২২ মে ২০২২
`

‘সচিবালয়ের পিয়ন পর্যন্ত আমাদের দাম দেয় না’ কেন?

-

এ বড় দুঃখের কথা! আওয়ামী লীগ থেকে আগত সংসদ সদস্য নাজিমুদ্দিন আহমদ গত ১৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে বড় অভিমান ভরে বলেছেন যে, ‘আপনারা এমপি হয়ে আসছেন, দেখেন আপনারা পার্লামেন্টে ... আপনাদের কী রকম করে? শুধু ‘স্যার’টাই বলে। এই ‘স্যার’টা না বলে পারে না। আমরা আমলাতন্ত্রের হাতে জিম্মি হয়ে গেছি। আমলাতন্ত্রের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমাদের সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। সংসদ সদস্যদের বলব, দয়া করে আমলাতন্ত্র থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আপনারা শক্ত হন। শক্ত না হলে তারা আমাদের গুরুত্ব দেবে না।’ গত সোমবার জাতীয় সংসদের রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

নাজিমুদ্দিন জাতীয় সংসদের বয়স্ক সদস্য। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সত্য কথা বলতে আমরা যদি সংসদে কথা বলি, তাহলে বিষয়টি বিরোধী দলের ফ্লোরের মতো হয়ে যায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কিন্তু আমরা ভুগছি। আমলারা যেভাবে কথা বলেন! একটা এমপির মূল্য নেই আমলাদের কাছে। জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে একজন সচিবের কাছে গেলে কোনো মূল্যায়ন নেই। তারা যে আমাদের শ্রদ্ধা করবেন, সে শ্রদ্ধাবোধ নেই। পিয়ন পর্যন্ত আজকে আমাদের দাম দেয় না। এই নাজিমুদ্দিন ময়মনসিংহ-৩ আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য।

কিছু দিন ধরে এ ধরনের আহাজারি আওয়ামী এমপিদের মুখে শোনা যাচ্ছে যদিও এ কথা সংবিধানে বলা আছে যে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। সুতরাং জনপ্রতিনিধিরাই তো রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর ব্যাপক ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নাজিমুদ্দিন আহমেদ আরো বলেছেন, ‘একজন এমপির মূল্যায়ন নেই। এমপি হিসেবে একজন সচিবের কাছে গেলে তারা যেভাবে শ্রদ্ধা করবেন, সেই শ্রদ্ধাবোধ নেই।’

এ কথা নতুন নয়, এর আগে গত বছর ২৮ জুন আওয়ামী লীগের সিনিয়র সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা সচিবদের ওপরে, এটা খেয়াল রাখতে হবে।’ ওই একই দিন জাতীয় সংসদে জাপার সাংসদ কাজী ফিরোজ রশিদ বলেছিলেন, ‘দেশ চালাচ্ছে কারা? দেশ চালাচ্ছেন জগৎশেঠরা। দেশ চালাচ্ছেন আমলা। আমরা রাজনীতিবিদেরা তৃতীয় লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। এই হচ্ছে আমাদের দুর্ভাগ্য। অথচ এই দেশ স্বাধীন করেছেন রাজনীতিবিদেরা।’

করোনার ত্রাণকার্যক্রম সমন্বয়ে ৬৪ জেলায় একজন করে সচিবকে দায়িত্ব দেয়ায় ক্ষোভ ঝেড়ে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রতিটি জেলার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সচিবদের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিসিদের সঙ্গে কথা বলেন। আর এমপি সাহেবেরা পাশাপাশি বসে থাকেন, দূরে। এরপর বলেন, ‘ডিসি সাহেব, আমি একটু কথা বলব প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে।’ এই হচ্ছে রাজনীতিবিদদের অবস্থা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডিসিদের সাথে যখন কথা বলছেন, তখন এমপিদের কোনো দাম থাকে না। এরও আগে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা তোফায়েল আহমেদ দুঃখ করে বলেছিলেন যে, রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। বহু আগেই রাজনীতিবিদদের হাত থেকে রাজনীতি সরিয়ে নিয়েছেন আওয়ামী লীগ দলীয় নেত্রী। এর জন্য তিনিই শুধু দায়ী নন। দায়ী গোটা রাজনৈতিক সমাজ।

এক সময় টেলিভিশনে ঘন ঘন টকশোতে অংশ নিতাম। মাঝে মধ্যেই সঙ্গী হতেন, আওয়ামী লীগের প্রয়াত সংসদ সদস্য ইস্রাফিল আলম। তার সাথে এক ধরনের বন্ধুত্বের সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। দেখা হলে, স্বাভাবিক সৌজন্যবোধ থেকে জিজ্ঞেস করতাম, কেমন আছেন, ভাই? বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় তিনি বলতেন, ‘কেমন যে আছি রেজোয়ান ভাই! ডিসি কথা শোনে না, এসপি কথা শোনে না, ওসি কথা শোনে না। বলে দেখিনি, তবে মনে হয়, কনস্টেবলও কথা শুনবে না। এর মধ্যে এমপিগিরি যে কী করে করি? কত কাজে এদের মধ্যে যেতে হয়! কিন্তু পদে পদে অপমান গিলে ফেলে হজম করতে হয়। এভাবে কী চলে, রেজোয়ান ভাই? অথচ ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী এমপি হিসেবে আমাদের অবস্থান তো সিনিয়র সচিবের উপরে। তার তো কর্তব্য আমাকে উপযুক্ত সম্মান দেয়া। সে সম্মান এখন আর নাই, রেজোয়ান ভাই।’ আমি তার সঙ্গে আর কথা বাড়াই না। ভেতরে ভেতরে অনুভব করি, কেন কোনো শ্রেণীর আমলা বা প্রশাসনিক কর্মকর্তা একজন জনপ্রতিনিধির কথা শোনেন না।

কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন জনপ্রতিনিধিরা এই মর্যাদা উপলব্ধি করতেন। তাদের যোগ্যতা ছিল। আত্মমর্যাদা ছিল। সামাজিক মর্যাদা ছিল। চোর-ছেঁচড়, ধর্ষণ মামলার আসামি জাতীয় সংসদে আসত না। যারা এমপি হতেন, তাদের ছিল সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে, যুবরাজনীতি হয়ে তারা একেকজন জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়ে আসতেন। ক্রমেই দিন বদলেছে। এখন অর্থবিত্তের জোরে, প্রভাবের জোরে খুনি, চোর, ডাকাত, লুটেরা জাতীয় সংসদে এমপি হওয়ার জন্য মনোনয়ন লাভ করে। ২০০৮ সালের পর যারা জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের কারো সলিড রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। যেমন ধরা যাক, সহিদুল ইসলাম পাপুল। তিনি কোনো আওয়ামী লীগ টাওয়ামী লীগ করতেন না। লক্ষ্মীপুরের যে আসন থেকে তিনি মনোনয়ন পেয়েছিলেন, সে আসনটি জাপাকে ছেড়ে দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু জাপার প্রার্থী পাপুলের অর্থের কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। আওয়ামী লীগ সেখানে কোনো প্রার্থী দেয়নি। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম কিসের যে বিনিময়ে এক সার্কুলার জারি করে দিলেন, যেহেতু ওই আসনে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থী নেই, অতএব আপনারা, আওয়ামী লীগাররা পাপুলকে ভোট দিন। সে পাপুল জাতীয় সংসদের নির্বাচিত হয়েছিলেন। এমনকি অর্থের বিনিময়ে তিনি তার স্ত্রীকেও সংসদ সদস্য করেছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন এক বিরাট প্রতারক- আদম ও অর্থপাচারকারী। কুয়েতে হাজার হাজার লোক অবৈধভাবে পাচার করে এখন সেখানে সাত বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। সাথে ৫০ লাখ দিনার জরিমানা।

তার সংসদ সদস্যপদ গেছে। কিন্তু, কী ইজ্জত তিনি বয়ে এনেছেন বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের জন্য? সরকারের তরফ থেকে এ জন্য কাউকে প্রশ্ন করা হয়েছে বলে শোনা যায়নি। এইচ টি ইমামকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। জাতীয় সংসদে এ রকম আরো বহু পাপুল রয়েছেন যাদের কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। যারা অবিরাম অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলতে পছন্দ করেন। যারা সরকারি কর্মকর্তাদের গায়ে হাত তুলতেও কসুর করেন না।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কেন এমন অবস্থার সৃষ্টি হলো যে, আমলাতন্ত্র রাজনীতিবিদদের দাম দেয় না। কারণ, আপনারা রাজনীতিবিদরা আমলাতন্ত্রের কৃপায় এমপি হয়েছেন। কিংবা উপজেলা চেয়ারম্যান। কিংবা মেয়র। কিংবা ইউপি চেয়ারম্যান। আমলারা মধ্যরাতে নির্বাচন করে ছয় কে নয় করে আপনাদেরকে এমপি বানিয়েছেন। তখন কিন্তু আপনারা আমলাদের অনেক তোয়াজ করেছেন। এখন আমলারা কেন আপনাদের তোয়াজ করবে? ফলে তারা নির্দেশের অঙ্গুলি তুলছে। সচিব মনে করছে, ‘আমি এমপি বানিয়েছি বলেই আপনি এমপি। অতএব আমি যা বলি, আপনাকে সেগুলো মানতে হবে।’ সচিবের পিয়ন মনে করছে, ‘আমি আপনার ভুয়া ব্যালট বাক্স বয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। অতএব আপনাকে এমপি হওয়ায় আমি অবদান রেখেছি। আমি আপনাকে মান্য করব কেন? আপনি আমাকে মান্য করবেন।’ দাবি খালি করলেই তো হলো না। সে দাবির যৌক্তিকতা তো থাকতে হবে!

গত দু’টি সংসদ নির্বাচনে একজন এমপিও দাবি করতে পারবেন না যে, তিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। বরং আমলাতন্ত্র আপনাদের জিতিয়ে দিয়েছে। ফলে ত্রাণ সমন্বয়ের কাজ এমপিদের কাছ থেকে আমলাদের হাতে চলে গেছে। প্রধানমন্ত্রী সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। আমলারাই তার সব, এমপিরা নন। ফলে আমলারা বসছেন এমপিদের ঘাড়ের ওপরে। জনপ্রতিনিধিদের শাসন এখন সুদূর পরাহত। এমনকি স্থানীয় সরকার পর্যায়ে আইন করা হয়েছে যে, মেয়াদ শেষ হলে স্থানীয় সরকারের কোনো তথাকথিত নির্বাচিত প্রতিনিধি পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না। সরকার তার জায়গায় একজন আমলাকে প্রশাসক বানিয়ে দেবে। অর্থাৎ শাসনকার্যের কোনো পর্যায়েই আর জনগণের প্রতিনিধিত্ব থাকবে না। এর চাইতে ‘সুন্দর গণতন্ত্র’ সারা পৃথিবীতে কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই।

ফলে, এমপি সাহেব, ডিসি সাহেব প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলবেন। আপনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য ডিসি সাহেবের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করবেন। এতে কি আপনাদের কিছু শিক্ষা হচ্ছে? আপনারা নিজেদের স্বার্থেই আমলাতন্ত্রের ঘাড়ে বসে নয়, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসুন। সচিব সাহেবরা হয়তো ভয়ে আপনাদের ডাকবেন।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com


আরো সংবাদ


premium cement