০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯, ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪ হিজরি
`

কাওয়ালি সংস্কৃতির এক পবিত্র নদী


১৯৯৮ সালে মোটামুটি তরুণই ছিলাম। পথেঘাটে নব্য তরুণ-তরুণীরা চাচা বা আঙ্কেল বলে ডাকলে মন খারাপ হচ্ছে। বুড়ো হয়ে যাবার সূক্ষ্ণ বেদনা বুকে চেপে পোশাকে, ভাব-ভঙ্গিতে তারুণ্য ধরে রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করছি।

তারও বছর বিশেক আগে ’৮০-এর দশকের শুরুতে দেশে ফিতাবন্দী ভিডিও ক্যাসেটে ভারতীয়, বিশেষ করে বলিউডি হিন্দি মুভি আসতে শুরু করে। তখন পুরান ঢাকার অলিগলি তস্য গলিতে কোনো পুরান দালান বা ছাপরা ঘরে হোগলার চাটাই বিছিয়ে সেসব ছবির প্রদর্শনী চলতো। পাশাপাশি চলত পর্নো ছবির বেআইনি রমরমা ব্যবসা। এমনকি মেয়েদের স্কুলের আশপাশেও চিৎকার করে সারা দিন ধরে চলত নীল ছবির প্রদর্শনীর টিকিট বিক্রি। তারই মধ্যে ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক, সাধারণ মানুষ সবাই চলাফেরা করতো। দর্শকের বয়সেরও কোনো বাছবিচার ছিল না। একটি দেশের খোদ রাজধানী শহরে এরকম উৎকট নোংরা পরিবেশ কী করে দিনের পর দিন চলতে পেরেছিল ভেবে বিস্ময়ে হতবাক হই। উপলব্ধি করি, জাতিগতভাবে আমাদের সাংস্কৃতিক মান কতটা ভিত্তিহীন, কতটা নিচু স্তরের।

স্বাধীনতার ৫০তম বছরে এসে সেই ’৮০-এর দশকের প্রসঙ্গের অবতারণার উপলক্ষ সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনা।
গত ১২ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে কাওয়ালি গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল একটি ব্যান্ড মিউজিকের গ্রুপ ‘সিলসলা’। সে অনুষ্ঠান হামলা চালিয়ে ভেঙে দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ। কাওয়ালি গানের অনুষ্ঠান কেন করতে দেয়া হবে না, কেন তাতে হামলা চালানো হবে এসব প্রশ্ন তুলছি না। কারণ হামলাকারীরা শুনবে না। তারা বোঝে কর্তৃত্ব। কর্তৃত্ব হুমকির মুখে পড়ে এমন কিছুই তারা ঘটতে দেবে না। কাওয়ালির অনুষ্ঠানের মধ্যে তারা সেই আলামত দেখেছিল। এর আগে ভিপি নুরের ওপর ৩৩ বার তারা হামলা করেছে, তাকে রক্তাক্ত করেছে। শিক্ষার্থীদের বহু ন্যায্য দাবির আন্দোলনে সশস্ত্র হামলা করেছে। কেউ প্রশ্ন করেনি, এসব হামলার অধিকার তারা কোথায় পেল। না প্রশাসন, না তাদের মূল দল, না মিডিয়া। কাওয়ালির আয়োজকদের মধ্যে ভিপি নুরের লোকজন ছিল। ছাত্রলীগ আতঙ্কিত হয়েছিল।

