০১ জুলাই ২০২২, ১৭ আষাঢ় ১৪২৯,
`

দস্যুবৃত্তি ও দেশের সমুদ্রসীমা


এবার মিডিয়ার অতীব গুরুত্বপূর্ণ খবর : ‘বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় ২০২১ সালে কোনো জলদস্যু ছিল না।’ এর প্রেক্ষাপটে চোখ বুলানো যায় একটি বহুল প্রচারিত ইংরেজি দৈনিকের পাতায় যার হেডিং ছিল Bangladeshsi Territorial waters saw no piracy in 2021 : reports. এর ওপরে কর্মব্যস্ত একটি বন্দরের বিরাট ছবি যার ক্যাপশন Businesses believe the latest developments will enhance the positive image off the chattogram port, the countries premier sea port, in the global maritime sector. (ব্যবসার অঙ্গনে এ বিশ্বাস জন্ম নিয়েছে যে, সর্বশেষ পরিবর্তনগুলো চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের- দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর- ইতিবাচক ইমেজ বাড়াবে বিশ্বে সমুদ্র পরিবহনের ক্ষেত্রে)
দেশী বিদেশী কোনো জাহাজই গত বছর বাংলাদেশের সাগরে চুরি কিংবা দস্যুবৃত্তির শিকার হয়নি। এটা সম্প্রতি বলেছে সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি প্রচারের দায়িত্বে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক দুটি প্রতিষ্ঠান। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, সমন্বিত নজরদারি ও পাহারা। বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছে। এসব কর্তৃপক্ষীয় সংস্থার মধ্যে আছে কোস্টগার্ড আর নৌবাহিনীর মতো প্রতিষ্ঠান। আলোচ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানদ্বয় হলো: দি রিজিওন্যাল কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট অন কমব্যাটিং পাইর‌্যাসি অ্যান্ড আর্মড রভারি অ্যাগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (জঊঈঅঅচ) আর অপরটির নাম: আইসিসি ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম ব্যুরো (আইএমবি)। আসলে গোটা দুনিয়াতেই গত বছর জলদস্যুপনা কমে গেছে। এটা রিপোর্টদ্বয়ে জানানো হয়েছে। তবে বাংলাদেশে তা কমে যাওয়া নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য বিরাট সুসংবাদ।

জঊঈঅঅচ-এর বার্ষিক রিপোর্ট ২৫ জানুয়ারি বের হয়। এটা জানায়, ২০২১ সালে এশিয়াতে ৮২টি জাহাজ সশস্ত্র ডাকাতির শিকার হয়। আগের বছর তার সংখ্যা ছিল এর ১৫ শতাংশ বেশি। প্রধানত বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপিনস্, ভিয়েতনাম এবং দক্ষিণ চীন সাগর ও সুনু সেলিবিস সাগরে এটা হ্রাস পায়। আমাদের বাংলাদেশে ২০২০ সালে পাঁচটি জাহাজে ডাকাতি হলেও ২০২১ সালের তালিকায় একটিও নেই। প্রতিবেশী ভারতে এ বছর তা ৯ থেকে ৫-এ নেমে আসে। তবে সিঙ্গাপুর প্রণালীতে জাহাজ ডাকাতির ঘটনা ৪৯টি থেকে পরের বছরেই বেড়ে ২৩৪টি হয়ে যায় ২০২১ সালে!

জঊঈঅঅচ বলেছে, বাংলাদেশে সংশ্লিষ্ট নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে, বেড়েছে টহলদারিও। চট্টগ্রাম বন্দরসমেত বিভিন্ন স্থানেই এটা দেখা গেছে। তাই বাংলাদেশে কোনো জাহাজেই দস্যুবৃত্তির ঘটনা ঘটেনি।

প্রায় একই সময়ে আইএমবি এর বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এর বিষয় ‘জাহাজে দস্যুবৃত্তি ও সশস্ত্র ডাকাতি’। তাদের রিপোর্টে ২০২০ সালে এমন ১৯৫টি অপরাধের উল্লেখ থাকলেও পরের বছরই তা কমে ১৩২টি হয়ে গেছে। এর মধ্যে দস্যুবৃত্তি বা ডাকাতির প্রকৃত ঘটনা এবং এর প্রয়াস, দুটোই অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে ২০২০ ও ’২১ সালে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে তারা জানিয়েছে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস সমিতির প্রধানের দৃষ্টিতে এমন সংবাদ আমাদের নৌবন্দরের জন্য বিরাট অর্জন বৈকি। স্মর্তব্য, আগে প্রধানত বহির্নোঙ্গর ছিল অরক্ষিত ও অনিরাপদ। ফলে এসব এলাকা ছিল অবাধ দস্যুপনার স্থান। তখন নাবিকরা ভয়ে বাংলাদেশে আসতে চাইতেন না। এখনও তারা এমন স্থানগুলো এড়িয়ে চলেন জাহাজের আন্তর্জাতিক রুটগুলোতে। জাহাজে দস্যু বা ডাকাতদের অপতৎপরতা কেবল সংশ্লিষ্ট জাহাজ কিংবা নাবিকদের ক্ষতির কারণ নয়, বরং সংশ্লিষ্ট এলাকা যে দেশের- এমনকি অনেক সময়ে জাহাজটি যে দেশের- তারাও বিরাট ক্ষতির শিকার হয়ে থাকেন। এসব অপরাধ সে দেশের ইমেজ ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ণ করে বলে সে দেশের সরকারের জন্য বিষয়টি খুব বিব্রতকর এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।

বাংলাদেশ এমনিতেই দুর্নীতি, দারিদ্র্য, দুর্যোগের দেশ হিসেবে পরিগণিত। এর সাথে যদি দুর্বৃত্তি বা দস্যুপনা যোগ হয়, তা অতীব দুঃখজনক বটে। নিকট অতীতেও এ দেশের সামুদ্রিক নৌপথে ডাকাতি ও দস্যুবৃত্তি বারবার ঘটত। তবে ইদানীং অবস্থার উন্নতি দৃশ্যমান। ফলে এ দেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রামের ইমেজ উন্নত হওয়ায় এ বন্দর আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠার সুযোগ এসেছে। চট্টগ্রামের এমন ভাবমূর্তি বন্দরটির জন্য একাধিক সুফল বয়ে আনার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। যেমন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাঝে, এই নৌরুটের অর্থাৎ সমুদ্রপথের বিষয়ে আস্থা ও বিশ্বাস বৃদ্ধি পাওয়া, জাহাজের ভাড়া কমে আসা, বীমার বেলায় অধিক সুবিধা ভোগ করা প্রভৃতি। আসলে দক্ষ লোকবল ও পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তার দরুন পরিস্থিতির উন্নতি ঘটেছে। সেসব দিকে কর্তৃপক্ষ বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে সম্প্রতি।

একটি জাতীয় পত্রিকায় এ বিষয়ে চিটাগং পোর্ট অথরিটি বা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) চেয়ারম্যান এম শাহজাহান বলেন, এখন এ বন্দর এলাকা সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় আছে। এ জন্য রাডারযন্ত্র এবং ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরাসজ্জিত জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা অথবা ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (ভিটিএমআইএস) গড়ে তোলা হয়েছে।

তিনি আরো বলেছেন, বিশেষ করে সমুদ্রে বহির্নোঙ্গরে এবং কুতুবদিয়া এলাকায় জাহাজগুলোর কাছে সন্দেহজনক কোনো চলাচল বা আর কিছু দেখতে পেলে কোস্টগার্ড বাহিনীকে অবিলম্বে জানানো হয় এ সম্পর্কে। তারাও সাথে সাথে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। তদুপরি, বাংলাদেশ নৌবাহিনী জাহাজের নিরাপত্তা সংক্রান্ত যেকোনো প্রয়োজনে দ্রæত এগিয়ে আসে। তারা বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকার ওপর আগে থেকেই কড়া নজর রাখেন।

অবশ্য দেশের সমুদ্রসীমার প্রসার এবং বন্দর এলাকা বৃদ্ধির পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জও বেড়েছে। দেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের আওতা উত্তরে মিরসরাই পর্যন্ত প্রসারিত। উল্লেখ্য, এ বন্দরের পূর্বতনসীমানা হতে অন্তত ২০ নটিক্যাল মাইল (জাহাজ ও নাবিকদের হিসাবে ১৮৫২ মিটার বা ৬০৮০ ফুটে ১ মাইল ধরা হয়) উত্তরে অবস্থিত, চট্টগ্রামের সর্ব উত্তর উপজেলা মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্প এলাকা গড়ে উঠছে যা এ ক্ষেত্রে দেশের বৃহত্তম। চট্টগ্রাম বন্দরের আওতায় এখন এর দক্ষিণ সীমার ৪০ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণের মহেশখালীও যা কক্সবাজার জেলায় পড়েছে এবং যেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে গভীর সমুদ্রবন্দর। অন্য দিকে, এ বন্দরের সিসিটিভির আওতাধীন করা হয়েছে উত্তরে ফৌজদারহাট এবং দক্ষিণে কুতুবদিয়া (কক্সবাজার জেলায়) পর্যন্ত। বন্দরের আওতায় আরো অনেক স্থানই আসছে ২০২২ সালেই।

সমুদ্র প্রতিরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত কোস্টগার্ডের বক্তব্য, তাদের পর্যাপ্ত টহল নৌকা রয়েছে যা সমুদ্র উপক‚লে কিংবা দেশের অভ্যন্তরীণ ভাগে চলতে সক্ষম। অর্থনীতির দিক থেকে অপরিহার্য, সমুদ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তাদের কয়েকটি দ্রুতগতির বোটও রয়েছে বলে জানা গেছে।

কয়েক বছর আগে সোমালিয়ার জলদস্যুরা সারা বিশ্বের জন্য মহাদুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর শিকার বারবার হয়েছেন বাংলাদেশী জাহাজ ও নাবিকরাও। এমনি এক ঘটনায় ইয়েমেনের বন্দর এডেনের অদূরে সোমালি দস্যুদের দ্বারা অপহৃত হয় আমার এক আত্মীয়, তরুণ নাবিক যাদের বাসা চাটগাঁও এবং বাড়ি ফেনীতে। তার মায়ের করুণ আকুতি পত্রিকায় উঠেছিল। পরে সাক্ষাৎকারও ছাপা হয়েছে মায়ের। অবশ্য এ তরুণ কিছু দিন পরে মুক্ত হয়েছে। অনেক নাবিক প্রাণ দিয়েছেন হয়তো। আমার সে আত্মীয়ের বেঁচে থাকার আশাও ছেড়ে দিয়েছিল তার পরিবার পরিজন। সে ফিরে এসে বলেছে, তাদের নির্যাতন করা হয়নি। বরং খেতেও দিয়েছে। হয়তো সে জলদস্যুদের টার্গেট ছিল প্রধানত নাবিকদের নগদ অর্থ ও জাহাজের মালসামান। সোমালিয়ার ভঙ্গুর অর্থনীতির দরুন সে দেশের অনেকে জলদস্যু হয়ে যায়, তবে বহু দেশের নাগরিকই এ পেশায় সম্পৃক্ত। এদের সবার বিরুদ্ধেই কঠোর অভিযান চালানো উচিত।


আরো সংবাদ


premium cement