১৬ আগস্ট ২০২২
`

একজন সফল স্বৈরাচারের নির্ভুল তৈলচিত্র!

-

বাংলাদেশের মানুষের কাছে স্বৈরাচার শব্দটি অনেকটা ডাল-ভাতের মতো। বাঙালির শরীর স্বাস্থ্য রক্ত মাংস কিংবা অস্থি-মজ্জা যা কিছুই বলি না কেন, কোনোটিই ডাল-ভাত ছাড়া খুব বেশি দিন চলতে পারে না। দেশের মাটিতে বসে অনেক বাঙালি ফুটানি দেখানোর জন্য ব্ল্যাক কফি রেড ওয়াইন সালাদ সবজি খেয়ে নিজেদের আধুনিক বাঙালি, স্মার্ট এবং স্বাস্থ্যসচেতন বলে জাহির করার জন্য দিবানিশি চেষ্টা চালাতে থাকেন। সকালে পাঁচতারকা হোটেলে নাশতা, দুপুরে বিশেষ স্প্যানিশ সালাদ এবং সন্ধ্যা রাতে হালকা পানীয়ের সাথে কাজু বাদাম স্যালমন্ড ফিস এবং ডেনিশ ইয়োগার্ট খাওয়ার জন্য যেসব নব্য ধনী তথাকথিত অভিজাত ক্লাবগুলোতে ভিড় জমান, তারাই ব্যাংকক সিঙ্গাপুর হংকং সাংহাই প্রভৃতি শহরে পা রেখেই বাঙালি হোটেলের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। তারপর বড় প্লেটে ভাত নিয়ে ডাল আলুভর্তা কাঁচামরিচ দিয়ে একেবারে তলপেট থেকে গলা পর্যন্ত উদর পূর্তি করেন এবং এককাপ দুধ-চা খেয়ে হাই তুলতে তুলতে হোটেলে গিয়ে মস্ত এক ঘুম দিয়ে তারপর অন্যান্য কর্মে মনোনিবেশ করেন।

বাঙালির জীবনে ডাল-ভাত যেমন অপরিহার্য ঠিক তেমনি স্বৈরাচার শব্দটিও একেবারে অনিবার্য। বাড়িঘর রাস্তাঘাট দোকানপাট অফিস আদালত রাজনীতি অর্থনীতি পীর-ফকিরের খানকা থেকে শুরু করে নাটক সিনেমা যাত্রাপালার মঞ্চ প্রভৃতি সব জায়গাতেই স্বৈরাচারের জয়জয়কার বাংলা মুলুকে যেভাবে নমস্য হয়ে পড়েছে তার ফলে অনাগত দিনে স্বৈরাচারের সূতিকাগার, প্রজননকেন্দ্র এবং উৎপাদন ও বিপণনের যদি কোনো বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা হয় তবে আবহমান বাংলার স্বৈরাচার নিশ্চয়ই দেশবাসীকে নবতর বিশ্বরেকর্ড উপহার এনে দিতে পারবে। স্বৈরাচারী মনোভাবের জন্য সচিবালয়ের নিম্নমান সহকারী যেমন ঘরের মধ্যে এসে বউয়ের সাথে জয়েন্ট সেক্রেটারির ভাব দেখায়, তদ্রূপ অফিস আদালতের বড় বড় রুই কাতলা কিংবা রাঘব বোয়ালরা ঘরের অভ্যন্তরে স্বৈরাচারীর পরশপাথরে মিউমিউ শব্দে গান গাইতে আরম্ভ করে।