কাওয়ালি সাম্প্রদায়িক কোনো বিষয় কিনা সেই ব্যাখ্যা দেয়ারও প্রয়োজন মনে করি না। কারণ সেই বিচার বিবেচনার মতো মাথা ছাত্রলীগের নেই। মাত্র ক’দিন আগেই একটি উপজেলা সদরে রাজনৈতিক দলের জনসভাস্থলে পাল্টা সভা ডেকে সেই সভা পণ্ড করেছে এই সংগঠনটি। স্থানীয় প্রশাসন সেখানে ১৪৪ ধারা জারি করে। ওখানে কোনো সাম্প্রদায়িকতা বা সন্ত্রাস সহিংসতার সম্ভাবনা ছিল না। তাহলে ছাত্রলীগ সেখানে পাল্টা সভা ডাকল কেমন করে? স্থানীয় প্রশাসন, আওয়ামী লীগ অথবা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতারা ছাত্রলীগকে নিরস্ত করলেন না কেন? প্রশাসনের তো দায়িত্ব ছিল, যারা আগে সভা ডেকেছে, সভার অনুমতি নিয়েছে তাদের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য ছাত্রলীগকে সভাস্থল থেকে দূরে রাখা। সেটা তারা করেনি। বরং ১৪৪ ধারা জারি করেছে। শুধু তাই নয়, সেই সভায় বক্তৃতা করতে ঢাকা থেকে যাবার সময় পুলিশ একজন সম্মানিত সংসদ সদস্যকে মাঝপথে আটকে দিয়েছে। তাকে থানায় নিয়ে আটকে রেখেছে দীর্ঘ সময়। পুলিশের এই কাজের কোনো ব্যাখ্যা নেই। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, পুলিশ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সবাই মিলেই ছাত্রলীগকে হামলা ভাঙচুরে মদদ দিচ্ছে এবং তা দিচ্ছে কোনোরকম রাখঢাক ছাড়াই। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই একটি চরম কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার উপজাত। সুতরাং সিলসিলার অনুষ্ঠান ভেঙে দেয়া বড় বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য বিষয় হলো, হামলাকারীরা যে বন্দুকের ট্রিগার সেই বন্দুকধারীর আলখাল্লা উন্মোচন।

একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলা বা কোনো সংস্কৃতিকে গায়ের জোরে স্তব্ধ করা আদৌ সম্ভব কিনা সেই প্রশ্নও তুলছি না। কারণ প্রশ্নটি মীমাংসিত। এ দেশে রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল। সফল হয়নি। উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল, সেটাও ব্যর্থ হয়। পাকিস্তানে কাওয়ালি গানের বিরোধী কট্টর ইসলামী গ্রুপ আছে যারা এমনকি কাওয়ালদের হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। কিন্তু সে দেশে কাওয়ালি এমনই জনপ্রিয় হয়ে আছে যে, গোটা বিশ্বে তা এক উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক ধারা হিসাবে স্বীকৃত। ফতেহ আলী পরিবারের নাম শোনেনি এমন সঙ্গীতপ্রেমী সম্ভবত গোটা পৃথিবীতেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফতেহ আলী খান থেকে শুরু করে নুসরাত ফতেহ আলী খান, রাহাত ফতেহ আলী খান, ফররুখ ফতেহ আলী খান পর্যন্ত গত ১০০ বছর ধরে এই পরিবারটি কাওয়ালি গানের ধারা বয়ে নিয়ে চলেছে। নুসরাত ফতেহ আলী খানকে বলা হয় শাহানশাহ অব কাওয়ালি।

পাকিস্তানের বিখ্যাত সাবরি ব্রাদার্সও এমনই আরেকটি পরিবার। গুলাম ফরিদ সাবরি, মকবুল আহমেদ সাবরি, আমজাদ সাবরি, আসলাম সাবরি কাওয়ালির অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য নাম। আমজাদ সাবরিকে ২০১৬ সালে গুলি করে হত্যা করে একটি কট্টর ইসলামী গ্রুপ। সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ।

ভারতেও একই ধারাবাহিকতা আবহমান কাল ধরে চলে আসছে। উপমহাদেশে কাওয়ালির ইতিহাস কম করে হলেও আট থেকে নয় শ’ বছরের। খাজা মাইন উদ্দিন চিশতির মতো আউলিয়াদের মাধ্যমে নকশবন্দী তরিকার সুফিবাদের ধারা সেই দ্বাদশ বা ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে চলে আসছে কাওয়ালির মধ্য দিয়ে। খাজা নিজাম উদ্দিন চিশতি, কবি আমির খসরু থেকে নিয়ে সপ্তদশ শতাব্দীর সৈয়দ আবদুল্লাহ শাহ কাদরি যিনি সংক্ষেপে বুল্লে শাহ নামে পরিচিত তারাই এই উপমহাদেশে কাওয়ালি রচনা ও চর্চা করে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন। এটি ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে মানুষের অধ্যাত্মচর্চার এক পবিত্র সংস্কৃতির নদী।

