১৯ মে ২০২২, ০৫ জৈষ্ঠ ১৪২৯, ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩
`

কোভিড : উন্নয়ন বনাম মানুষের উপলব্ধি

কোভিড : উন্নয়ন বনাম মানুষের উপলব্ধি - ছবি : সংগৃহীত

বহুরূপী ও প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ সম্পর্কে এর প্রাদুর্ভাবকালেই বিশ্বের বিশিষ্ট চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এমন সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন- ‘এই মহামারী খুব সহসা বিশ্ব থেকে বিদায় হবে না।’ ২০২০ সালে কোভিডের সূচনাকালে এ কথা বলা হয়েছিল। এখন ২০২২; কোভিডের প্রচণ্ডতা হ্রাস পায়নি; বরং এই অতিমারী এখন ক্রমেই আরো প্রচণ্ডতা নিয়ে বেড়ে চলেছে, তা যেন বিশ্ব সভ্যতাকে পর্যন্ত হুমকির মুখোমুখি করে চলেছে। এই কোভিড এখন শুধু কোনো একক দেশের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক সঙ্কট। অতিসম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম-ভিত্তিক ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সির (ইএমএ) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, করোনা মহামারী কবে শেষ হবে তা আমরা কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না।

গোটা ইউরোপ, আমেরিকা, চীন, ভারত, বাংলাদেশসহ বহু দেশে কোভিড-১৯-এর প্রচণ্ডতা আবার তীব্রভাবে দেখা দিচ্ছে। এই বালাই দ্রুত বিশ্বের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। কোনোভাবেই একে প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। মানুষের অহংবোধ ছিল, তারা সব জয় করে ফেলতে পারে। এখন বোঝা যাচ্ছে, মানুষের দম্ভ কতটা ফাঁপা, মানুষ প্রকৃতপক্ষে কত যে অসহায় তার প্রমাণ হয়ে গেছে। সন্দেহ নেই মানুষ এই বালা থেকে রেহাই পাওয়ার টিকা অতি অল্পসময়ে বের করা হয়েছে। কিন্তু কোভিড মুহূর্তেই তার রূপ পাল্টে টিকার জাল ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলছে। বিশ্বে প্রথম কোভিডের ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর গত বছর পর্যন্ত ভাইরাসটি প্রায় ১২ হাজার ৭০০ বার তার রূপ বদল করেছে। প্রতিনিয়ত কোভিড-১৯-এর ভাইরাস তার চরিত্র পরিবর্তন করে আগ্রাসী রূপ ধারণ করে চলেছে। এদের বেশির ভাগ ধরন এতটা গুরুতর না হলেও কয়েকটি ধরন খুবই মারাত্মক। তার মধ্যে ইউকে স্ট্রেইন মারাত্মক একটি ধরন, যা এরই মধ্যে বাংলাদেশে শনাক্ত হয়েছে। দেশে এখন প্রতিদিন হাই জাম্প দেয়ার মতো করে বাড়ছে কোভিডে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু। ভাইরাসের ধরন পরিবর্তন হলেও ভাইরাসটির সংক্রমণের পদ্ধতি কিন্তু পরিবর্তন হয়নি। সে কারণে কোনো অবস্থায় ভাইরাস প্রতিরোধ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে এতটুকু শিথিলতা দেখানো যাবে না। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করছেন। ভবিষ্যতে এই ভাইরাস কিরূপ ধারণ করে, তা স্রষ্টা ভিন্ন কেউ বলতে পারবে না। বাংলাদেশের সরকারি কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টায় খুব একটা ত্রুটি করছেন বলা যাবে না; কিন্তু সাধারণের কাছ থেকে এ ক্ষেত্রে খুব একটি সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না, পরে এ নিয়ে কথা বলা যাবে।

সরকার তথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১১ দফা সতকর্তামূলক এক নির্দেশিকা জারি করেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন এই নির্দেশিকাকে গুরুত্ব দেয়ার ক্ষেত্রে যদি হেলা করা হয়, তবে পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাবে না। কিন্তু প্রতিদিন পত্রিকায় যে সচিত্র খবর প্রকাশিত হচ্ছে, সেখানে কিন্তু মানুষের ‘কমন সেন্সের’ খুব পরিচয় মিলছে না। মানুষ তার নিজের ও তার স্বজনদের বিপদ নিয়ে চিন্তিত নয়; যে হুঁশিয়ারি সরকারের পক্ষ থেকে ও বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আসছে, তা নিয়ে মানুষের গা ছাড়া ভাব।