উল্লিখিত কারণে বাঙালির রাজনৈতিক জীবনে বহু নায়ক-মহানায়কের সাথে অসংখ্য স্বৈরাচারের ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আমরা যেরূপ শশাঙ্ক, গোপাল, গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ, শায়েস্তা খাঁ, ঈসা খাঁ প্রমুখ মহানায়ককে স্মরণ করি তদ্রূপ রাজা গণেশ, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, মীর জাফর, রাজা নন্দলালের মতো হাজার হাজার হাবিজাবি চরিত্রের ইতিহাসের বস্তাপচা প্রকৃতির স্বৈরাচারী লোকজনের কুকীর্তির কাহিনী ভুলতে পারি না। এসব কারণে আমাদের দেশের গল্পকাহিনী সিনেমা বা যাত্রাপালার নায়ক-নায়িকাদের মতো, ভিলেন চরিত্রে অভিনয় করা লোকজন সম্পর্কেও মানুষের রয়েছে নিদারুণ উৎসাহ এবং উদ্দীপনা। আমাদের দেশে স্বৈরাচাররা মাঝে মধ্যে ইতিহাস রচনার কাজে হাত দেয় - আবার তাদের তৈরি করা ইতিহাস আরেক স্বৈরাচার এসে কুটি কুটি করে ছিঁড়ে নর্দমায় ফেলে দেয়। ফলে স্বৈরাচার আসলে কত প্রকার এবং কী কী তা আমরা প্রায়ই ভুলে যেতে বাধ্য হই। এ অবস্থায় একজন সফল খাঁটি এবং সত্যিকারের স্বৈরাচারের চরিত্র কেমন হওয়া উচিত অথবা এ ধরনের স্বৈরাচারের চেহারা-চরিত্র কেমন কিংবা এদের ভাবমর্যাদার যদি কোনো ভাস্কর্য বা তৈলচিত্র নির্মিত হয় তবে তা কেমন হবে এমন চিন্তা থেকেই আমি মূলত আজকের নিবন্ধ রচনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছি।
নিবন্ধ লিখতে গিয়ে আমি ইতিহাসের হাল-আমলের নিকৃষ্টতম স্বৈরাচাররা যেমন হিটলার, মুসোলিনি, পলপট, পিনোসে, গাদ্দাফি, সাদ্দাম প্রমুখের জীবন ও কর্ম নিয়ে অধ্যয়ন করেছি। কিন্তু আবহমান বাংলার স্বৈরাচারীদের সাথে তাদের কোনো মিল খুঁজে পাইনি। গত ১০০ বছরের ইতিহাসে যেসব স্বৈরাচার তাদের বহুমুখী কর্মে পৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি, সভ্যতা ওলটপালট করে দিয়েছেন তারা কিন্তু নিজ নিজ দেশের ইতিহাসের অনেক বিষয়ে মহাকালের জন্য জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে আছেন। আমরা যদি চেঙ্গিস খান অথবা হালাকু খানের স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করি তবে বাংলাদেশে বসে হয়তো তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে পারব। কিন্তু আধুনিক মঙ্গোলিয়া এবং গণচীনে চেঙ্গিস খানকে বলা হয় ‘সর্বকালের কিংবদন্তির মহাপুরুষ’। একইভাবে তার প্রপৌত্র হালাকু খান এবং তার প্রতিষ্ঠিত ইসলামী বংশ পারস্য সাম্রাজ্য, তুরস্ক এবং মধ্য এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোতে আজো গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছেন।

উল্লিখিত ইতিহাসের সাথে আমাদের স্থানীয়, ডাল-ভাত খাওয়া স্বৈরাচারের দলের কোনো মিল খুঁজে পাবেন না। আমাদের স্বৈরাচারীদের যত মাতব্বরি কেবল নিজস্ব ভূখণ্ড, অফিস আদালত অথবা গৃহকোণের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তারা কোনোকালে পৃথিবী কাঁপানো তো দূরের কথা, আমাদের সীমান্তের কাছাকাছি গিয়ে সীমান্তের অপর প্রান্তের একটি ছাগল অথবা ভেড়াকেও ভয় দেখাতে পারেনি। তারা আমাদের ধানক্ষেতে প্রচণ্ড তাণ্ডব দেখাতে পারে অথবা পাটক্ষেতের পাটগুলো যখন এক ফুট বা দেড় ফুট লম্বা হয়ে বৈশাখ মাসের প্রকৃতিতে অনাবিল সৌন্দর্য দান করে তখন এ দেশীয় স্বৈরাচাররা সেই পাটক্ষেতে গিয়ে তুফান সৃষ্টি করে নিজেদের বীরত্ব জাহির করতে পারে।

আমাদের স্বৈরাচারদের আপনি এক দিকে যেমন কুয়ার ব্যাঙ হিসেবে অভিহিত করতে পারেন - অন্য দিকে তাদের আচার আচরণকে বড়জোর মফস্বলের সার্কাসের ভাঁড় অথবা সার্কাস কোম্পানির হাতে বন্দী হিংস্র প্রাণীর সাথে তুলনা করতে পারেন। তারা সার্কাসের প্রাণীগুলোর মতো নাচগান করে এবং তাদের মালিকের হুকুমে মাঝে মধ্যে বিভিন্ন কসরত দেখিয়ে সার্কাসের দর্শকশ্রোতাকে আনন্দ দিয়ে থাকে। সার্কাস দলের হাতে বন্দী বাঘ-ভালুক শূকর হাতিদের সার্কাস মঞ্চের বাইরের লোকজন অন্যান্য হিংস্র প্রাণীর মতোই ভয় করে। কিন্তু সার্কাসের দর্শকশ্রোতারা কিন্তু ওগুলোকে বিনোদন প্রাণী হিসেবে মনে করে। একইভাবে আমাদের দেশের স্বৈরাচারদেরও সার্কাসের প্রাণীদের মতো দ্বিমুখী পরিচয় রয়েছে। তারা সাধারণ জনগণের জন্য যদিও ভয়ঙ্কর কিন্তু তাদের প্রশিক্ষক মালিক এবং দর্শকদের জন্য তারা বিনোদনবালক বা ‘নটী বিনোদিনী’ বৈ অন্য কিছু নয়। মালিকের হুকুমে তারা নির্দিষ্ট সময়ে নাচন কুদন করে এবং পরে আবার সার্কাসের প্রাণীদের মতো খাঁচাবন্দী হয়ে লেজ গুটিয়ে পরিহাসের পাত্র-পাত্রীরূপে বেঁচে থাকতে বাধ্য হয়।