এই মুহূর্তে ২০২২ সালে যেসব কাওয়ালি বিশ্ববিখ্যাত সেগুলোর বেশির ভাগই কিন্তু এখনকার কোনো কবির লেখা নয়। বরং সেই বুল্লে শাহ বা আমির খসরুর রচনা। আছে ভারতসম্রাট হুমায়ুনের পুত্র মির্জা মোহাম্মদ হাকিমের রচিত গান এমনকি খোদ ভারত সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের লেখাও।
এই সময়ের বিখ্যাত দুয়েকটি কাওয়ালি প্রসঙ্গ উল্লেখের লোভ সামলাতে পারছি না। তবে তার কারণও আছে। সেটা পরে বলি।

এই লেখার শুরুতে ১৯৯৮ সালের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। ওই বছর বলিউডে ‘দিল সে’ নামে একটি ছবি মুক্তি পায়। শাহরুখ খান ও মনীষা কৈরালা অভিনীত ছবিটি ফ্লপ হয়েছিল। কিন্তু এর একটি গান, ‘চল ছাইয়া ছাইয়া’ ওই সময় থেকে পরবর্তী প্রায় এক যুগ ধরে সারা ভারতবর্ষে তরুণ-তরুণীদের মুখে মুখে ছিল। এটি হয়ে উঠেছিল ভারতের সর্বকালের সেরা ১০টি গানের একটি। গানের কথাগুলো মারাত্মক। বিখ্যাত ভারতীয় কবি ও গীতিকার গুলজার এই গানটি লিখেছেন সেই সপ্তদশ শতকের পাঞ্জাবি দরবেশ কবি বুল্লে শাহর (১৬৮০-১৭৫৮) ‘থাইয়া থাইয়া’ শীর্ষক গানের অনুসরণে। বলে রাখি, বুল্লে শাহ হলেন আধুনিক পাঞ্জাবি সাহিত্যের আদিপুরুষ।

ছাইয়া ছাইয়াতে বলা হচ্ছে একটি আধ্যাত্মিক প্রেমের কথা। বলা হচ্ছে, প্রেমাস্পদ লুকিয়ে আছেন ফুলের ভেতরে, কিন্তু ফুলের খুশবুতে তার প্রকাশ ঘটছে/ যদি পবিত্র আয়াতের মতো কখনো তাকে পেয়ে যাই, আমি তাকে তাবিজ বানিয়ে গলায় ধারণ করব/সেই প্রিয়তমা আমার ঈমানের মতো, ওরই মধ্যে আমার নিঃশ্বাস (সঙ্গীত), ওতেই আমার কলেমা (বিশ্বাসের ঘোষণা), সেই প্রেমের ছায়ায় যে আশ্রয় পেয়েছে, বেহেশত তার পায়ের নিচে। এই গান পুরোপুরিই আধ্যাত্মিক চেতনার।

কিন্তু এর জনপ্রিয়তা এসেছে নারীপ্রেমের মোড়কে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে। ভারতের অসংখ্য তরুণ শুধু এই গানের বক্তব্য হৃদয়ঙ্গম করার জন্যই উর্দুর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন, উর্দু শিখেছেন, উর্দু কাব্য পাঠ করেছেন। গানের একটি চরণে আছে, ‘সেই সাথী হলেন পুষ্পসুগন্ধির মতো, যার মুখের বুলি উর্দু কাব্যের গুঞ্জরণের মতো’।
আমাদের রুনা লায়লার গাওয়া ‘দমাদম মাস্তকালান্দর’ গানটিও বুল্লে শাহর রচিত কাওয়ালি। সে গানে হযরত আলীকে প্রথম সুফি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মির্জা মোহাম্মদ হাকিমের কথা বলেছি। তিনি সম্রাট হুমায়ুনের পুত্র এবং আকবর দ্য গ্রেটের ছোটভাই। শাসনকর্তা ছিলেন কাবুলের। তার লেখা এবং সাবরি ভাইদের গাওয়া একটি কাওয়ালি এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে খ্যাত। কারণ এই সময়ের অন্যতম ইসলামী সঙ্গীতশিল্পী আতিফ আসলাম এটি গেয়েছেন এবং এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ৪০ কোটি মানুষ ইউটিউবে গানটি শুনেছে। গানটি হলো, ‘তাজদার-ই হারাম’।

প্রত্যেক কাওয়ালির শুরুতে একটি ভূমিকা থাকে, তারপর মূল কাওয়ালি শুরু হয়। তাজদার-ই হারামের ভূমিকায় বলা হচ্ছে, ‘কিসমত মে মেরি চয়ন সে জিনা লিখ্ দে/ ডুবে না কভি মেরা সাফিনা লিখ্ দে/ জান্নাত ভি গাওয়ারাহ হ্যায় মাগার মেরে লিয়ে/ আয় কাতিব-এ-তাকদির মদীনা লিখ্ দে’
‘আমার তকদিরে শান্তি ও সন্তুষ্টির জীবন নসিব করো/
ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সাগরেও আমার তরী যেন ডুবে না যায়
সেই ভাগ্য নসিব করো/
বেহেশত আমার কাম্য নয় এমন না/
কিন্তু, ও আমার নিয়তির লিপিকার,
আমার কপালে মদীনা লিখে দাও।’

এরপর মূল কাওয়ালিতে পবিত্র হারাম শরিফের মালিকের প্রতি নানা আকুতি জানিয়ে শেষে ভক্ত আশিকদের প্রতি আহŸান জানানো হচ্ছে এই বলে, ‘এসো আমরা মদিনায় চলে যাই, এই পবিত্র মাসে (রমজান), আমরা মদিনায় যাই/সেখানে জীবনের কোনো দুঃখ নেই, নেই মৃত্যুর ভয়/তাঁর (রাসূল সা:) গৌরবের বিস্ময় এখানেই তো দীপ্তিমান হয়েছিল।’
মির্জা হাকিম কিন্তু সম্রাট আকবরের মতো ধর্মীয় সংস্কারপন্থী বা ধর্মসমূহের সমন্বয়প্রয়াসী ছিলেন না। তিনি ইসলামের সত্যিকারের আদর্শ অনুসরণ করতেন বলে জানা যায়।
আরেকটি কাওয়ালি এই সময়ের তরুণদের ক্রেজে পরিণত। সেটি হলো, ‘কুন, ফা ইয়া কুন, কুন, ফা ইয়া কুন’। লিখেছেন এই সময়ের বলিউড সিনেমার অন্যতম তরুণ গীতিকার ইরশাদ কামাল। গানটি রকস্টার ছবিতে ব্যবহার করা হয়। ‘ছাইয়া ছাইয়া’ এবং ‘কুন, ফা ইয়া কুন’ গেয়েছেন বিশ্বখ্যাত এ আর রহমান। এ কারণে এই গানগুলো সর্বভারতীয় শুধু নয়, বিশ্ব পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রতিটি কাওয়ালির বাণী অতি উচ্চমার্গের এবং তুঙ্গস্পর্শী প্রতীকী কাব্যিক ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ। একে বলা যায় আত্মার নিগূঢ় স্পন্দনের বাণীরূপ। খোদায়ী প্রেম অনুভবের লোকজ মাধ্যম। বাংলাদেশে এর চর্চা নেই বললেই চলে। কিন্তু বিশাল বিশাল ওয়াজ মাহফিল করে ইসলামের আবেদন মানুষের কাছে যতটা না পৌঁছানো সম্ভব, একটি কাওয়ালির মাধ্যমে ততটাই সম্ভব মনে করি।
মুসলিম সমাজে অনেক বেদাত ছিল, এখনো আছে। সব বেদাত ঝেঁটিয়ে বিদায় করার কিছু কুফলও আছে। কাওয়ালিতে কখনো এমন কিছু বিষয় বা বাণী থাকে যা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের সাথে ঠিক যায় না। যেমন এ আর রহমানেরই গাওয়া একটি সুবিখ্যাত কাওয়ালি ‘তু কুজা মন কুজা’। খাজা মাইন উদ্দিন চিশতির (রহ:) উদ্দেশে গাওয়া। এতে একটি বাক্য আছে, ‘তেরা দরবারে খাজা, শির ঝুকাতি হ্যায় খাজা।’ ঠিক যেন, ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা।’ ইসলামের সাথে যায় না। কিন্তু ইসলামের মর্মবাণীর সঙ্গে বেমানান কিছু কথা আছে বলে গোটা কাওয়ালি বিষয়টাকেই যদি জনজীবন থেকে হটিয়ে দিই তাহলে ক্ষতির কারণ আছে। সেটা বড় ক্ষতি। এ প্রসঙ্গে শবেবরাত পালনের বিষয়টি বলতে পারি। হিন্দুদের দেওয়ালি উৎসবের মতো করে আলো জ্বালিয়ে পালন করা হতো এবং কুরআন হাদিসে জোরালো কোনো উল্লেখ নেই বলে বিষয়টি এখন প্রায় বর্জিত। কিন্তু আমরা খেয়াল করিনি যে, এই উৎসব পালনের দিনে মহল্লার প্রতিটি ঘরে রুটি-হালুয়া বা রুটি-গোশত বিতরণের মধ্যে যে সামাজিক বন্ধন, সম্প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টি হতো, গরিবের জন্য যে দান-ধ্যানের সুযোগটা ছিল তার সবই বন্ধ হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় যে জিনিসটি হারিয়েছে সেটি হলো, মুসলিম সমাজের একটি সর্বজনীন উৎসবের আমেজ। এই আমেজ দুই ঈদের ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের ভেতর ঠিক যেন পাওয়া যায় না। উৎসবের আমেজের লোভেই আমাদের ছেলেমেয়েরা হিন্দুদের নানা পূজা পার্বণে যোগ দিতে যায় এই সত্য অস্বীকারের উপায় নেই। এজন্যই শবেবরাত উৎসবের প্রয়োজন ছিল। ছেলেরা মসজিদমুখী হতো। মেয়েরা সন্ধ্যায় গোসল করে রাতভর নফল নামাজের চেষ্টা করতো। এটি বন্ধ হওয়ায় কী ক্ষতি হয়েছে, যারা বুঝতে অক্ষম তাদের সঙ্গে তর্কে যাবো না। শুধু মনে রাখবো, ইসলামী বিপ্লবের পরও ইরানে নওরোজ উৎসব বন্ধ করে দেয়া হয়নি।

কাওয়ালি প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলা দরকার। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় চেতনা সামাজিকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার হাতিয়ার হতে পারে কাওয়ালি। আমার বিশ্বাস, ‘কুন ফা ইয়া কুন’ গান গেয়ে বা শুনে যে তরুণ আবিষ্ট হয়ে থাকবে, সে আর যাই হোক কখনো নাস্তিক হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাওয়ালি অনুষ্ঠানে হামলার প্রতিবাদ হিসাবেই সারা দেশে, সব শহরে বন্দরে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তোলপাড় তোলা কাওয়ালির অনুষ্ঠান করা উচিত। এই হাতিয়ারটিকে শাণিত করে তা কাজে লাগানো উচিত।

কাওয়ালি ইসলামী সংস্কৃতির ঐতিহ্য এমনটা বলা হয়তো সর্বাংশে ঠিক নয়। তবে এটি অবশ্যই মুসলিম সংস্কৃতির অঙ্গ। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মুসলমানিত্বের অংশীদারিত্ব না থাকলে ’৮০-এর দশকের পুরান ঢাকার ভিসিআর সংস্কৃতির মতো নোংরামি ছড়ানোর শঙ্কা থেকে যায়।
mujta42@gmail.com


আরো সংবাদ


premium cement