দেশে এখন কোভিডের প্রকোপ আবারো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা ওপরে বলা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ এই বালা প্রায় নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল। সরকার দ্রুত কোভিডের টিকা দেয়াসহ নানা ‘মেজারস’ বা ব্যবস্থা নেয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কোভিড প্রায় নিঃশেষ হতে চলেছিল। কিন্তু আবার তা ব্যাপকভাবে ছড়াতে থাকলে এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে কোভিড ভয়াবহ রূপ নেয়ার পরপরই বাংলাদেশের কোভিড পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি ঘটছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, কোভিডের নতুন ধরন ‘ওমিক্রন’ এত বেশি সংক্রামক যে, তা গোটা বিশ্বেই বিদ্যুৎ বেগে ছুটছে। বাংলাদেশেও ‘ওমিক্রন’ ঢুকে পড়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে, পারে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ৬০০ বারের বেশি কোভিড তার জিন পাল্টেছে। দেশের কতজন কোভিডে আক্রান্ত হয়েছে এবং কতজন মৃত্যুবরণ করেছে তার সঠিক অঙ্কটি বলা দুষ্কর। আমাদের নানা ‘শর্টকামিং’ এর মধ্যে এটাও একটি যে, আমাদের পরিসংখ্যান সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে নানা দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আক্রান্ত, মৃত্যু ও সুস্থ হয়ে ওঠার সঠিক তথ্য বা সংখ্যা আমাদের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে কোনো রেকর্ড রাখা যাচ্ছে না। কোভিডের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায়, তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুমানভিত্তিক সব তথ্য। যাই হোক যে তথ্য এখন পাওয়া যায় তার ওপর ভিত্তি করে চলতে হবে। সেই তথ্য অনুসারে এ পর্যন্ত এক কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার ৩০১ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১৬ লাখ এক হাজার ৩০৫ জন আক্রান্ত হয়েছে। অবশ্য এসব হালনাগাদ তথ্য নয়। মৃত্যুবরণ করেছে ২৮ হাজার ১১১। এ লেখা যখন প্রকাশিত হবে তখন সব সংখ্যাই বেড়ে যাবে। করোনা সংক্রমণের ৮০ ভাগের বেশি ঢাকাতেই। গতকাল (১৪ জানুয়ারি) ঢাকায় করোনা সংক্রমণের হার ছিল ৮১.৫০ শতাংশ।’ নির্দ্বিধায় স্বীকার করতে হবে, কোভিড নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানের আন্তরিকতা ষোলোআনা থাকার পাশাপাশি সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেয়া দ্রুততার সাথেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ-ও সত্য প্রথমাবস্থায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনেক দুর্বলতা দেখা গেলেও তা পরে কাটিয়ে ওঠা গেছে। সেই সাথে এ কথাও স্মরণ করতে হবে কোভিড যুদ্ধে অগ্রসৈনিক দেশের চিকিৎসক, সেবিকাদের নিবেদিত ভূমিকার কথা। সার্বিক পর্যবেক্ষণে এটি বলা যায় বিশ্বে আমাদের সমকাতারে অবস্থান করছে- এমন সব দেশের চেয়ে কোভিড মোকাবেলায় বাংলাদেশ অবশ্যই সম্মুখ ভাগেই রয়েছে। তবে এটি স্বীকার করার পরও বলতে চাই এটি নিয়ে সন্তুষ্টিতে ভোগা যেন না হয়। অন্যান্য ক্ষেত্রসহ স্বাস্থ্য খাতে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। তবে পথটা সঠিক হতে হবে, ভুল পথে খরগোশের মতো দ্রুতগতিতে চলার চেয়ে সঠিক পথে কচ্ছপের মতো ধীরগতিতে চলাও উত্তম। আমাদের নিজেদের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে হবে, বাইরের দিকে তাকাব শুধু ভালোটা জানা বোঝার জন্য, সে পথে চলার জন্য। আমাদের অভিধান থেকে অসম্ভব, অক্ষমতা, আলস্য, শুধু ছিদ্রান্বেষণ করা দূর করতে হবে। মনমস্তিষ্কে সর্বদা জাগরুক রাখতে হবে সময়ের এক ফোঁড় আর অসময়ে দশ ফোঁড়, সুযোগ বারবার আসে না, একের বোঝা দশের লাঠি। গত ৫০ বছরেও স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের খুব বেশি কোনো কাজ হয়নি। সংবিধানে মানুষের যে পাঁচটি মৌলিক চাহিদা পূরণের গুরুত্ব রাষ্ট্রের ওপর তথা সরকারের ওপর দেয়া হয়েছে তার মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নিরোগ দেহে দীর্ঘ জীবন লাভ করতে সবাই তো চায়। মানুষের মনোবাঞ্ছনা পূরণ করতে হলে সুচিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে। দেশে সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা চাহিদা চেয়ে অনেক কম। সরকারি হাসপাতালগুলোতে চাহিদার চেয়ে শয্যার সংখ্যা এতটাই কম যে, রোগীর সুচিকিৎসা দেয়া বহু ক্ষেত্রেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। বিত্তশালীদের পক্ষেই কেবল বেসরকারি চিকিৎসালয়ে যাওয়া সম্ভব। এ ক্ষেত্রে প্রশাসনকে আরো গণমুখী আয়োজন নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

