবজ্ঞা ইত্যাদির মতো খারাপ প্রভাব মুছে ফেলতে পারে; ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, আত্মবিশ্বাস, প্রেরণা ও জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে সাহায্য করে। এসব মান শিক্ষার্থীকে উৎসর্গীকৃত, নিঃস্বার্থ, প্রেমময় এবং অন্যের প্রতি যতœশীল হতে সাহায্য করে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট সরকারি প্রাইমারি স্কুলের সংখ্যা ৬৩ হাজার ৬০১টি। দেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষক সংখ্যা প্রায় চার লাখ। এর মধ্যে নারী শিক্ষক ৭০ শতাংশের ওপরে। ১৯৭২ সালের কুদরত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯৭৩ সালে একসাথে ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করা হয়। এটি ছিল বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার বিস্তার ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী এবং সাহসী পদক্ষেপ।

ধর্মনির্ভর শিক্ষাই ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের আদি শিক্ষা। হিন্দুরা টোল, বৌদ্ধরা পালি ও মুসলমানরা পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে শিক্ষার সূচনা করতেন। মসজিদকেন্দ্রিক লাখ লাখ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। সুলতান ও রাজা-বাদশাহরা এর পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। বিপুলসংখ্যক নিষ্কর ভ‚মি মাদরাসা ও মসজিদের নামে বন্দোবস্ত দেয়া হয়।

১৭৫৭ সালের পলাশীর বিপর্যয়ের পর আংশিক এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর পূর্ণভাবে বাজেয়াপ্ত করা হয় মুসলমানদের যাবতীয় ওয়াক্ফ ও লাখেরাজ সম্পত্তি। উদ্দেশ্য ছিল সুফি-দরবেশ ও আলেম-ওলামার দাওয়াত ও তালিমের ধারাবাহিকতা রুদ্ধ করে দেয়া এবং সেকুলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি চালু করা। ফলে অনিবার্যভাবে বন্ধ হয়ে যায় মুসলমানদের ধর্মীয়, দাতব্য, খানকাহ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে মুসলমানদের এসব ওয়াক্ফ ও লাখেরাজ সম্পত্তি ব্রিটিশ অনুগতদের প্রদান করেন। ১৭৯৩ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় এ ব্যবস্থা চালু করা হয়। পরবর্তীকালে বারানসি, উত্তর-পশ্চিম প্রদেশ ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির কোনো কোনো অঞ্চলে চালু করা হলো।

ভারতবর্ষে মুসলিম শাসনামলে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষার ব্যাপক প্রচলন ছিল। ১৮৩৫ সালে উইলিয়াম অ্যাডাম বাংলার তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর জরিপ চালিয়ে মন্তব্য করেন, বাংলা ও বিহারে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়স্ক প্রতি ৩০০ জনের জন্য একটি গ্রাম্য বিদ্যালয় ছিল। ইসলামী বিষয়াদি ছাড়াও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দর্শন, গণিত, জ্যামিতি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্র পড়ানো হতো (উইলিয়াম অ্যাডাম, শিক্ষা রিপোর্ট, ১৮৩৫-৩৮, কলকাতা, পৃষ্ঠা ৬-৭)। গবেষক এ জেড এম শামসুল আলম লিখেছেন, ‘বখতিয়ার খিলজির বাংলা জয়ের পর থেকে প্রায় ৫০০ বছর পর্যন্ত সুবে বাংলা ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। মুসলিম সুবাদার, সুলতান, নায়েব, নাজিমরা মাদরাসা ও খানকার জন্য উদার হস্তে দান করতেন। নগদ অর্থ যা দিতেন, লাখেরাজ সম্পদ দিতেন তার চেয়ে অনেক বেশি।’

ইতিহাসবিদ ড. এ আর মল্লিক বলেন, “মুসলিম বালক-বালিকাদের জন্য চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই ইবতেদায়ি (প্রাথমিক) মাদরাসায় ভর্তি হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এটি ছিল প্রতিটি মুসলিম পরিবারের অপরিহার্য প্রথা, যখন কোনো সন্তানের বয়স চার বছর চার মাস চার দিন পূর্ণ হতো, ‘বিসমিল্লাহ অনুষ্ঠান’ নামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার শিক্ষার সূচনা হতো।” পবিত্র কুরআনের কিছু অংশ শিশুকে পাঠ করে শোনানো হতো, শিশু তা পুনরাবৃত্তি করত (Dr. A R Mallic, British policy and Muslims in Bengal : 149).