দুনিয়া কাঁপানো স্বৈরাচারদের সাথে আমাদের স্থানীয় স্বৈরাচারের কোনো মিল না থাকার দরুন বঙ্গীয় স্বৈরাচারের আদল-মুখোশ এবং তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমি কোনো স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছিলাম না। হিটলার-মুসোলিনিদের মতো স্বৈরাচারের চরিত্র-কর্মকাণ্ড, ভালো-মন্দ ইত্যাদি ইতিহাসে নির্ধারিত হয়ে গেছে। এমনকি আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খানের ইতিহাসও নির্মোহভাবে লিখিত হয়েছে। বিশ্বের কুখ্যাত স্বৈরাচারদের চরিত্র নিয়ে ইতিহাস রচনা করতে ঐতিহাসিকদের তেমন কোনো কষ্ট পেতে হয়নি। কারণ তাদের সবারই একটি চরিত্র ছিল। অন্য দিকে বঙ্গীয় স্বৈরাচারীদের কোনো চরিত্র কোনোকালে ছিল বলে আজ অবধি কোনো ঐতিহাসিক নিশ্চিত হতে পারেননি। ফলে দেশীয় স্বৈরাচারীদের সম্পর্কে জেনে-বুঝে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আমজনতার কোনোকালেই হয়নি। ফলে তাদের বহুরূপী ফানুসের কবলে পড়ে প্রায় সব যুগেই পাবলিক নিদারুণভাবে সর্বস্ব হারিয়েছে।

উল্লিখিত অবস্থায় গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে কখন কিভাবে স্বৈরাচারের উদ্ভব হয় এবং এই ভূখণ্ডের আলো বাতাস-মশা-মাছি, উড়শ (ছারপোকা), ডাঁশ (রক্তখেকো মাছি) জোঁক, ব্যাঙ ইত্যাদির সংস্পর্শে যেসব স্বৈরাচারের শৈশব-কৈশোর কাটে এবং বাংলার চুলকানি-খুজলি-পাঁচড়া-অপুষ্টি এবং চিরায়ত কলহ-বিবাদ দেশীয় স্বৈরাচারীদের ওপর কী প্রভাব বিস্তার করে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনার একপর্যায়ে একটি দুনিয়া কাঁপানো বøক বাস্টার হলিউডি সিনেমা দেখছিলাম। ২০১২ সালে নির্মিত সিনেমাটির নাম দ্য ডিক্টেটর, যার সহজ সরল বাংলা অনুবাদ হলো স্বৈরাচারী একনায়ক। উত্তর আফ্রিকার কল্পিত একটি দেশের নাম ওয়াদিয়া। সেখানকার জুলুমবাজ শাসক অ্যাডমিরাল জেনারেল আলাদিন। তার রয়েছে হাজারখানেক ডক্টরেট ডিগ্রি। তিনি তার নিজ দেশে অনেক স্থানীয় অলিম্পিক খেলার আয়োজন করেছেন এবং সেই অলিম্পিকের সব ইভেন্টে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন।

ব্রিটিশ অভিনেতা সাচা ব্যারন অভিনীত দ্য ডিক্টেটর সিনেমাটি সেই ২০১২ সাল থেকে আজ অবধি সর্বাধিক দর্শকপ্রিয়তার কারণে বিশ্ব সিনেমার জগতে যে মাইলফলক স্থাপন করেছে তার ধারে কাছেও রাজনৈতিক স্যাটায়ারকে উপজীব্য করে নির্মিত অন্য কোনো সিনেমা পৌঁছাতে পারেনি।

আপনি যদি সিনেমাটি দেখেন - তাহলে স্বৈরাচারের অধীনে কিভাবে আমলাতন্ত্র চলে এবং স্বৈরাচারের দেশে জনগণের অধিকার কেমন হয় তা বুঝতে একটুও কষ্ট হবে না। অধিকন্তু চরিত্রহীন বঙ্গীয় স্বৈরাচারদের মুখ ও মুখোশ কেমন হতে পারে এবং তাদের অধীনে কী ধরনের কর্মকাণ্ড চলে তা-ও খুব সহজে বুঝে যাবেন এবং সিনেমাটি দেখার পর আপনি যদি একজন সফল স্বৈরাচারের কোনো পোট্রেট বা তৈলচিত্র অঙ্কন করতে চান তবে আপনাকে একটুও বেগ পেতে হবে না।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য


আরো সংবাদ


premium cement