দেশে চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে এক কথায় বলতে গেলে, পরিস্থিতি নাজুকই বলতে হবে। বিষয়টি এভাবে চলতে দেয়া যাবে না। আমাদের যতটুকু সাধ্য সামর্থ্য রয়েছে তার সবটুকু কোনো অপচয়, অপব্যয় যেন না হয় বা কোনো চোরাই পথে কোনো একটি কানাকড়ি যাতে বেরিয়ে যেতে না পারে। তার জন্য দায়িত্বশীলদের সজাগ সতর্কতা হওয়ার পাশাপাশি সততার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

আরেকটি কথা এখানে উল্লেখ করা খুবই প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি রাজধানীতে নবনির্মিত ‘জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কমপ্লেক্স’ উদ্বোধনকালে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি গবেষণালব্ধ জ্ঞান আর্থসামাজিক উন্নয়নের কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আসলে আজকে প্রযুক্তির কথা অনুক্ষণ চেতনায় লালন করা নিয়ে কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশেষ করে এখন কোভিডের এই ক্রান্তিকালে যতটা পারা যায় তা নিয়ে গবেষণা অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে যদি না পারা যায়, হালনাগাদ থাকতে চেষ্টা না করা হয় জনগণের সাথে তবে প্রতারণা করা হবে। গত বছর কোভিড যখন কিছুটা স্তিমিত হয়েছিল, তখন বিশ্বের উন্নত সাত জাতির সম্মেলনে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তখন তারা এ মর্মেও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আগামীতে কোভিডের অনুরূপ যদি কোনো দুর্যোগ মহামারী তাদের দেশগুলোতে দেখা দেয়, তবে তা যেন ১০০ দিনের মধ্যেই যায় এখন থেকেই সে জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রাখতে হবে। আমরা হয়তো এত দ্রুত এতটা এগিয়ে যাওয়ার কথা ভাবতে পারব না; কিন্তু পিছিয়ে পড়ার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়াও যাবে না। আজকে সব কিছু সমন্বয় করা একান্ত জরুরি।

গবেষণা অনুসন্ধানের কাজ নিয়ে আমরা এত যে পিছিয়ে আছি, তা বলাবাহুল্য। কিছুকাল আগে এই কলামে একটি জাতীয় দৈনিকের একটি খবর উদ্ধৃত করেছিলাম। তাতে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য অর্থ ব্যয়ের মারাত্মক হতাশাজনক চিত্র এসেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য যে যৎসামান্য অর্থ বরাদ্দ দেয়া হতো তা এখন আরো কমিয়ে দেয়া হয়েছে, আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দই নেই। তাই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাধারণ পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণা উদ্ভাবন নিয়ে আসলে কিছুই করা হচ্ছে না। অথচ দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বহু মেধাবী শিক্ষক রয়েছেন, যারা গবেষণা করে অনেক ক্ষেত্রে জাতির জন্য অবদান রাখতে পারতেন। কিছু কিছু শিক্ষক রয়েছেন যারা স্বপ্রণোদিত হয়ে বৈদেশিক সহায়তায় কিছু কাজ করছেন বটে।

এ প্রসঙ্গে একটি কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এই কোভিডকালে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বহু বিশ্ববিদ্যালয় কোভিডের টিকা উদ্ভাবনসহ কোভিডের অন্যান্য বিষয় নিয়ে নিরন্তর গবেষণা অনুসন্ধান চালিয়ে তাদের দেশের মানুষের কল্যাণে তো বটেই, বিশ্ববাসীর জন্য সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। স্রষ্টা মানুষকে যে জ্ঞানগরিমা তো এ জন্য দিয়েছেন, যাতে তারা মানবকল্যাণের কাজ করতে পারে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বহু স্থানে গবেষণা করতে মানুষকে উৎসাহ-উদ্দীপনা দিয়েছেন। এ কাজে ব্রতী হওয়া গেলে নিশ্চিত, স্রষ্টার করুণা বর্ষিত হবে। স্রষ্টা আরো বলেছেন, যে জাতি নিজেদের ভাগ্য বদলে চেষ্টা করে না, তাদের তিনিও সাহায্য করেন না। বিদেশে শুধু চিকিৎসার ক্ষেত্রেই নয়, মানুষের প্রয়োজনের নিরিখে সব ধরনের গবেষণা অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে এবং নতুন নতুন বিষয়ে উদ্ভাবন ঘটছে।

কোভিডের টিকা নেয়া জরুরি বটে, তার পর বুস্টার ডোজ নেয়া, আবার ৬-৭ মাস পর ফের ডোজ নেয়া, কিন্তু তার পর কী হবে? এভাবে টিকা নিতে থাকলে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বলতে কিছু কি থাকবে? এটি আমাদের মতো সাধারণের সঠিক উত্তরটা জানা নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের জানার কথা। তবে মনে হয়, এমনটি বাস্তবসম্মত হয়তো নয়, এর পেছনে অনেক কারণই রয়েছে। তার মধ্যে অন্য সমস্যার কথাও ভাবতে হবে।

শুধু টিকার পেছনে দৌড়ানো বাস্তবতার নিরিখে কতটা যৌক্তিক? দেশের প্রায় ১৭ কোটি মানুষ তাদের কতবার টিকা দেয়ার জন্য আমাদের দেশের সঙ্গতি আছে? আরো তো অনেক বিষয় রয়েছে। সেটিও তো ভাবতে হবে। ১৭ কোটি মানুষের পুষ্টির বিষয়টি কোভিডের নিরিখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যদি মানুষকে ন্যূনতম পুষ্টি জোগান দেয়া সম্ভব না হয় অর্থাৎ দুবেলা দুমুঠো ভাতের জোগান দেয়া না যায় তবে মানুষ হীন দুর্বল হতে থাকবে, তাতে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকবে না। তাই আমাদের জীবনশৈলীর দিকে নজর দিতে হবে। স্বাস্থ্যবিধিসহ বিভিন্ন সময় যে দিকনির্দেশনা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আসে সেটি যতটা সম্ভব দ্রুত বিবেচনায় নিতে হবে। লক্ষ করা গেছে, দেশের মানুষ বহু ক্ষেত্রে ন্যূনতম সতর্কতাও মানছে না। সাহস অবশ্যই সৎ গুণ কিন্তু দুঃসাহস মূর্খতার পরিচায়ক, সেটি নিজের ও আরো ১০ জনের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এখানে প্রশ্নটা কিন্তু জীবন মরণের সাথে সম্পর্কিত। তাকে উপেক্ষা করার অবকাশটা কোথায়? বক্ষ্যমাণ নিবন্ধের সূচনায় বলেছি, এখনো বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত বলতে পারছেন না কোভিডের এই বালা কবে শেষ হবে। যদি এই বালা নিয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয় তবে তার প্রস্তুতি হচ্ছে শৃঙ্খলাবোধ বিবেচনা আর বিজ্ঞজনের নির্দেশনা কান পেতে শোনা প্রভৃতি। তবে প্রশাসন কি ভাবছে আমাদের জাতীয় চরিত্র নিয়ে? কী করলে কতটুকু ফল পাওয়া যাবে, সেটি নির্ণয়ের জন্য চেষ্টা সাধনা করা উচিত। তবে এটি মনে করছি না যে, জনসচেতনতার লক্ষ্যে কিছুই হচ্ছে না। তবে এটি বলতে চাই আরো কার্যকারিতা নিয়ে আমাদের বক্তব্য। এ ক্ষেত্রে প্রচার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া যেতে পারে। এ নিয়ে হেলা করা চলবে না।