১৭৬৫ সালে বাংলায় ৮০ হাজার মক্তব-মাদরাসা চালু ছিল। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলার ৪ ভাগের ১ ভাগ জমি লাখেরাজভাবে (নিষ্কর ভ‚মি) বরাদ্দ ছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্রমান্বয়ে এই লাখেরাজ সম্পত্তি আইন, বিধিবিধান প্রণয়ন এবং জোরজবরদস্তি করে দেশের হিন্দু জমিদার ও প্রজাদের ইজারা দিতে থাকে। এ-সংক্রান্ত তিনটি বিধান হলোÑ (১) ১৭৯৩ সালের রেগুলেশন-১৯, (২) ১৯১৮ সালের রেগুলেশন-২, (৩) রিজামসান ল অব ১৮২৮ (লাখেরাজ ভ‚মি পুনঃগ্রহণ আইন)। ফলে মাদরাসার আয় কমতে থাকে। বহু মাদরাসা বন্ধ হয়ে যায়। গুটিকয়েক মাদরাসা কোনোভাবে অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। ১৭৬৫ সালে বাংলায় মাদরাসার সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার। ২০০ বছর পর ১৯৬৫ সালে এ সংখ্যা দুই হাজারের নিচে নেমে আসে। (এ জেড এম শামসুল আলম, মাদরাসা শিক্ষা, মে-২০০২, পৃষ্ঠা ৩-৪; মাওলানা সাখাওয়াতউল্লাহ, কালের কণ্ঠ, ২৬ নভেম্বর, ২০১৯)

২০১৬ সাল থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের সরকারি স্কুলে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে ভগবদ্গীতা, কুরআন, বাইবেল ও গুরু গ্রন্থ সাহেব থেকে টেক্সট নিয়ে কারিকুলাম তৈরি করা হয়। (India Today, July 4, 2016). জম্মু কাশ্মির, হিমাচল প্রদেশ, পাঞ্জাব, উত্তরখণ্ড, হরিয়ানা, দিল্লি, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ ও চণ্ডীগড়ের স্কুল সিলেবাসে জাতীয়তাবাদী উগ্র নেতা ছত্রপতি শিবাজি জীবন কাহিনী সন্নিবেশিত করা হয়েছে হিন্দুধর্মীয় চেতনা শাণিত করার লক্ষ্য নিয়ে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, শিবাজি ছিলেন সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী। তার সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সদস্য ছিলেন মুসলমান। তিনি মুসলিম সুফি-সাধকদের সমীহ করে চলতেন এবং ইয়াকুত বাবা নামে এক মুসলিম দরবেশের খানকায় আসা-যাওয়া করতেন। তিনি মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব ও বিজাপুরের সুলতান আদিল শাহের সাথে বহুদিন যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এসব যুদ্ধ ছিল রাজনৈতিক, কোনোক্রমেই ধর্মীয় নয়। আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে রাজপুত হিন্দু সেনা এবং আদিল শাহের নেতৃত্বে দাক্ষিণাত্যের হিন্দু সেনা শিবাজির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। শিবাজি ছিলেন সাহসী যোদ্ধা, এতে কোনো সন্দেহ নেই। একশ্রেণীর ইতিহাসবিদ শিবাজিকে হিন্দু পুনরুজ্জীবনের প্রতীক হিসেবে চিত্রায়িত করার প্রয়াস পেয়েছেন।

প্রাইমারি স্কুলে ধর্মশিক্ষক নিয়োগের অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ধর্মপ্রাণ জনগণ প্রধানমন্ত্রীর সদয় হস্তক্ষেপ কামনা করছে। এতে শিশুদের কোমল হৃদয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও দেশপ্রেম জাগ্রত হবে; সন্ত্রাস, মাদক ও জঙ্গিবাদসহ সামাজিক অপরাধের প্রতি ঘৃণা তৈরি হবে। জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর শিশুদের নৈতিক, মানবিক ও আদর্শিক ভিত্তির ওপর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক
drkhalid09@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement