২০ আগস্ট ২০২২
`

স্বাধীন বাংলাদেশ একুশের বড় অর্জন

-

একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের আত্মপরিচয়ের দিন। এবার এ দিনটি এসেছে একটু ভিন্ন মাত্রায়। এর সূচনা গত রোববার রাত ১২টা ১ মিনিটে। এ দিনটিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষ ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে স্মৃতির মিনার।

এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে এ কারণে যে, বায়ান্নর মহান ভাষা আন্দোলন ৭০ বছর পূর্ণ করেছে। দ্বিতীয়ত গত দুই বছর করোনা মহামারীর কারণে শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের পক্ষে যথাযথভাবে শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব হয়নি। করোনা মহামারীর অবসান না হলেও সংক্রমণ কমে এসেছে। অমর একুশের গ্রন্থমেলাও শুরু হয়ে গেছে। ফলে দিনটি পালনে মানুষের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততাও লক্ষ করা যাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার কয়েক দিন আগে থেকেই সাজানো হয়। মিনারের সামনের দেয়ালে কবিতার অমর পঙ্ক্তি এবং বাংলা ভাষার অমর বাণী উৎকীর্ণ করা হয়েছে। একে ঘিরে কৌতূহলী মানুষের ভিড় এবং ছবি তোলার হিড়িক থেকেই তা বোঝা যাচ্ছে। একুশের এ দিনটি আমাদেরকে ইতিহাসের সেই গৌরবোজ্জ্বল সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

ভাষা আন্দেলনের বিজয়ের ৭০ বছর পূর্তি আজ আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা কী করতে পেরেছি? এই ঐতিহাসিক সংগ্রামের মর্মবাণী ছিল বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন। এই অর্জন কি সম্ভব হয়েছে?

এটি ঠিক, বিশ্বব্যাপী বাংলা ভাষা বর্তমানে একটি জোরালো অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে। বিশ্বের প্রায় সাড়ে ২৬ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। বাংলা এখন বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ মাতৃভাষা। আমাদের একুশের ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি লাভ করার পর দেশে দেশে আমাদের ভাষা সংগ্রামের কথাও ছড়িয়ে পড়েছে। নিঃসন্দেহে এটা গৌরবের।

একুশের অর্জন নিয়ে যদি আমরা মূল্যায়ন করি তা হলে দেখব- মহান ভাষা আন্দোলনের আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন স্বাধীন বাংলাদেশ। বায়ান্নর অগ্নিঝরা একুশে ফেব্রুয়ারির সেই সময়টিতে আমরা কেউ স্বাধীন দেশের কথা না ভাবলেও কিংবা অনুভব না করলেও স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা কিন্তু সম্ভব হয়েছে। এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে? ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এ দেশে যত গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন হয়েছে, ভাষা আন্দোলনই তাতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

আমাদের সংস্কৃতির সব শাখায় ভাষা আন্দোলন এবং একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাব ও প্রত্যক্ষ চিত্রণ আমরা দেখতে পাই। আমাদের সাহিত্যে নাটকে, গানে, চিত্রকলায় ও সংস্কৃতির অন্য সব মাধ্যমে একুশে যতখানি প্রভাব ফেলেছে, অন্য কোনো আন্দোলন ততখানি প্রভাব ফেলতে পারেনি। কবি হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত প্রথম একুশে সঙ্কলন ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয়। সেটি একুশে ফেব্রুয়ারির পরিচয় যেমন তুলে ধরে, তেমনি তাতে আমাদের সাহিত্যকর্মের তখনকার অবস্থার একটি প্রতিনিধিত্বও ছিল। আমাদের সংস্কৃতির বেশ কিছু চিরায়ত সৃষ্টি হয়েছে এ আন্দোলনকে ঘিরে; যেমন আবদুল গাফফার চৌধুরীর গান, মুনীর চৌধুরীর নাটক, জহির রায়হানের উপন্যাস ও চলচ্চিত্র, হাসান হাফিজুর রহমান, মাহবুবুল আলম চৌধুরী, আলাউদ্দিন আজাদ, এ জেড এম ওবায়দুল্লাহ খানসহ বেশ কয়েকজন বরেণ্য কবির কবিতা- এসবের কথা প্রথমেই বলতে হয়। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত একুশের গল্প ও একুশের উপন্যাস দেখলেও বোঝা যায় যে, আমাদের কথাসাহিত্যে একুশের প্রভাব কতটা গভীর। আমাদের বরেণ্য চিত্রশিল্পীরা প্রায় সবাই একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে কাজ করেছেন। কামরুল হাসান, মোহাম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর, কাইয়ূম চৌধুরী তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া শহীদ মিনার স্থাপত্যের ক্ষেত্রে একুশের স্মৃতি বহনকারী বিশাল শিল্পকর্ম।

একুশের চেতনাকে ধারণ করে এখন প্রতি বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলা হয়। সাহিত্য মূল্যসমৃদ্ধ ও মননশীল বই যথেষ্ট বের হচ্ছে। ভালো মানের বইয়ের সাথে সাধারণ মানের বইও প্রকাশ করা হচ্ছে। অজস্র বই প্রকাশে এই যে উচ্ছ্বাস, এটি একুশেরই প্রেরণা। বই প্রকাশে দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, ভালো বই প্রকাশের সংখ্যা একেবারে কম নয়। আমাদের সাহিত্যে একাত্তরও এসেছে।

গবেষকদের গবেষণায় উঠে এসেছে ওয়ালীউল্লাহর লালসালু ছাড়া সব মহৎ লেখা বায়ান্ন-পরবর্তী সময়েই হয়েছে। ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, আবু ইসহাক, হুমায়ূন আহমেদ- সবাই এই সময়কালের।
ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রত্যক্ষ লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষাকে দেশের রাষ্ট্রভাষার মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা। সে উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে। তবে রাষ্ট্রভাষা হওয়ার পরে জীবনের সর্বক্ষেত্রে মাতৃভাষার যে ব্যবহার প্রত্যাশিত ছিল সেটি অনেকাংশে পূরণ হয়নি। শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি পর্যায়ে হলেও বাংলা ভাষা যে, উচ্চশিক্ষারও মাধ্যম হতে পারে তা হয়ে ওঠেনি। আদালতের উচ্চ পর্যায়ে খুব সীমিত পরিসরে বাংলা ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পরে আমাদের উচ্চবিত্তের সংখ্যা বেড়েছে, মধ্যবিত্তেরও কিছু অর্থাগম হয়েছে। তাদের বেশির ভাগেরই সন্তান-সন্তুতিকে বিদেশে পড়াতে চান। সে কারণে শিক্ষার মাধ্যমে হিসেবে বাংলা তাদের কাছে প্রাসঙ্গিক তো নয়ই, বরং খানিকটা আপদস্বরূপ মনে হয়। দৃষ্টিভঙ্গির এই যে পরিবর্তন হয়েছে কালের ব্যবধানে, এর ফলে একুশে ফেব্রুয়ারির দিনের সব আবেগ সত্ত্বেও জীবনের সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে আমাদের আগ্রহ ও প্রচেষ্টা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

একুশের ফসল বাংলা একাডেমি। কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানটি সেই উদ্দেশ্য ততটা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অনুবাদ কর্মের ওপর বাংলা একাডেমির বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন ছিল। মননশীল গবেষণার ওপর মনোনিবেশ করা এর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু একাডেমির কার্যক্রম খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, প্রতিষ্ঠানটি সেসব দিকে অল্পই নজর দিয়েছে। কালক্রমে এটি একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মতো উৎসব ও দিবস পালনে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ করছে। বাংলা একাডেমি কিছু বইপত্র প্রকাশ করে থাকে- এতটুকুই সাফল্যের দিক। তবে উচ্চতর স্তরের পাঠ্যপুস্তক রচনা ও প্রকাশের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির আশানুরূপ ভূমিকা নেই। একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমি যতটা নিজের পরিচয় তুলে ধরেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কুক্ষিগত হয়ে পড়েছে। এটি একাডেমির জন্য কোনোভাবেই ভালো হয়েছে বলে মনে হয় না।

বাংলা একাডেমির প্রকাশিত অভিধানগুলো মূল্যবান। তবে বাংলা ভাষায় পূর্ণাঙ্গ কোনো অভিধান এখনো রচিত হয়নি। গত পাঁচ-ছয় দশকে বাংলা ভাষায় আত্তীকরণ হয়েছে অনেক শব্দ। কিন্তু কত শব্দ অভিধানে স্থান পেয়েছে কিংবা কী উপায়ে এসেছে এসব শব্দ তার কোনো পরিসংখ্যান নেই বাংলা একাডেমির কাছে। অভিধান সম্পাদকের অনেকেই সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, বাংলা ভাষায় পূর্ণাঙ্গ কোনো অভিধানই নেই। বর্তমানে বাংলা ভাষার ভাণ্ডারে রয়েছে প্রায় দেড় লাখ শব্দ। তার মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার শব্দ তৎসম (খাঁটি সংস্কৃত), তিন হাজার আরবি-ফারসি শব্দ, প্রায় চার শ’ তুর্কি শব্দ, হাজার দুয়েক ইংরেজি শব্দ এবং পাঁচ শর মতো পর্তুগিজ ও ফারসি শব্দ। গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার থেকে বাংলা ভাষায় যুক্ত করেছেন প্রায় ৩০ হাজার শব্দ। জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের লেখনী থেকেও এসেছে প্রায় ১০ হাজার শব্দ। এ ছাড়াও বিভিন্ন লেখকের লেখনী থেকেও এসেছে প্রচুর শব্দ। বিজ্ঞানসম্মত সমকালীন কোনো অভিধান তৈরি না হওয়ায় শব্দ আত্তীকরণের সুন্দর ব্যাখ্যা বা পর্যালোচনা নেই। এ ধরনের অভিধান তৈরি হলে জানা যেত কোন শব্দ কোথা থেকে এসেছে, এর ব্যবহার এবং সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব কী? বাংলা বানান প্রমিত করার ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ আছে, বাংলা একাডেমি নিজেই সেই বানান রীতি অনুসরণ করছে না। বাংলা বানান রীতি নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। বাংলা একাডেমির একরকম বানান রীতি, টেক্সট বুক বোর্ড এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বানান রীতি অন্য রকম। হালে আবার বিভিন্ন পত্রিকা অফিসও নিজ নিজ বানান রীতি অনুসরণ করছে। একই ধরনের বানান রীতি অনুসরণ করার ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির নেতৃত্বদানের প্রয়োজন ছিল।

তাই একুশের অর্জনের সামগ্রিক দিক চিন্তা করলে দেখা যাবে, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি লাভ করলেও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা এই ৭০ বছরেও চালু করা যায়নি। ভাষা আন্দোলনের চেতনা ধারণ করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোতে আমরা বিজয়ী হয়েছি, এটি ঠিক। আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আজ পাঁচ দশক পূর্ণ হয়েছে। একুশে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছে। আগেই উল্লেখ করেছি, আমাদের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ভুবনটি একুশের অর্জনের ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ। তবে এটি জোরের সাথেই বলতে হবে- আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম, প্রতিষ্ঠান পরিচালনাসহ সব কাজে বাংলা ভাষাকে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে নিয়ে যেতে হলে মহতি উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমিকে এগিয়ে আসতে হবে। উপযুক্ত পরিভাষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করা গেলে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন সহজ হবে। আর সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের মাধ্যমেই আমরা মহান ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানাতে পারি।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব
ই-মেইল : abdal62@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement

সকল