কোভিড চিকিৎসার ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে চিকিৎসক, চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সাজসরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। এর আগে কোভিড যখন ‘পিক’ এ উঠেছিল, তখন আমরা দেখেছি মানুষের কী মারাত্মক ভোগান্তি আর বেদনা। এটি সামনে রেখে যদি বিবেচনা করি ছোট শহরে, উপজেলা, গ্রামগঞ্জের হালটা কত শোচনীয়? সেখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের কত স্বল্পতা, সেবক-সেবিকাদের পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো অবস্থাই থাকে না। তার পর ডাক্তার, সেবক-সেবিকাদের জীবন তো একটি, তার জন্যও তাদের মায়া মমতা তো থাকবেই, কতটা ঝুঁকি তারা নেবেন? সেখানে তাদের সুরক্ষার সরঞ্জাম তো ছিল না। ওষুধপত্র চিকিৎসার উপায় উপকরণের দুষ্প্রাপ্যতা তাদের রোগীর সম্মুখে অসহায় করে তুলেছিল। এটি তো মনে রাখতে হবে, সেসব অঞ্চলেই কিন্তু দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস। তাদেরও বাঁচার অধিকার কারো চেয়ে কম নয়। এসব নিয়ে প্রশাসনকে ভাবতে হবে। কোভিড যখন কমে গিয়েছিল, তখন তো সময় পাওয়া গিয়েছিল। সে সময়টার সদ্ব্যবহার কী করা হয়েছে? নাকি এমন বার্তা তাদের কাছে ছিল, এই বালা আর ফিরবে না! যাক সে কথা তখন চিকিৎসক সেবক-সেবিকাদের সর্বোত্তম চিকিৎসা ও সেবা দেয়া নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেত না কি? চিকিৎসার সরঞ্জামের সাথে চিকিৎসক সেবিকাদের সুরক্ষার ঘাটতি পূরণের চেষ্টা কি হয়েছে?

আমাদের এটি জানা, কোভিড আমাদের অর্থনীতি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কী মারাত্মক ক্ষতি করে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বহু স্বপ্ন ভাঙচুর করে দিয়ে গেছে। বহু মানুষকে হতদরিদ্র করে দিয়েছে, মধ্যবিত্ত সমাজ এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এ দিকে ১৩ জানুয়ারি নয়া দিগন্ত-এর প্রকাশিত এক খবরে প্রকাশ করোনার ‘তৃতীয় ঢেউ’ শুরু হয়েছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে করোনার সংক্রমণ বেড়েছে ১৬৯ শতাংশ। সংক্রমণের এ পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে দেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে আগামী দুই মাসের মধ্যে ইউরোপের অর্ধেক মানুষ করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ‘ওমিক্রনে’ সংক্রমিত হবে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বিশেষ করে রফতানি আয় আবারো কমে যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সাথে ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন এবিবি নেতারা সৌজন্য সাক্ষাতে দেশে সমসাময়িক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও পর্যালোচনা করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও এবিবি সূত্র জানিয়েছে, গভর্নরের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে ব্যাংকাররা সমস্যার নানা দিক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, এরই মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। চলতি হিসাবের ভারসাম্যসহ সামগ্রিক হিসাবের ভারসাম্য ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। কিন্তু আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রায় প্রতিটি ব্যাংকেরই ডলার সঙ্কট দেখা দিয়েছে। একই দিনে নয়া দিগন্ত-এর শীর্ষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, করোনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর টানা ৫ম দিনে তা দ্বিগুণ হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকাল থেকে গত বুধবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে পরীক্ষার বিপরীতে করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি, বিশেষ করে দেশের গ্রামগঞ্জের মানুষ ভালো আছেন এমন চিন্তা করা কিন্তু খুব একটি যৌক্তিক হবে না। ঢাকায় তথ্য-উপাত্ত পাওয়ার যতটা সুব্যবস্থা রয়েছে বাইরে তেমনটি ভাবাই যায় না। তাই গ্রামগঞ্জের লোক ভালো আছেন, এটি অলীক। তা নিয়ে কী চিন্তাভাবনা সরকারি মহলে হচ্ছে?

গোটা বিশ্ব এটি সন্দেহ করে, কোভিড চীন থেকে ছড়িয়েছে। সে দেশের উহান প্রদেশের একটি বাজার থেকে এই ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে। সে বাজারের বন্যপ্রাণীর গোশতের দোকান থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার কথা বহুল প্রচারিত। চীনা নাগরিকরা হেন বন্যপ্রাণী, পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ নেই যা খায় না। বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন, বন্যপ্রাণীর শরীরে অজানা মারাত্মক সব ভাইরাস থাকার সম্ভাবনা শতভাগ। তাই সেই বাজারে কোনো প্রাণীর শরীরে কোভিডের ভাইরাস হয়তো ছিল, তা থেকেই এই মহামারী বিশ্বে ছড়িয়েছে। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার। বিশ্বে সবাই নির্বিচারে বন নিধন করছে। ফলে বন্যপ্রাণী বাধ্য হয়ে লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এ থেকেও নানা ধরনের ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। পরিবেশবিদরা ও বিশেষজ্ঞরা বন নিধন মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে বলে বহুবার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এবার কপ-২৬ সম্মেলনে এই মর্মে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে বন-বনানী নিধন বন্ধ করতে হবে। বিশ্বের শতাধিক দেশ সে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। নিঃসন্দেহে এটি কপ-২৬ এর একটি বড় সাফল্য। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, বাংলাদেশ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। এমন অনীহার নানা ব্যাখ্যা হতে পারে। আমরা সাধারণ মানুষ এরই মধ্যে লক্ষ করেছি, বনে বিচরণ করা হয়তো আর নিরাপদ নয় বলে অথবা খাদ্যের অভাবে বন্যহাতির দল লোকালয়ে প্রবেশ করছে, যা অভূতপূর্ব এবং মারাও গেছে কিছু হাতি। সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় এমন বহু ছবি দেখেছি, বিভিন্ন ধরনের জন্তু-জানোয়ার লোকালয়ে হাজির হচ্ছে। জানি না বন কর্তৃপক্ষ এসবের কী ব্যাখ্যা দেবে। এটি পরিষ্কার, আমরা বন নিধন বন্ধের পক্ষে। কারণ বন-বনানী প্রকৃতির সৌন্দর্য, পৃথিবী তো কেবল মানুষের বসবাসের জন্য নয়, স্রষ্টা বহু ধরনের জন্তু-জানোয়ার সৃষ্টি করেছেন, এসবের বাসস্থান নিধনের অধিকার কে আমাদের দিয়েছে? এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের মালিক কি আমরা? পৃথিবী মহাকাশ কি মানুষ সৃষ্টি করেছে? তবে তার যে শৃঙ্খলা সেটি কেন আমরা ধ্বংস করছি? পৃথিবীর সুন্দর দেশগুলো বনকে শুধু সংরক্ষিত করছে, তা কেবল নয়। শহরগুলোর সৌন্দর্য বর্ধন এবং মানুষের বিনোদন ও নির্মল বায়ু সেবনের জন্য নগর মাঝে ছোট ছোট গ্রিনস্পট, তথা পার্ক তৈরি করে রেখেছে। এসব গ্রিনস্পট নগরীর আবহাওয়া নির্মল রাখতে বিরাট অবদান রাখছে। ঢাকায় সবেধন নীলমণি রমনা পার্ক গোটা রমনা এলাকার আবহাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের জন্য ঢাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। বায়ুদূষণের দিকে বিবেচনা করলে যে তথ্য আমরা পাই, সেটি হলো ঢাকা বায়ুদূষণের দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষ কয়েকটি শহরের মধ্যে অন্যতম। ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে আমাদের অনুরোধ, আপনারা এই সংস্থা থেকে বেতনভাতাসহ নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন; প্রশ্ন হলো বিনিময়ে শহরটাকে সবুজায়নে এ পর্যন্ত কী করেছেন? নিশ্চয়ই আপনারা জানেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনকে ‘গার্ডেন সিটি’ বলা হয়। আপনারা কি ঢাকার সবুজায়নে কখনো কোনো ব্যবস্থা নিয়েছেন? আসলে এটি চরম গ্লানিকর তো বটেই। কোভিডের বিবেচনায়ও এটি দাবি রাখে, একটি নির্মল পরিবেশ। শুধু কোভিড নয়, যে রোগ বালাইয়ের জন্য ঢাকার পরিবেশ নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে।

অন্য দিকে আমরা বন নিধনবিষয়ক একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরতে চাই। একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা, ইতিবাচক জলবায়ুর জন্য, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং পাখির নীড় রচনার জন্য একটি দেশের সমতল এলাকার অন্তত ২৫ শতাংশ অঞ্চল বনের জন্য সংরক্ষণ করা অত্যাবশ্যক। সে দিক থেকে আমাদের দেশে বনভূমির পরিমাণ মাত্র ১৭ শতাংশের মতো। তার পরও আমরা বেখেয়ালি। তার প্রমাণ কপ-২৬-এর বন নিধন বন্ধ করার চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা। দেশে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে বৃক্ষরোপণ সপ্তাই পালন করা হয়। সে সময় বিপুল অর্থ ব্যয় করে প্রচুর গাছ বোনা হয়। কিন্তু তার পর সেসব গাছের পরবর্তী অধ্যায় সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। দীর্ঘকাল থেকে যে লাখ লাখ চারা বোনা হয়, তার যদি যথাযথ পরিচর্যা হতো তবে দেশটি একটি সবুজ ভূখণ্ডে পরিণত হতো। আজ আমাদের আবহাওয়ার যে বৈরীপনা তার সমাপ্তি ঘটতে পারত। দেশের মানুষ অনাবিল আর কোমল স্নিগ্ধ পরিবেশের মধ্যে বসবাস করতে পারত। মানুষ হিসেবে বাঙালি কোমল প্রাণের অধিকারী কিন্তু বন-বনানীর প্রতি এখন কেন এত বৈরী, তা বুঝে উঠতে পারি না। মেনে নিলাম, যারা বন নিধনের সাথে জড়িত পরিবেশের ‘প’ পর্যন্ত তারা বুঝে না, তাদের কাছে অর্থটাই বেশি গুরুত্বের। সে ক্ষেত্রে দুটো প্রশ্ন জাগে, তারা কি বেআইনিভাবে বৃক্ষ নিধন করছে? যদি তাই হয়, তবে কি দেশের আইনকানুন সব শিকায় উঠেছে? সব কিছুই কি এখন ফ্রি স্টাইলভাবেই চলছে? যদি তা না হয়ে অনুমতিসাপেক্ষে বৃক্ষ নিধন করা হচ্ছে। তবে মারাত্মক পরিবেশ বিধ্বংসী সিদ্ধান্ত দানকারী পামর পাষণ্ডদের রোখার কি কেউ নেই?

আমরা দেশের উন্নয়ন নিয়ে অনেক কথা শুনি! কিন্তু একটি প্রশ্ন এ বিষয়ে মনে বারবার জাগে তা হলো ব্যক্তিগতভাবে মানুষের আয় রোজগার ক্রমেই কমছে। মানুষের জীবনমান হ্রাস পাচ্ছে। অথচ উন্নয়ন কি ব্যক্তির জীবনকে স্পর্শ করবে। কিন্তু সেটি কোথায়? উন্নয়ন বলতে একটি সামগ্রিকতাকেই তো বোঝায়। শুধু বালু পাথরে কিছু স্থাপনাকেই যদি উন্নয়ন বলতে হয়, তবে উন্নয়নের সংজ্ঞাই তো পাল্টাতে হবে। এ দিকে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রীয় অত্যাবশ্যকীয় সেবা পেতে জনগণকে অতিরিক্ত পয়সা গুনতে হচ্ছে। উন্নয়নের ধারণা বলতে তো মূলত একটি সামগ্রিকতাকেই বোঝায়, মানুষের জীবনমান, সুলভে রাষ্ট্রীয় সেবা লাভ, মানুষের শ্রমের যৌক্তিক মূল্য পাওয়া, ব্যক্তি, সমাজের নিরাপত্তা, জনগণের বসবাসের জন্য দূষণমুক্ত নির্মল পরিবেশ, সৌন্দর্য, শুভবোধ লালনের জন্য স্বস্তি শান্তি, শিক্ষার অধিকার অবারিত উন্মুক্ত থাকা, গণতন্ত্র মানবিকতা, নারীর মর্যাদা, শিশুদের ভালোবাসা, সব বৈষম্যের অবসান। এসব অপূর্ণ থাকলে তো উন্নয়নের যত কথাই হোক তা অপূর্ণাঙ্গ থাকবে। উপরের সব কথা প্রাসঙ্গিকভাবে বলা হলো। কোভিডের কথা বক্ষ্যমাণ নিবন্ধের মূল চেতনার বিপরীত নয়। কোভিড নিয়ে আলোচনাকে আমরা ব্যাহত করতে চাই না। উপরের কথাগুলো তো তারই সম্পূরক। উন্নয়নের সাথে মানুষের চিকিৎসা লাভের অধিকার বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। আর স্বাস্থ্যের যত নেপথ্যের কাহিনী, তা বর্ণনা করলে তো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য খুব উপাদেয় হবে না। অগত্যা সবাইকে এটিই মনে রাখা দরকার, একটি ইংরেজি ফ্রেজের কথা ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দেন কিউর’। দেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই পথটার অনুসরণ শ্রেয়।

ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞরা অতিসম্প্রতি কিছু আশার কথা শোনাচ্ছেন, কোভিড ভাইরাসের ‘ওমিক্রন’ ধরনটি যেভাবে ছড়াচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে করোনা মহামারী শেষ হতে আর হয়তো বেশি সময় লাগবে না। এমন খবর আমরা পাঠ করেছি যে, ইউরোপীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি (ইএমএ) সম্প্রতি এ বক্তব্য দেয়। তবে কোভিড এখনো মহামারীরূপেই রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে সংস্থাটি। সাধারণ মানুষকে বারবার বলা হচ্ছে বুস্টার ডোজ নেয়ার কথা। কিন্তু মহামারী নিয়ন্ত্রণে তা কোনো টেকসই কৌশল নয় বলেও মনে করে ইএমএ।

নেদারল্যান্ডসের আইমস্টারডামভিত্তিক সংস্থাটির টিকা কৌশল বিভাগের প্রধান মারকো ক্যাভালরি মনে করেন, করোনা কবে শেষ হবে, তা আমরা কেউই সঠিকভাবে বলতে পারব না। তবে এর শেষ হওয়াটা বোধহয় আমরা দেখতে পাবো। এরই মধ্যে মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছু বৃদ্ধি এবং ওমিক্রন সংক্রমণের কারণে প্রচুর প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে। এখন মনে করা যেতে পারে, করোনা শেষ দিকে ধাবিত হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতির বহুল প্রচলিত একটি কথা উল্লেখ করে লেখা শেষ করতে চাই। সে কথাটি হচ্ছে- ‘ডেফেসিং রিটার্ন’। কোনো শস্য বা অন্য কোনো প্রডাক্ট উপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার পর তা আবার ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কোভিড আর কোন চূড়ায় উঠবে? এখন তার প্রকোপ তো কমাই স্বাভাবিক। কোভিড প্রকৃতপক্ষে কতগুলো বিষয়ে আমাদের চেতনাকে ঝালাই করে দিয়ে গেল- তা হলো বিশ্বকে আমরা এখন গ্লোবাল ভিলেজ বলে অভিহিত করে থাকি। কোনো গ্রামের এক মাথায় কোনো সংক্রামক রোগ দেখা দিলে তা গোটা গ্রামকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। কোভিড তেমনি পৃথিবীর দুই শতাধিক দেশে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, ভূপেন হাজারিকার একটি গান- ‘মানুষের মানুষের জন্য’। সেটিও কম বেশি দেখা গেছে। বিশ্বের ধনী ও কোভিডের টিকা উদ্ভাবনকারী দেশ অনেক টিকাই দরিদ্র দেশগুলোকে দান করেছে। এই সহমর্মিতা অবশ্য প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।

ndigantababor@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement